সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ১৬)

ইচ্ছামণি

পর্ব ১৬

পুনেতে অফিস ট্যুরে গিয়ে তিন প্যাকেট চানাচুর জাতীয় ভুজিয়া যার প্যাকেটের গায়ে লেখা ‘চিউড়া’ নিয়ে এসেছিল অতীন। ঘুম যখন আসছে না ওষুধ খেয়েও, তখন পালা করে চিউড়া আর কাজু বরফিই খাওয়া যাক। স্যুপের প্যাকেটগুলো গত কয়েক রাতে শেষ করে ফেলেছে।
দেখতে দেখতে চিউড়া বা ভুজিয়ার প্যাকেট শেষ হয়ে গেল। অসময়ে খেয়ে গা গুলোচ্ছে। কী মুশকিল! আবার বমি হবে না তো? লেখা থাক। একটা অ্যান্টাসিড খেয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু পা শিরশির করছে। রুমার বাবারও করে থাকে। এবং এজন্য মাকে রাত্রে খাটাখাটনির পরও বিছানায় এসে না ঘুমিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাবার পা টিপতে হোত বা এখনও বোধহয় হয়। বাবা ঘুম না আসা পর্যন্ত বিনা অস্বস্তিতে সেবা নিয়ে যেত। রুমা তখন রাগে ঘুমোতে পারত না। যতক্ষণ টের পেত মা স্বামীর পদসেবা থামিয়ে ঘুমের অনুমতি পায়নি, ততক্ষণ রুমা পাশের ঘরে জেগে থাকত। ওর উচ্চ মাধ্যমিক শুরু হওয়ার আগের রাতে ও বাংলা বই খুলে পড়বে কী, রেগে কেঁদে, দাঁতে দাঁত ঘষে ঠায় বসেছিল। কতক্ষণ মনে নেই, হয়তো ঘণ্টা খানেক পরে ও ঘর থেকে মা দেখতে এসেছিল মেয়ে কী করছে। সকালে পরীক্ষা, না শুলে সুস্থ ভাবে দিতে পারবে? মাও শুয়ে পড়েছে টের পাওয়ার পর রুমা বোনের পাশে শুয়ে পড়েছিল।
বোন দিয়া অবশ্য ওদের শোবার ঘরে আলো জ্বেলে পড়লে প্রচণ্ড অশান্তি করত। মশারির বাইরে মশার কামড় খেতে খেতে পড়াটা কতটা কষ্টসাধ্য কিছুতেই বুঝতে চাইত না। পরীক্ষার আগেও কোনও ছাড় নেই। অথচ নিজের পরীক্ষার জন্য দিদির ওপর জুলুমবাজি – আইসিএসই পরীক্ষা পর্যন্ত দিদি ছাড়া ওর পড়াই হোত না। আর পরের দিকে তার পরীক্ষার আগে পড়াশুনোর চাপ বাড়লে দিদির ঘরে পর্যন্ত থাকা চলত না, এমনকি বাড়ি থেকে চলে গেলে ভালো হয়। দিয়ার স্বভাব অনেকটা বাবার মতো। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ছাড়া কোনও কিছু বুঝতে চাইত না। ওর স্কুলের জন্যও যখন ওর দিদি রাত জেগে পরিশ্রম করে এক একটা হস্তশিল্প তৈরি করত, তখনও ঘরে আলো জ্বালালে খেপে যেত।
আজকাল বারবার লাইট অন করলে অতীনেরও ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু পা শিরশির করলে রুমা কিছুতেই স্থির হয়ে শুয়ে থাকতে পারে না। সে মেয়েমানুষ। বাবার মতো অবিবেচক হয়ে কাউকে তো পা টেপার কথা বলতে পারে না। আবার উঠে একটা স্যারিডন খেয়ে শুয়ে পড়ল। হাল্কা হাল্কা ঘুম আসছে। শিরশিরে ব্যাথাটা গেলে হয়ত পুরোপুরি চলে আসবে। যদি না আসে? আবার উঠে ঘুমের জন্য ভুলে যাওয়া ওষুধগুলোও খেয়ে নিল। সকালে এই ওষুধের হ্যাংওভার অবশ্যম্ভাবী এবং আবার এক প্রস্থ সংঘাত অনিবার্য। বেচারা অতীন।
“হ্যাঁ গো, অরুণ কোলের সঙ্গে কথা বলেছ?”
“কোন অরুণ কোলে?”
“সি কী! যার ফ্ল্যাট দেখবে বলে সেদিন আমাকে গ্রীন পার্ক নিয়ে গেলে। এর মধ্যে নাম ভুলে গেলে? কথা হয়নি?”
“কথা আবার কী হবে? আমরা ডিসাইড করলেই সেল এগ্রিমেন্ট সাইন করা হবে।”
“আমরা ডিসাইড করছি না কেন? আমার তো ছোটোর ওপর ফ্ল্যাটখানা মন্দ লাগেনি। তখন দক্ষিণ পশ্চিম খোলা প্লাস রাস্তামুখো পাচ্ছিলাম দেখে তো সেদিনই মত দিয়েছিলাম। ওটা কতদিন খালি থাকে কে জানে? হয়তো এখনও আছে। আজ যাবে কথা ফাইনাল করতে?”
“বললাম তো ফাইনাল করার কিছু নেই। গেলেই হল।”
“তাহলে যাচ্ছি না কেন? আমি এখনই তৈরি হয়ে নিতে পারি। হব?”
অতীন নিরুত্তর। রুমা বারবার একটা সদুত্তরের আশায় প্রশ্ন করে গেল। অতীন টিভি খুলে বলল, “গুবলু কি ওপর থেকে নামবে না? কতক্ষণ লোকের হেফাজতে রেখে দেবে?”
“গুবলুকে তো ওরা সময়মতো রোজই দিয়ে যায়। এই তুমি আসার মিনিট পনেরো আগে গেছে। আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেছ বলেই বলছি, আজ ঘুরে আসা যায়। আর প্রয়োজনটাও তো আমাদেরই।”
“ওফ্‌! অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে খুব অপরাধ হয়ে গেছে বুঝতে পারছি। স্যরি। আর কাল থেকে ভুল হবে না।”
“আমি কি তাই বললাম? তাড়াতাড়ি এলে কত কাজ করা যায়। আমি সময়টা ইউটিলাইজ় করার কথা বলেছি। এতে এত রাগ করার কী আছে?”

ক্রমশ….

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।