সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শুভস্মিতা কাঞ্জী (অন্তিম পর্ব)

কলিকাতা বিশ্বাবিদ্যালয় থেকে সম্মানিক ভূগোল নিয়ে পাশ করার পর, ওখান থেকেই ভূগোলে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে এই মুহূর্তে নিজের এন.জিও, নাচ এবং লেখালিখি নিয়ে আছেন। 

বন্ধু

শেষাংশ

নবারুন চিঠিটা খোলে, তাতে লেখা,
“আমি জানি তুই আসবি, খেয়াল রাখবি, যত্ন নিবি আর সব থেকে জরুরি এতদিনের না বলা কথাটা বলবি! আমি চাইনা, আমি চাইনা যেটা এতদিন না বলা হয়েই রয়েছে সেটা এই সময়ে তুই বলে সবটা আবার ঘেঁটে দিস, তাই কাল তুই চলে যাওয়ার পরই ডাক্তারবাবুর কাছে আর্জি জানাই আমাকে ছুটি দেওয়ার জন্য, উনি দেননি, বাধ্য হয়ে রেফার করতে বলি, উনি চাননি তারপর জোর করাতে রেফার করলেন, অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছি | একদিন বাবা মার জন্য আমাদের বিচ্ছেদ হয়েছিল, আজ স্বইচ্ছেয় দেখা হল, এই দেখাটা বোধহয় নাহলেই হত! আর আমরা পুরানো বাড়ি বদলে নিয়েছি|
ভালো থাকিস |
ইতি তোর মালু”
চিঠিটা পড়ে টুলে বসে পড়ে | বুকের ভিতরটা বড় কেমন করে, ও তো ভুলেই গেছিল মালিনী ওকে পরতে পরতে চেনে, ওর সব মনের কথা বোঝে! ও জানত খুঁজলেও মালিনী কে আর পাবে না, বাড়িতেও পাওয়া যাবে না | আরও একটা বিচ্ছেদ!
মেনে নিল, কারণ মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না যে|
সময় যায়, ধীরে ধীরে আবার অভ্যস্থ হতে থাকে নিজের ব্যস্ত জীবনে নবারুন, অন্যদিকে মালিনীও বাড়ি ফেরে, ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে, আর বেশিদিন নেই ওর হাতে, কমপ্লিকেটেড হয়ে গেছে , সন্তান টা পৃথিবীতে আসার সময়টুকু পাবে কিনা কে জানে! মালিনী মনে প্রানে চাইতে থাকে সন্তান আসার আগেই যেন ও চলে যায় | কিন্তু ওই আমরা চাই এক হয় আরেক!
মাসের পর মাস কাটে, মালিনীর সন্তান হয়, মেয়ে হয়! মেয়েটির হওয়ার পর ওর অবস্থার আরও অবনতি হয়, এবং তিনদিনের মাথায় চলে যায় সে চিরতরে সবাই কে ফাঁকি দিয়ে |
মাস দেড়েক কাটে, নবারুন দোকান থেকে বেরোচ্ছে এমন সময়,
-নবারুন
ও পিছনে ফিরে দেখে মালিনীর বাবা, কোলে একটি বাচ্চা |
-বলুন
-তোমার সাথে একটু কথা বলা যাবে?
-হ্যাঁ কেন নয়?? মালিনী কেমন আছে?? এটা কে???
-সব বলব, আগে কোথাও বসি?
-হ্যাঁ বাড়িই চলুন| এই সামনেই, দুটো গলি ছেড়ে|
-আচ্ছা |
ওরা নবারুনের বাড়ি আসে, ওঁকে জল দিয়ে বসতে বলে, নবারুনের মা ও এসে বসেন, ভদ্রলোক বলেন,
-মালিনী চলে গেল, গত মাসে
-মানে! আমাকে একবার জানালো না!
-না, ও জানত ওর চলে যাওয়াটা তুমি মেনে নিতে পারবে না, ও চেয়েছিল সন্তানটা আসার আগেই যাতে…(ভদ্রলোকের গলা বুজে আসে, চোখটা মুছে আবার বলেন) কিন্তু হল না, বাচ্চাটা হল যেদিন তার তিনদিনের মাথাতেই |
নবারুন স্থানুবৎ বসে থাকে, বুকের ভিতরটা শেষ হয়ে যাচ্ছে, শেষবারের মত মেয়েটাকে দেখতে অবধি পারল না! এত নিষ্ঠুর কেন ও?? কেন??
ভদ্রলোক বলেন,
-যাওয়ার আগে তোমার জন্য একটা চিঠি লিখে গেছে, সেটা দিতেই এলাম |
ওর হাতে চিঠিটা দিল, নবারুনের মা এসে বাচ্চাটাকে কোলে নিল,
-আহা এইটুকু বয়সে কী হারালো, কোনদিন বুঝবেও না!
নবারুন চিঠিটা খোলে,
“নবো,
জানি স্বার্থপর হচ্ছি, কিন্তু উপায় ছিল না, আমি জানি তুই আমার অবস্থা জানলে …থাক সেসব!  জানিস আমি চেয়েছিলাম সন্তান আসার আগেই আমার মৃত্যু হোক, হল না, ওর আসার সময় হয়ে এসছে প্রায়, আর মন কেন জানি না বলছে আমার হাতেও আর সময় নেই, তাই তোকে একটা দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি, জানি তুই রাখবি | যে কথাটা আমাদের বলা হয়নি কখনও, যে কথা কখনও আমি শুনতে চেয়েছি তুই বলিসনি, কখনও তুই বলতে চেয়েছিস আমি শুনিনি, আমাদের সম্পর্কটা বড়ই অদ্ভুত রে! তবে আমি লাকি যে তোর মতন বন্ধু পেয়েছি, যাক গে, যেটা বলার যে কথা বলার ছিল  বলা হয়নি সেই কথার দোহাই দিয়ে বলছি আমার সন্তানটাকে তোর পরিচয়ে বড় করবি? মানুষ করবি ওকে?? মানুষ করবি ওকে তোর আদর্শে? তোর স্বপ্নে?? আমি চাই ও তোর ছায়ায় বেড়ে উঠুক! আমার আমিটাকে তোর কাছে দিয়ে যাচ্ছি, পারলে নিজের করে নিস, বাবা মা আর কদ্দিন তাই ওকে একটা নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে গেলাম…”
এরপর অনেকটা ফাঁকা পিছনের পাতার একদম শেষে লেখা
“ভালোবাসি..ভালো থাকিস, ভালো রাখিস, আমাদের আর দেখা হল না, তোকে বড় দেখতে ইচ্ছা করছিল…”
আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না নবারুন| বাচ্চাদের মত হাউহাউ করে কেঁদে উঠল|
মালিনীর বাবা এসে ওর কাঁধে হাত রাখে,
-আমার দোষ, সেদিন তোমায় ভুল না বুঝে, তোমাদের সম্পর্ককে ভুল না বুঝে যদি |
নবারুন চোখটা মুছে মায়ের কাছে গিয়ে বাচ্চাটা কে কোলে নেয়, বলে
-আজ থেকে ও আমার, আমার আর মালিনীর সন্তান
নবারুনের মায়ের চোখেও জল, ভদ্রলোকেরও |
মাঝে সতেরোটা বছর কেটে গেছে,
-বাপি, চলো , আর কতক্ষন লাগবে!
-তোর বাপি এখনও ইয়াং না! একটু সাজুগুজু করবে না?
-সেই! মাথায় সাদা চুলগুলো উঁকি মারছে সে খেয়াল আছে?
-ওটাই তো চার্ম!
-সেই তো! চলো এবার
-চ
বাপ মেয়ে বেরোয় | গন্তব্যে পৌঁছয়, মেয়েকে প্রথমদিন কলেজে নামিয়ে গেল | নবারুন মালিনীর মেয়ে মালশ্রী ওদের কলেজেই কেমিস্ট্রি তে ভর্তি হয়েছে, আজ প্রথম দিন ওর কলেজের, তাই মেয়েকে ছেড়ে গেল নবারুন, নিজের কলেজবেলার কথা মনে পড়ে গেল, সেই প্রথম দিন কলেজ গেট পেরিয়ে কলেজ প্রবেশ আর তারপর কত স্মৃতি, কত কথা আর মালিনী….. যে হারিয়ে আজও আছে, ভীষন রকম আছে, ভালোবাসা যে অবিনশ্বর! এই কলেজই নবারুন কে ওর প্রিয় বন্ধু দিয়েছে, সবথেকে কাছের বন্ধু দিয়েছে, সব সম্পর্কই যে বন্ধুতেই শুরু বন্ধুতেই শেষ!
মেয়ে হেসে ঢুকে গেল নিজের জীবনে বাঁচতে হয়তো সেও তার প্রিয় বন্ধু এখান থেকেই পাবে…নবারুন ফিরে আসে, সাথে থাকে মালিনীর স্মৃতি |

 

সমাপ্ত

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।