জন-জনি জনার্দন সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে তৃষ্ণা বসাক (পর্ব – ৩১)
জাগি রাত একা বাসরে
পর্ব – ৩১
বিয়ে নিয়ে যতগুলো বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচলিত আছে, তার মধ্যে এটা বোধহয় সবার সেরা- আজকাল মেয়েদের বিয়ে বেশি হচ্ছে। ভারি মুশকিল, ছেলেগুলো তাহলে করছেটা কী? বুঝিবা অতীব সরল কোন লোক এর উদ্ভাবক, যে কেবলই মেয়ের বাড়ি থেকে নেমন্তন্ন পেত বলেই এরকম একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল।
বিয়ে হবার কোন সম্ভাবনা নেই, আইনে আটকে যাবে, এমন বয়সেই বুঝি বিয়ে নিয়ে কৌতূহলটা বেশি থাকে। আর সেই বয়সেই বিয়ে, বউ, বর বিষয়ক ছড়া বা ধাঁধা কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলে বেশ একটা আত্মপ্রসাদ লাভ করা যায়। মনে নেই কে প্রথম জিগ্যেস করেছিল ‘বলতো বাটা বানান কী?’ তখন কি ছাই জানি, এ হচ্ছে সেই বিখ্যাত প্রশ্ন, যার সঠিক উত্তর দিলে ঈশ্বরের বাগান থেকে জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়ে একেবারে নির্বাসিত হতে হয়। সরল বিশ্বাসে বললাম ‘কী আবার? বি এ টি এ’ এর পরে কী হয়? প্রশ্নটা তো সহজ খুবই, উত্তরও তো জানা। অতর্কিতে পরের প্রশ্ন ‘তাহলে বিয়ে টিয়ে কবে করছিস?’ এই প্রশ্নোত্তর পর্বের পর কেউ আর অমল শৈশবে থাকতে পারত না, তাকে নির্বাসিত হতে হত শিশুর স্বর্গ থেকে বড়দের জটিল পৃথিবীতে, কারো কারো অবসেশনই হয়ে যেত বিয়ে। নিরীহ ছড়ায় বিয়েকে জুড়ে দিয়ে কি যে মজা!
‘বল দিকিনি কাচের গেলাস
তোর বউটা ফাস্টোকেলাস!’
‘বল দিকিনি পাথরবাটি
তোর বউকে নিয়ে সাঁতার কাটি!’
পড়ে পড়ে ক্লান্ত যুবকরা বলত ‘সারাজীবন হ্রস্ব ই হ্রস্ব ই করেই কেটে গেল, হ্রস্ব উ যে কবে আসবে!(এর ভাবার্থ হল সারাজীবন বই বই করে কেটে গেল, বউ যে কবে আসবে?’)
বিয়ে নিয়ে স্মরণীয় গানও আছে অংশুমান রায়ের-
‘দাদা পায়ে পড়ি রে/ মেলা থেকে বউ এনে দে/
তুই দাদা বউকে নিয়ে সুখে করিস ঘর/ আমি বউ চাইতে গেলে গালে মারিস চড়/ তুই চাসনা আমি বউকে নিয়ে খেলা করি রে/ মেলা থেকে বউ এনে দে’
এর প্রায় কাছাকাছি একটা হিন্দি গান ছিল ‘মুন্না তেরা হো গয়া, মুন্না মেরা কেয়া হোগা?’ এইসব গানে যে সিন্ড্রোম ফুটে উঠেছে, তাকে বলে বিয়েপাগলা সিনড্রোম।সংক্ষেপে বি পি। শুনেছি আমার পিতৃকুলে, বাবার জেঠতুতো ভাইয়েরা উনিশ কুড়ি বছর বয়সের পর দাড়ি রাখতে শুরু করত আর মন্দিরের চাতালে গিয়ে শ্যামাসংগীত গাইত। এ ছিল একটা সঙ্কেত। এই সংকেতের অর্থ ‘ভালো চাও তো বিয়ে দিয়ে দাও, নইলে সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে যাব’ এই সঙ্কেত পেলেই বাড়ির লোক ঘটককে খবর পাঠাতেন, তড়িঘড়ি পাত্রী দেখে ছেলের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত।মেয়েদের বেলা অবশ্য কোন সংকেতের বা সম্মতির অপেক্ষা করত না সমাজ। তাদের বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত জন্ম থেকেই। প্রবাদ আর ছড়াগুলো তো সেই ইঙ্গিতই দ্যায়-
‘ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে’ (এইটা লিখতে লিখতে আমার রবি ঠাকুরের মা সারদাসুন্দরীর কথা মনে পড়ছে। মা স্নানে গিয়েছেন, এমন সময় ঘটকী এসে তুলে নিয়ে এলেন সাত বছরের মেয়ে সারদাকে দেবেন ঠাকুরের সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্যে, ফিরে মেয়েকে না দেখতে পেয়ে মৃত্যু হল মার)
‘দোল দোল দুলুনি/ রাঙা মাথায় চিরুনি/ বর আসবে এখুনি, নিয়ে যাবে তক্ষুনি’
‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে
ছাদনাতলায় কে?
হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে
সোনামণির বে’
‘খুকু যাবে শ্বশুরবাড়ি
সঙ্গে যাবে কে?
বাড়িতে আছে হুলোবেড়াল
কোমর বেঁধেছে’
খুকুদের পাশাপাশি খোকাদের বিয়ের উল্লেখ প্রায় নেই বললেই চলে।এর থেকেই হয়তো সিদ্ধান্ত হয়েছিল মেয়েদের বিয়ে বেশি হয়! তবে বাংলা ছড়ায় কিন্তু একটি পুরুষের বিয়ের ঘটাপটা খুব। তিনি বিখ্যাত শিবু ঠাকুর।
‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
নদে এল বান
শিবঠাকুরের বিয়ে হল
তিন কন্যে দান
এক কন্যে রাঁধেন বাড়েন
এক কন্যে খান
এক কন্যে রাগ করে
বাপের বাড়ি যান’
আমার দেখা প্রথম বিয়ে সম্ভবত টুকিদির বিয়ে, যেখানে ছাদনাতলায় যাবার আগেই টুকিদি পালিয়ে গেল।এর পরে স্মরণীয় দুই মামার বিয়ে, যেখানে ভোজনবীর হিসেবে আমার দাদা নাম করেছিল। স্তূপীকৃত সন্দেশ গলায় আটকে যাওয়ায় সে দই দিয়ে মেখে নিয়েছিল, আর সেই দেখে মর্মাহত বড়রা তাকে ইশারায় বলেছিল আর ইজ্জতে গ্যামাকসিন না ঢেলে উঠে আসতে। কারণ সেটা ছিল কন্যাযাত্রীর ব্যাচ।
কেউ যদি সেকাল আর একালের বিয়েবাড়ির একটা তুলনাত্মক রচনা লিখতে চায়, তবে দেখা যাবে এই সব ভোজনবীরের আর দেখা মেলে না। ষাটটা রসগোল্লা বা তিরিশটা মাছ খাওয়া তাদের কাছে কোন ব্যাপার ছিল না।
বিয়ে কিন্তু এখনো জীবনের মেজর ইভেন্ট, সেটা বুঝি, যখন দেখি হালের আশি শতাংশ সিনেমাই বিয়ে কেন্দ্রিক-
হাম আপকে হ্যায় কোন
বিবাহ
তনু ওয়েডস মনু
তনু ওয়েডস মনু রিটান্স
শুভ মঙ্গল সাবধান
আরও অসংখ্য সিনেমার থিম বিয়ে। এর কারণ বোধহয় ভারতীয় বিয়ের রকমারি আচার অনুষ্ঠানের ভিজুয়ালস– র আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য, আর লোকে হারিয়ে যাওয়া যৌথ পরিবারের আনন্দ পেতে চায় এই সেলুলয়েডের বিয়েগুলো দেখে।
আমার একটু কম জানা একটা বিয়ের ছবির কথা মনে পড়ছে, বাংলায়। তার নাম শুভবিবাহ। বিয়ের দিন কনের নিরুদ্দেশ হওয়াকে কেন্দ্র করে একটা দুরন্ত ফ্যামিলি ড্রামা, যাতে শেষে আলমারিতে লুকোনো পারিবারিক অপরাধের কংকাল বেরিয়ে এল।
আর যদি খাওয়াদাওয়ার কথা বলা হয়, আমার ভোট পুরনো বিয়েবাড়ির দিকেই যাবে।আদা কুচি, বাদাম দেওয়া লাল শাক, লেজওলা বেগুন ভাজা, শুক্তো, ছেঁচড়া, খাসির মাংস এবং বাড়িতে ভিয়েন বসিয়ে বানানো অসাধারণ সব মিস্টি। যদি আত্মীয়ের বিয়ে হত, তবে তো রাতে থাকা হবে এবং সকালে জলখাবার হিসেবে বাঁধা বাসি লুচি ও বোঁদে। ‘জীবনস্মৃতি’র বয়ান অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথ এখো গুড় দিয়ে বাসি লুচিতে অমৃতের স্বাদ পেয়েছেন, বোঁদে দিয়ে খেলে অমৃততর স্বাদ মালুম হত নির্ঘাত! সেইসময় কলাপাতার বদলে কাগজের ফুলকাটা প্লেট এবং ফ্রায়েড রাইস এর প্রচলন হল। আমি বলতাম ফেরাডাইস। প্যারাডাইসের মতোই!
প্রফুল্ল রায়ের স্মৃতিকথা ‘যখন যা মনে পড়ে’-তে দেশভাগের আগের পুব বাংলার গ্রামের বিয়ের ভোজের একটা দারুণ ছবি পাই।
‘আমার সেই অল্প বয়সে বিয়ের ভোজ বলতে ছিল উৎকৃষ্ট রূপশাল কি সুগন্ধি গোবিন্দভোগ চালের ভাত, খাঁটি গাওয়া ঘি, বেগুন আলু এবং দুরকম মাছভাজা, মাছের মাথা দিয়ে ঘন সোনামুগের ডাল, তিন চার পদের মাছ, গরমকালে আম, নইলে আনারস বা আমসত্ত্বের চাটনি, দই, ক্ষীর এবং চার পাঁচরকম মিস্টি।
তখনও বিয়েবাড়িতে লাচ্ছা পরোটা, কোর্মা, কাবাব, বিরিয়ানি, আইসক্রিম ইত্যাদির কথা কেউ ভাবতেই পারত না। বাঙ্গালির মতো অনুকরণপ্রিয়, নকলনবিশ জাত ভূ-ভারতে দ্বিতীয়টি আর নেই। অনেক বছর বাদে কলকাতায় লক্ষ্য করেছি বাঙ্গালিদের বিয়ের ভোজে কিংবা অন্য অনুষ্ঠানে মোগলাই, কন্টিনেন্টাল খানা ঢুকে পড়েছে। সেই সঙ্গে ফুচকা, জিলিপি, টিলিপি। নিজেদের ট্র্যাডিশনাল সব সুখাদ্য তাদের কাছে ব্রাত্য’ সেই বিয়েতে নতুন আমদানি হল, লুচি আর নারকেলের কুচি, কিশমিশ দেওয়া ছোলার ডাল, গ্রামের একজন ১৯৩০ সালের কলকাতার বিয়েবাড়িতে দেখেছিলেন।
এই যে সমবেতভাবে (আত্মীয় তো বটেই, পাড়ার লোকজনও তাতে শামিল) বসে ভোজের মেনু ঠিক করা, এই ব্যাপারটার মধ্যে বেশ ট্রাজি-কমিক একটা ব্যাপার আছে। ট্রাজেডিটা তো সবাই জানেন, নিজের বিয়ের লোভনীয় খাবারগুলো আয়েশ করে খাবার সৌভাগ্য খুব কম ছাদনাতলা-যাত্রীরই হয়েছে।আমি কিন্তু একেবারে ট্র্যাডিশনাল বিয়ের কথাই বলছি। সারাদিন ধরে ধোপার কাপড় আছড়ানোর পর গভীর রাতে অত তেল মশলা খাওয়ার দম কার বা থাকে? তাদের কপালে নাচে পরদিন টোপা বড়ি ভাসা জিরেবাটার অশ্রুসজল মাছের ঝোল। তবে যার বিয়ে তার কপালে না জুটলেও, প্রাক্তন প্রেমিকরা কিন্তু সে ভোজ কব্জি ডুবিয়ে খায়, মোটেই সবাই দুঃখে দেবদাস হয়ে যায় না। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রণয় পরিণাম’ গল্পের মানিকলাল, হিন্দু বয়েজ স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র, প্রতিবেশিনী বালিকা কুসুমলতার ‘লভ’-এ পড়েছিল। রীতিমতো শিক্ষিত প্রেম। চোদ্দ বছর বয়সে মৃণালিনী, চন্দ্রশেখর, উদ্ভ্রান্ত প্রেম থেকে সোহাগিনী, বউরানী ইত্যাদি পড়ে সে যাকে বলে প্রেম একেবারে গুলে খেয়েছিল। আর কবিতাও লিখতে শুরু করেছিল-
কুসুমলতা
মনের কথা
শুন সই
দিবা রজনী
তব মুখখানি
মনে লই।
এতকিছু করেও শেষ রক্ষা হল না। বাপ ডাক্তার নন্দ চৌধুরীর কয়েকটা চড় খেয়ে মানিক প্রেমে ক্ষান্ত দিল।
‘উপন্যাসের অনুকরণে প্রেমে পড়িয়াছিল, কিন্তু উপন্যাসের অনুকরণে গৃহত্যাগ করিল না, বিষও খাইল না। বিষ খাইল না বটে – তবে কুসুমের বিবাহের সময় লুচি খাইল বিস্তর। এত খাইল যে পরদিন অসুখ হইয়া গেল।’
এর থেকেও অধিক কমেডি ঘটে যখন কোন বৃদ্ধ বৃদ্ধার মৃত্যুর পরে শ্রাদ্ধ বা মৎসমুখীর মেনু ঠিক হয়। আমার দাদু, সম্ভবত সত্তরের মতো বয়স হয়েছিল, তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর দশ ছেলেমেয়ে, জামাই, পুত্রবধূরা মিলে যে মেনু ঠিক করেছিল, আমি সেই সভার নীরব সাক্ষী হিসেবে বলতে পারি, বাবা এটা খেতে ভালবাসতেন বলে প্রত্যেকে তার পছন্দের ডিশ ঢুকিয়ে দিয়েছিল। না, শ্রাদ্ধের কথা আজ নয়, আজ শুধু বিয়ে।
বিয়ে মানেই শুধু কিন্তু একটি নারী ও একটি পুরুষের (পলিটিকালি কারেক্ট বললে দুটি মানুষের, নারী পুরুষ যাই হোক) একসঙ্গে পথ চলার শুরু নয়, এর সঙ্গে ফ্রি অফার হিসেবে আসে দুজোড়া শ্বশুর শাশুড়ি, ননদ, দেওর, শালি শালা, আরও কত কী। আর বরপক্ষ কন্যাপক্ষ তো বিয়ের দিনটাকে ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ম্যাচের মতো উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে। বউদির বোনের ঝুপ করে প্রেমে পড়ে যাওয়া, দিদির দেওরকে দেখে বুকে একটা মৃদু ব্যথা -এসব তো আছেই, আমার কাছে পারিবারিক বিয়েগুলোর বড় আকর্ষণ ছিল বিয়ের বাসর, যেখানে সারারাত জাগার আর জেগে অসাধারণ গান শোনার ছাড়পত্র পাওয়া যেত। এখন বিক্রমপুরে যাওয়া বাঙালি (যাদের সংস্কৃতির রত্নভাণ্ডার বিক্রি হয়ে গেছে কবে!) যে সঙ্গীত বা মেহেন্দি অনুষ্ঠানে ঢোলক বাজিয়ে গান করে বা ডিজে এনে মোচ্ছব মানায়, তার তুলনায় সত্যিই স্বর্গীয় ছিল এই বাসরগুলো, যেখানে সদ্য গান শেখা কিশোরীটি আত্মবিশ্বাসী হতে শিখত।
সেইরকম একটি বিয়ের বাসরের কথা কোনদিন ভুলব না। মায়ের মাসতুতো বোন, পিংকুমাসির বিয়ে। ডায়মন্ডহারবারের বিখ্যাত লজ সাগরিকা বুক করা হয়েছে। উল্টোদিকে নদী। বর এবং বরযাত্রীদের দেখেই মনে হল অ-সুর প্রজাতির। যখন বাসর জাগার কথা বলা হল, তারা বলল, বেজায় ঘুম পেয়েছে। তাদের বাদ দিয়েই অন্য বাসর বসল সাগরিকার ছাদে। সেদিন ছিল পূর্ণিমা। জ্যোৎস্নায় চরাচর ভেসে যাচ্ছে। চাঁদ ভেসে চলেছে নদীতে। গান হয়ে চলেছে পরপর। আমরা ভেবেছিলাম, পিংকুমাসী, বিয়ের কনে, সারাদিনের ধকলে শ্রান্ত, তাছাড়া বরের অভব্যতায় নিশ্চয় সে বিব্রত, তাই তাকে কেউ গাইতে বলেনি। সবাইকে অবাক করে সে গেয়ে উঠল ‘আজু সখি মুহু মুহু গাহে পিক কুহু কুহু কুঞ্জ বনে দুঁহু দুঁহু দোঁহার পানে চায়’
হায়, শূন্য কুঞ্জে মাধব কোথায়? গানের মধ্যে দিয়ে আর্তি ছড়িয়ে পড়ল নষ্ট বসন্তের রাতে, চাঁদ আর নদীর সব আয়োজন ব্যর্থ করে। একটি কিশোরী শুধু জেনে গেল বিবাহ সব বহন করতে পারে না।