একাদশ রুদ্র ও দ্বাদশ আদিত্য , অষ্ট বসু্ , সাধ্যগণ , বিশ্বদেবগণ , অশ্বিনীকুমারদ্বয় ,মরুদগণ , পিতৃগণ এবং গন্ধর্ব , যক্ষ , রাক্ষস ও সিদ্ধগণ আপনারা সর্বপুরুষ সাক্ষি , এই আখ্যানে মুন্নিকথা যদৃশ বর্ণিত হইবে তাহা অন্যকোনো , অন্যকিছু অথবা অন্যান্য লেখনীর পাঠ প্রতিক্রিয়া রূপে গন্য হইবে না । বর্তমান বর্ণনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক , অধিকন্তু অ্যাখানকারের গোময়চর্চিত উৎকৃষ্ট মস্তক নিঃসৃত । বাস্তব , অবাস্তব , পরাবাস্তব প্রভৃতি কোনো ঘটনার সহিত সম্পর্কিত নহে । যদ্যপি স্মরণ রাখিতে হইবে চন্দ্র ও সূর্য্য দূরবর্তী হইলেও একে অন্যের সহিত সম্পর্কিত । চন্দ্র সূর্যালোকে আলোকিত , সমুদ্র চন্দ্রাকর্ষণে স্ফীত , বায়ূ সমুদ্রজনিত সৃষ্ট , নিঃশ্বাস বায়বীয় অতয়েব সূর্য বায়বীয় । এমত সিদ্ধান্ত বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে বিজ্ঞান সম্মত হইতে পারে । যেমত মুন্নির কাল্পনিক অবয়ব শ্রবণ করিবামাত্র হাঁচি হইল । যোগ নাই , তথাপি ।
ট্রেনে যাত্রা করিতেছি । সম্মুখে হিজড়া তালি দিতেছে । আমি সচেতন উদাস হইয়া তাকাইয়া আছি দূর সঞ্চরণশীল মাঠগুলির দিকে । যে স্থানে চাষি চাষ করিতেছে । লাঙ্গলের ফালে উঠিয়া আসিতেছে মাটি । এতদ্ কর্দম মাখিয়া চাষি আনন্দিত হইতেছে । কলঙ্কিত হইতেছে না । আমার অহেতুক উদাসীনতা দেখিয়া হিজড়া একটি চুমা খাইয়া বলিল – ডার্লিং !
হাস্য রোল উঠিল । ডার্লিং শব্দের এমত ব্যবহারে হাস্যরোল উঠে পূর্বে কখনো লক্ষ্য করি নাই । শব্দ দৃশ্যভেদে ভিন্নভিন্ন অর্থ নির্মাণ করে ইহা অনুধাবন করিয়া আমার আপনাকে অসহায় মনে হইল। নাসিকা সিরসির করিয়া উঠিল । আমার প্রেমিকা কপোলে চুমু খাইয়া বলিয়াছিল , তুই কী রে ? যখন গঙ্গোত্রীতে স্নান করে উঠে আমি ধ্যানে বসব তখনও তুই পাশে বসে এমনি করে নাক চুলকোবি আর হাঁচবি ? ’’
নাসিকা সিরসির করিলে আমার হাঁচি পায় । হাঁচি পাইলে আরো বেশি হাঁচি পায় । হাঁচি হইলে আমার সর্দি হয় । এজন্য প্রেমিকার কথা ভুলিয়া আমি তোর কথা ভাবিতেছিলাম । ছলছবিলা নাচের কথা ভাবিতেছিলাম । শরীরি বিভঙ্গ হইতে যে খাঁজ ভাঁজ আঁচ লাগে হিজড়া স্পর্শে তাহা নাই ।
সম্মুখে নপুংসক । ভীষ্ম ধনুর্বাণ ত্যাগ করিয়াছেন । তিনি কহিলেন , ডার্লিং তোর সামনে যুদ্ধ করব না । তথাপি গান্ডীব উত্তোলিত হইতেছে না । অসহায় বোধ করিতেছে। তজন্ন তিনি কহিলেন , সখা একটি কবিতা লেখ । ’’
কবিতা পাঠ করিয়া যুদ্ধের তেজ জন্মাইল । গান্ডীব উঠিল ।
কবিতা কোথা হইতে উথ্থিত হয় ? ভালবাসা অথবা যুদ্ধ ? মুন্নি যুদ্ধই কর বা ভালই বাস, তোর জন্য কবিতা লিখিত হইতেছে না । ব্যাঙ্গ হইতেছে। সম্মুখে যে রূপসী কালো নখরঞ্জনী লাগাইয়া বাহিরে তাকাইয়া আছেন তিনিও অস্ত্রহীন অসহায় আমাকে দেখিয়া মৃদু হাস্য করিতেছেন ।
সমস্ত লোক হিজড়াদের উচ্চাঙ্গ ও নিম্নাঙ্গের গীত বাদ্যাদি শ্রবণ করিতেছিল ও তন্মধ্যে আত্মবিভোর হইয়া হস্ত পদাদিতে ইষৎ ঝাঁকা দিতেছিল । যেনবা সমবেত আনন্দহুঙ্কার এক অবশ্য কর্তব্য। ইহা জাতীয়তাবাদ।
মুন্নিকে আমি কহি নাই – আয়, মু্ন্নি লাচ্ ।
মুন্নি আপন ডার্লিং লইয়া বিভোর । এমত নহে যে শাঁখা নোয়া ঘর্ষণজনিত শব্দ উথ্থিত হয় নাই । যদ্যপি পাঞ্চজন্য বাজে নাই । কারণ কি, প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা হয় নাই ।
শ্বেতশঙ্খ সামুদ্রিক জীব । প্রথমে তাহার মৃত্যু হয় । উত্তাল তরঙ্গ প্রক্ষোভে চালিত হইয়া উপকূল সন্নিকট হয় । করাত দ্বারা কর্তিত হয় , ইহার পর শঙ্খকার কর্তক, ছেদক প্রভৃতি যণ্ত্র দ্বারা নকশা নির্মাণ করে । জীবন মরণ ঘর্ষণ কর্তন ছেদন ইত্যাদি বহুবিধ ‘ ন ’ কারান্ত হইয়া শঙ্খ রমণের লাইসেন্স প্রাপ্ত হয় । পুনর্বার , জীবন , দর্শন , শ্মশান ।
ন শব্দের অর্থ কি ? অভিধান খুলিলাম । হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় যাহা লিখিতেছেন তাহা বিন্দুমাত্র বোধগম্য হইল না । তিনি লিখিতেছেন ন২ পুং; ১ বিত্ত , রত্ন । ২ ব্রহ্ম । ৩ গণেশ ৪ [ ছন্দ শাস্ত্রে ] ত্রিলঘুবর্ণযুক্ত গণ । ত্রিলঘুশ্চ নকারঃ [ Tribrachys ] । অসংখ্য ন এর একটি হইল ন৪ বি [ লোহ > লো> নো > ন ] সধবার লৌহময় বলয় বিশেষ ; খাড়ু । [ হাতে ন ক্ষয় যাক – অর্থাৎ যাবজ্জীবন থাক । পাকা চুলে সিঁদূর পর ।
তোর নামের মধ্যে যে ন কার বিরাজমান রহিয়াছে পূর্বে তাহা নজর করি নাই রে।
কথা রবে , কথা রবে , জগতে কলঙ্ক রবে । কথা হইতে কলঙ্কের জন্ম , বা কলঙ্ক হইতে কথা ? চর্তুপার্শে এমত বহুবিধ উচ্চনাদ , এমত ঘর্ষণ যে সর্বভূত এয়ো হইতেছে । শব্দ কলঙ্কিত হইতেছে ।
মুন্নি তুই এয়ো হইয়াছিস । তোর বদনাম হইয়াছে । বালিকাবেলায় এক্কা দোক্কার ছলে তোর ফ্রক উড়িলে বদনাম হইয়াছে । কিশোরী বেলায় ভিজে হাতে তোর বদনাম হয় । মেয়েবেলায় চেরীম্বাদের লিপস্টিকে তোর বদনাম হয় । যেমত সূর্যালোকে ঝলসে যায় তোর ছায়া , সেই ছায়া দর্শনেও বদনাম হইতে পারে । বদনামের কোন উপযুক্ত কারণ নাই । আমার হাঁচির ন্যায় । গঙ্গোত্রীর পবিত্র শীতলতাতেও উহা ঘটমান হইতে পারে । বালক বয়সে ঋতুচক্র , ঋতু পরিবর্তনের কথা পড়িতে পড়িতে ট্রেনগাত্রে সাদা কালো হরফে লেখা ঋতুবন্ধ সজোরে উচ্চারণ করিয়া উহাদের একগোত্রে ফেলিয়াছি । এক্ষণে ট্রেনগাত্রে উহা লিখিত নাই । রহিয়াছে জাপানি তৈলের বিজ্ঞাপন ও মুন্নির খাঁজের ছবি । ঋতুর পরিবর্তনে হেমন্তের খাঁ খাঁ মাঠের রিক্ততাতে তোর বদনাম হয় । ইহা পূর্ব নির্ধারিত । জ্ঞাত নহে তথাপি হইতে পারে যে বেদশাস্ত্রে এইরূপ লিখিত রহিয়াছে । বেদ অপৌরুষেয় ।
নাসিকাগ্রে মুন্নির লোহিত কাঁচুলি নাচিয়া চলিতেছে । ডার্লিং তেরে লিয়ে ।‘’ নপুংসক কাঁচুলি , যাহা দৃশ্যমান হইলে ভীষ্ম ধর্নুবান ত্যাগ করেন , সারথি কবিতা বলেন , অর্জুন গান্ডীব তাক করেন । আমার হাঁচি পাইল। একফোঁটা সর্দি হিজড়ার কাঁচুলির বিভাজিকাতে পড়িল । হিজড়া লাফাইয়া উঠিয়া সজোরে কহিল , বোকা… ’’।
আমিই সেই । সো অহম্ । আমার মৃত্যু হয় নাই বলিয়া তুই জন্ম সধবা । একজন পুরুষকে তুই বিবাহ করিয়াছিস ইহার অর্থ পুরুষকেই বিবাহ করা। আমিও পুরুষ। একজন পুরুষকেও ভালবাসার অর্থ পুরুষকেই ভালবাসা। আমার জন্য তুই সাজিয়ে রাখিস শরীর । আমার জন্য ঢাকিস । আমাকে ক্রোড়ে লইয়া দিবারাত্র কাটাস । আমিই তোর পিতা , দয়িতা , সন্তান । আমাকে লইয়া তোর জীয়ন্তে মরণ ।
সর্বজনে যেমত বুঝিল যে বহু ব্যবহারে ইহার মধ্যবর্তী সৌন্দর্য্য প্রকাশ পায় । তখন শব্দটি বলিতে বলিতে এক অভ্যাসময় বলা সূচিত হইল । ক্রমশ সাহস , আরও সাহস সঞ্চারিত হইলে , ব্রহ্মজ্ঞানের মত আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হইয়া উচ্চারিত হইল B for বোকা ডট্ ডট্ । এই শব্দে সৃষ্টি , স্থিতি মধ্যে মহাপ্রলয় জাগরুক হইল। আবাল বৃদ্ধ বনিতার মনে প্রবল ভীতি সঞ্চারিত হইল । মহাস্থবির পর্বত শ্রেণিতে প্রবল কম্পন সৃজিত হইল।
পূর্বে সুর করিয়া গলা সাধিয়াছি , ক-য়ে কণিকাদি , খ-য়ে খগেনের ঘরে ইত্যাদি ইত্যাদি হইয়া ঞ আঁহু আঁহু । কিন্তু বোকার পরবর্তী ডট্ দুইটিকে উচ্চারণ করিতে পারি নাই । তুই কেমন অবলীলাক্রমে ভানতাড়া ঘুচাইয়া নতুন ইংরাজীলব্ধ শব্দ বানাইতে পারিলি । ইহা এক ডায়াস্পোরিক শব্দে রূপান্তরিত হইয়াছে । অতঃপর আমার উচ্চারণে আর বাধা নাই ।
মুন্নি আয় তোর সঙ্গে এক মঞ্চে নাচিব । ডার্লিং রহিবে না। গাণ্ডীবের ছিলার ন্যায় দৃপ্ত হ। তোর এক একটি পদমে উথ্থিত হইবে অগ্নি । পদতল ছাইয়া যাইবে ফোস্কাতে । শরীর নিসৃত স্বেদ হইতে প্রবাহিত হইবে স্রোতস্বিনী। আয়, এক দুরন্ত আত্মবিনাশে মাতিয়া উঠি । আয় ।
সেই মহাপ্রলয় নৃত্যে রাত্রির বক্ষে জাগ্রত হইবে ফাটল । দিগন্ত ঋতুমতী হইবে। পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ ঈশান অগ্নি নৈরিত্ কোণে বহিবে লোহিত কণিকার স্রোত । আলিঙ্গনে বদ্ধ লতা বৃক্ষে উচ্চারিত হইবে –