ছোটগল্পে শর্মিষ্ঠা সেন
টুকুনের গল্প
বিছানায় শুয়েই টুকুন শুনছিল সবাই খুব কথাবার্তা বলছে আর হাসছে ৷ স্কুলে এখন শীতের ছুটি ৷ এইতো বড়দিন গেলো পরশুদিন ৷ টুকুন এখন একটু বেশীক্ষণ ঘুমিয়ে থাকতে পারে ৷ অবশ্য , মায়ের যণ্ত্রনায় নিশ্চিতে, আয়েসে, আধোঘুমে লেপের ওম নিতে নিতে একটু স্বপ্ন দেখারও যো নেই ! মা সকাল সকাল উঠে পড়তে বলে সবসময় ! কোনো মানেই হয়না ভেকেশান এ সাত সকালে ওঠার ! স্কুলে ছুটি থাকেই বাচ্চাদের অনেকক্ষণ ঘুমোনোর জন্য ৷ টুকুন চুপিচুপি বাবার সাথে পরামর্শ করে, যাতে মা একটু পরে ডাকে টুকুন কে ৷ আজ মা ডাকার আগেই টুকুনের ঘুম ভেঙে গেলো ৷ ব্যপারটা কী ? দেখতে হচ্ছে ! সবাই হঠাৎ হইচই করতে লেগে গেল কেন ?
টুকুন ড্রইংরুমে এসে দেখল একজন মামার বয়সী রোগা সোগা লোক, একজন বয়স্ক দাদু আর ঘোমটা দেওয়া একজন মানুষ এসেছেন অনেক বিগশপার আর ব্যাগ নিয়ে ৷ টুকুন ঢুকতেই সবাই মিলে প্রায় একসাথেই বলে উঠল , ‘এই তো এসে গেছে ৷’
এই সময়গুলো টুকুনের মোটেই ভালো লাগেনা ৷ একটু অস্বস্তি হয় ৷ টুকুন জানে এরপর এই নতুন মানুষেরা তাকে অনেক প্রশ্ন করবে ৷ ” বাবা ! কত্ত বড় হয়ে গেছো ! আমাদের চিনতে পারছ ? তোমার নাম কী? কোন ক্লাসে পড় ? স্কুলের নাম কী? পড়াশুনো করতে ভালো লাগে? কে বেশী বকে? বাবা না মা ? কে বেশী ভালবাসে ? ঠাকুমা না দাদা ?”
টুকুনের এসব অভ্যেস আছে ৷ টুকুন অবশ্য খুব স্মার্ট মেয়ে ৷ ও আর উড্ডু ক্লাস মনিটর ৷ টীচার্সরুমে গিয়ে কত্ত কাজ ওরা দুজন করে ৷ ক্লাস মেইনটেন করা, ম্যাম কে চক এনে দেওয়া, হোমওয়ার্ক কপি জমা দেওয়া , অন্য সেকশান থেকে লেসন প্ল্যান নিয়ে আসা, কো অর্ডিনেটর ম্যাম এর কাছে যাওয়া – এসব নানান কাজ ৷ গেস্টদের সাথে ও খুব সুন্দর কথা বলতে পারে ৷
যেমনি ভাবা….টুকুন কাছে আসতেই দাদুমতো মানুষটা জিগ্গেস করলেন , ‘ কি দিদিভাই , আমাকে চিনতে পারছো ?’
টুকুন বললো, ‘ হ্যাঁ, তুমি তো একটা দাদু ‘ ৷ শুনে সবাই হেসে উঠলো ৷
মা বললেন, ‘সোনা , আগে ফ্রেশ হয়ে এসো, তারপর গল্প হবে ৷’
নতুন দাদুটি হলেন টুকুনের বাবার ছোটকাকা ৷ ঠাকুরদাদারা চার ভাই ছিলেন ৷ এখন আছেন দুজন , টুকুনের দাদা শিবেন্দ্রনাথ এবং সর্বকনিষ্ঠ উমানাথ ৷ অসম্ভব ডানপিটে উমানাথ নিজের গ্রামের চৌহদ্দি ছাড়াতে চেয়েছিলেন বহুবার , নতুন দেশ দেখবার আশায় ৷ শেষমেষ বাড়ি ছেড়েছিলেন কলেজে পড়ার সময়, তখন বলত প্রি- ইউনিভার্সিটি ৷ অনেক গ্রাম ,শহর, নগর ঘুরে বেড়িয়েছেন ৷ নানারকম কাজও করেছেন , যখন যা পেয়েছেন ৷ মালবাহী ট্রাকের খালাসী হয়ে ভারতবর্ষের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অঞ্চলে ঘুরেছেন বেশ কয়েকবছর, রাস্তার ধারে হোটেলে রান্নার কাজ নিয়েছেন , এমনকী শোনা যায় , গেরুয়া ধারণ করে উত্তর ভারতের মন্দিরে মন্দিরে কীর্তনও করেছেন ! শেষমেষ মা বাবার ডাকাডাকিতে আবার ফিরে এসেছিলেন ৷ থিতু হয়েছিলেন বনবিভাগের চাকুরীতে ৷ জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বাঘ গণনা করার কাজে উনি যুক্ত ছিলেন ৷
এমন বিচিত্র মানুষটি অথচ চেহারা দেখে বুঝবার উপায় নেই ৷ রোগাসোগা উমানাথের উচ্চতা মেরেকেটে পাঁচফুট , মিশকালো গায়ের রং, পরনে পাজামা পাঞ্জাবি, পোশাকের রংটাও গায়ের রং এর মতোই, মলীন! মানুষটা যেন থেকেও নেই, অন্য লোকেদের ভীড় এ মিশে থাকা কেউ একজন, ঘরের অন্যান্য আসবাবের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা আরো এক আসবাব যেন !
টুকুন উমানাথকে নামে চেনে , দাদার ছোটভাই , যিনি সুন্দরবনে বাঘ গুনতি করেন ৷ টুকুন ভেবেছিল উনি ঠাকুরদাদার মতোই ইয়া লম্বা হবেন ৷ সবাই যখন চা খাচ্ছিল টুকুন মন দিয়ে উমাদাদুকে দেখছিল ৷
সে একসময় জিগেস করল, “দাদু , তুমি কী সুন্দরবন থেকে এলে? এতদিন আমাদের বাড়ি আসনি কেন?”
দাদু হেসে বললেন, ” দিদিভাই, আমি তো অপেক্ষা করছিলাম তুমি বড় হবে কবে , তারপর তোমার সাথে গল্প করব , যেই টের পেলাম তুমি বেশ কথা বলতে শিখেছ ওমনি চলে এলাম!”
শুনে টুকুন একটু হাসল ৷ ও বুঝতে পারল দাদু ভাব করার চেষ্টা করছেন ৷ কিন্তু উনি তো দাদু হন, আপনজন, টুকুন তো এমনিই ওনার সাথে ভাব করে নেবে ৷
টুকুন দেখল মা আর ঠাম্মা দাদুর বিগশপার থেকে জিনিসপত্র বার করছে ৷ দেখতে দেখতে রান্না ঘরে একটা গন্ধমাদন পর্বত হয়ে গেল ! পালং শাক, লাউ শাক, মটর শাক,ধনেপাতা, বেগুন, লাউ, মূলো-গাজর , টোপা কুল আর অনেক পোঁটলা ৷ যাতে আছে মধু, গুড়, কাসুন্দি এবং পিঠে ৷
টুকুন বলল, “দাদু, আমি তো গাজর খেতে একদম পছন্দ করিনা, তুমি এতগুলো গাজর এনেছো, মা আমাকে এবার জোর করে গাজর খাওয়াবে ” ৷
দাদু বললেন, “দিদুন, সে তো বাজারের গাজর আমিও মোটেই পছন্দ করিনা ! এটাতো , ঐ যে দেখছো কাকুটা বসে আছে, ওই সমর চাষ করেছে ৷ এটা খেয়ে দেখো, তোমার বাবার ছোটবেলার গন্ধ আছে এতে ৷”
সেদিন জলখাবারে সবাই খেল সাদা ধপ্ ধপে সাজের পিঠে আর ঝোলাগুড় , সাথে পাটিসাপটা ৷ বড়রা পেল চা ৷
বেলা গড়াতেই দাদুর সাথে টুকুনের ভারি ভাব হয়ে গেল ৷
“দাদু , তোমার বাঘ দেখার গল্প বল ৷”
দাদু ফিচিক করে একটু হেসে বললেন , ” সত্যি ঘটনা কি জান দিদিভাই , আমি জঙ্গলে একটাও গোটাগুটি বাঘ দেখতে পাইনি ! একটু পিঠ বা লেজের ডগাটুকু দেখেছি হয়ত ৷”
টুকুন অবিশ্বাসে চোখ গোল্লু গোল্লু করে ফেলল ৷ “হতেই পারেনা ! দাদু, ইউ আর লাইং !” “তোমরা বাঘ গুনতে কি করে তাহলে ?”
দাদু বললেন , ” আমাদের দলের লোকেরা দিনের বেলা জঙ্গলের কয়েকটা জায়গায় গিয়ে গোল করে কিছু গাছপালা সাফ করে সেখানে ক্যামেরা বসিয়ে দিয়ে আসতাম ৷ আর একটা লাঠি পুঁতে আসতাম যাতে গন্ধ মাখানো থাকত , পচা মাংসের গন্ধ , ওটাই ফাঁদ বলতে পার ৷ রাত্তির বেলা ওই গন্ধে বাঘ আসত আর ছবি উঠে যেত ৷ আমরা কদিন পর গিয়ে ক্যামেরা থেকে মেমরী কার্ড বার করে নিয়ে আসতাম ৷” “ক্যামেরা আসার আগে পাগমার্ক দেখে বাঘ গুনতাম ৷ পাগমার্ক হল বাঘের পায়ের ছাপ ৷”
এই ছোটখাট চেহারার দাদু বনে জঙ্গলে ঘুরেছেন এবং বাঘ দেখেছেন, যদিও ‘গোটাগুটি’ নয়, ভেবেই টুকুন অবাক হতে থাকল ৷ ও মনে মনে ঠিক করল স্কুল খুললেই উড্ডুকে দাদুর কথা বলতে হবে ৷ এমন দুর্দান্ত দাদু আর কারুর নেইই ৷ এমনকি টুকুনের ঠাকুরদাদাও শুধু চাকুরী করেছেন , তাতে কোনো মজা ছিলনা ৷ দাদুর নিশ্চয় খুব মজা হত বনবিভাগের চাকরী করে ৷
এই নতুন ঠাম্মাও খুব অন্যরকম ৷ কি সুন্দর পাটিসাপটা বানিয়ে এনেছেন ! পৌষমেলায় যেগুলো পাওয়া যায় তার থেকে থাউজেন্ড টাইমস বেটার ৷ মা কি বানাতে পারে এমন ? টুকুন এই প্রথম এত পিঠে খেল ৷ এমনিতে টুকুন ঝাল ঝাল খাবার পছন্দ করে ৷ নতুন ঠাম্মাও ছোটখাট মানুষ, গোল মুখখানা ৷ কপালে একদম পারফেক্ট সার্কেল করে সিঁদুরের টিপ , সিঁথিতেও ৷ দেখলেই জড়িয়ে ধরে কোলে বসতে ইচ্ছে করে৷ টুকুন আর একটু ছোট হলে মোটেই কোল থেকে নামতো না ৷ কিন্তু টুকুন তো বড় হয়েছে, ঠাম্মার পায়ে ব্যথা করবে না? উনি শাড়ি পড়েন , ঘোমটা দিয়ে ৷ টুকুন এতদিন টিভিতে ঘোমটা পড়া মানুষ দেখেছে, তার সত্যিকারের, নিজের ঠাম্মাও যে এমনভাবে শাড়ি পড়তে পারেন এটা দেখে টুকুন খুব এক্সাইটেড ৷ এবার সরস্বতী পূজোয় নতুন ঠাম্মার মতো শাড়ী পড়ে সব্বাইকে তাক লাগিয়ে দেবে টুকুন ৷ তার অবশ্য এখনও বেশ কিছুদিন দেরী আছে ৷
আচ্ছা, টুকুন কি দু একটা টোপাকুল খাবে ? সরস্বতী ঠাকুর টুকুনকে এটুকু দুষ্টুমির জন্য নিশ্চয়ই মাফ করে দেবেন , টুকুন তো সারাবছর লক্ষী মেয়ে হয়েই থাকে, তাইনা ?
চারটে দিন হইচই করে কোথা দিয়ে কেটে গেল বোঝা গেল না ৷ এত সুন্দর ভাবে নতুন বছর কখনও আসেনি ৷ মা নতুন ঠাম্মাকে একটা মোবাইল কিনে দিয়েছে যাতে ভিডিও কল করা যাবে ৷ কিন্তু ঠাম্মা কিছুতেই ঠিকঠাক বটন্ টিপতে পারছে না আর হেসে কুটিপাটি হচ্ছে ৷ মা কে তো চেনেনা , মোবাইলে কল রিসিভ না শেখা পর্যন্ত মা বাড়ি থেকে বেরোতেই দেবেনা বলেছে ৷ আগামীকাল উমাদাদুরা চলে যাবে ৷ খুব বেশীদিন থাকার উপায় নেই ! গ্রামের বাড়িতেও কাজ রয়েছে অনেক ৷ তবে বাবা মা ঠিক করেছে পরীক্ষা হয়ে গেলে টুকুনকে কিছুদিন রেখে আসবে ঐ বাড়িতে ৷ ছোটনীলপুরের মামার বাড়ির মতো এটাও একটা ফার্মহাউস ৷ টুকুন কান্ট ইভেন ওয়েট !
দুদিন পর দুপুর বেলা টুকুন কচর কচর করে গাজর খাচ্ছিল ৷ ভীষণ মিষ্টি আর অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ ! এটাই কি বাবার ছেলেবেলার গন্ধ ? টুকুন চোখ বুজে পরিষ্কার দেখতে পেল একটা হাফ পেন্টুল পড়া ছোট ছেলে ধূলোমাখা পায়ে দৌড়ুচ্ছে ……মুখে আলোজ্বলা হাসি , হাতে তার লাঠি….কী জানি কোথায় যাচ্ছে ! থাকুক ও ওর মতো , আনন্দে , টুকুনের মনের গভীরে ৷