ছোটগল্পে শর্মিষ্ঠা সেন

মনোরমার দিনরাত্রি

মাঝেমাঝে এমন হয় ৷ মন বসেনা কিছুতে , কাজ করতেও ইচ্ছে করেনা ৷ শরীর চলেনা , আবার চুপ করে বসে থাকলেও শান্তি নেই , মাথার মধ্যে জমে থাকা কথারা অনর্গল গুঁতোগুঁতি করতে থাকে , দুটো কথা শোনার তো কেউ নেই  , কেউ সত্যিই নেই , সবাই শুধু বলতেই চায় !

দুপুর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে এই দিনগুলোতে ৷ ছেলে মেয়ে যার যার মতো বেরিয়ে যায় সেই সকালেই ৷ ছেলে অফিসে , মেয়ে কলেজে ৷ কলেজ সেরে ফিরতে ফিরতে আটটা সাড়ে আটটা ৷ তার অনেক দায়িত্ব পড়ানো ছাড়াও ৷ ছেলে ফেরে আরো পরে ৷

অথচ এত দিনে নিঃসঙ্গতা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যাবার কথা ৷ বারো বছর হয়ে গেছে উনি চলে গেছেন ৷ তবু মনে হয় আছেন কোথাও ! সময় হলেই আসবেন হইহই করে ৷ জীবিত থাকাকালীন ভ্রু কুঁচকে আসত অনর্থক হাঁকডাকে ৷ গামছা কোথায় , নারকেল তেল কোথায় , শার্ট কোনটা পড়ব? চশমা কোথায় ? আরে, সাইকেলের চাবিটা আবার কোথায় ! সবই হাতের কাছে থাকত, তবুও ডাকাডাকি ৷ উনি আসলে  কথা না বলে থাকতে পারতেন না ৷ আশেপাশের বাড়ির লোক কান খাড়া রাখলে বুঝতে পারত , বাড়িতে কী বাজার এলো, কী মাছ এলো, ক’টার লোকাল ধরবেন…এসব সাত সতের কথা ৷ ভালবেসে  ‘হ্যাঁ গো’ , ‘কই গো’  বললেও পাশের বাড়ির মেয়েরা বলতো , বৌদি , দাদা সকালে খুব ডাকাডাকি করছিল তো ! ছেলে মেয়ে দুটোও বাবার ধারা পেয়েছে ৷ মা বলত , জামাইয়ের চিৎকারে আমার মনুটা কানে কালা হয়ে যাবে !

কতদিন পর মায়ের কথা মনে পড়ল! এখন এমনই হয় ৷ দিন, মাস , বছরের হিসেব কেমন গুলিয়ে যায় ! মায়ের মুখটা আজ যেমন স্পষ্ট দেখত পেলেন মনোরমা ৷ ছোট্ট কপালে সিঁদুরের টিপ, লম্বা কালো একঢালা চুল , শ্যামলা মিষ্টি মুখখানা ! ছোট ছোট ফুলছাপ সুতীর শাড়ি পরনে ৷ মা গো ! কতদিন দেখিনা মাগো ! নাকি কত বছর !

শীতের দিনের ছোট  বেলা, তাও যেন কাটতে চায়না ৷ আগে  পাড়ার আইবুড়ো মেয়ে – বউরা মিলে গল্প করতে করতে উল বুনতেন ৷ সোনালী নরম রোদ্দুর দেখে মনে পড়ে গেল ৷ আর কত গল্প যে হত ! নিন্দাচর্চাও ৷ এখনকারমতো সকলের কাছে ফোন ছিল না, তবে যোগাযোগটা ছিল ৷ দুদিন না দেখলে বাড়ি বয়ে পাড়ার বৌ-ঝিরা  খবর নিতে চলে আসত ৷ মনোরমার কাছ থেকে মেয়েরা নতুন নতুন রান্নার প্রনালী শিখত ৷ মনোরমা রান্না করতে ভালবাসতেন ৷ খাওয়াতেও ৷ এখনও বাসেন বৈকি , নইলে ভাবতে ভাবতে ঘ্রাণ পান কী করে ! ছেলে ভালবাসে নিরামিষ ৷ সে শুক্ত , মোচাঘন্ট, পোস্ত ,ডুমুরের ডালনা, রসা, কষা , চাটনি, টক – এসব পছন্দ করে ৷ বৌমা কি আর রাঁধে এসব ! অজান্তেই একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে আসে ৷ মেয়ে তেমন খেতে শেখেনি ৷ সে খায় পাখির আহার ৷ ঠুকরে ঠুকরে ৷ থালায় ভাত ফেলে উঠে যাওয়ার বদভ্যেস ছিল তার ৷ এখন এসব দেখা টেখা হয় না ৷ যে যে যার যার মতো থাকে ৷ মনোরমা খেয়াল করে উঠতে পারেন না ৷

খেতে জানতেন উনি ৷ মনোরমার উনি ৷ সকালে অফিস যাওয়ার আগেই মনোরমার ভাত ডাল সবজি আর মাছ নেমে যেত ৷ তাড়াহুড়ো করেই খেতেন, কখনও হয়ত আধভেজা গামছা পড়েই চেয়ারে ! খেতেখেতেই ছেলেমেয়ের নজর এড়িয়ে খুনসুটি, রাতে রুটির বদলে পরোটার আবদার এবং আরো কিছুর …মনোরমা একটু লজ্জা পেলেন নাকি ? এরপর সাইকেল নিয়ে স্টেশন , ন’টা পনেরোর লোকাল ধরে অফিস ৷ ন’টা পনেরো ? নাকি সাড়ে আটটা ? নাহ্ , সাড়ে আটটায় তো বাচ্চাদের স্কুল বাস আসত ৷ মনে পড়েনা ঠিকঠাক ! যেন বহুযুগ আগের কথা !

দূরের স্টেশন থেকে ট্রেনের বাঁশি শুনতে পেলেন ৷ নিঃস্তব্ধ ঝিম ধরা দুপুরে ট্রেনের বাঁশি কতকিছু মনে পড়িয়ে দিল ৷ সেবার সবাই মিলে পুরী যাওয়া হয়েছিল ৷ সবাই মিলে কেন মনে আসল? আর কারা ছিল ? অনেক চেষ্টা করেও মুখগুলো মনে করতে পারলেন না ৷ মেয়ে এলে জিজ্ঞেস করতে হবে ৷ খুব মজা হয়েছিল ৷ বিয়ের পর প্রথম ঘুরতে আসা , প্রথম সমুদ্র দেখা, ওনার হাত ধরে সমুদ্রে স্নান করা, ঝিনুক কুড়োনো , বিকেলে বহুদূর হেঁটে যাওয়া আনমনে ৷  ছেলে মেয়ে,  ননদ, দেওর , শ্বশুর শাশুড়ি মিলে  খুব হইচই হয়েছিল ৷ আচ্ছা ওরা ছিল সাথে ! এবার মনে পড়ল ৷

কতকাল এই চার দেওয়ালের বাইরে যাওয়া হয়নি ! ইচ্ছে করে খুব কিন্তু শরীর দেয়না ৷ সকাল সন্ধ্যা উপাসনা ঘরে যাওয়াটাও এখন অনেক পরিশ্রমের মনে হয় ৷ কেউ বিশ্বাস করবে না  এককালে কতবড় সংসারটা একাহাতে ধরে রেখেছিলেন ! সবাই ভালবাসত, মান্যও করত ৷ উনি চলে গিয়ে মনোরমার বাঁচার ইচ্ছেটাই নিয়ে গেছেন !  বিনা নোটিশে ! অথচ মানুষটার কোনো বাজে নেশা ছিল না, কোনদিন সামান্য একটা পান পর্যন্ত খেয়ে দেখেন নি , তাঁর যে হঠাৎ পতন এবং মৃত্যু, কেউ ভাবতে পারেনি, সবাই শুধু বলেছিল, ভাল মানুষ ছিল, কষ্ট পায়নি ৷  কষ্ট তো মনোরমা পেয়েছিলেন ! এখনও পাচ্ছেন, এভাবে থাকাও একটা থাকা !

” ও ঠাকুমা ! ঠাকুমা ! এখনও এখানে বসে বসে ঢুলছেন ! কি বেয়ারা বুড়ি রে বাবা !
ঠাকুমা আপনাকে যে বলে গেলাম , রোদ পড়ে গেছে, নিজের ঘরে যান ! বসে বসে মশার কামড় খাচ্ছেন , আপনার কিছু হলে আমার চাকরিটা থাকবে ?” রীতা বলল ৷

রীতা মনোরমাদেবীর আয়া ৷
অশীতিপর মনোরমার দেখাশোনার জন্য তাঁর ছেলেমেয়েরা ঠিক করে গেছে ৷ এখানে অবশ্য চব্বিশ ঘন্টাই ডাক্তার নার্স থাকেন ৷ সন্ধ্যাদীপের এই ব্যাপারটা ছেলেমেয়েরা প্রেফার করেছিল ৷ না হলে ওল্ড এজ হোম তো কলকাতায় কতই আছে ৷ সন্ধ্যাদীপের মতো কেয়ারিং কেউ নেই ৷ মনোরমার তো এই বয়সে একটু বেশী কেয়ার দরকার ! নয়কি ? ছেলেমেয়েরা নিজেদের সংসারে ব্যস্ত ! তাই এই ব্যবস্হা ৷

মনোরমা একহাতে লাঠি, অন্যহাতে দেওয়াল ধরে হাঁটতে থাকেন, নির্দিষ্ট ঘরটির দিকে ৷

আজও কেউ এলনা ৷ হে কৃষ্ণ ! করুণাসিন্ধু !

মনোরমা ঘরে ঢুকে যান৷

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।