গল্পকথায় চিরন্তন ব্যানার্জি

ভারসাম্য

কোলকাতায় আমার বিশেষ আসা হয় না। বিয়ের পর থেকেই মুম্বাইতে বাস। কর্তার চাকরি, ছেলের পড়াশুনা, সবই ওখানে। বাবা মা বেঁচে থাকতে তাও বছরে বার দুয়েক আসতাম, এখন তো টানটাও কমে গেছে। ফোনেই যোগাযোগ রাখি আত্মীয়স্বজনের সাথে।
এবারে হঠাৎ করেই লম্বা ছুটিতে কলকাতা চলে এলাম। আমার একমাত্র ছেলে আই আই টি তে সুযোগ পেয়ে কানপুরে পড়াশুনা করছে শেষ দুবছর। আমার উনি গেছেন নেদারল্যান্ডস, অফিসের কাজে। প্রায় মাস খানেকের ধাক্কা। তাই আমিও বাক্স প্যাঁটরা গুছিয়ে নিয়ে কলকাতা এসেছি দিন পনেরোর জন্য। দেওর, ননদ সবার কাছে ঘুরে আপাতত আছি দিভাইয়ের বাড়ি।
এসে ইস্তক দুইবোনে জমিয়ে গল্প করছি। এত কথা যে জমে ছিল ভাবতেই পারিনি। জামাইবাবু মাঝে মধ্যে গল্পে যোগ দেন বটে,তবে অফিস থেকে ফিরে টিভির সামনে বসে দুনিয়ার খবর দেখাটাই ওনার বেশী পছন্দের।
বছর দুয়েক পর দুইবোনে দেখা। শেষ এসেছিলাম দিভাইয়ের একমাত্র মেয়ে রুপুর বিয়ের সময়। ছেলেবেলায় রুপু আমার ভীষন ন্যাওটা ছিল। তখন আমার বিয়ে হয়নি, দিদি মনোহরপুকুরে এলে রুপু সারাক্ষণ আমার সঙ্গেই লেপ্টে থাকত। সেই টানটা এখনো রয়ে গেছে দুতরফেই।
রুপু বিয়ের পর রাজারহাটের একটা ফ্ল্যাটে থাকে, ও আর ওর বর রাহুল। দুজনেই আই টি তে কাজ করে, ওখান থেকেই যাতায়াতের সুবিধা। রুপুর শ্বশুরবাড়ি বহরমপুরে,বিধবা শ্বাশুড়ী ছোট দেওরের সাথে ওখানেই থাকেন।
গতকাল দুপুরে রুপুর ওখানে খাওয়া দাওয়া ছিল। সুন্দর দুকামরার ছিমছাম ফ্ল্যাট। দিদি যেতে যেতে বলছিল “একদম ছোট্ট ফ্ল্যাট কিনলো রে। আমি আর ওর বাবা বলেছিলাম আমরা কিছু টাকা দিচ্ছি, আর একটু বড় একটা নে, তা মেয়ে শুনলে তো।”
কে জানে, মুম্বাইতে থেকে অভ্যেস বলেই বোধহয়, আমার তো ছোট লাগলো না মোটেই। কি সুন্দর সাজিয়েছে রুপু। ওইদিন রাহুলও ছিল, ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছে। ছেলেটা কথা কম বলে, কিন্তু বেশ ভালোই মনে হল। খাবার সময় এতো আয়োজন দেখে আমি বলেই ফেললাম”বাবা, সেই ছোট্ট মেয়েটা, যে সারাদিন আমার থেকে গান শুনতে চাইতো সে তো দেখছি পাকা গিন্নি হয়ে গেছে।”
খাওয়া দাওয়ার পর একটু জিরিয়ে নিয়ে আমরা ফিরলাম। রুপুও আমাদের সঙ্গে বেহালায় এলো, শনিবারটা এখানেই কাটাবে।শনি রবি ওর ছুটি থাকে।
গোলমালটা বাঁধলো শনিবার সন্ধ্যেতে। ওইদিন রাতে রাহুলের আসার কথা ছিল, ডিনার খেয়ে একসাথে ফিরে যাবে রুপুকে নিয়ে। বিকেলে দিদি তখন রান্নাঘরে, আমি আর রুপু গল্প করছি শোবার ঘরে, এমন সময় রাহুলের ফোন এল রুপুর মোবাইলে।
ফোন রেখে রুপু জানালো যে আজ রাহুল আসতে পারবে না, কাজে আটকে গেছে।
দিভাই কে ডেকে বললো, “মা, তুমি একটা কাজ কর, খাবার দাবার প্যাক করে দাও। আমি নিয়ে চলে যাই, অনেকটা দূর একা ফিরতে হবে।”
“তা রাহুল যখন আসতে পারবে না কাল সকালে ফিরবি নাহয়, আজ রাতটা থেকে যা।”
“মা, তুমি তো জানো কাল দুপুরে মামনি আসবে, আমায় আজ যেতেই হবে গো। আর আমি তো কচি খুকিটি নই, একা একাই সব করি। নেহাত এই ব্রীজ ভেঙ্গে যাতায়াতের এতো অসুবিধা, তাই তাড়া করছি।”
“মামনি মানে তোর শ্বাশুড়ি, রুপু?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
রুপু কিছু বলার আগেই দিভাই শুরু করলো “আর কে। কাল আসছেন তিনি। এবার রুপু সব সামলাবে। হাজার বাতিক ওনার, এঁটো কাঁটা, ছোঁয়াছুঁয়ি। সারাদিন অফিস করে এসে মামনির সেবা করবেন ইনি। এই সবই যদি করার ছিল কষ্ট করে এতো লেখাপড়া চাকরির কি দরকার ছিল।”
“আহ মা, চুপ কর তো। কি যে বকো না।”
“আমি তো চুপ করেই থাকি মা। তোমাদের কিছু বললেই বা শুনছো কোথায়। প্রথম থেকেই সংসারের রাশ হাতে রাখতে হয়। তা কেই বা শুনছে, সবই ভষ্মে ঘি ঢালা। ওনাকেও বলিহারি যাই, এতো ঘনঘন আসার কি আছে তাও বুঝি না।”
“মা, উনি ওনার ছেলের বাড়িতে আসছেন। যখন ইচ্ছে তখনই আসবেন, আমি কেন বাঁধা দেব বলতে পারো?”
“ছেলের বাড়ি? ফ্ল্যাটের ই এম আই টা তো তুই দিস।”
“হ্যাঁ, বাকি সংসারের খরচ রাহুল করে। দুজনেরই তো সংসার, নাকি? আর তুমি এসব নিয়ে ভাবছো কেন? তোমার ইচ্ছে হয় তুমি এসে থাকো না, কেউ তো বারন করে নি।” দেখলাম রুপুর গলায় রাগ ঝরে পড়ছে।
আমি বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেছি। বললাম “দিভাই, তুই চুপ কর তো। রুপু আমাদের বুদ্ধিমান মেয়ে, সব সামলে নেবে।”
“আমার কি। ওর কষ্ট হবে বলেই বলা। হাজার হোক মা তো আমি।” এইটুকু বলে দিভাই দুড়্দাড় করে রান্নাঘরে চলে গেলো।
আমি রুপুর পিঠে হাত বুলিয়ে বললাম,”রাগ করিস না মা। তুই তো তোর মাকে চিনিস। ও অত ভেবে চিন্তে কথা বলতে পারে না।”
“জানি মাসিমনি। রাগ করছি না, কিন্ত খারাপ লাগে জানো। বিয়ে সংসার তো দাবা খেলা নয়, যে রাহুল এক পা এগোলে তবেই আমি এক পা এগোবো। মাকে এটাই বোঝাতে পারি না। দেখো, মামনির একটু বাতিক আছে। এঁটো কাঁটার বাছবিচার আছে। উনি থাকলে আমি সবার জন্যেই নিরামিষ রান্না করি, কিন্তু এটুকু মানিয়ে নেওয়া কি খুব সাংঘাতিক কষ্টের? অন্য দিকে যখন মা বাপি গিয়ে থাকে রাহুলও তো অনেক কিছু মানিয়ে নেয়। এমনিতে আমরা সপ্তাহে একদিন বাজার করি, কিন্তু বাপি টাটকা মাছ ভালোবাসে বলে সেইসময় ও রোজ বাজার যায়। মায়ের পায়ে বাত, তাই মাস্টার বেডরুম টা মাদেরকে ছেড়ে দেয়, দেখলে তো ওটার সাথেই অ্যাটাচড বাথরুম। কোনদিন তো মা বাপির আসা নিয়ে আমায় কিচ্ছু বলে না। তাহলে মামনির আসা নিয়ে আমি আপত্তি করব কেন? আমি বললে হয়ত রাহুল মেনেও নেবে, কিন্তু ওর তো খারাপ লাগবে, বলো?
যদি একে অপরের চাওয়া পাওয়া, ভালোলাগা না ভালোলাগা গুলো কে সম্মানই না করতে পারি, ভালো বাসবো কি করে মাসিমনি।সব ভালোবাসাতেই তো অল্পবিস্তর অসুবিধা আছে, তাই না? শুধু ভালোটাকেই ভালোবাসবো, খারাপটা কে নয়, তেমন তো হয় না, বলো।”
আমি অবাক হয়ে রুপুর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কি ভয়ানক কঠিন কথাটা কি সহজে বলে দিলি মা। যে কথাটা বুঝতে মানুষের জীবন কেটে যায়, সেই কথাটা এতটাই সহজ?
আমার অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে বোধহয় রুপু একটু লজ্জা পেলো। হেসে বললো, “দাঁড়াও, মাকে ডেকে আনি। রান্নাঘরে গিয়ে নিশ্চয়ই ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কাঁদছে।”
বিছানা থেকে উঠে রুপু রান্নাঘরের দিকে গেলো। আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলাম, আমার ছোট্ট রুপু কি সাংঘাতিক বড় হয়ে গেছে। আমার চেয়ে বড়, দিভাই এর চেয়ে বড়, উঠোনের নারকেল গাছটার চেয়েও বড়।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।