গল্প কথায় অজিতেশ নাগ

ইচ স্প্রেচে

যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব টয়লেট সেরে এসে চিরুনি দিয়ে মাথার অবিন্যস্ত চুলগুলো গুছিয়ে নিলাম। মাথার প্রায় পিছনে চুড়ো করে বাঁধা একটা পনিটেল জাতীয়। প্রসাধন বিশেষ আমি করি না, বিশেষ করে ইউনিভার্সিটিতে। কপালে একটা ছোট্ট টিপ। ঠোঁটে হালকা ব্রাউন লিপস্টিকের ছোঁয়া মাত্র। কানে এক জোড়া দুল আমার সবসময়েই থাকে। ডান হাতের রিষ্টে ঘড়িটা জড়াতে জড়াতে একবার তাকালাম। এখনো বেশ খানিকটা সময় আছে, তবে ইউনিভার্সিটিতে দেরি আমি করি না। সেকেন্ড সেমিস্টারের আজ ফিফথ সেশন। অ্যাডভান্সড ফাংকশনাল ম্যাটেরিয়ালস ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর হবার্ট ভন অ্যাল্টেন ভারি কড়া প্রফেসর। তাঁর ক্লাশে লেট প্রেজেন্ট তিনি একেবারেই বরদাস্ত করেন না। আমার অবশ্য এযাবৎ মাত্র একদিন সামান্য দেরি হয়েছিল। তাতেই পুরু চশমার আড়াল থেকে তিনি মন্তব্য ছুঁড়েছিলেন – ‘ডু বিস্ত স্প্যাট’। অর্থাৎ তুমি লেট। সামান্য শব্দগুচ্ছ। কিন্তু তারই এফেক্ট মারাত্বক। একই কথা তিনি সবাইকেই বলে থাকেন। তবে যেটুকু সময় ধরে ক্লাশ নেন, অনবদ্য। তাই কেউই প্রায় ওনার ক্লাশ মিস করতে চায় না।
জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। কালকের মত আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। জার্মানিতে এখন হেমন্ত। এইসময়ে আমার দেশে যখন বেশ গরম তখন এখানে উষ্ণতা ১২ ডিগ্রির আশেপাশে। সেই হিসেব ধরলে বৃষ্টি হবার কথা নয়। কিন্তু আজ কি যে হল!
বেভারিয়া প্রদেশের শহর অগসবার্গে এখন আমার ডেরা। জার্মানরা বলে আউগসবূর্গ। কেউ বলে রোমান সম্রাট অগাস্টাসের নামে এই শহরের নাম। যাই হোক অগসবার্গ পাঁচশ বছরের পুরোনো শহর। তবে আমি যেখানে থাকি সেটা ঠিক শহর নয়, শহরতলি বলা যেতে পারে। আবার গ্রাম বললেও ভুল হবে না। তবে গ্রাম ভাবতে আমাদের দেশের কর্দমাক্ত পথ আর পানায় সমৃদ্ধ ডোবার কথা ভাবলে ভুল হবে। হাতে আঁকা ছবির মত গ্রাম এটা। সবটাই ভালো। শুধু বাড়িওয়ালী মিস গ্রিসেল্ডা ডুসেলডার্ফ বেশ রগচটা। ভদ্রমহিলা বিয়ে করেন নি। ফিরতে দেরি হলেই কড়া বাদামী চোখে তাকিয়ে থাকেন। তাকিয়েই থাকেন।
দ্রুত পায়ে কিচেনে গিয়ে রেফ্রিজারেটর থেকে কালকের এনে রাখা সসেজ আর চিজ বের করে নিলাম। সামান্য গরম করতে আর কতটা সময় লাগে? সাথে একগ্লাস স্যাফট। এদেশের জুস জাতীয় পানীয়। ব্যস। আমার প্রাতরাশ রেডি। সবেমাত্র সবটুকু গলাঃধকরণ করেছি, আমার ঘরের ফোনটা বেজে উঠল মিষ্টি সুরে। এই সময় কে আবার? এখনো অবধি এখানে আমার দুএকজন প্রতিবেশী, কাছের ওয়াইনবার-কাম-রেস্টুরেন্টের মালকিন ক্ল্যারামন্ড আর দুএকজন ইউনিভার্সিটির বন্ধু ছাড়া কারোর সাথেই মিশি না। ফোনের কানেকশন দেওয়াই আছে। এটা আসলে দোতলায় বাড়িওয়ালীর ফোনের এক্সটেনশন। আমায় যেটুকু ফোন করতে হয় সেটা শুধুমাত্র মিলচভারকাউফার আর ওয়াসচের জন্য। সাদা বাংলায় যাদের দুধওয়ালা আর ধোপা বলে। স্যাফটের শেষ বিন্দুটুকু গলায় ঢেলে আমি রিসিভার তুললাম। জানতে চাইলাম, কে বলছেন?
-ইচ স্প্রেচে।
যেটুকু জার্মান বিদ্যে দেশ থেকে আমি নিয়ে এসেছিলাম, তা অনেকটাই বেড়েছে এখন। তা দিয়ে আপাতত কাজ চালিয়ে নিচ্ছি, তবে আরো শিখতে হবে। বুঝলাম ফোনের ওপাশ থেকে কেউ বলতে চাইছে, -‘আমি বলছি’। কি কান্ড! এই পৃথিবীতে সবাই তো আমি। তুমি কে হরিদাস হে? সেটাই জানতে চাইলাম, ওয়ার বিস্ত ডু?
-ইচ স্প্রেচে।
সেই একই জবাব! রিসিভারটা কানে চেপে বাইরে তাকালাম। অন্ধকার বেশ ঘনিয়ে আসছে। বন্ধ জানলার বাইরে ব্লোমেন গাছটা বেশ বেড়েছে। জানলা খোলা থাকলে নিশ্চিত ঘরে ঢুকে পড়ত। মিস ডুসেলডার্ফের গাছগাছালি-ফুলের সখ। সামনে বাগিচায় নানান রকম মরশুমি ফুলের বাহার। সামারমিক্স, প্রভেন্স, ভিন্টেজক্রিম, দাস এদেলওয়েব, সিলবারডিস্টেল, হিমেলশেরল্ড, হাইড্রাঙ্গিয়া… কত যে অদ্ভুত ফুলের নাম শুনলাম অগসবার্গে এসে। একটাকে চিনতে পেরেছিলাম। অরেঞ্জ লিলি। এরা বলে ফুয়েরার লিলি। কিন্তু আপাতত এ কী উৎপাত! আমি আবার জানতে চাইলাম পুরুষালী কন্ঠের মালিকের নাম। জবাবে দুবার ‘ইচ স্প্রেচে’ আর একবার দিলখোলা হাসির আওয়াজ শুনলাম। একবার ভাবলাম থিওডোর নয়ত? থিওডোর আমার সাম্প্রতিকতম বন্ধু। কিন্তু সে তো আমার নাম্বার জানে না। তবে? ফের জানতে চাইলাম, কে বলেছেন দয়া করে নামটা বলবেন?
-বললাম যে আমি। হাঃ হাঃ হাঃ।
ফের সেই প্রাণখোলা হাসি। ফোনটা কেটে গেল। একবার ভাবলাম রং নাম্বার নাকি? পরে হেসে ফেললাম। অগসবার্গে রং নাম্বার হয় না। বাইরে সামান্য বৃষ্টি নেমেছে। ছাতা মাথা করেই বেরিয়ে গেলাম। ইউনিভার্সিটি আজ তেমন জমল না। প্রফেসর অল্টেন আসতে পারেন নি কোনো কারণে। তার উপরে মাথা গরম হয়ে গেল লকাররুমে থিওডোরকে হেনরিয়েটের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়ে বার্তালাপ করতে দেখে। হেনরিয়েটকে আমি পছন্দই করি না। মারাত্বক উগ্রসাজ আর বিপজ্জনকভাবে ছোট পোশাক পরে। ছেলে দেখলেই কেমন একটা গায়ে পড়া ভাব আছে। মনটা খিঁচড়ে গেল। বাইরের আবহাওয়াটাকেই মনে মনে দায়ী করতে লাগলাম।
সন্ধ্যেবেলা সবেমাত্র ভাবছি একবার ক্ল্যারামন্ডের সাথে একঝলক আড্ডা মেরে এসে পড়তে বসব, ফোনটা আবার এল। রিসিভার তুলতেই সেই কন্ঠ, ইচ স্প্রেচে।
-চাইছটা কী?
অপরিচিতকে তুমি সম্বোধন এদেশে চলে যায়। তাছাড়া যেই ফোনটা করুক, গলাটা বেশ মোহময়। কানে এলেই কেমন খারাপ মনও বদলে যায়। আমি কিছু বলার আগেই প্রশ্ন এল, আমরা কি একবার দেখা করতে পারি?
এই কথার উত্তরে বিদেশ বিভূঁইয়ে একা থাকা একটা মেয়ের কি জবাব হওয়া উচিৎ? কিন্তু বলতে পারলাম না কেন? বদলে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছিল, কাল ক্লাশ আছে, সহসা মনে পড়ল কাল অ্যাসাম্পসন ডে। ছুটি। রিসিভারটা কানে ঠেসে ফিসফিস করে বললাম, ওহার? মানে কোথায়?
-সামনেই। ক্ল্যারা এফএলএসের পিছনে যে জলাশয়টা আছে, সেখানেই।
ফোনটা কেটে গেল। ছেলেটা কে? চিনি না, জানি না। বিশেষ করে বাড়িওয়ালী প্রথমদিনেই সাবধান করে দিয়েছিলেন, আমি যেন যার তার সাথে না মিশি। এখানে দুষ্টুলোকের অভাব নেই। আর বিশেষ করে বাড়িতে তো কোন ছেলেকে আনাই যাবে না। পার্টি-ফুর্তি একদম ব্যানড। যা করার বাইরে কর। কিন্তু যাকে চিনিই না, দেখা তো দূরের কথা, তার এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম? স্থির করলাম যাব না। আরেকবার ফোন করলে বাড়িওয়ালীকে জানিয়ে দেব। তাঁরা পাঁচপুরুষ এখানকার বাসিন্দা। এখানকার ঘাঁতঘোত চেনেন। আমি নিজের স্টাডি নিয়ে বসলাম।
পরদিন সকাল হতেই কিন্তু মনটা পাল্টে গেল। এয়ার কন্ডিশনারটা অফ করে জানলা খুলে দিলাম। আহ! কি মনোরম একটা বাতাস ঘরে আসছে। এখন অগাস্ট যায় যায়। শীত আসছে। গত শীতের ছুটি কাটিয়েছিলাম ফ্রান্সে। ভিভিয়ানের সাথে। ভিভিয়ান পিওঁরি। কি মিষ্টি ছেলে। বিশেষ করে ওর পাতলা গোলাপি ঠোঁটজোড়ার কথা মনে পরতেই মনটা উদাস হয়ে গেল। ব্লোমেন গাছের একটা ডাল সত্যি সত্যি ঘরের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। আমিও হাত বাড়িয়ে ওর পাতাগুলো ছুঁয়ে দিলাম। কাল সারারাতের বৃষ্টিভোগ করে এখন ঝকঝকে সবুজ। রোজ রোজ সসেজ ভালো লাগছিল না। আজ কিছু বানাতেও ইচ্ছা করছে না। ধড়াচুড়ো পরে বেরিয়ে পরলাম। সামান্য দূরেই একটা বেকারি আছে। সেলফ সার্ভিস কাউন্টার থেকে নিলাম এক কাপ কালো কফি আর চমৎকার ফ্রেস বেকড রোল, সাথে হার্ড বয়েলড ডিম। এখানে বলে ‘হার্টজেকোচেস এ’। চিবুতে চিবুতে একবার ভাবলাম। আজ কাজ বিশেষ কিছুই নেই। ছেলেটা আসবে কি? কে ছেলেটা? আমাকে চেনে? আমিও কি চিনি? হয়ত চিনি, আমার সাথে মজা করছে। দুত্তেরি বলে উঠে পরলাম। অত ভাবলে কাজের কাজ কিছু হয় না। বাবা বলত।
প্রথমেই গেলাম ক্ল্যারামন্ডের শপে। ক্ল্যারা কাউন্টারেই ছিল, আমাকে দেখে সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, গুটেন মর্গান।
আমি জার্মান ভাষায় প্রথমেই যে শব্দটা শিখেছিলাম সেটা ‘গুটেন মর্গান’। সামান্য হেসে প্রভাতী শুভেচ্ছা ফিরিয়ে দিলাম।
-মিট্টাগেচেন?
-লাঞ্চ! এত তাড়াতাড়ি? না হে, আমায় তুমি বরং পানীয়ই দাও। হাউএভার আজ লাঞ্চে কী বানাচ্ছ?
-আজ হলিডে বলে স্পেশাল মেনু। কার্টোফেলসালাট মিট ওয়ার্স্টচেন। নেক্সট স্প্যাটজলে নুডলস উইথ স্টির-ফ্রাই।
-বাবারে! তুমি আমাকে পানীয়টাই দাও। ঘুরে এসে পরে লাঞ্চ নেব।
ক্ল্যারা মিষ্টি হেসে এক পেগ ডনহফ এগিয়ে দিলো। আমি কাউন্টারের সামনেই উঁচু টুলে বসে একটু একটু করে চুমুক দিতে লাগলাম। ডনহফ আমার প্রিয় পানীয়। এছাড়া ক্রুজনাচের স্কেরুবেটাও মন্দ লাগে না। আর কিছু টেস্ট করে দেখি নি আজ অবধি। ক্ল্যারার সাথে টুকটাক গল্প করে এবং গ্লাস শেষ করে বেরিয়ে পরলাম।
প্রথমেই ওদিকে গেলাম না, অনাম্নী ছেলেটা যেখানে বলেছিল। ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। এখানকার রাস্তা দেখলে মনে হয় পাথরে বাঁধানো। ভিলশটে রোডের ওদিকের বাড়িগুলো একদম ছবির মত। বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙয়ের। পরপর একরকম দেখতে। আচ্ছা, এরা নিজেদের বাড়ি চিনতে পারে? বেশ খানিকটা হেসে নিলাম। দেশে থাকতে কম্পিউটারের ওয়ালপেপারে রাখতাম এইরকম সব ছবি। এই শহরতলিটা দেখলে মনে হয় কোনো নাইটদের যুগে এসে পড়েছি। অনেক অনেক জায়গায় দুর্গ বা ক্যাসল টাইপের বাড়ি। কারা থাকে ঐসব জায়গায় কে জানে। একদিকে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। সামনে দিন পনের মতন ছুটি পেলে থিউডোরকে নিয়ে ওল্ডেনবুর্গ যাবার ইচ্ছে। ওটি নাকি আরো সুন্দর। থিউডোরের সাথে কথা হয়ে গেছে। ছেলেটা আদতে ভালো। শুধু ঐ ডাইনিটার পাল্লায় না পড়লেই হয়। যাক গে, কাল থেকে হাল ধরতে হবে। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে মেরিলিয়া গার্ডেনে পৌঁছে গেছি খেয়ালই করিনি।
ভারি সুন্দর জায়গাটা। রবিবার হলেই আমি এখানে চলে আসি। একটা গোল পার্কের মত। সার সার সুদৃশ কাঠের বেঞ্চি পাতা। এখন বেশ কয়েকটি চেয়ার পূর্ণ। আমি একটা ম্যাপল গাছের তলার বেঞ্চিতে বসে চারদিকে তাকাতে লাগলাম। কোন ছেলেটা? একটা ছেলেকে চোখে পড়ল। বেশ লম্বা। অনেকটা অভিনেতা এডয়ার্ড উইন্টারস্টেইনের মত দেখতে। সেও আমাকে একবার দেখল। তারপর চোখ ঘুরিয়ে নিল। তবে কি ঐ টুপি পরিহিত ছেলেটি? ধ্যুৎ! ওর সাথে তো একটি মেয়েকেও দেখতে পাচ্ছি। ওরা চুম্বনরত। আমি আরও একবার চারদিকে দৃষ্টি ঘোরালাম। একদম কাছের বেঞ্চে বসে এক মধ্যবয়স্ক মানুষ। একমনে কী একটা বই পড়ছে। এ হবে না। তাহলে কি ঐ দীঘির উত্তরদিকের বেঞ্চটায় বসা পুরুষটি? তার দিকে মিটিমিটি তাকাচ্ছে। হুম মন্দ না। তবে লম্বা না। বরং বেশ বেঁটের দিকেই। আমি বেঁটে লোক সহ্য করতে পারি না। বিশেষ করে পার্সোনাল সম্পর্কের ক্ষেত্রে তো একেবারেই না। মাথা ঘুড়িয়ে দেখলাম আমার ঠিক কোনাকুনি একজন বসে আছে। বেঞ্চটাতে নয়, ঘাসের উপরে। তবে কি এ? এবার আমি নিজের ভাবনায় নিজেই হেসে ফেললাম। মানুষটা একটা পাগল বিশেষ। এক মুখ দাঁড়ি। নোংরা একটা ঢোলা প্যান্টের ওপরে ততোধিক নোংরা একটা ওয়েস্টকোট। কত বছর ওয়াশিং মেশিনের ছায়াও পড়েনি ওর ওপরে। আমি মুখ ঘুড়িয়ে নিলাম। পর মুহুর্তেই চমকে উঠলাম। কেউ একজন কানের খুব কাছে ফিসফিস করে বলল, ইচ স্প্রেচে।
কে! তবে কি সে এলো? আমি চমকে ঘাড় ঘুরিয়েই প্রায় চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলাম। ততক্ষণে আমার প্রায় কাঁধের চুল স্পর্শ করে ফেলেছে সেই পাগলটা! আমি প্রচন্ড রেগে কী একটা বলতে যাচ্ছিলাম, পাগলটা হেসে উঠল। সেই প্রাণখোলা হাসি। আমি হাসব না কাঁদব বুঝতেই পারলাম না। ততক্ষণে সে আমার পাশে বসে পরে এক এক করে মাথার চুল, দাড়ি খুলতে শুরু করেছে। আমি হাঁ করে দেখছি। এইবার যে মানুষটা বেরিয়ে এলো তাকে দেখে লেচ অথবা ওয়ারটাক নদীতে পাহাড়প্রমাণ ঢেউ উঠলেও আমি অতটা অবাক হতাম না। এই মুহুর্তে আমার সামনে এক অপরূপ পুরুষ বসে। এত সুন্দর জার্মান পুরুষ আমি আগে দেখিনি। স্বপ্নের মত গায়ের রং। প্রায় ছ ফিটের কাছাকাছি উচ্চতা। সাধারণ জার্মানদের মত ধূসর রঙয়ের চোখ নয়। বরং কাকচক্ষু জলের সাথে উপমা টানা যেতে পারে। জার্মানদের মত নয়, অনেকটা ফরাসি ছেলেদের মত পাতলা ঠোঁট। আমার কাছ ঘেঁষে বসে সে জানতে চাইলে, meine liebe Dame, wie heißt du?
ভারি অথচ রাশভারি নয় এমন কণ্ঠে আমার নাম জানতে চাইছে! জানালাম। সে জানালো তার নাম। এতদিন পরে সঠিক আজ আর মনে নেই। শুধু মনে আছে সেই সকাল, সেই দুপুর, সেই বিকেল…অপূর্ব! অপূর্ব! অতটা সময়, অথচ কি অবলীলায় কেটে গিয়েছিল! সে আদতে একজন কবি মানুষ। একের পর এক কবিতা আউড়েছিল সে। আমি কবিতা তেমন বুঝিনা, শুধু মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম কেন সেইদিন, আজও বুঝে উঠতে পারিনি। সে কাঁধের ঝোলাটা থেকে একটা ওয়াইনের ছোট বোতল বের করল। আমি সবিস্ময়ে দেখলাম! ডনহফ!! ছেলেটি বলল, Für deinen namen, für diesen abend (for your name, for this evening)
তখন সন্ধ্যে নেমে আসছে। জলের ধার দিয়ে দাঁড় করানো উইলো ট্রি গুলোর পাতা ঘেঁষে একটু একটু করে অন্ধকার নামছে। দূরের গির্জায় একবার ঘণ্টাধ্বনি হল। আমি অনুভব করলাম ছেলেটির ঠোঁট নেমে আসছে আমার ওষ্ঠ বরাবর। আমি বাধা দিতে চাইছিলাম না সেই মুহুর্তে। ওর গোলাপি পাতলা ঠোঁট আমাকে ভিভিয়ানের কথা মনে করাচ্ছিল, আমি বললাম, তাহলে এইভাবে আমাকে ভয় দেখালে কেন?
-ভয় না পেলে তোমার আসল চেহারাটা দেখতাম কি করে ম্যাডাম?
-তাই বলে এইরকম নোংরা পোশাক?
-এটা ছদ্মবেশ। তোমাকে যাচাই করে নিতে হবে না? তুমি ভয় পেলে বলে কাছে এলাম, ঘৃণা করলে দূরে যেতাম।
-তুমি কে বলতো?
ছেলেটি জবাব দিলো না। ওর হয়ে সব কথা বলে গেল ওর ঈষদুষ্ণ নিঃশ্বাস। আমি চোখ বুজলাম। কতক্ষণ মোহগ্রস্ত হয়ে ছিলাম জানি না, চোখ খুলতেই চমকে উঠলাম। একি! ছেলেটির চোখের মণি বদলে গেছে। ঠোঁটের সেই মৃদু হাসিটাও আর নেই। ভালো করে তাকালাম। mein Gott! (মাই গড!) চোখের ভুরুটাও যে আর নেই। চোখের মণিটা! ওটা কি আগে নীল ছিল? এখন কেমন জানি সাদাটে ভাব ধরেছে। ছেলেটি ততক্ষণে আমার একটা কব্জি চেপে ধরেছে। উফ! কি লাগছে! আমি ওর নাম ধরে বললাম, প্লিজ ছেড়ে দাও, আমার লাগছে।
ও ছাড়ল না। এবার আমার মনে হল ওর চোখের মণিটা সবটাই সাদা হয়ে গেছে। একটা বিশ্রী হাসি ওর পাতলা ঠোঁট ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। কব্জির কাছে একটা ধারালো কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করলাম। একি! আমার শিরা কেটে দিয়েছে! এ কে! আমায় হত্যা করতে চায়? চাইছে কি? আমি শরীরের সব শক্তি জোগাড় করে চেঁচিয়ে উঠলাম, Was willst du? bitte geh (what do you want? please leave me)
ও ছাড়ল না। সম্পূর্ন সাদা চোখে সে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। আমি পরিষ্কার দেখলাম অবিন্যস্ত চুলগুলোর অগ্রভাগ এক একটা সাপের মত হিলহিল করে নড়ছে। আমার কব্জি দিয়ে টপটপ করে রক্ত ঝরে যাচ্ছে, টের পাচ্ছিলাম, না তাকিয়েই। আর পারলাম না। সজোরে পা চালালাম। ছেলেটি যেন মেঘের তৈরি। যেন একটুকরো তুলো হাওয়ায় উড়িয়ে দিলাম, এইভাবে ছেলেটি প্রায় বিশ ফার্লং দূরে গিয়ে পড়ল। ঘাসের ওপরে পতনের জন্যই বোধকরি আওয়াজ হল না। তারপর উঠে দাঁড়ালো। আর ফিরল না। আস্তে আস্তে জলাশয়ের ওপরে জমা কুয়াশায় মিশে গেল।

সেদিন কিভাবে টলতে টলতে বাড়ি ফিরেছিলাম মনে নেই। নেশাটা কি বড্ড বেশী হয়ে গিয়েছে? আমার পা টলছিল। বড় রাস্তার চড়া আলোয় হাতের দিকে তাকিয়ে কোন রক্তের দাগ দেখতে পেলাম না, হাতের কব্জিও অক্ষত। যখন কটেজের দরজা ঠেলে ঢুকছি, দেখলাম পোর্টিকোয় মিস গ্রিসেল্ডা ডুসেলডার্ফ দাঁড়িয়ে। কি ব্যাপার! আমি তো দেরি করিনি। মিস ডুসেলডার্ফ বললেন, তোমার ফোন এসেছিল।
-আমার? কে?
-কে জানি না, সে শুধু বলল, ‘ইচ স্প্রেচে’। তারপর ফোন কেটে গেল। আমি তোমাকে বলছি, এমন ফোন এলে ধরবে না। এখানে অনেকেই ফোন করতে পারে। অথবা পার্টিকুলারলি একজন। ধরবে না।
-কেন?
-আমি বলছি তাই। ‘ইচ স্প্রেচে’! ‘ইচ স্প্রেচে’!! ‘আমি এখানে’!! ‘আমি এখানে’ মানে কি? মাই গার্ল, আমি নামে কেউ হয় না, কেউ হয় না, কারও হতে নেই।
মিস ডুসেলডার্ফ খটখট শব্দে উপরে উঠে গেলেন। সশব্দে দরজা বন্ধের শব্দ পেলাম। আমিও আমার ঘরের দরজার লক খোলার আগেই টের পেলাম ভেতরে ফোনটা বাজছে। বাড়িওয়ালী বলেছেন ফোন ধরতে না। কিন্তু আমি পারব না, কিছুতেই না ধরে থাকতে পারব না। কোনমতে দরজা খুলে দৌড়ে গেলাম রিসিভারের দিকে। হয়ত রিসিভার তুললেই কেউ বলবে ‘ইচ স্প্রেচে’। যদি বলে? আমি অন্ধকারের মধ্যেই হাতড়াতে লাগলাম। রিসিভারটা কোথায় গেল? এখানেই তো ছিল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।