‘শোনো রাজারহাটের ফ্ল্যাটটা দেখে এলাম,আঠারো তলায় বুঝলে? মাটি ছেড়ে অত উঁচুতে থাকতে অসুবিধা হবেনা তো তোমার? পারবে তো? লিফট আছে অবশ্য।’ রাজীব উৎসুক নয়নে শর্মিলার দিকে তাকিয়ে বলে।
শর্মিলা পানের বাটা নিয়ে বসেছে পান সাজাতে।একটা পান মুখে দিয়ে কচর কচর কচর করে চিবাতে চিবাতে বলে ‘ ভালোই তো।এতদিন মাটির কাছে ছিলাম,কি এমন হাত পা গজালো শুনি?’
‘তা ঠিক, তবে এত বছর ধরে মাটিতে বসবাস হঠাৎ আকাশে বসবাস সইবে তো?’
রাজীবের পুরোনো কথা মনে পড়ে যায়,অবশ্য মনে পড়ে যায় বললে ভুল হবে।যে তুষের আগুন মনের মধ্যে দশ বছর ধরে জ্বলছে সেটা কোনোও দিনই নির্বাপিত হবে না, শুধু মাঝে মাঝে দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে আজীবন।
জানে ভেবে লাভ নেই, খোকা আর ফিরবে না।কত আশা নিয়ে ছেলেকে ভালো শিক্ষা দিয়েছিল রাজীব।ইন্জিনিয়ারিং পাস করে ভালো কোম্পানিতে জয়েনও করেছিলো যথাসময়ে। তারপর বিদেশের হাতছানি।যদিও পরম মানে খোকা প্রথমে যেতে চায়নি কিন্তু রাজীবই বলে কয়ে বুঝিয়ে সুজিয়ে রাজি করায়।ছোটবেলা থেকেই আকাশের প্রতি একটা টান ছিলো ওর।আকাশে কোনো উড়োজাহাজ দেখলেই হাঁ করে তাকিয়ে থাকতো ততক্ষণই যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা যেতো।কাজেই একদিন চলে গেলো চাকরি নিয়ে বিদেশে।বছরে একবার আসতো,তার তিন বছর পরে সেই দুঃসংবাদটা এলো,প্লেন ক্র্যাশের।তখন রাজীবদের মনে হচ্ছিল আর বাঁচবেনা,বেঁচে থেকেই বা কি লাভ? কিন্তু বেঁচে তো আছে,দশ দশটা বছর তারপর কেটে গেলো,সময়ের থেকে বড় ওষুধ আর কি আছে?
তা হলে কাল পরশু ফাইনাল করে ফেলি,কি বল?বাড়িটারও তো বিক্রির বন্দোবস্ত করতে হবে একটা।অবশ্য প্রোমোটারই বন্দোবস্ত করে দেবে বলেছে।’
তা আর বলতে? ওরা তো মুখিয়ে আছে বাড়ি ভাঙ্গার জন্য।তবে দেখো ঠকায় না যেনো।ঠাকুরপোকে নিয়ে যেও ডিল পাকা করার সময়।’
হ্যাঁ,সঞ্জীবকে বলা আছে।ও ঠিক কাল সকালে চলে আসবে। ‘
রাত্রে খোকার জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছিল রাজীব একটা বাক্সে,ছোটবেলার স্মৃতির ঝাঁপি । হঠাৎই খোকার ক্লাস নাইনে আঁকা একটা ছবির দিকে নজর পড়ল তার।মাঠ,ঘাট,নদী,বাড়ি আর বড় বড় গাছ যাদের শিকড় মাটির অনেক অনেক ভিতরে প্রবেশ করেছে।আকাশে একটা উড়োজাহাজ যার পেছনেও কতগুলো শিকড় আঁকা।নীচে লেখা ” মানুষের জন্য একদিন সব গাছ শিকড়ের টান ছেড়ে আকাশে পাড়ি দেবে।”
রাজীবের দুচোখ ভরে জল চলে এলো।খোকা তো অনেকদিনই শিকড়ের মায়া কাটিয়ে আকাশে চলে গেছে।
বাক্সটা বন্ধ করতে করতে পাশে বসা শর্মিলাকে বললো ‘ বুঝলে , কাল সকাল সকালেই ফাইনাল করে আসবো ফ্ল্যাটটা,তাও তো খোকার কিছুটা কাছাকাছি থাকা যাবে।কি বল?’ জলে ভরা দুচোখ তুলে প্রশ্ন করে রাজীব।
শর্মিলা পান চিবানো বন্ধ করে রাজীবের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে!