গল্পে দিশারী মুখোপাধ্যায় 

একটা বাড়ির গল্প 

সামনে আলো , পিছনে আলো । ডানে আলো , বামে আলো । হাজার হাজার আলো বাতিময় । তাদের রঙও হাজার । তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য , তাদের বিস্তার , তাদের দেমাক বহুবিচিত্র । এত আলো নিয়ে একটা বাড়ি । আলোময় বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে আছে ।

বাইরে বাইরের ঘর । বৈঠকখানা । ঠেক মারার এলাহি আয়োজন । সুদৃশ্য দেওয়াল । রম্ভার জানু থেকে স্ল্যাব কেটে এনে বাঁধানো ঘরের মেঝে । রাশভারী ঘরের সিলিং ।

বাইরের ঘর বাইরে । একা । একা মানে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ । নিজেও নিজের সঙ্গে না থাকা । একসময় সে বাড়ির ভেতরে যায় । সাবেকি বাড়ি নয় । উঠোন নেই । আকাশ নেই । সবুজ নেই । অক্সিজেনের অভাবে বুকের জন্ম হয়না এখানে। একটাই ছাদ সবাইকে শাসন করছে । একসঙ্গে । বাইরের ঘর পায়ে পায়ে শোবার ঘরে । একাধিক শোবার ঘর । দিনের শোয়া । রাতের শোয়া । একাকী শোয়া । অন্বেষণ , খনন ও অপহরণের জন্য শোয়া । এরপর খাবার ঘর । সেখানে খাবার টেবিল আছে । আবার হাতে তৈরি দুএকটা আসনও আছে । হয়তোবা ধুলো পড়া । ঝুলে ঢাকা কাঠের পিঁড়িও ।
পুজোর ঘর । স্নানের ঘর । পুজোর ঘরেও স্নান হয় । স্নানের ঘরেও পুজো । পান ও গানের ঘর । বই সাজিয়ে রাখার ঘরও রয়েছে বাড়িতে ।
সম্পূর্ণ বাড়িটা এই ঘরেদের চেনে না । একটি ঘর অন্যকে । বাইরের ঘর যখন ভেতরে যায় , ভেতরের ঘরটি তখন বাইরে এসে দাঁড়ায় ঘোমটা দিয়ে বা বেলিফুলের মালা জড়িয়ে বাইরের সম্পূর্ণ বাহিরটিকে ধরে। যেমন খুশি কল্পনা করুন পাঠক আপনি ।
এই আলো ঝলমলে বাড়িটি অন্ধকারে রয়েছে। এখন আপনি কী করবেন ঠিক করুন পাঠক । সরাইখানায় এসেছেন । বসেছেন । আপনার পাতে কী পরিবেশন করা হবে ? আলো না অন্ধকার ? আপনি তো জানেন কাঠের সিঁড়ি দিয়ে স্বর্গে ওঠা যায় না । স্বর্গের আলো মাটিতে এসে পৌঁছায় না । সে অনেক আলোকবর্ষের হিসাব । একজন পাঠকের অত অঙ্ক শিখতে , বুঝতে গেলে চলে না । কারণ পাঠক আদতে একজন পথিক । এইযে ঘরে ঘরে এত জায়গা , সেখানে তো , সময় কেবল পায়চারি করে । করছে । করবেও ।
এমন কেউ কী আছেন , সময় যার কাছে যায়নি । থাকলে জানাবেন ।
একটা মই । চিৎ হয়ে শুয়ে আছে । মাটির সঙ্গে কথোপকথন করছে সমান্তরালে ।
আমি সেই আলোময় অন্ধকার বাড়িটির ভেতর থেকে একটা লম্বা ছিপের অনেকটা সুতো ছেড়ে বাড়িয়ে দিয়েছি রাস্তার দিকে । বড়শিতে গাঁথতে চাই । সময়কে বড়শিতে গাঁথা যায় না । সে টোপ খায়না । সোনার তৈরি টোপও না । তাহলে আমাকে ও ছিপকে নিয়ে প্রশ্ন ওঠেই । উঠতে পারে । কিন্তু ওঠে না । বাড়িটি পছন্দ করে না ।
আমি বোধহয় সেই বাইরের ঘর । সিঁড়ি ভাঙতে থাকি । সিঁড়ি কিন্তু ভাঙে না । আমার হাঁটু , গোড়ালি , হিপ ভাঙতে থাকে । একটু একটু করে । আমাকে তবু উঠতে হবে । বাড়ির উপরের তলাটার উপরেই তো ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গোটা বাড়িটা । সেটাকে না জানলে জানা ক্রিয়া পদটি বিপন্ন হয় ।
আমি বাইরের ঘর । হাজারো পোশাক পরিচ্ছদের ভেতর আমি সম্পূর্ণ নগ্ন । উপর তলায় আরও যেসব ঘর আছে তারা তো কেউ সে অর্থে ঘর নয় । তারা বাড়ির কেউ হয় না ।  বাড়িবিহীন উপর তলায় আরো অনেক উপর তলা । তারা ঘুড়ির লড়াই ভালবাসে । তাদের আকাশ নেই কিন্তু উড়াল আছে । পাথর কেটে কেটে বানানো কৃত্রিম উড়াল ।
এটা একটা বাড়ির গল্প । বাগানের কথা মানায় না ।
অনেক দূরে দূরে ভয়ে ভয়ে পালিয়ে গেছে গাছেরা । সাপ কেন তোমার রেনপাইপ বেয়ে অগম্যে গমন করে এমন অনধিকার প্রশ্ন তারা করেনি । শুধু সেতারের কথা জানতে চেয়েছে । কেন তুমি বাজাও না ? কেন তুমি বাজ না ? সেতারের উচ্চারণবিহীন অভিযোগে তারা পুড়ছিল । তারা তাদের সেতার-সংস্রব বাঁচাতে পালিয়ে এসেছে ।
তুমি ঘর । তুমি বাইরের ঘর । তুমি ভেতরও । আমি বোধহয় সেই বাইরের ঘর যেখানে একটা সমান চিহ্নের দরকার পড়ে ।
এটা একটা বাড়ির গল্প । এখানে আলো অন্ধকার নিয়ে কিছু বলবে না ক্যানভাস । সে না চেনে তোমাকে , না আমাকে ।
পাঠক , আপনি এই ক্যানভাস সরিয়ে নিতে পারেন । কেননা আপনিই পথিক ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।