লম্বা জানালাটার সামনে প্রভাবতী সকাল থেকেই বসে থাকেন।সামনে সবুজ মাঠটার ওপাশেই রাস্তা।কত্তো গাড়ি যায়। স্কুলের বাস একটার পর একটা পেরোতে থাকে। বাড়ির এই লম্বা বারান্দা টার সামনে নীচ থেকে ওপর অব্দি লম্বা জানালা। মোটা মোটা লোহার রড।আর প্রভাবতী দুপুরটুকু বাদ দিয়ে বাকি সময় জানালাটার সামনে বসে থাকেন।কতো বিচিত্র রঙীন দৃশ্যপট তাঁর চোখের সামনে মাঠটায়, রাস্তার ওপাশে ফুটে ওঠে। বড়ো রাস্তাটা দিয়ে একটার পর একটা গাড়ি পেরোতে থাকে, স্কুলবাস পেরোতে থাকে। এতোবড় একতলা বাড়িটাতে, সামনের দিকটাতে তিনি থাকেন, পেছনের দিকটা এক ডাক্তারের ফ্যামিলিকে ভাড়া দেয়া আছে। প্রভাবতীর স্বামী ছিলেন ডাক্তার, ছেলে পুলে হয়নি। বোনের বাড়ি কাছেই।বোনের ছেলেরা মাঝে মাঝে এসে খোঁজ খবর নিয়ে যায়।ভাড়াটে ডাক্তার বাবু রাও ভালো মানুষ, খোঁজ খবর রাখে। প্রভাবতীর বয়স পঁচাত্তর।
ভোরে ওঠা অভ্যেস, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে সকালেই একবার ঠাকুরঘরে ঢোকেন।বাড়ির উঠোনের সাদা ফুলের গাছটায় অজস্র ফুল ফোটে।ঠাকুরের ফুল তোলেন। গোপালকে একটু খাইয়ে _ নিজের চা আর দুটো বিস্কুট নিয়ে জানালাটার সামনে বসেন।সকাল সাতটা বাজে, সকালের রোদ এসে পড়েছে সামনের খোলা মাঠে, একটা ছোট্ট ফিঙে পাখি ব’সে আছে মাঠে__ ওই তো ঘোষে দের বাড়ির ভোলা স্কুলে যাচ্ছে।থ্রী তে পড়ে ভোলা। রোজ তাঁর সাথে গল্প করে। প্রভাবতী ডাকেন _ ভোলা কি টিফিন নিয়েছিস রে আজ? তোর কি আজ পরীক্ষা আছে? তোর ছোট্ট বোনটা কথা বলতে শিখেছে? দাদা বলল তোকে? তোর ঠাকুমার জ্বর টা সেরেছে? স্কুলের বন্ধুদের সাথে মারামারি করিস _ এ হেন কত কথা শুধোন।
ভোলা একটু কথা বলে একছুট লাগায় স্কুলের দিকে।প্রভাবতী খানিকক্ষণ ভোলার বয়সে পৌঁছে যান।মনে পড়ে স্কুল জীবনের কথা। কবেকার কথা সে সব। পাশের বাড়ির দীনু পড়তো তাঁর সাথে। আর এক প্রিয় সাথী ছিল পদ্মা। কত খেলনাবাটি খেলেছেন পদ্মা, দীনু ওদের সাথে।
চোখের সামনে দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। ঐ তো রায়বাড়ির ছোট বৌ, ছেলের হাত ধ’রে হিড়হিড় করে টানতে টানতে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে, বাচ্চা টা কিছুতেই স্কুলে যাবে না, দু চোখ কচলাতে কচলাতে মা’র হাত ধ’রে চলেছে। হাসি ও পায় প্রভাবতী র _ কি শাস্তি দেখো_ ঐ টুকুনি শিশু _ সবে পৃথিবী টাকে দেখতে শিখেছে _ কি বোঝে বাপু পড়াশোনা র। টিং টং _ বেল বাজল_ ঐ বুঝি দুধওয়ালা এল।_ “ও হারু আজ বড় সকাল সকাল যে _ তা তোমার নাতি কত বড় হলসব ক’টা গোরু কি দুধ দিচ্ছে এখন – খানিক গল্প করেন হারু র সাথে।হারু চলে যায়। প্রভাবতী ঢোকেন রান্নাঘরে।একটু ছানা, কলা, বাতাসা দিয়ে জলখাবার টা সারেন। রবীন্দ্রনাথের ‘ গোরা’বইটি নিয়ে আবার জানালার পাশে বসেন। বেলা দশটার পর একটার পর একটা স্কুল বাস পেরোতে থাকে। খুব ব্যস্ত বর্ণময় ছবি সকালের এই সময়টায়। ঐ তো মুখার্জী বাড়ির ছোট বৌ কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে দৌড়চ্ছে বাস ধরবে বলে। ও একটা স্কুলে পড়ায় _ ইংরেজি র শিক্ষিকা।ভারি ভালো লাগে এই ব্যস্ততা টা।তিনি নিজেও তো বাংলা র শিক্ষিকা ছিলেন এখানকার গার্লস স্কুলের।খুব সুন্দর কাটতো সে সব দিন। স্কুলের ঘন্টা বাজতো, সে শব্দ বড় মধুর লাগত।এগারোটা বেজে গেলে সামনের রাস্তাটার ব্যস্তভাব টা থিতু হয়ে আসে। আস্তে আস্তে যৌবনোত্তীর্না নারী র মত শান্তরূপ ধারন করে রাস্তাটা।বইটা খানিক পড়েন নাঃ উঠে পড়েন খানিক বাদে_ স্নানে যেতে হবে। বোনের বাড়ি থেকে দুপুরের খাবার টা আসে। নিজে আর পারেন না এখন।মিনতি এসে দিয়ে যায়।
প্রভাবতী স্নানে ঢোকেন। তারপর পুজো, খাওয়া দাওয়া সেরে আবার জানালা _ টার পাশে বসেন বইটা নিয়ে। শরতের রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরে, পেঁজা পেঁজা মেঘ ভেসে বেড়ায়, মনে হয় আকাশের কোথায় যেন পুজো পুজো সাড়া পড়েছে।একটা ছোট্ট ফিঙে পাখি মাঠটার পাশের পেয়ারা গাছটায় অকারনে দোল খাচ্ছে।
: ভারি ভালো লাগে তাঁর এই শান্ত অলসযাপন। পুরোনো দিনের কত ছবি মনে আসে। তিনি ছিলেন বড় রসিক।প্রচুর বাজার করতে আর লোককে খাওয়াতে ভালোবাসতেন।বাজার করে ফিরে বলতেন _ এই যে দিদিমনি _ দেখুন কি কি মাছ এনেছি।আরো কতো কথা। এখন তো আর বেরোতে পারেন না কোথাও।
তবে এক একটা দিন এক একরকম রং নিয়ে আসে তাঁর কাছে _ বিভিন্ন ঋতুতে ওই সবুজ মাঠটার ওপাশের রাস্তাটায় জীবনের ক্যানভাসে বিভিন্ন রং ফুটে উঠতে থাকে।দিব্যি কেটে যায় প্রভাবতীর। মানুষ কি একা? বোধহয় নয়। বিকেলের সোনালী রোদ ছোঁয়া দিয়ে গেলে আস্তে আস্তে সন্ধ্যে নামে। পাড়ার ছেলেগুলো _ ও পাড়ার ভোলা, নান্টু, বুড়ো,পটলা_ সব ফুটবল খেলে মাঠটায়।সন্ধ্যে অব্দি ব’সে ব’সে ওদের খেলা দেখেন।
ছেলেগুলো হৈ হৈ করে চেঁচায়, ভারি ভালো লাগে তাঁর _ প্রানের স্পন্দন অনুভব করেন, সন্ধ্যে নেমে আসে। সন্ধ্যে দিয়ে ঠাকুরঘরে বসেন। নির্মলা আসে সাড়ে সাতটায়। খানিক গল্প করেন ওর সাথে। নির্মলা কয়েকটা রুটি আর দুধগরম করে রেখে চলে যায়। একটু টিভি দেখেন বসে, তারপর খেয়ে শুয়ে পড়েন।ভোরে ঘুম ভাঙে তাঁর, জানালা দিয়ে দেখেন কচি সূর্যের আলো ঢুকেছে ঘরে, আর একটা ছোট্ট চড়াই মাথার কাছের জানালাটায় তুড়ুক তুড়ুক করে লাফাচ্ছে। দেরী হয়ে গেছে উঠতে, হাত মুখ ধুয়ে চা নিয়ে বসেন জানালাটার পাশে, আজ বোধহয় ভোলার সাথে দেখা হল না রে_ ওই তো ভোলা, কাঁধে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছে, ও ভোলা তোর আজ পরীক্ষা না কি রে? ডাক দেন প্রভাবতী।সামনের মাঠটায় রোদ উজ্জ্বল রং নিতে থাকে।অবাক লাগে তাঁর _ রোজ এক ই রুটীনের চলা, তবু প্রতিটা দিন কি করে আলাদা মনে হয়? সামনের এই মাঠটার রং ই তো কি রকম করে রোজ রোজ পাল্টে পাল্টে যায় !… গরমে মাঠটার কিরকম শুকনো রূপ, বর্ষায় মেঘের কালোছায়া যেন কচি ঘাসগুলোয় পড়ে। সেইযে কবি গেয়েছিলেন _ ছায়া ঘনাইছে বনে বনে_ এই কচি ঘাসগুলোতে ও যেন মেঘের কালোরূপ ছোঁয়া লাগায়।
আবার শরতে কচি সবুজের ওপর সোনালী রোদের কি বাহার। আবার শীতে যেন দুঃখীরূপ নেয়।প্রভাবতী রোজ বসে বসে এগুলো দেখেন।
মনে মনে কতো ছবি আঁকেন। বিকেলে ছেলেগুলো খেলে _ আজ নান্টুকে দেখলেন না_ নান্টু কোথায় রে? শুধোন_ পটলা উত্তর দেয়_ নান্টুর শরীর খারাপ দিদা_জ্বর এসেছে। শরীরটা প্রভাবতীর ও খারাপ লাগছে আজ। জ্বর জ্বর লাগছে, মাথাটা কেমন যন্ত্রণা করছে, জানালাটার সামনে থেকে উঠে আসেন, সন্ধ্যে দিয়ে একটা হাল্কা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েন।কাল ডাক্তার দেখাতেই হবে।নির্মলা এসে রুটি করে। সকালে শরীরটা একটু ভালো বোধ করছেন। এককাপ লিকার চা আর বিস্কিট নিয়ে বসেন জানালাটার সামনে। সবুজ মাঠটায় সুন্দর শরতের রোদ পড়েছে তো! সামনে পুজো। মনে একটা বেশ অদ্ভুত আনন্দ হয়।কিসের আনন্দ কে জানে! _ হাসি পায় প্রভাবতীর। ছেলেবেলার পুজোর আনন্দের রেশটা এই বুড়ো বয়সেও মোছেনি! নাঃ শরীর টা ভালো লাগছে না। আজ বোন বলেছে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। একটা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েন।
বিকেলে খুকু জোর করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল।আজ বিকেলে আর বুড়ো, পটলাদের খেলাটা দেখা হল না। নান্টু _ কেমন আছে কে জানে ! খুকু রাত্তিরে থাকতে চেয়েছিল, থাকতে দেন নি। তাড়াতাড়ি খাবার আর ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়েন। কতো ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে _ সেই খেলনাবাটি খেলার দিনের কথা, পুতুলের বিয়ে… কেমন একটা নেশা নেশা অন্ধকারের মধ্যে যেন তলিয়ে যেতে থাকেন।
সকালে নির্মলা দরজা ধাক্কা দিয়ে সাড়া না পেয়ে ডেকে আনেন ডাক্তারবাবুকে। ঘরে ঢুকে দেখেন প্রভাবতী খাটে নিঃসাড় হয়ে শুয়ে আছেন।ডাক্তারবাবু নাড়ি দেখেই বোঝেন রাত্তিরেই এটা হয়েছে _ ম্যাসিভ অ্যাটাক।
: সঙ্গে সঙ্গে প্রভাবতীর বোন ছুটে আসে, পাড়ার পটলা, হারু, ভোলা,প্রত্যেকে ছুটে আসে। ঘরে লোক ভেঙে পড়ে। এবার তো নিয়ে যাবার প্রস্ততি।ভীড়ের মাঝে কে যেন বলে ওঠে _ আহা রে মানুষটা বড্ড একা ছিল _ মৃত প্রভাবতীর ঠোঁটের কোনায় কি মুচকি হাসি? একা কি আদৌ ছিলেন প্রভাবতী না কি জনারন্যে থেকেও অনেকে জনহীন হয়? প্রভাবতীর সংসার তো ছিল _ পাড়াজুড়ে, ঐ মাঠটার ওপারের ক্যানভাসে। তাঁর মন তো জড়িয়েছিল _ ভোলা, হারু, পটলা, নান্টু দের সাথে _ আর প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে ফুটতে থাকা মাঠটার বিচিত্র রূপের সাথে। এই জানালাটা ই তো ছিল তাঁর পৃথিবী। জীবনের স্পন্দন, রং, রূপ এই জানালাটা দিয়েই তো তিনি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেছেন। এবার সবরূপ ছেড়ে অরূপের পথে যাত্রা।