পেশায় Intelletual Peoperty Lawyer, এর পাশাপাশি Siege Now নামে একটি মিডিয়া স্টার্টআপ গড়ে তুলছেন। বৈদ্যুতিন মাধ্যমে বিষয়ভিক্তিক লেখালিখির সূত্রপাত।
কলকাতা লেটস বি ভেগান
ফেব্রুয়ারীর 25 তারিখ, 2019
দুরন্ত মেলের AC 3A টে উঠে নিজের বার্থ টা খুঁজে পেতে দেরী হলো না অবন্তিকার ।
নিজের বার্থে গুছিয়ে বসতেই ট্রেন ছেড়ে দিলো পুনে জং থেকে।
ট্রেন ছাড়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই WhatsApp এ ঢুকে বিশেষ একজন কে টেক্সট করে জানিয়েও দিলো যে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে আর কয়েকটা ঘণ্টা মাত্র আর তারপরেই কলকাতা।
WhatsApp থেকে বেরিয়েই সটান ফেসবুকের গ্রুপের নোটিফিকেশন গুলো চটপট চেক করলো অবন্তিকা।
কিছুদিন আগেই কলকাতাতে বালিগঞ্জ এলাকায় পিজির খোঁজ করে কিছু পোস্ট করেছিলো, প্রচুর লিডস ও পেয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে কারুর কারুর সাথে ফোনে কথাও হয়েছে ইতিমধ্যেই তবুও আরেকবার দেখে নিলো নতুন কোনো নোটিফিকেশন এসেছে কিনা।
অবন্তিকার মা পুনের একজন নাম করা সাহিত্যিক, মূলত মারাঠী ভাষায় লেখেন, উনি আবার ইংলিশেও লেখেন হিউম্যান রাইটস ইস্যু ভিক্তিক প্রচুর আর্টিকল যা প্রকাশিত হয় বিভিন্ন ইন্টারন্যাশনাল ম্যাগাজিনে।
অবন্তিকা মাসকম নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর পরে এখন একটা এনজিও সাথে যুক্ত যারা সারা বিশ্বেই আনিম্যাল রাইটস নিয়ে কাজ করছে।
এই এনজিওটির নতুন প্রোজেক্ট ইন চার্জ অবন্তিকা, ওঁর কাছে এটা ওঁর ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট , প্রোজেক্ট সাইট কলকাতাতে আর তাই আজ রাতের ট্রেনে কলকাতা যাত্রা।
দুই বছর আগে :
ইন্টারন্যাশনাল ফুড কনক্লেভ এর প্যাভিলিয়ন, তাজ হোটেল | মুম্বাই
( দুই ব্যক্তির মধ্যে লাঞ্চ টাইমের কথোপকথন)
প্রথম ব্যক্তি : মিস্টার ভাটিয়া, ২০১৪ টে ইলেকশন এ গাদা গাদা টাকা ঢাললাম আপনার কথা মেনেই তবুও লাভ কি হলো? এই আমেরিকান ফুড চেন গুলো আমাদের ব্যবসা টে ভাগ বসিয়েই চলেছে।
আপনাদের সরকারকে বলুন কিছু করতে আমাদের মতো দেশীয় ব্যবসায়ী দের জন্য।
মিস্টার ভাটিয়া : আগরওয়াল সাহেব, ধৈর্য ধরুন, একদিনে কিস্যু হয়না। বিশেষ করে আপনার স্টেট, সেখানে আমাদের গভর্নমেন্ট নেই সেটা ভুললে চলবে না, আর ওখানকার মানুষ জন বিশেষ করে ওই বাঙালী, জানেন তো ওঁরা কি রকম ? হাহাহাহা
সুহুনেছি পাণ্ডবদের ও মেরে ভাগিয়ে ছিলো একবার ।
হাঃ হাঃ হাঃ
মিস্টার আগরওয়াল : ওই বাংলাউয়ে হামাদের কয়েক পুরুষের ব্যবসা, আমরা বুজি ওদের সেন্টিমেন্ট। জেনে রাখুন ক্যালকাটা ভুজিযাওয়ালার আজকে বাঙ্গালীদের মধ্যেও একটা গুড উইল আছে জানেন। কিন্তু কি করবো নতুন জেনেরশন তো ওই কে এফ সি, ম্যাকডোনাল্ড ছাড়া কিসসু বুজসে না।
এপ্রিল | 2019
যাদবপুর ইউনিভার্সিটির করিডোর দিয়ে ঢুকতেই প্রায় মুখোমুখি ধাক্কা, অবন্তিকার হাত থেকে পেন টা মাটিতে পড়ে যেতেই সায়ন্তন নীচু হয়ে ঝুঁকে তুলে দিতে গিয়েই লক্ষ্য করলো অবন্তিকার পরনের হাঁটুর অনেকটা ওপর অবধি ঝুলে থাকা মিনিস্কার্ট, ভ্যাকসিং করা পায়ের অমোঘ আকর্ষণ অনিচ্ছা সত্ত্বেও উপেক্ষা করে পেনটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েই অবন্তিকার দিকে ছুঁড়ে দিলো ওর ট্রেডমার্ক হাসিটা ….
– হাই
– ওহঃ হাই অবন্তিকা।
– সোও ? তুমি এখানে ?
– এটা আমারই তো কলেজ , আই মিন , ছিলো..
তো তুমি বলো ? তুমি এখানে ?
– হ্যাঁ আমাদের এনজিওর একটা সেমিনার চলছে স্ট্রেই ডোগ দের নিয়ে, অনেক লোকাল এনজিও এসেছে।
– ও আচ্ছা।
একসাথে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে;
“তারপর বোলো আমাদের কলকাতা কেমন লাগছে ? খাবার নিয়ে সমস্যা হচ্ছে না তো ? “তুমি তো আবার ভেগান ” বলেই অবন্তিকার চোখের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলো সায়ন্তন।
সায়ন্তনের সাথে অবন্তিকার প্রথম আলাপ ফেসবুকেই , গাঁজার আইনিকরণের লড়াইয়ের একটা গ্রুপে। সায়ন্তন কলকাতার বামপন্থী রাজনীতির সাথে ছাত্রাবস্তা থেকে আগাগোড়াই যুক্ত, এখন একটা প্রথম সারির নিউজ মিডিয়া কোম্পানিতে কর্মরত হলেও নিজের পুরোনো ক্যাম্পাসকে ভুলতে পারেনি তাই সময় সুযোগ পেলেই ঢুঁ মেরে যায় ক্যাম্পাসে।
জুন | 2019
পার্ক স্ট্রিট এর ক্যালকাটা ভুজিয়াওয়ালা প্রাইভেট লিমিটেড এর অফিসে এমডি মিস্টার আগরওয়ালের কেবিনে ঠিক কাঁটায় কাঁটায়ে দুপুর দুটোর মধ্যেই প্রবেশ করলো আনন্দ দণ্ডপাট তাঁর দুইজন সহকারী সহ।
আনন্দ কলকাতার একটি প্রথমসারির PR Firm বা জনসংযোগ স্টার্টআপ এর কর্ণধার।
আসন গ্রহণ করেই নিজের ল্যাপটপ থেকে প্রেসেনটাশন টা চালিয়ে দিলো ।
– দেখুন স্যার, আপনার বন্ধু মিস্টার ভাটিয়ার উপদেশ মেনে আমরা যে যে এনজিও গুলোর এপ্লিকেশন পেয়েছিলাম তারমধ্যে পুনের এই বিশেষ এনজিও টিকে আমাদের ক্যাম্পাইনিং এর জন্য বেছে নিয়েছি , এঁদের পাস্ট ওয়ার্ক স্টাডি করে দেখেছি এরা আজ অবধি প্রচুর সফল ক্যাম্পাইনিং করেছে এবং সেগুলোর সব কটি প্রথাগত মিডিয়ামের বাইরে মানে সোশ্যাল মিডিয়াতে, এর আগেও কর্ণাটকে Hemp Legalisation এর ওপর একটা মুভমেন্ট এরা করেছিলো যা তরুণদের কাছে বেশ গ্রহণযোগ্য।
অতিমধ্যেই ওদের প্রোজেক্ট ইন চার্জ কলকাতাতে, স্মার্ট লেডি। আমি নিজেই মিট করেছি।
পুরো প্রেসেনশনটা বেশ মন দিয়ে দেখছিলেন আগরওয়াল আর তারসাথে শুনছিলেন আনন্দ এর কথা। আনন্দ শেষ করতেই বেশ এক্সসাইটেড হয়ে বললেন;
– ভেরি গুড, আপনি তো এই কয়েকমাসে বেশ এগিয়েছেন দেখছি। কিন্তু লোকাল গভর্নমেন্ট থেকে কি কোনো সাপোর্ট পাওয়ার আশা আছে?
– অফ কোর্স স্যার। দক্ষিণপন্থা কে রুখতে এখন ওয়েস্ট বেঙ্গল এর গভর্নেমেন্ট মরিয়া, আমি ঠিক জায়গায় সোর্স লাগিয়ে দিয়েছি Ad campaigning এ আমরা এখানকার কলকাতার নিউজ আর প্রিন্ট মিডিয়া গুলোতে প্রায় ফিফটি পার্সেন্ট এর ওপর রিবেট পাবো ।
– এক্সসেলেন্ট ওয়ার্ক আনন্দ।
আপনার ইনভয়েসটা মেল করে দেবেন পেমেন্ট হয়ে যাবে।
– নো প্রবলেম স্যার।
আগস্ট | 2019
টাকির গেস্ট হাউসের একটি কটেজে !
অবন্তিকার মিশন কলকাতা বেশ ভালো ভাবেই এগুচ্ছে, ওঁদের “কলকাতা বি ভেগান” ক্যাম্পাইনিং বেশ হিট করেছে , কিছু নেকু সেন্টিমেন্টাল বাঙালী আরো বেশি করে ওদের বিরোধিতা করতে গিয়েই আজ কে মাত্র দিন পনেরোর মধ্যেই ওদের পেজ লাইক এক লাখ ছাড়িয়েছে। তাই সেলিব্রেশন তো বানতা হ্যায় । এই ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী হেল্প পেয়েছে সায়ন্তনের থেকে, ওর নিজের পেপারে প্রচুর আর্টিকল ছাপিয়েছে ছেলেটি নিজের থেকেই তৎপর হয়ে আর তাই আজ ওকে নিয়েই অবন্তিকা বেড়িয়ে পড়েছে, একটা ছোট্ট ব্রেকের খুব দরকার ছিলো।
পরপর তিনবার যৌন মিলনের ফলে এখন দুজনই বেশ টায়ার্ড, বাইরে বৃষ্টি পড়ছে বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়া, এসি টে টেম্প তাই ২৬ এ সেট করা। রুমে নক হতেই অবন্তিকা টি শার্টটা গলিয়ে উঠে পড়লো। বেয়ারা চারটে বিয়ারের বোতল আর সাথে দুপ্লেট চিকেন ফ্রাই সার্ভ করে বেরিয়ে যেতেই অবন্তিকা দেখলো সায়ন্তন বিছানায় উঠে বসে একটা সিগারেট ধরিয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।
অবন্তিকা কপোট রাগ দেখিয়ে কোমরে হাত দিয়ে বললো;
– আমি জানি তুমি কেন হাসছো, কি করবো এমন একটা জায়গায় বুকিং করেছো যেখানে বেবী কর্ন পাওয়া যায় না, অগত্যা চিকেন ছাড়া উপায় নেই।
– আরে আমি তো মজা করছিলাম বেবি, আমার বাবা কি বলেন জানো! “বি লাইক রোমান ওহেন ইন রোম”,
আর আমাকেই দেখোনা হার্ড কোর কম্যুনিস্ট হয়েও, মাদুলী; আমার বড় কাকার সৌজন্যে।
কথাগুলো বলেই খিখি করে হাসতে লাগলো সায়ন্তন ।
সেপ্টেম্বর | 2019
সকাল ৮টা | আইটিসি সোনার বাংলা হোটেল
কনফারেন্স রুমের বন্ধ দরজার ওপারে পিন ড্রপ সাইলেন্স।
গ্রুপ মেডিটেশন চলছে।
প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তির পরনে সবুজ রঙের পোশাক।
মিনিট পনেরো পরে মেডিটেশন পর্বের সমাপ্তির সাথে সাথেই ডক্টর হার্ডি মঞ্চে উঠলেন, সমবেত উপস্থিত সদস্যদের স্বাগতম জানিয়ে শুরু করলেন ওনার বক্তব্য।
“যে কোনো ইসাম যেরকম কমুনিসম বা সোশালিসম এর মতোই কিন্তু ভেগানিসম ও একটি আদর্শ, আর এই আদর্শের প্রতি আনুগত্যতাই আমাদের আগামীর পথ প্রদর্শক । কিন্তু এই আনুগত্যতা আগেও যেটা দরকার সেটি হলো স্যাক্রিফাইস। যে কোনো মহান উদ্দেশ্য কে সফল রূপদানের জন্য দরকার পড়ে স্যাক্রিফাইসের” ।
লাস্ট রোও টে সায়ন্তন বসে আছে, অবন্তিকার জোরাজুরিতে শেষ অবধি আসতেই হলো সকালের ঘুমটা পণ্ড করে এই পাঁচ তারা হোটেলের কনফারেন্স রুমে, প্রথমে খুব বোরিং লাগলেও এই মুহূর্তে বেশ একটা আবেশের মধ্যে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে সায়ন্তন, ডক্টর হার্ডি নির্ঘাত সম্মোহন বিদ্যায়ে পারদর্শী তা না হলে এই কথাগুলো ধীরে ধীরে ছেয়ে যাচ্ছে কি করে সায়ন্তনের মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে কোষে !
“আপনাদের গর্বিত হওয়া সাজে, কারণ আপনারাই সেই গুটিকয়েক বাছাই করা ব্যক্তিবর্গ যারা এই প্ল্যানেট কে রক্ষা করার মহান দ্বায়িত্ব ভার গ্রহণ করতে সক্ষম। “
সকাল ১১ টা :
ওয়েস্ট বেঙ্গল ফুড সেফটি ডিপার্টমেন্ট, প্রধান কার্যালয় :
ডিরেক্টরের মুড যে আজকে একদমই বিগড়ে আছে সেটা উনি অফিসে আসার সাথে সাথে অনিমেষ লক্ষ্য করেছে, কিন্তু এতোটা বিগড়ে আছে সেটা বুঝতে পারেনি ততক্ষণ অবধি যতক্ষনে না পিয়ন পান্ডে ব্যাজার মুখ করে তাকে জানালো যে বড় সাহেব তাঁর ঘরে তলব করেছেন অনিমেষ কে।
কপালে কি আছে ভাবতে ভাবতেই উঠে পড়ে জলদি পা চালালো বড় সাহেবের কেবিনের দিকে ।
– তোমার কি হয়েছে অনিমেষ ?
– কেন স্যার ?
অনিমেষ ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলো, গত সপ্তাহে একদিন কামাই ছিলো, সেই জন্য কি !
এতক্ষনে অনিমেষের কাছে ব্যাপারটা খোলসা হলো। পিকে গ্রুপের এজেন্ট নিশ্চয়ই স্যারের সাথে যোগাযোগ করে ওঁদের ফুড লাইসেন্স এর আপডেট জানতে চেয়েছেন।
– ভালো হয়েছে স্যার আপনি জিগ্যেস করেছেন, না হলে আমি ঠিকই করে রেখেছিলাম আজ আপনার সাথে বসবো বলে ওঁদের ফাইলটা নিয়ে।
ভ্রু কুঁচকে ডিরেক্টর তাকালেন অনিমেষ এর দিকে,
– কেন ? কাগজ পত্রে ভুল কিছু আছে ?
খানিকটা আমতা আমতা করে অনিমেষ জবাব দিলেন ,
– না স্যার তাও ঠিক নয়, কোম্পানি ইনকর্পরাশন সার্টিফিকেটে, বোর্ড অফ ডিরেক্টরের লিস্ট, ফুড প্রোডাক্টরের ক্লাসিফিকাশন, সোর্স ওয়াটার টেস্টিং রিপোর্ট , প্যাকেজিং স্যাম্পেল এই সব কিছুই ওনারা দিয়েছেন, অফিসিয়াল ফী এর চালান সমেত, কিন্তু !
– কিন্তু কি ? সব ঠিক থাকলে ফাইল পাস করে দেও, আমি সাইন করে দেওয়ার পরেই লাইসেন্স ইস্যু করো ।
– কিন্তু স্যার একটা খটকা আছে ।
– আরে মহা মুশকিল। সব ঠিক আছে নিজেই বলছো আবার বলছো খটকা আছে । কিসের খটকা শুনি ?
-স্যার খটকা ওঁদের প্রোডাক্ট নিয়ে, সব জেনেটিক্যালি মোডিফয়েড ফুড প্রোডাক্ট স্যার। বেশ কিছু প্রোডাক্ট এর বিবরণী পড়ে মনে হলো এগুলো আমাদের জানা কোনো বাজার চলতি প্রডাক্টই নয়ে, সম্পূর্ণ নতুন কিছু যার জন্য দিল্লির ডিপার্টমেন্ট থেকে নিউ প্রোডাক্ট আপ্রুভাল দরকার। এই সব ভেবেই আমি পুরোপুরি ঘেঁটে গেছি স্যার।
– অনিমেষ তুমি একটু বেশী ভাবছো, জেনেটিক্যালি মোডিফাইএড মানে GMO তাই তো ? সে তো আজকালকার ম্যাক্সিমাম শাক সব্জিই তাই, বাজারে গিয়ে তুমি আলাদা করতে পারো কোনটা নন-জিএমও আপেল বা টম্যাটো আর কোনটা জিএমও টম্যাটো।
আর GMO কি বেআইনি কিছু ?
শাক সব্জির মান যদি বৈজ্ঞানিক উপায় ভালো রাখা যায় তাহলে ক্ষতি কি তাতে ?
– কিন্তু স্যার ওঁদের প্রোডাক্ট গুলো বাজার চলতি কিছু নয় সম্পূর্ণ নতুন কিছু।
– তুমি কি করে জানলে বাজার চলতি নয় ? ফুড প্রোডাক্ট ক্লাসিফিকাশন তো উল্লেখ করে দিয়েছে বললে তাই না ?
– হ্যাঁ দিয়েছে, ডেয়ারি জাতিয় বলছে বটে কিন্তু আমার কেন জানিনা মনে হচ্ছে এটার সাথে দুধ থেকে উৎপন্ন কোনো কিছুরই বিশেষ যোগাযোগ নেই।
– অনিমেষ তোমার মনে হওয়ার ওপর একটা সরকারী ডিপার্টমেন্ট চলবে না । তোমার কোনো একটা জায়গায় ভুল হচ্ছে ।
– স্যার আপনি আমাকে আর দুটো দিন দিন প্লিজ । আরেকবার ফাইল রিভিউ করেও যদি কিছু না পাই, আমি পাস করে দেবো।
অনিমেষের মুখের দিকে ভালো করে খানিকক্ষন চেয়ে থাকলেন ডিরেক্টর সাহেব, প্রায় বছর খানেক হয়ে গেলো অনিমেষ এই ডিপার্টমেন্টে যোগ দিয়েছে, আজ অবধি এরকম অদ্ভুত ব্যবহার করেনি ।
আজ হটাৎ করে কি হলো ?
বিকেল ৪ টে | বালিগঞ্জ |
দুই কলেজ ফেরত বন্ধু নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে এগুচ্ছে; আর ঠিক তখনই একটা বিশাল আকারের ভ্যান তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কৌতূহলী পায়ে এগিয়ে গেলো।
ভ্যানের সামনে ইতিমধ্যেই বেশ ছোট খাটো একটা জটলা বেঁধে গেছে, সামনে এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলো এক পরমা সুন্দরী মডেল ভ্যানের ওপেন প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে মাইকে কিছু বলছে ;
“সেভ দা প্ল্যানেট আর্থ, ভেগানিসম ইস ফিউচার গাইস ।
তোমাদের মধ্যে এইমুহূর্তে প্রথম যে পাঁচ জন এগিয়ে এসে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হবে যে জীবনে আর কোনো দিন কোনো রকম প্রাণীজ খাদ্য বা যে কোনো প্রকারের প্রাণীজ দ্রব্যের ব্যবহার করবে না তাঁরাই পাবে এই আকর্ষণীয় টি-শার্ট গুলো আর সাথে সারপ্রাইস গিফ্ট বক্স । “
” বলো কলকাতা মাছ খাবেনা- আগামী তিরিশ দিনের চ্যালেঞ্জ “
প্রচুর আগ্রহী ছেলে মেয়ে এগিয়ে গেলো, বেশ নাটকীয়ভাবে তাঁদের কে দিয়ে জনসমক্ষে সুন্দরী প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিচ্ছে যে সেই মুহূর্তের পর থেকেই মাছ মাংস, দুধ , পনীর বা অন্য কোনো প্রকারের প্রাণীজ খাদ্য বস্তু ছুঁয়েও দেখবে না আর চামড়ার ব্যাগ জাতীয় দ্রব্যও সম্পূর্ণ পরিহার করবে। সম্মোহিত জনসাধারণের একাংশ তাই পাখির বুলির মতো আউরে, পাণ্ডার ছবি দেওয়া টিশার্ট গায়ে গলিয়ে সুন্দরীর সাথে সেলফি নিচ্ছে।
এই পুরো ব্যাপারটা আবার “কলকাতা লেটস বি ভেগান” এর টিম রেকর্ড করে তাঁদের ফেসবুক পেজে লাইভ স্ট্রিমিংও করছে, হাজার হাজার ভার্চুয়াল লাইকে আর মন্তব্যে ভরে উঠছে পেজটি।
দুই বছর আগে | আমেরিকার ম্যানহাটনের কোনো একটি হাইরোড ।
ল্যাব টেস্ট এর রিপোর্ট হাতে আসার সাথে সাথে পিটার ফোনে টিম লিডার শন কে সঙ্গে সঙ্গে জানিয়েছে, পুরোটা চুপচাপ মন দিয়ে শুনে শন তাকে আস্বস্ত করেছে যে ও ম্যানেজমেন্ট কে পুরো বিষয়ে অবগত করবে কিন্তু ততক্ষণ অবধি যেন পিটার এই বিষয়ে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তিকে না জানায় ।
ল্যাব থেকে তাই সোজা বেরিয়েই পিটার তাঁর বাড়ীর পথ ধরেছে।
আর ঠিক তখনি উল্টো দিক থেকে একটা ট্রাক দ্রুত গতিতে ধেয়ে এলো।
কিছুক্ষনের মধ্যে পিটারের ফোর্ড এর গাড়িটি দুমড়ানো মোচড়ানো অবস্থায় পাওয়া গেলো, গাড়ীর ড্রাইভারের সিটে পিটারের মৃতদেহ সমেত।
অক্টোবর | 2019
পুজোর এই সময়টাই সবচেয়ে বেস্ট; সায়ন্তনদের পুরো গ্রুপটাকে একসাথে পাওয়া যায়।
সারা সন্ধে জুড়ে সাউথ কলকাতায় প্যান্ডেল হপিং এর পরে মাঝ রাত্রে ওদের পুরো গ্রুপটা চাইনা টাউনের একটা রেঁস্তোরাতে গিয়ে বসলো।
আর সেখানেই সায়ন্তনের বন্ধুরা প্রথম জানতে পারে সায়ন্তন ভেগান ডায়েট এ আছে সম্পূর্ণ ভাবে।
প্রচন্ডভাবে মাংসাশী ছেলেটা ভেগান হয়েছে শুনে প্রথমে কেউ পাত্তাও দেয় নি।
হোহহহ করে একটা হাসির রোল উঠেছিলো কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই বন্ধুদের চমকের আরো বাকী ছিলো। বেয়ারা ফিস মাঞ্চুরিয়ানের ডিশ টা সার্ভ করতে যেতেই সায়ন্তন নিজেকে আর সামলাতে পারলো না।
হড়হড় করে বমি করে ফেললো ।
নিজের নতুন শার্টের সাথে সাথে পাশে বসা রিয়ার নতুন শাড়িও খারাপ হলো।
ওয়াশ রুম থেকে ফিরেই লজ্জার মাথা খেয়ে বন্ধুদের কোনো ক্রমে বাই বলে প্রায় প্রিমিয়াম চার্জে একটা উবের বুক করে বাড়ী ফিরেই নিজের বেডরুমের দরজা লক করে এসি চালিয়ে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো সায়ন্তন।
দুটো হাত মাথার পিছনে রেখে চোখ বুঝে গভীর ভাবে ভাবতে লাগলো যে বিগত কয়েক মাসে ওর জীবন ঠিক কি ভাবে পরিবর্তীত হয়ে গেছে।
পিছনে তাকিয়ে দেখলে, কয়েকমাস আগেও বন্ধুদের সাথে আড্ডা, অফিস, টুকটাক পলিটিক্স , ফেসবুকে চাড্ডিদের সাথে বাওয়াল, এই করেই জীবন বিন্দাস কেটে যাচ্ছিলো যতোদিন না অবধি ওর জীবনে অবন্তিকার প্রবেশ ঘটে।
ওঁদের সম্পর্ক টা পুরোপুরি ক্যাজুয়াল।
দুই পক্ষের কেউই গরজ নিয়ে নাম দেওয়ার চেষ্টাও করেনি। কিন্তু সায়ন্তন কিসের যেন এক অমোঘ টানে অবন্তিকার জগতে ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছে সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছে না ।
এটাকি সম্পূর্ণভাবে অবন্তিকার প্রভাব ? নাকি ওদের এই ভেগান মুভমেন্ট সত্যি সত্যি ওর নিজের ব্যক্তি জীবনেও প্রভাব বিস্তার করছে?
সেটাই এখন ওর মূল ভাবনার বিষয়।
“আমরা সবাই শিম্পাঞ্জির বংশধর, কতো সিম্পেল লাইফস্টাইল ছিলো আমাদের, গাছে গাছে ফলমূল খেয়েই কেটে যাচ্ছিলো বেশ, কিন্তু ইডেন এর ওই ফরবিডেন ফ্রুইটের মতোই যেদিন থেকে নিজের উদোরপূর্তির জন্য প্রাণী হত্যা করা শুরু করলাম ঠিক সেদিন থেকেই পৃথিবী ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো।”
এই কথা গুলো বিগত কয়েক মাসে একাধিকবার শুনেছে, কখনো অবন্তিকার মুখে আবার কখনো ওদের সেমিনারের কোনো বিশেষ স্পিকারের প্রেসেন্টেশনেও ।
ধীরে ধীরে মন বিশ্বাস করতে শুরুও করেছে, হ্যাঁ এটাই সঠিক বাকি তার ২৫ বছরের এই জীবন সম্পূর্ণ মিথ্যা, তার বাবা, ঠাকুর্দা সব্বাই ভুল করেছে। নিম্ন শ্রেণীর জানওয়ারে মতো শুধুমাত্র নিজের পেট ভর্তি করতে পশু হত্যা ?
এই কি সভ্যতা ?
এক সময় কবজ্জী ডুবিয়ে খাসীর মাংস খাওয়া সায়ন্তন নিজেকে বার বার ধিক্কার জানিয়েছে।
এক বছর আগে : মুম্বাই
একটি বহুতলের পিকে গ্রুপের কর্পোরেট অফিসের কনফারেন্স রুমে মিস্টার আগরওয়াল অপেক্ষা করছে ডেভিডের জন্য।
ডেভিড নিজে আমেরিকান হলেও এই কোরিয়ান কোম্পানির গ্লোবাল এক্সপেনসনের ইন চার্জ।
পিকে গ্রুপ; যার মূল শাখাটি সিউল, কোরিয়া।
কিন্তু প্রশাখা গুলো ইন্ডিয়ায় ছাড়াও আমেরিকা,ইউরোপ, মিডিডল ইস্ট সব জায়গায় ছড়ানো।
লাস্ট ইয়ার এর টার্ন ওভার ১৩ বিলিয়ন ডলারের।
মূলত রিয়াল এস্টেট দিয়ে শুরু করলেও আজকে এই কোম্পানী দুনিয়া জুড়ে ফাস্ট মুভিং কংনউম্যার গুডসের চাহিদা পূরণের শেষ কথা।
এঁদের দ্বারা প্রস্তুত বিভিন ইনস্ট্যান্ট্ন ফুড প্রোডাক্টরে চাহিদা বিশ্বের প্রায় সব মার্কেটেই আছে।
এঁদের জিএমও(GMO) প্রযুক্তির যা মূলত জিনকে বদলে ফেলে বা জিনের কাঠামোগত খানিকটা পরিবর্তন করে উন্নত ধরণের শস্য, ফলমূল সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রযুক্তি খুব নতুন কিছু না হলেও পিকে গ্রুপের দীর্ঘদিনের রিসার্চের ফলে ওরা এই সংক্রান্ত এক বিশেষ প্রযুক্তির আবিষ্কার করে ফেলছে যার দ্বারা একটি বিশেষ প্রোডাক্ট এরা প্রথমে পরীক্ষামূলক ভাবে মার্কেটে লঞ্চ করতে চায় আর তার জন্য বেছে নিয়েছে কলকাতাতে।
কারন পিকে গ্রুপের দাবী অনুসারে মাংস আর চীজ জাতীও ফুড প্রোডাক্টকে সম্পূর্ণ ভাবে রিপ্লেস করতে পারে ওদের ল্যাবে প্রস্তুত এই বিশেষ প্রোডাক্টটি যা মূলত একটি হাই-প্রোটিন বার কিন্তু মাংস আর চীজ এই দুটোরই কৃত্রিম স্বাদ তৈরি করতে সক্ষম, আর কলকাতার মানুষ সবচেয়ে বেশী প্রাণীজ খাদ্যের ওপরে নির্ভরশীল ঠিক সেই কারণেই ওঁদের এই বিশেষ ফুড প্রোডাক্ট কলকাতাবাসীর কার্নিভরাস হ্যাবিট বদলাতে পারে কিনা এখন সেটাই দেখার।
এই পিকে গ্রুপের সাথেই আজ ক্যালকাট্টা ভুজিয়াওয়ালার এই বিশেষ প্রোডাক্টের মার্কেট ফ্রাঞ্চাইসের একটি চুক্তি পত্র হওয়ার আগে তাই আগরওয়াল শেষ বারের মতো সামনে রাখা ফাইলে এই তথ্যগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন।
নভেম্বর | 2019
খানিক্ষণ আগেই নার্স এসে জানালার ভারী পর্দাটা সরিয়ে গিয়ে গিয়েছে, বিকেলের অস্তগামী সূর্যটা যাওয়ার এই বেলায় রং ছড়িয়ে দিচ্ছে, মুঠো মুঠো গোলাপি আবির।
সায়ন্তন সেই দিকেই তাকিয়ে , বারংবার অবন্তিকা কে ফোনে ট্রাই করেছে কিন্তু মেয়েটি ফোন তোলার প্রয়োজন বোধ করেনি, না তো WhatsApp এর মেসেজ গুলো খুলে পড়েছে, গতকাল থেকে এখানে এই নার্সিং হোমে ভর্তি আছে সায়ন্তন, এলার্জি জাতীয় কিছু একটা সমস্যা জনিত কারণে হটাৎ অসুস্থ হয়ে পরতেই এই নার্সিং হোমে নিয়ে আসা হয় ওঁকে।
ডক্টর বার বার জানতে চেয়েছেন যে ইদানিং নতুন কিছু খাবার ট্রাই করেছে কিনা কিন্তু একমাত্র অবন্তিকার কথা মাথায় রেখে সায়ন্তন তাই ওঁর মুখ বন্ধ রেখেছে, আর এখন সেই অবন্তিকাই তাকে অভ্যাওইড করছে দেখে বুকের মধ্যে ভারী কিছুর অনুভূতি মনকে আকুলি বিকুলি করাতে লাগলো।
সায়ন্তন খুব ভালো করেই বুঝেছে যে এলার্জি জানিত সমস্যাটির মূল কারণ অবন্তিকার দেওয়া ওই প্রোটিন বার।
অবন্তিকার ভেগান মতাদর্শের অনুপ্রেরণায় সায়ন্তনের ভেগান ডায়েট শুরু করার কিছুদিন পরের কথা,
সায়ন্তন আগের মতো আর শারীরিক জোর পেতো না, অফিসে এসেই ঘুম ঘুম পেতে লাগলো, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার ইচ্ছেও ক্রমে লোপ পেতে লাগলো।
ব্যাপারটা অবন্তিকাই প্রথম নোটিশ করে, অবন্তিকার পিজির রুমের বিছানায়।
“তোমার কি কোনো সমস্যা হচ্ছে ? আমাকে খুলে বলো” এর পরেই সায়ন্তন জানায় যে ভেগান ডায়েট প্ল্যান শুরু করার পর থেকেই ও শারীরিকভাবে আগের মতো জোর পাচ্ছে না।
অবন্তিকার মুখের হাল্কা হাসি বুঝিয়ে দিলো যে ও এই ব্যাপারটা আগের থেকেই জানতো, মডেলের মতো নিজের হ্যান্ড ব্যাগ খুলে এগিয়ে দিয়েছিলো এই প্রোটিন বার গুলো।
“আমরা এই মুহূর্তে এগুলো বিক্রি করছিনা, কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি শুরু করবো । ইতিমধ্যেই আমেরিকার মার্কেটে ছেয়ে গেছে এগুলো। তুমি আমাদের মেম্বার আর সহযোদ্ধাও তাই এটা শুধুমাত্র তোমার নিজের জন্য, আর কাউকে জানতে দেবে না কারণ আমরা এখনো লাইসেন্স পাইনি। মনে থাকবে !”
এর আগেও ছোটোখাটো সমস্যা হচ্ছিলো কিন্তু কাল ওরকম ভাবে মাথা ঘুরে পরে যাবার পরে আর গায়ে চাকাচাকা ফুস্কুড়ি দেখে বাড়ীর লোক একরকম জোর করেই নার্সিং হোমে ভর্তি করিয়ে দিয়ে যায়।
জ্ঞান ফেরার পর থেকেই অবন্তিকাকে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সায়ন্তন কিন্তু অবন্তিকার ফোন নট রেস্পন্ডিং ।
[২]
নভেম্বর | শেষ সপ্তাহ | 2019
অনিমেষের অফিসে বেরোনোর ঠিক আগেই ছোট ভাই সায়ন্তনের সাথে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেলো । এমনিতে সাংবাদিকতার মতো পেশায় কর্মরত সায়ন্তনের টিকিটির দেখা মেলা দুস্কর কিন্তু ইদানিং ছেলেটা কিরকম ঘরকুনো হয়ে গেছে ।
– কিরে ভাই, অফিসে যাবি নে ?
“না রে, আজ শরীরটা কি রকম ম্যাজ ম্যাজ করছে” তাই রেস্ট নেবো ঠিক করেছি”
কথা গুলো বলেই সায়ন্তন সটান নিজের বেডরুমে ঢুকেই মুখের ওপর দরজা এঁটে দিলো। এছাড়া আর উপায় কি, বেশ কয়েক হপ্তা আগেই চাকরিটা খেয়ে বসে আছে যে, বাড়ীতে জানতে পারলেই অশান্তি তাই এইরকম যতোদিন পারা যায় চাপা দিয়ে রাখা। দিনের পর দিন না বলে কয়ে কামাই, কাজে অমনোযোগ, শারীরিক দুর্বলতা জনিত সমস্যার কারণে দূরের আসাইনমেন্ট নিতে না পারা এগুলো তো একটা প্রাইভেট নিউজ এজেন্সি বরদাস্ত করবে না দিনের পর দিন ধরে।
অনিমেষ বড়ো রাস্তায় উঠে এসে বাস স্ট্যান্ডে তাঁর অফিস গামী বাস টার জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঠিক এটাই ভাবছিলো “নির্ঘাৎ তাঁর ভাইয়ের চাকরিটা গেছে” ইদানিং ছেলেটা কি রকম দ্রুত বদলে যাচ্ছে সে তো নিজের চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে , আগের থেকে অনেক বেশী রোগা হয়ে গেছে, চোখ মুখ বসে গেছে। সারাদিন কি রকম একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। ফোনে কাউকে বার বার ট্রাই করে কিন্তু ওপার থেকে রেসপন্স না পেয়ে নিজে নিজেই দাঁত মুখ খেচায়, বাবা মা কিছু বললেই চট করে মাথা গরম করে ফেলছে। এই ব্যাপারগুলো বিগতো কয়েকমাস আগের সায়ন্তনের সাথে একেবারে বেমানান যতদিন না অবধি ওই নিরামিষ খাবার শুরু করেছে এমন কি পনির অবধি খায় না, এমনিতেই অনিমেষ নিজেও লক্ষ্য করেছে সোশ্যাল মিডিয়া আর খবরের কাগজ জুড়ে “ভেগান মুভমেন্ট” চলছে এটাই নাকি কলকাতার নতুন ট্রেন্ড। টিভি খুললেও এই নিয়েই সারাদিন তর্ক বিতর্ক।
বাবা মা এর কথা তো শোনেই না অনিমেষ তাই নিজেই বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন;
“দেখ সায়ন্তন, পৃথিবীর প্রত্যেকটি জাতের, সম্প্রদায়ের একটা ন্যাচারাল ফুড হ্যাবিট আছে, বাঙালিরাও ব্যাতিক্রমী নয়।
একদিন হঠাৎ করে তাঁদের নিজস্ব ফুড হ্যাবিট থেকে বের করে নিয়ে এলে শরীর আর মন তো বিদ্রোহ করবেই।
প্রাণী জগতের দিকেই তাকিয়ে দেখ, পুরোটাই প্রাকৃতিক বৃত্ত, এখানে ছোট মাছ বড় মাছের খাদ্য, আবার ছোট খাটো প্রাণীগুলো জঙ্গলের বড় প্রাণীর খাদ্য এটাই তো প্রাকৃতিক সুষমতা।
এই ভারসাম্য কে উল্টে পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা নয় ?”
কথা গুলো মন দিয়ে শুনলেও সায়ন্তনের মুখের ভাব স্পষ্ট বলেই দিচ্ছে যে সে মন থেকে কিছুতেই মানতে পারছে না, চোয়াল শক্ত করে প্রত্যুত্তর দিলো সে এবারে ” দেখ দাদা, তুই যদি মানুষের সাথে বাদ বাকী প্রাণী জগতের তুলনা করিস তাহলে এই তর্কে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। ভুলে যাসনা, আমরা মানুষ আমার ইউনিক। ”
ভাইয়ের কথার জবাবে অনিমেষ বললো ;
“মানুষ ইউনিক ? হ্যাঁ অবশ্যই কিন্তু সে তো একটা কুকুরও তাঁর মতো করেই ইউনিক, তার ঘ্রাণ শক্তির সমকক্ষ কি মানুষ ? প্রাণী জগতের প্রতিটা প্রাণীই কোনোনা কোনো ভাবে ইউনিক, এদের সকলের অধিকার আছে বাঁচার, কারুর খাদ্য না হয়েই, না মানুষের না অন্য কোনো প্রকারের বড় জন্তুর দ্বারা শিকার হয়ে কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মে সেটা সম্ভব নয়। ”
“ফরগেট এবাউট এভরিথিং , তুই জাস্ট আমাকে বল আমরা প্ল্যান্ট বেসেড ডায়েট এ কি জীবনধারণ করতে পারিনা ? কি অসুবিধা তাতে?” সায়ন্তন বেশ খানিকটা উত্তেজিত হয়েই জিগ্যেস করলো ।
‘হাহাহা’ করে হেসে উঠলো অনিমেষ;
“প্ল্যান্ট বেসড ডায়েট ? যেগুলো তোরা ওই সুপারমার্কেট গুলো থেকে কাড়ি কাড়ি পয়সা দিয়ে কিনে নিয়ে এসে ফ্রিজের আর মাইক্রোওয়েভের বিদ্যুৎ পুড়িয়ে খাচ্ছিস ?
টেবিলের ওপর পরে থাকা একটা ইনস্ট্যান্ট ফুডের প্যাকেট হাতে তুলে নিয়ে অনিমেষ আরো বললো;
“আর এই সেই প্ল্যান্ট বেসড যা তৈরি হয়ে কোনো একটা ফ্যাক্টরীতে, আর সেখানেও কোনো না কোনো ভাবে পশুশ্রমকে কাজ লাগানো হচ্ছে, গ্যালন গ্যালন জল ব্যবহার করা হচ্ছে, বিদ্যুৎ খরচা করতে হচ্ছে জাস্ট এই প্যাকেটের সমপরিমাণ ২০০ গ্রামের প্ল্যান্ট বেসড ইনস্ট্যান্ট ফুড প্রোডাক্ট বানাতে ?
এটা কি ধরণের দ্বিচারিতা সায়ন্তন ?
আর দেখ ভাই, তুই জানিস আমার প্রথম চাকরী সূত্রে আমি প্রত্যন্ত ওড়িশার একটা আদিবাসীদের গ্রামে পোস্টেড ছিলাম। সেখানে ওই আদিবাসীরা এখনো জঙ্গলে শুয়োর, বনমুর্গী শিকার করে খায়, নদী থেকে মাছ ধরে খায়। ওদের ওই লাইফস্টাইলটা বরং অনেক বেশী ভেগান তোদের এই শহুরে হুজুগেমাতা ভেগানদের টা নয়। এটা একটা হুজুগ মাত্র, আজ এসেছে কাল চলেও যাবে, এই হুজুগে মেতে বৃথা নিজের শরীর পাত করে লাভ কি তোর ?
এবারে আর কোনো উত্তর না দিয়েই সটান উঠে পড়লো সায়ন্তন, যে বুঝবে না তাকে বোঝানো আর হাতিকে মোজা পরানো একই ব্যাপার, তাঁর দাদার মেন্টালিটি পরিবর্তীত হওয়ার নয়, মরুগে যাক, ওরা জানে না ওই নোংরা মাছ যা নদীতে মানুষের পরিত্যক্ত বর্জ্য পদার্থ খেয়ে বাঁচে আর ওই বয়লার রুগ্ন মুরগী আর তার ডিম, এগুলো খেয়ে ওঁদের নিজেদের শরীরে কীভাবে রোগের ডিপো তৈরি করছে।
দুই ভাইয়ের এই তর্ক বিতর্কের পরেও কেটে গেছে অনেক দিন মাঝে সায়ন্তন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নিয়ে নার্সিং হোমেও দৌড়োতে হয়েছে কিন্তু বদলায়নি কিছুই, শুধু দিনকে দিন অনিমেষ চোখের সামনে তাঁর ভাইকে শুকিয়ে যেতে দেখছে, মানসিকভাবে বিষাদগস্ত ও খানিকটা বোধহয়।
এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই অফিসে পৌঁছে গেলো, ফুড সেফটির এই সরকারী বিভাগে সে আজ ভারপ্রাপ্ত ফুড সেফটি বা খাদ্য সুরক্ষা অফিসার।
হটাৎ করেই একটা কুচিন্তা অনিমেষের মনে উকি দিলো, তাঁর ভাই ইদানিং কোনো ড্রাগস এর চক্করে পড়েনি তো ? সঙ্গে সঙ্গে অনিমেষ তার স্ত্রীকে ফোন করে বললো যে অনিমেষের রুম পরিষ্কার করা সময় খেয়াল রাখতে বিশেষ কিছু চোখে পড়লেই তাঁকে যেন সঙ্গে সঙ্গে তার স্ত্রী জানান।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি, খানিক ক্ষণ পরেই whatsapp এ তাঁর স্ত্রী একটা ফুড প্যাকেটের ছবি তুলে পাঠালেন, যেটা দেখে অনিমেষের খুব চেনা কিছু মনে পড়লো কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলো না এই প্যাকেজিংটা আর কোথায় যেন দেখেছে।
ডিসেম্বর | 2019
যাদবপুরের এইট বি এর ফুটপাথ ধরে হেঁটে চলেছে সায়ন্তন, চারপাশে পথচলতি মানুষের কোলাহল, হকারদের চিৎকার, এবার শীত টা বেশ জাঁকিয়ে এসেছে, তবুও গায়ে সোয়েটার বা জ্যাকেট কিছুই নেই, জিন্সের ওপরে একটা পাতলা পাঞ্জাবী চাপিয়েই তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে পড়েছিলো যখন ফেসবুকে দেখেছিলো যে কলকাতা লেটস বি ভেগানদের একটা ইভেন্ট আছে আজ যাদবপুর ক্যাম্পাসে।
অনেক আশা ছিলো অবন্তিকার সাথে দেখা হবে, সরাসরি কথা হলে ওঁদের মাঝে এতদিনের জমে থাকা বরফটা হয়তো গললেও গলতে পারে।
কিন্তু সে গুঁড়ে বালি।
অবন্তিকার সাথে মুখোমুখি দেখা হতেই একটা শুকনো হাই বলেই ব্যস্ততা দেখিয়ে সরে পড়েছিলো, বাকী অতিথীদের আপ্যানয়ন করে বসিয়ে প্রোগ্রাম শুরুর ঠিক আগের মুহূর্তে একবারে সামনের সিটে গিয়ে বসে পড়লো। সায়ন্তন এগিয়ে গিয়ে দেখলো ওই সামনের রো টে আর একটি সিট ও খালি নেই। পরেও রো তেও নয়, আর তারপরের পরেও রো গুলোর কোনোটিতেই তার জন্য একটি সিট ও সংরক্ষিত নেই , অগত্য একেবারে লাস্ট রো টে জায়গা করে নিলো। মনের মধ্যে তখনো বুদবুদের মতো আশা, মেয়েটা বড্ড ব্যস্ত হয়তো প্রোগ্রামের শেষে কথা বলার জন্য ফ্রী হবে!
ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে প্রোগ্রাম শেষ হলো, একে একে সব গেস্ট বিদায় নিলো, অবন্তিকা কে খুঁজে পেল একটা ছোটখাটো জটলার মধ্যে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে শুনলো ওরা নিজেদের মধ্যে কলকাতায় সদ্য গজিয়ে ওঠা একটা ভেগান ক্যাফেতে গিয়ে আড্ডা মারার প্ল্যান করছে, সায়ন্তন চোখের ইশারায় অবন্তিকাকে ডাকতেই ওর দিকে সরাসরি তাকিয়ে অবন্তিকা খানিকটা যান্ত্রিক ভাবেই জিগ্যেস করলো;
– হাই সায়ন্তন, প্রোগ্রাম কেমন লাগলো ?
– ভালো হয়েছে.. খুব ভালো, আচ্ছা আমার না তোমাকে অনেককক কিছু বলা র রর..
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অবন্তিকা বলে উঠলো;
“আচ্ছা শোনো, আজ না আমরা একটু বিজি হ্যাঁ, পরে কথা হবে, সাবধানে যেও , বাই। ”
কথা শেষ করে একটা প্ল্যাস্টিক হাসি উপহার দিয়েই নিজের গ্রুপের দিকে মুখ ফেরালো।
“কি দাদা কানা নাকি ? চোখে দেখতে পান না রোড ক্রস করছেন”
সায়ন্তন উলটো পারের অটো ধরার জন্য রাস্তা ক্রস করতে যেতেই একটা অটো গায়ের প্রায় দু-ইঞ্চি দুরুত্বে জোরে ব্রেএক কোষলো।
বাড়িতে তুমুল অশান্তি, ওর দাদা জানতে পেরেছে ওই প্রোটিন বারের কথা, স্পষ্ট করে কিছু না বলতে পারলেও ওর দাদা নাকি নিজে ওই প্রোডাক্টের লাইসেন্স ইস্যু করতে চাইনি কিন্তু প্রামাণ্য কিছু না পেয়ে শেষমেশ ইস্যু করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ওর দাদার ধারণা অনুযায়ী এটা শরীরের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর কিন্তু তবুও সায়ন্তন গা করেনি ওদের কারুরই কথা, মানসিক ভাবে ধীরে ধীরে পরিবারের মানুষ গুলোর থেকে নিজেকে সরিয়ে এনেছে শুধু।
ব্যবহারিক আর সামাজিক পরিবর্তনের ফলস্বরূপ চেনাজানা মানুষগুলোও সায়ন্তনের কাছে বড়োই অচেনা হয়ে গেছে এই কদিনে। কোনো পুরোনো বন্ধু বান্ধব আর যোগাযোগ রাখে না আজকাল। নতুন করে চাকরির ইন্টারভিউ টে যাওয়ার ও আগ্রহ পাচ্ছে না মন থেকে।
অনেককক কিছু বলার ছিলো অবন্তিকা কে, প্রশ্ন করার ছিলো ।
কিন্তু বলা হয়ে উঠলো না।
কিন্তু বলতে যে হবেই না হলে অনেক দেরী হয়ে যাবে।
পরের দিন সায়ন্তনের মৃতদেহ পাওয়া গেলো ঢাকুরিয়া রেল ব্রিজের কাছে । ট্রেনের তলায় মাথা দিয়েছে সায়ন্তন।
পুলিশ ইনভেস্টিগেট করতে গিয়ে সায়ন্তনের সুইসাইড নোটও উদ্ধার করেছে কিন্তু সেই সুইসাইড নোট সায়ন্তনের লেখা সর্বশেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস হিসেবে পোস্টেড, আত্মহত্যার কয়েক মুহূর্ত আগেই।
ফেব্রুয়ারির 25 তারিখ | 2020
দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাইট টেক অফ করার ঠিক আগের মুহূর্ত;
নিজের সংরক্ষিত সিটে বসে মোবাইটা ফ্লাইট মুডে করে দিলো অবন্তিকা। গত একবছর আগে আজকের দিনেই পুনে থেকে কোলকাতার উদ্দেশ্য যাত্রার শুরু আর আজ এখান থেকে সরাসরি আমেরিকাতে যাচ্ছে , ইস্ট জর্জিয়া ইনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্সের জন্য একটা স্কলারশীপ পেয়ে।
গত দু মাসে কম ভোগান্তি পোহাতে হয়নি ওঁদের পুরো টিম টাকেই।
সায়ন্তনের ফেসবুক পোস্ট যেভাবে ভাইরাল হয়েছে সেরকমটিই ওঁদের এই যাবৎ করা কোনো ভেগান ক্যাম্পনিং ও হয়নি।
আর তারপরেই আত্মহত্যায় পরোচনা দেওয়ার মামলায় ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে নেহাত অবন্তিকার মায়ের দিল্লির মিনিস্টার লেভেলের সংযোগ ছিলো তাই এই যাত্রায় বেঁচে যায়, যদিও ওঁদের টিম ভেঙে গেছে পুরোপুরি, কলকাতার মানুষের আর ওদের ভেগান ক্যাম্পাইনিং এর ওপর আস্থা নেই। এই ডামাডোলের মধ্যে পিকে গ্রুপ তাঁদের নতুন প্রোডাক্টের বিপণনও অস্থায়ী ভাবে বন্ধ রেখেছে যতোদিন না ন্যাশনাল ফুড সেফটি ডিপার্টমেন্ট ক্লিন চিট ইস্যু করছে কোর্টের অনুরোধে ।
অবন্তিকা ওর মোবাইলে অফ লাইন মুডে সেভ করে রাখা সায়ন্তনের সুইসাইড নোট টা বের করে পড়তে শুরু করলো, যদিওবা এখনো অবধি প্রায় হাজারবার পড়েছে তবুও আরো একবার শেষবারের মতো পড়তে চায় এটা কলকাতা ছেড়ে যাবার এই বিশেষ মুহুর্তে;
ডিয়ার কলকাতা !
অনেক অভিমান করেছি তোমার ওপরে যখন পার্ক সার্কাস মোড়ে জ্যামে আটকেছি, কিংবা পেপার খুললেই খুন, চুরি , রেপের খবর পড়ে নিজের ওপর নিজের ঘৃণা জন্ম নিয়েছে।
অনেক রাগ অভিমান জমে আছে কিন্তু বিশ্বাস করো তা সত্বেও একমুহূর্তের জন্যও তোমাকে ভালোবাসতে ভুলে যায়নি কখনই।
কারণ, তুমিতো শুধুই একটা শহর নয়ও, তুমি একটা অনুভূতিও।
দেড়শো বছরের এক তিলোত্তমা, আমাদের মা।
মায়ের বয়স হচ্ছে বুঝতে পারি, কিন্তু রাগ করে আমরা যাবই বা কোথায় বোলো।
আজ আমার সেই মা কে বাঁচানোর দিন । আমার মা যে খুব সরল, সে কাউকেই পর ভাবতে জানেন না। সবাইকে আপন করে নিয়ে পথ চলাতেই তাঁর খুশী। আর তাঁর সেই সরলতার সুযোগ আজ কিছু স্বার্থপর মানুষ নিচ্ছেন।
তাঁদের বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার সামনে আমি নিত্তান্তই এক সাধারণ মানুষ । তবুও এই শেষ চেষ্টাটা আমাকে করতেই হবে।
আমার এই গল্পের সূত্রপাত সেই মুহূর্তে যখন কলকাতা বাইরে আমদানী হওয়া নতুন ভেগান মুভমেন্টের হুজুগে মেতেছে।
কলকাতাতে সম্ভবত আমি প্রথম অদ্যাপ্টার ওঁদের এই নতুন ধারার লাইফস্টাইল এর ।
ওঁদেরই দলের একটি মেয়ের প্রেমে পড়ে আমার এই নতুন ধারার মতবাদের প্রতি আকর্ষণ জাগে, সেই আমাকে এই নতুন দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমার মনে হয়েছিলো আমি জীবনের এক নতুন মানে খুঁজে পেয়েছি। এমনিতে তো একজন সাধারণ ছেলে, আরো হাজার গন্ডা জার্নালিজম পাশ করা ছেলের মতোই একজন অতিসাধারণ সংবাদ কর্মী হিসেবে কাজ করতাম।
কি বিশেষ পরিচয় ছিলো বলুন আমার ? কিস্যু নয়।
তাই মনে হয়েছিলো জীবনের এক নতুন পথের সন্ধান এই কলকাতা লেটস বি ভেগান কমিউনিটি।
কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।
আমি যদিও বা ভুল ছিলাম তদাপি আমি আজও ভেগানিসম এর বিপক্ষে নই।
আসলে আমি ভেগান হয়ে উঠতেই পারিনি কোনোদিন। কারণ আমি তো ভেগান ছিলাম না ।
ভেগান লাইফস্টাইল গ্রহণ করার পর কিছুদিনের জন্য মনে হয়েছিলো আমি সকলের থেকে আলাদা, ‘ইউনিক’ কিন্তু ধীরে ধীরে যখন আমি সত্যি সত্যি আলাদা হতে শুরু করলাম তখন সেই একাকীত্ব আমাকে পাগল করে তুললো।
নিজের পরিবার, পরিজন, বন্ধু বৃত্ত এঁদের সবাইকে হারিয়েও একজনের ওপরে ভরসা হারাতে পারিনি “অবন্তিকা” ।
হ্যাঁ অবন্তিকা আমি তোমাকে ভালো, বাসতাম। কোনোদিন বলার সুযোগই দিলে না। জানি আজ, এখন এই মুহূর্তে আমার এই লেখাটা পড়ছো, পাবলিকলি এভাবে লিখেছি বলে আমার ওপরে রেগেও আছো নিশ্চয়ই। কিন্তু বিশ্বাস করো, এছাড়া আমার সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিলো না।
তোমার দেওয়া প্রোটিন বার খেয়ে আমি প্রথম যেদিন হসপিটালাইসিড হয়েছিলাম সেদিন থেকে ক্রমাগতভাবে তোমাকে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে গেছি কিন্তু তুমিই সময় করে উঠতে পারোনি জাস্ট একটা রিপালাইয়ের ।
পারবেই বা কি করে ! সে মুহূর্তে তুমি সত্যিই খুব ব্যস্ততার মধ্যে ছিলে, টলিউডের একের পর এক তারকা রা তখন ভেগান হওয়ার শপথ গ্রহণ করছেন, মিডিয়াতে সেই নিয়ে নিত্যদিনের হুলুস্থূল।
তোমার ব্যস্ততার পিছনে সংগত কারণ অনুমান করেই আমিও তাই তোমাকে দোষারোপ করিনি বা করছিও না কিন্তু তোমাদের ভেগানদের শপথ গ্রহণের দিন যে কমিউনিটি সাপোর্টের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিলো আমাকে আর আমার মতন নব্য ভেগানদের সেই সাপোর্ট সিস্টেম কোথায় গেল ? তোমাদের ফেসবুক গ্রুপেও আমার অসুবিধার কথা লিখে পোস্ট করেছি তথাপি আজ অবধি এডমিন অপ্রভ করেননি কেন বলতে পারো ?
এর মধ্যেই আমার fssai ডিপার্টমেন্টে কর্মরত দাদা এসে যখন জানালেন যে এই জিএমও (GMO) প্রোটিন বারটি সঠিক ভাবে পরীক্ষিত নয় তখন দাদার সামনে গা এড়িয়ে যাওয়া ভাব দেখলেও পরে এই প্রোডাক্টের মূল কোম্পানীর ব্যাপারে ইন্টারনেট ঘেঁটে খোঁজ খবর করতেই জানতে পারি যে আমেরিকার সর্বোচ্চ সরকারি বিভাগ যা খাদ্য বস্তু আর ঔষধ পত্রের ছাড়পত্র দেয় যাঁর পোশাকি নাম FDA , সেই ডিপার্টমেন্ট এখনো অবধি এই প্রোডাক্ট এপ্রোভ করেনি, তার কারণ যাঁদের কোনো প্রকারেই এলার্জি আছে তাঁদের জন্য এটি কতোটা সুরক্ষিত টা নিয়ে একটা প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি হয়েছে আর এই কারণেই আমেরিকা ইউরোপে লঞ্চ এর আগেই এঁরা ভারতের এক ইস্টার্ন মেট্রোকে বেছে নিয়েছিলো প্রোডাক্ট লঞ্চ এর জন্য।
আরো ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে জানতে পারি যে, এই প্রজেক্টের একজন সহকারীর খুব রহস্যজনক ভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিলো।
আমি সাংবাদিক, ছেঁড়া তথ্য জুড়ে পুরো কাহিনীটা বুঝতে সময় না লাগলেও ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছিলো ।
আমি চাইলে কী ভেগান জীবন থেকে বেরিয়ে এসে নিজের পুরোনো জীবনে ফিরে যেতে পারতাম না ?
পারতাম, কিন্তু সেটা ওই একবার ব্যাপটিসাইড হয়ে যাওয়া আদিবাসী মানুষটির নিজের ঘরে ফেরার মতো, যাকে তাঁর নিজের সম্প্রদায় পূনগ্রহন করেনি।
পৃথিবীতে কোনো মতই খারাপ নয়, তাঁদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেগুলোই শ্রেষ্ঠ মত কিন্তু আমার মতো জীবন আর নিজের ব্যাপারে অনভিজ্ঞ মানুষের জন্য যেকোনো মতের বা বিশ্বাসের বা ধর্মের অন্ধ-অনুকরণ স্বপতনের লক্ষণ।
এটাই আমার শেষ অবধি আত্ম অনুসন্ধানের ফল।
আমি জানি আমার আত্মহত্যা “কলকাতা লেটস বি ভেগান” বা পিকে গ্রুপের মতো মিলিয়ন ডলারের ব্যয়বহুল সামাজিক ব্যবসায়িক সুচারু পরিকল্পনার প্রকল্পকে একবারে ধুলায় মিশিয়ে দিতে কখনোই পারবে না কিন্তু এর পরেও আমার মতো একজনও যদি আত্মউপলদ্ধি করতে পারে, কোনো প্রকার হুজুগে না মেতে আগে নিজেকে চিনতে শেখে তাহলে সে হয়তো বেঁচে যাবে।
এই আশা নিয়েই নিজের জীবনের বলিদান দিচ্ছি।
কারণ, যেকোনো আদর্শের সংগ্রামী এই কথাটি আমাকে বার বার শিখিয়েছেন যে মহান উদ্দেশ্য আত্মবলিদান চায়।
কলকাতা তোমাকে বাঁচাতে, আমার নিজের ক্ষুদ্র এই জীবনের বলি গ্রহণ করো মা।
ইতি,
আপনাদের হেরে যাওয়া ছেলেটি!
পড়া শেষ করে ফাইলটি মোবাইলের থেকে সম্পূর্ণভাবেই এইবারে মুছে ফেললো অবন্তিকা।
জীবন দৌড়ের এই খেলাতে তাঁকেও যে শুধুমাত্র একটি শব্দবন্ধ শেখানো হয়েছে আর সেটি হলো “মুভ অন” ।
প্ল্যেনের উইন্ডো দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘগুলো কে দেখতে দেখতে তবুও যে কেন অবন্তিকার চোখ দুটো জ্বালা করছে !