গল্পগাছা -তে সুতপা সরকার

পায়ে পায়ে প্রেম  

তাজমহল দেখলি? অসাধারণ তাই না? প্রমীলাকে ঘিরে ধরে ক্লাসের সবাই।
পরীক্ষা শেষের ছুটিতে ওরা গিয়েছিল দিল্লী আগ্রা। ঝকঝকে চোখমুখে সেই বেড়ানোর গল্প শোনাচ্ছে প্রমীলা স্কুলে এসে। এমনিতেই নতুন বছরে নতুন ক্লাসে প্রথম দিন আজ। পড়া এবং পড়ানোর চাপ নেই। তাই ক্লাসটীচার রমাদিও গল্প শুনে নিলেন খানিক্ষন। তারপর সবাই কে বললেন, দিল্লী আগ্রাটা পারলে ঘুরে নেবে অন্ততঃ একবার। দেখবে কেমন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা শহর দুটো! মাস কয়েক আগে গরমের ছুটিতে পরমারা গিয়েছিল কাশ্মীর। ফিরে এসো কত গল্প। ভূস্বর্গ নাম সার্থক। চোখ নাকি জুড়িয়ে গেছে ওদের কাশ্মীরের সৌন্দর্য দেখে। রুনা হাঁ করে শোনে আর ভাবে কি ভাগ্য ওদের। কত জায়গায় ঘুরতে যায়। কত কি দেখতে পায়। ওরা মামার বাড়ি আর দেশের বাড়ি ছাড়া কোথাও যায়নি। ট্রেনে নাকি শোওয়ার জায়গা আছে – পরমারা বলে। নম্বর দেওয়া সব সীটে। সেই নম্বর টিকিটের সাথে মিলিয়ে নিয়ে বসতে হয়। দু’দিন তিনদিন ধরে ট্রেনেই থাকতে হয়। সে আবার কেমন করে পারে কে জানে! প্রমীলার বাবা আবার রেলে চাকরি করেন। পাস পান। তাই ওদের নাকি টিকিট কাটতে পয়সাও লাগে না। ইস্, বাবা যে কেন রেলে চাকরি করে না! রুনা সব শোনে আর কেবলই অবাক হয়। ভাবে বড় হয়ে সে রেলে চাকরি করবেই। আর প্রতি বছর বেড়াতে যাবে। যাবেই।
ক্লাস এইটে পড়ার সময় রুনারা গেল মালদা। পিসির বাড়ি। কি আনন্দ। সারাদিন ধরে ট্রেনে চড়লো। সীট নাম্বারও দেওয়া ছিল। মিলিয়ে মিলিয়ে বসেও ছিল, কিন্তু রাত হওয়ার আগেই পৌছে গেল যে! সেখান থেকে ওরা ঘুরলো গৌড়, আদিনা। কি ভালোই যে লেগেছিল। তারপর আর কোথ্থাও নিয়ে যাননি বাবা। মালদার গল্প দিয়েই রুনার বেড়ানোর গল্প, এলবাম থেমে থাকল। তারপর কলেজ। কলেজ শেষে পরীক্ষা। কম্পিটিটিভ পরীক্ষা। খালি পরীক্ষা। চাকরি কি পাবে রুনা? কি দুশ্চিন্তায় যে থাকত। আর রেলের পরীক্ষা কই, রেলের অ্যাডভার্টাইজই দেখে না রুনা । যাও বা একটা দুটো পরীক্ষা দিল, রেল তাকে কোনবারই ইন্টারভিউতেও ডাকলো না। ডাকলো না অন্যরাও। শুধু কি রুনা, পাড়ায় পাড়ায় বেকার ভর্তি। চাকরি কই! রুনার স্বপ্ন কি তবে অধরাই থাকবে! মা জোর দেন বিয়ের জন্য। রুনার ছোট দুটো ভাই বড় হচ্ছে। ওরা কবে চাকরি পাবে কে জানে। বাবার রোজগার থাকতেই মেয়ে পার করতে চান মা। রুনা বেঁকে বসে। খুঁজে খুঁজে প্রাইভেট ইনসিওরেন্স কোম্পানীতে চাকরি যোগাড় করে ফেলে একটা। ডালহৌসী পাড়ায় মস্ত একটা বাড়ির সাত তলাতে অফিস দুটো ঘর নিয়ে। ঢোকা বেরনোর সময় চোখে পড়ে রোজ, পাশেই এক ট্রাভেলসের অফিস। বড্ড লোভ হয়। কিন্তু ইনসিওরেন্স কোম্পানী যা মাইনে দেয় তাতে তার আসা যাওয়া আর জামাকাপড় কেনার খরচটা সামলে যায়। হ্যাঁ, একটা সেকেন্ড হ্যান্ড স্মার্ট ফোন কিনতে পেরেছে বটে মাস ছয়েক পর। বেড়ানো? তাজমহল? কাশ্মীর? ধুর, দার্জিলিংটাও যদি যেতে পারতো! কিম্বা দীঘা? কত লোক হুট বলতেই দীঘা চলে যায়! একবার যদি সেখানেই যেতে পারত! রুনার স্বপ্নের বিস্তৃত পৃথিবী ছোট হতে থাকে ক্রমশঃ। বাড়িতে বিয়ের চাপও বাড়তে থাকে।
সেদিন ট্রেনটা প্রায় মিস্ করছিল। দৌড়ে শেষ কম্পার্টমেন্টে উঠেছে রুনা। জেনারেল বগি। উঠেই হাঁফাতে থাকে। একটি ছেলে বসতে দেয়। ধাতস্থ হলে খেয়াল পড়ে, আরে! একে তো রুনা পাশের ঐ ট্রাভেল এজেন্সিতে দেখেছে। ধন্যবাদ দেওয়ার পর রুনা তুমুল উৎসাহে তার সাথে আলাপ জুড়ে দেয় যেচেই। কত খুটিনাটি জিজ্ঞাসা ওর! ছেলেটি অরুণ, বিরক্ত হয়না একটুও। বরং রুনার বেড়ানোর শখটাকেই আরো খুঁচিয়ে দেয়। শুধু সেদিনই না, তারপরেও টুকটাক দেখা হলেই অরুন একই প্রসঙ্গ টেনে আনত।
কিছুদিন পর রুনাকে একটা অদ্ভুত প্রস্তাব দেয় অরুণ। সে দীর্ঘদিন ঐ এজেন্সিতে আছে। বেড়ানোর অনেক রকম হালহদিশ, সুলুক সন্ধান জানে। সে নিজেই একটা ট্রাভেল এজেন্সি খুলতে চায় এবার। স্বাধীন ভাবে কাজ করতে চায়। রুনাকে যদি পাশে পায় সে খুশি হবে। রুনা অবাক। সে তো কিছুই জানে না, সে কি করে হেল্প করবে? অরুণ বোঝায়, সব করবে সে। রুনা শুধু টীমের সঙ্গে থাকবে, সকলের ভালো মন্দের খবর নেবে, কার কি লাগবে এসব জানবে আর অরুণকে জানাবে। বাকি সে সামলে নেবে। এসব ক্ষেত্রে সঙ্গে একজন মহিলা থাকা নাকি প্লাস পয়েন্ট, ফ্যামিলি ট্রিপে সকলে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। আর বেশ কিছু মহিলারা নিজেরাই ট্রিপ করতে উৎসাহী। অরুণ বলে ফেসবুকে একটা একাউন্ট খুলতে। এখনকার মানুষজন, তাদের চাহিদা বুঝতে নাকি ফেসবুকের জুড়ি নেই।
রুনা প্রচন্ড দ্বিধায় পড়ে গেল। প্রথমতঃ এবং প্রধানতঃ বাড়িতে রাজী হবে কিনা। দিনের পর দিন বাইরে কাটানো, যদিও দল মানেই অনেকে থাকবে। দ্বিতীয়তঃ, এর ভবিষ্যৎ কি! সে বেড়াতে চায় , কিন্তু দলবল নিয়ে দায়িত্ব সহকারে কতটা কি করে উঠতে পারবে? তৃতীয়তঃ, অরুণকে কেন সে বিশ্বাস করবে? কতটাই বা চেনে!
প্রস্তাবটার ভালো দিকও আছে একটা। অরুনের নতুন অফিস রুনাদের বাড়ি থেকে কাছেই, যাতায়াতের ঝামেলা অনেক কমবে। মাইনেও অরুণ কম দেবে না বললো, এখন যা পায় তাইই দেবে। আর প্রথমদিকে মাসে একটার বেশি ট্রিপ করাবে না অরুণ। যদি গ্রুপে একজন মহিলাও না থাকেন, সেক্ষেত্রে রুনাকে যেতে হবে না। অনেক ভেবেচিন্তে মাকে লুকিয়ে বাবাকে ধরে বসে রুনা একদিন। বাবার ভেতরে ব্যবসা করার একটা প্রচন্ড ইচ্ছের কথা রুনারা সবাই জানে। সেই দুর্বল জায়গাটা দিয়েই সে অর্ধেক সফল হলো। বাকি অর্ধেকের দায়িত্ব অরুণ নিলো। ইনসিওরেন্সের চাকরিটা অবশেষে একদিন রুনা ছেড়েই দেয়। তারপর রথের দিন অরুন উদবোধন করলো ওর এজেন্সির। প্রথম দিনই রুনার সাথে বাবা গেলেন নতুন অফিসে। অরুণের সাথে আলাপ হলো। রুনা চমৎকৃত হলো অরুণের বশ করার ক্ষমতা দেখে! দিনের শেষে রুনার মনে হলো, সরকারি চাকরি না করলে বাবা নিজেই চাকরি ছেড়ে অরুণের সাথে ভিড়ে যেতেন।
রুনা সাতদিনেই বুঝে গেল, ফ্লেক্স টাঙিয়ে, লিফলেট ছেড়ে ট্রাভেল এজেন্সিতে লোক জোগাড় করা যায় না। অরুণ আগের এজেন্সির কিছু বাঁধা ক্লায়েন্টকে পাকড়াও করেছিল। এবার তাদের থ্রুতেই আরো যোগাযোগ বাড়াতে লাগলো। রুনা অফিস ওয়ার্ক গুলোর সাথে সাথে ফেসবুক হোয়াটস অ্যাপ নিয়ে পড়লো। ভাইদের পিছনে পড়ে থেকে থেকে শিখে নিতে লাগলো খুটিনাটি। ততদিনে মা ভাইরাও জেনে গেছে রুনার এই নতুন কাজের কথা। মা গজগজ শুরু করলেও বাবা সামাল দিয়েছে ভালোই। প্রথম ট্রিপটা ওরা পেলো পুরীতে। চেনা জায়গা অরুণের। লোকসংখ্যা বাইশ। পাঁচজন মহিলা। অতএব রুনা যাবে। এইবার তুরুপের তাস খানি খেললেন রুনার বাবা। তিনি ছুটি নিয়ে নিলেন এক সপ্তাহ। রুনার মাকে নিয়ে তিনিও হলেন ঐ দলের সঙ্গী। অরুণের সাথে শর্ত হলো, কোন রকম কনশেসন দেওয়া চলবে না, কোন রকম স্পেশাল খাতির করাও চলবে না। রুনা বুঝলো, তাকে একা ছাড়তে বাবা মানসিক ভাবে প্রস্তুত নন। তাই-ই সই। শুরু তো হোক্। অরুণের প্ল্যানে ট্রিপটা গতানুগতিক ভাবে না করে একটু নতুনত্ব যোগ করা হলো। রঘুরাজপুর বলে একটা নতুন জায়গা, অপূর্ব সুন্দর হাতের কাজ করেন সেখানকার মানুষ। শেষ দিনে সেইখানে ঘুরিয়ে আনা হলো টুরিস্টদের। আর মাঝখানে ছিল একদিন পূর্ণিমা রাত্রি। সেই দিন গোল হয়ে বসে সাগর পাড়ে ওপেন এয়ার আড্ডা হলো আর মুনলাইট ডিনার। ফেরার পথে ট্রেনে আন্তরিক ভাবেই ধন্যবাদ জানিয়ে ছিলেন সকলে। পরের ট্রিপে আবার যাবেন জানিয়ে গেলেন অনেকেই। রুনার বাবাও খুব খুশি। মায়ের সাথে অরুণের ভাব হয়ে গেল খুব স্বাভাবিক ভাবেই। ফিরে এসে রুনা একটা দুর্দান্ত কাজ করে ফেললো। ফেসবুকে তাদের ট্রাভেল এজেন্সির নামে একটা একাউন্ট খুলে ফেললো। আর তাতে দিয়ে দিল দারুণ সব ছবি, বিশেষ করে রঘুরাজপুরের। তার ট্যাগ লাইন হলো, চলুন ঘুরে আসি অন্য রকম ভাবে।
দিন কয়েকের মধ্যে অরুণ চমৎকৃত হয়ে গেল। যারা সঙ্গে গিয়ে ছিলেন তাঁরাও খুব প্রশংসা করে কমেন্ট করলেন। চাঁদনি রাতের আড্ডার প্রচুর প্রশংসা করলেন। ঠিক সেই পরিস্থিতিতেই রুনাকে দিয়ে একটা মহিলা ট্রিপের প্রস্তাব পোস্ট করে দিল অরুণ। আশাতিরিক্ত সাড়া মিললো। বিভিন্ন বয়সী কুড়ি জন মহিলাকে সিলেক্ট করা হলো। তাঁদের নিয়ে অরুণ রুনা এবার যাবে ভাইজাগ। বাবা মার মধ্যেও এবার আর কোন দ্বিধা দেখলো না রুনা। ওদিকে অরুণ আরো এক পার্টি যোগাড় করে ফেলেছে পূজোয় দার্জিলিং এর জন্য। দুজনের খুশি আর উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে। ভাইজাগ যাওয়ার আগে রুনার পরামর্শে একটা শপিং মলে গেট টুগেদার হলো। প্রাথমিক আলাপ পরিচয় আর সেই গেট টুগেদারের ফেসবুক পোস্ট রুনাদের এজেন্সিকে আরো একধাপ এগিয়ে দিল। ভাইজাগ যাওয়ার দিন থেকে শুরু করে ফেরার দিন পর্যন্ত অসংখ্য ছবি আর লেখা দিয়ে একাউন্টটা সাজিয়ে তুললো রুনা। ফল মিললো ভালোই। পুরীতে যাওয়ার জন্য আরো একটা মহিলা গ্রুপ তৈরি হয়ে গেল। কিন্তু সেই পূজোতেই। রুনা চ্যালেঞ্জটা একসেপ্ট করে নিল। আরো দুজন লোক রাখা হলো। অরুণের সাথে একজন যাবেন দার্জিলিং আর রুনা আরেকজনকে নিয়ে যাবে পুরী। পুরো দেখভাল দায় দায়িত্ব এবার রুনার কাঁধে। সমস্ত ব্যবস্থাদি হয়ে যেতে এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে ফিরতে অরুন বলে – তাহলে সব শিখেই গেলে তো রুনা? শুধুমুদু ভয় পাচ্ছিলে?
রুনা বললো, এবার যদি আমি আলাদা এজেন্সি খুলে ফেলি, কি করবে অরুণ? ওরা আপনি থেকে তুমিতে নেমেছে অনেকদিন হলো। অরুণ হাসে – তুমি চাইলে পুরোটাই তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি। শুধু একটা সই করতে হবে। করবে?
নিশ্চয়ই- রুনা খিলখিল হেসে ওঠে। একটা সইতে যদি সব কিছুর মালিক হয়ে যাই নিশ্চয়ই করবো।

তাহলে ম্যারেজ রেজিস্টারকে খবর দিই ?

রুনা আচমকাই হোঁচট খেয়ে গেল। না না, সিনেমার মত অরুণ এসে জড়িয়ে ধরেনি। কিন্তু রুনার মুখে একগাদা অরুণালোক ছড়িয়ে পড়ে। অরুন খেয়াল করে তা। স্মিত হেসে মৃদুস্বরে বলে – সেই ট্রেনের লাস্ট কম্পার্ট্মেন্টে যেদিন দেখা হলো তোমার সাথে, সেদিন থেকেই অপেক্ষায় ছিলাম এই মুহুর্তটা দেখবো বলে। কিন্তু সেদিনের সাথে আজকের তফাৎ কি জানো?
কি? রুনার গলার স্বর অচেনা প্রেমিকার মত শোনায় ।
আজ শুধু আমি না, আমার এই স্বপ্নের এজেন্সিও তোমাকে ছাড়া বাঁচবার কথা ভাবতে পারে না, জানো!
উহু… আমার না, আমাদের।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।