কোনো কিছুর সাথেই কম্প্রোমাইজ করিনা,
শিল্পই শেষ কথা। সুর আর শব্দে জীবন যাপন।
কলমের সাহায্যে কথা বলি। আপাতত কোনো কাব্যগ্রন্থ নেই।
তেরোই পৌষ
বারো বছর হলো নির্মলবাবু বিপত্নীক। দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে স্ত্রী লাবণ্য তার শরীর পরিত্যাগ করেন। সেই দিনটা ছিলো তেরোই পৌষ। এরপর বারোটি বছর কেটে গেছে তাঁর স্মৃতি আঁকড়ে।
বয়স হয়েছে, নিভে আসছে তার দৃষ্টি। প্রতি বছর ওই দিন নির্মলবাবু স্ত্রীর ছবির সামনে রজনীগন্ধার তোড়া ও থালায় ইলিশ মাছের ঝোল, ভাত, পাঁচ রকম ভাজা সাজিয়ে
দেন ।
একমাত্র ছেলে পেশায় সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বিলেতে থাকে ফ্যামেলি নিয়ে। বাবার কাছে আসে দু’বছর অন্তর। এদিকে পেনশন হোল্ডার, একা বৃদ্ধের দিন কেটে যায় জোড়াতালি দিয়েই।অর্থাৎ চশমা ভেঙে গেলে পাড়ার কেষ্ট বলে, দিন কাকাবাবু আমায়, আমি তো যাচ্ছি ওদিকে, আবার জ্বরের ঠ্যালায় বাজার বন্ধ হলে সেদ্ধ ভাত খেতে খেতে যখন মুখে চড়া পড়ে! তখন কোথা-থেকে এক অচেনা মাছওয়ালা এসে পছন্দের মাছ দিয়ে যায় বাড়ি বয়ে। উনি মনে মনে ভাবেন সবই ঈশ্বরের কৃপা…
বারো বছর পর এবার নির্মল বাবুর মনে হলো এবার তেরো তারিখ টা একা একা না কাটিয়ে এগারো বছরের নাতনি তিতুনের সাথে কাটাবেন। ছেলেকে সেই মত জানালেন ও আগে থেকে, ছেলেও কথা দিলেন আসবেন যথা সময়ে।
আনন্দ আর অপেক্ষার কড় গুনতে গুনতে এসে গেলো সেই দিন। সকাল থেকেই নির্মল বাবু মনে বড্ড বল পাচ্ছেন। এবার আর আমি একা নই, আমরা সব্বাই একসাথে কাটাবো আজ লাবণ্য…বলে চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে বাজারে গেলেন, ওরা আবার এসে পড়বে কিনা! ঝড়ের গতিতে সমস্ত কাজ সেরে ফেললেন নির্মল বাবু, আজ যেন তিরিশ বছর আগের তিনি।
এদিকে ঘড়ির কাঁটা বাঁই বাঁই ঘুরছে, কিন্তু ওরা! ফোনেও পাচ্ছেন না, অপেক্ষাই একমাত্র পথ এখন। দুপুর গড়িয়ে সন্ধে। এবার আর কিচ্ছু ভালো লাগছে না তার, ফুল ও খাবার যথারীতি দেওয়া হয়েছে ছবির সামনে।
তোমাকে মালা পরাই না কেন জানো লাবণ্য! জীবিতদের মালা পরাতে নেই যে! তুমি তো আছো আজো একই ভাবে…
বলতে বলতেই ঘড়ির কাঁটায় ৬.৩০ মিনিট, এই সময়েই বৃদ্ধের জীবন থেকে সব আলো নিভে যায়, বারো বছর আগে…
হঠাৎ ডোরবেল বেজে ওঠে টিং টং…টিং টং…
অমনি বাড়ির কর্তা লাফিয়ে উঠে দরজা খুলতেই দেখেন, একগাল হাসি নিয়ে নাতনি তিতুন দাঁড়িয়ে, সঙ্গে ট্রলি ব্যাগ । দাদাই আমি এসে গেছি বলে জড়িয়ে ধরলো। দাদুর আনন্দের আর সীমা নেই,শুধু বললেন তুমি একা দিদিভাই! সে বললে বাবার অফিসে ছুটি ক্যানসেল, মায়েরও তাই, তাই আমি চেনা এক আঙ্কেলের সাথে এসেছি।
এরপর দুজনে চললো সারারাত গল্প। খুনসুটি চলতে চলতে তিতুন বলে উঠলো, দাদাই আমি একটা গান গাইবো! সেই যে সেই গানটা! টেগোর সং —
” তোমায় নতুন করে পাব ব’লে হারাই ক্ষণে-ক্ষণ ” ঠাম্মা গেয়ে তোমায় শোনাতো। দাদু অবাক হয়ে বললেন, তুমি কেমন করে জানলে এ গান? বাবা বলেছে দাদাই, আমি এটাও জানি, তুমি ঠাম্মাকে কী বলে ডাকতে, ঠাম্মার জ্বর হলে বকুল ফুল এনে রাখতে বালিশের পাশে…
বলেই গাইতে লাগলো তিতুন, বিস্ময়ে ঢলে পড়া বৃদ্ধ শুনতে লাগলেন নাতনির গান, অবিকল যেন লাবণ্যই গাইছিলেন। শুনতে শুনতে কখন চোখ লেগে গিয়েছিলো তা তিনি টেরও পাননি। ঘুম ভাঙে কলিংবেলের শব্দে, চোখ খুলে দেখেন সকাল,পাখিও ডাকছে, পাশে দিদিভাইও নেই! বোধ হয় বাথরুমে গেছে, যাই দরজাটা খুলে দেখি এতো সকালে আবার কে এলো! বলেই চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুললেন নির্মলবাবু।
খুলেই তিনি হতবাক! সামনে দাঁড়িয়ে ছেলে, বৌমা ও নাতনি তিতুন, ছেলে বাবার হাত দুটো চেপে ধরে বললো বাবা ভুল বুঝোনা আগের ফ্লাইট টা মিস করেছি, তাই দেরি হলো…
নির্মল বাবুর গলা শুকিয়ে কাঠ, বাকরুদ্ধ হয়ে খানিক্ষন চেয়ে রইলেন, তারপর বললেন,