গল্পকথায় আত্রেয়ী রায়

দুঃস্বপ্নের দিনগুলি

রজতপুরকে পুরোপুরি গ্রাম না হলেও আধা মফস্বল এলাকা বলাই চলে। ওখানেই আমাদের তিন পুরুষের বসতবাড়ি। ঠাকুরদাদা ছিলেন নামকরা কবিরাজ।আশেপাশের গ্রামের লোক তার নামে ধন্য ধন্য করত। আমাদের বাড়িটার নামই ছিল ‘কবিরাজবাড়ি’। পরে বাবাও চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ভূতে-ভগবানে বিশ্বাস করতেন না আমার চিকিৎসক বাবা শ্যামল সরকার। নিজের উপর ছিল প্রগাঢ় আস্থা। সত্যের মুখোমুখি হতে কোনোদিন ভয় পাননি। বহু মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। বাড়ির নিচেই ছিল চেম্বার। সারাদিন সেখানে রোগীদের ভিড় লেগে থাকত। এত নামী ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও মায়ের অসুখের সঙ্গে পেরে উঠলেন না বাবা। মায়ের ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। কেমোথেরাপির ফলে মাথার চুল, ভুরু সব উঠে গিয়েছিল। চামড়া কুঁচকে শরীরটা গুটিয়ে গিয়েছিল। এই অবস্থায় মা আড়াই বছর বেঁচে ছিলেন। মায়ের অসুখের সঙ্গে লড়াই করতে করতে বাবা মনের দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। মায়ের মৃত্যুর পর প্র্যাকটিস কমিয়ে দিয়েছিলেন অনেক। সন্ধ্যের দিকে একা একা হাঁটতে বের হতেন রোজ।
আমরা তিন ভাইবোন তখন স্কুল ও কলেজের উপরের দিকে । একদিন সন্ধ্যাবেলায় আমি বোনকে অংক দেখিয়ে দিচ্ছিলাম আর ভাই গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে বসেছিল। এমন সময় বাবা হাঁপাতে হাঁপাতে বাইরের দরজা দিয়ে ভেতরবাড়িতে এসে ঢুকলেন। চোখ দুটি যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, মাথার চুলগুলি খাড়া খাড়া। ঘরে ঢুকে তক্তপোষে  বসে পড়ে বললেন বাবু, ‘এক গ্লাস জল দে।’ আমরা ততক্ষনে বাবাকে ঘিরে ধরেছি। কোনমতে ঢকঢক করে জলটুকু নিঃশেষ করে দেওয়ালে মায়ের ছবির দিকে চেয়ে রইলেন বাবা। আমাদের সপ্রশ্ন মুখের দিকে চেয়ে অনেকক্ষণ পরে বললেন, তোদের মাকে দেখলাম, আমতলায়। আমরা হতবাক। বাবার মতন যুক্তিবাদী, শক্ত মনের মানুষের এমন হ্যালুসিনেশন হয় নাকি? বাবার কথা উড়িয়ে দিতে শিখিনি কোনদিন। তাই জোর গলায় তর্ক করতে পারলাম না। সে রাত্রের মত ওখানেই শেষ।
কিন্তু এমন হতে লাগল প্রতিদিন। সান্ধ্যভ্রমণ থেকে ফিরে এসে প্রতিদিন বাবার ওই এক মূর্তি। দিনকতক এভাবে চলার পর ভাই বাবার সাথে হাঁটতে যাওয়া শুরু করলো। ভাই কিন্তু আমতলায় কিছুই দেখতে পেল না। বাবা বললেন, মা নাকি শুধু তাকেই দেখা দেন। কয়েকদিন পর থেকে বাবা আর ভাইকে সঙ্গে নিতেন না। আর মা’ও নাকি আবার আগের মত দেখা দিতেন।
এইভাবে মাসাধিককাল চলতে লাগল। আমার অমন তেজোদ্দীপ্ত  বাবার শরীর শুকিয়ে কাঠের মত হল। এক বেলা আহার ধরলেন, তাও স্বপাকে। রাত্রে ঘুমোতেন না।খোলা জানালা দিয়ে ঘরে আলো জ্বলতে দেখা যেত। দরজা বন্ধ করে কি যে করতেন জানা নেই। প্র্যাক্টিস শিকেয় উঠেছিল। দিনের বেলা অধিকাংশ সময়ে বাড়িতে থাকতেন না। কানে আসত তিনি সাধুসঙ্গ ধরেছেন। এরপর আমি ডাক্তারি পড়তে চলে যাই কলকাতায় মেডিকেল কলেজে। মেজ ভাই কলেজে ও ছোটবোন স্কুলের শেষ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পড়াশোনায় তিনজনই ভালো ছিলাম, ভবিষ্যত ছিল উজ্জ্বল। চিঠিপত্রের মাধ্যমে ভাই ও বোনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকত। বাবাকে চিঠি লিখেও উত্তর পেতাম না। ভাইয়ের চিঠিতে জানতে পারতাম বাবা নাকি প্রায় উন্মাদদশা প্রাপ্ত হয়েছেন।
ভাইয়ের কাছ থেকে রোমহর্ষক সব খবর আসতে লাগল। বাবা নাকি বাড়িতে নিজের ঘর এবং আরো দুটো ঘর নিয়ে আলাদা থাকেন। সেখানে তান্ত্রিক কাপালিকদের নিত্য আনাগোনা। ঝাড়ফুঁক, মারন উচাটন, বশীকরণের চর্চা হয় সেখানে। ছুটিতে বাড়ি গিয়ে বোন ও ভাইয়ের দুর্দশা দেখে চোখে জল এল। কিন্তু আমার ডাক্তারি পাশ করতে এখনো অনেক দেরি। কী করে ওদের দায়িত্ব নেব বুঝতে পারছিলাম না। বাড়ির পুরনো কাজের লোকেরা প্রায় সবাই উধাও। বাবার সাথে দেখা করা গেল না। জানলা দিয়ে উঁকি দিয়ে একবার দেখবার চেষ্টা করলাম ভিতরে কি হচ্ছে। পোড়া মাংসের কটু গন্ধে নাক চাপা দিয়ে দেখলাম কয়েকটা মড়ার খুলি, হাড় আরো নানারকম চেনা-অচেনা দ্রব্য মেঝেতে ছড়ানো। বাবা একটা বাঘের ছাল এর উপর সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় বসে আছেন আর বিড়বিড় করছেন। মাথায় জটাজুট, দাড়ি বুক ছাড়িয়েছে, কোথায় আমার সেই সৌম্যকান্তি বাবা? শীর্ণকায়, অস্থি চর্মসার শরীরটা যেন ঘরের অন্ধকারে মিশে রয়েছে, সারা শরীর তাবিজ, কবচ, মাদুলিতে আচ্ছন্ন। ‘বাবা’ বলে ডাকতে গিয়েও মুখ ফিরিয়ে চলে এলাম। বাড়ির পুরনো রাঁধুনী হরিদা এখনো ভাই-বোনের জন্য রান্না করে দিয়ে যায় এক বেলা। হরিদার থেকে জানতে পারলাম বাবা এখন যোগ সাধনা শুরু করেছেন। বাড়িতে নাকি গভীর রাত্রে যোগিনীদেরও আনাগোনা হয়। লজ্জায় ঘৃণায় মাথা নিচু করে চলে আসলাম সেখান থেকে।
রাত্রে ভাই জানাল আমেরিকার ইউনিভার্সিটি তে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করার সুযোগ পেয়েছে সে, স্কলারশিপ সহ। খুব শিগগির এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চায়। মনে মনে খুশি হলেও চিন্তা হতে লাগলো ছোট বোন পরীকে নিয়ে। বাবার বড় আদরের সন্তান। মাধ্যমিকে ভাল রেজাল্ট করলে কলকাতার কলেজে ভর্তি করব ঠিক করলাম। হোস্টেলে থাকবে। আমিই দেখাশুনা করব। কিন্তু পরীক্ষার এখনো মাস ছয়েক দেরি।
ভাইকে আমার মেসে টেলিফোন করতে বললাম আর বোনকে চিঠি লিখতে বলে ফিরে এলাম কলকাতায়। আগে বাবার চেম্বারে গোটাদুয়েক টেলিফোন ছিল। সময়মত বিল না দেওয়ায় সে দুটোই আপাতত মৃত। মোবাইলের যুগ তখনো শুরু হয়নি। চিঠি লেখা ছাড়া গতি নেই।
দিন কাটতে লাগলো। পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। সুদূর আমেরিকা থেকে ভাইয়ের ফোন কল পেতে লাগলাম প্রতি সপ্তাহে। ফোনে সে শুধু বোনের কথাই জিজ্ঞাসা করতে থাকে। বাড়ি থেকে ফেরার পর এখনো পর্যন্ত বোনের কাছ থেকে শুধু একটি চিঠি পেয়েছি। আশা করি সবাই জানেন যে ডাক্তারি পড়া খুব একটা সহজ কাজ নয়। বোনকে দেখতে যাওয়ার প্রচন্ড ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মাস দুয়েকের মধ্যে একবারও সময় বার করতে পারলাম না। একদিন সকালে কলেজে যাবার জন্য তৈরি হয়ে বেরোনোর মুখে রাস্তায় দেখি হরিদা দাঁড়িয়ে আছে। লোকজনকে আমার নাম করে ঠিকানা জিজ্ঞেস করছে সম্ভবত। আমাকে দেখতে পেয়ে হাউমাউ করে আমাকে জড়িয়ে ধরলো হরিদা। আমি তার হাত ধরে আমার মেসের ঘরে এনে বসালাম। অনেক কষ্টে জলটল খাইয়ে শান্ত করার পর জানতে চাইলাম কি হয়েছে, পরী কেমন আছে ইত্যাদি। বহুক্ষণ কথা বলতে পর যা উদ্ধার করতে পারলাম তার সারমর্ম হল এই যে, বাবার সাধনসঙ্গীদের একজন অক্ষতযোনি  ষোড়শী কন্যা প্রয়োজন ছিল। একদিন রাত্রে পরীকে নিজের ঘরে ডেকে বাবা তাকে প্রচুর মাদকদ্রব্য সেবন করান এবং প্রায় সংজ্ঞাহীন মেয়েকে সঙ্গীসাথীদের হাতে তুলে দেন। সে বেঁচে আছে কিনা হরিদা জানে না, কারণ ওই ঘর থেকে পরীকে  হরিদা এখনো পর্যন্ত বের হতে দেখেনি। হরিদা গ্রামের কয়েকজন শিক্ষিত মানুষকে ডেকে এনেছিল, কিন্তু তারা ভয়ে ডাক্তারবাবুর ঘরে ঢুকতে চায়নি। অনেকে বিশ্বাসই করেনি ডাক্তারবাবু এমন কাজ করতে পারেন।
লজ্জায়, ঘৃণায়, অপরাধবোধে মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম আমি। হরিদাকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে চেপে বাড়ি ফিরলাম। ফেরার পথে থানায় ডায়েরি করে একেবারে থানার বড়বাবুকে সঙ্গে নিয়ে এলাম। পুলিশ দিয়ে গোটা বাড়ি সার্চ করানো হল, কোথাও খুঁজে পেলাম না পরীকে। অবশেষে বাবার ঘরে পৌঁছলাম। আমার বাবা এখন মৌনীবাবা, পুলিশের জেরার কোন উত্তর দিলেন না। জোর করে পুলিশ নিয়ে ঢুকলাম সেই পূতিগন্ধময় কক্ষে। না, কোথাও পরীর চিহ্নমাত্র নেই। প্রমাণের অভাবে পুলিশ বাবাকে অ্যারেস্ট না করে চলে গেল। হরিদা বারবার জোর দিয়ে বলতে লাগলো ‘মামনি এই বাড়ি থেকে কোথাও যায়নি’।
 আমি হরিদা ও বাড়ির পুরনো ড্রাইভার বনমালীদাকে নিয়ে আবার খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। বাড়ির বাগানও বাদ গেল না। মন বলছিল পরী আর বেঁচে নেই, তাও শুধু একটা প্রমাণের আশায় সারারাত খুঁজে গেলাম আমরা। শেষ পর্যন্ত বাবার ঘরের ঈশান কোণে দেওয়ালে একটা গর্ত আবিষ্কার করতে পারলাম। দেওয়ালে একটি মা কালীর পটচিত্রের পিছনে গর্তটা। ওই গর্ত দিয়ে যে কোন সাধারণ চেহারার মানুষ গলে যেতে পারে। আমরা হাতে টর্চ নিয়ে গর্তের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চললাম। বাড়ির এই গোপন অংশ সম্পর্কে আমার কোন ধারণা ছিল না। সম্ভবত এই অংশটি সম্প্রতি তৈরি হয়েছে। একটা অন্ধকার করিডোরের শেষে মৃদু বাল্বের আলোতে কে যেন বসে আছে। দূর থেকে ঠাহর করা যায় না, আমরা কাছে এগিয়ে গেলাম। আমাদের পায়ের শব্দে পিছনে ফিরে তাকাল, কে ও? ন্যাড়া মাথা, চোখ কোটরাগত, শীর্ণকায় শরীরে একটা কাপড় জড়িয়ে মা বসে আছে না? তিনজনে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলাম, আমার হাত থেকে টর্চ পড়ে গেল। হরিদার ডাকে সম্বিত ফিরতে বুঝলাম মা নয়, ও পরী। দুহাতে জাপটে ধরে বাইরে নিয়ে আসলাম।তারপর আর দেরি করিনি, গাড়ি ভাড়া করে সোজা কলকাতা। মেডিকেল কলেজে ভর্তি করি ওকে। মাসখানেকের শুশ্রূষায় একেবারে সুস্থ হয়ে ওঠে ও।
তান্ত্রিকেরা কিভাবে বাবার  মগজ ধোলাই করেছিল তা জানি না, খুব সম্ভবত মায়ের মৃত্যুশোক এবং একাকিত্বজনিত দুর্বলতার কারণে বাবা যুক্তিবোধ হারিয়েছিলেন এবং আত্মসমর্পণ করেছিলেন তন্ত্রমন্ত্র, ডাকিনীবিদ্যা, প্রভৃতির কাছে। মাকে ফিরে পাওয়ার এক অদম্য বাসনা তার মনে স্থান করে নিয়েছিল। পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিকরা বাড়িতে যাওয়া আসার কারণে পরীকে দেখতে পায় এবং লোভাতুর হয়ে বাবাকে বোঝায়, একটি ষোড়শী মেয়েকে তাদের হাতে তুলে দিলে বাবা আবার তার স্ত্রীকে ফিরে পেতে পারেন। বাবা ততদিনে সকল মানবিক যুক্তি-বুদ্ধির অতীত হয়েছিলেন, তাই অক্লেশে নিজের প্রাণসমা কন্যাকে ওই নরপিশাচদের হাতে তুলে দিতে দ্বিধা করেননি। মায়ের শেষ দিকের চেহারা যেমন হয়েছিল বাবাকে বোকা বানানোর জন্য পরীকে ওরা সে ভাবে সাজিয়ে রাখত, মা মেয়ের চেহারার মিল থাকায় যা খুব সহজে সম্ভব হয়েছিল। খাবারের সাথে মাদক মিশিয়ে খাইয়ে সারাদিন ওকে আচ্ছন্ন করে রাখত ওরা। শারীরিক অত্যাচার তো ছিলই।
বাবাকে আমি পরে মেন্টাল অ্যাসাইলামে ভর্তি করেছিলাম। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার আগেই বাবা মারা যান।
এখন আমি মেডিকেল কলেজের ডাক্তার, দুঃস্বপ্নময় দিনগুলি পরীর স্মৃতি থেকে মুছে দিতে সক্ষম হয়েছি পুরোপুরি। সম্পূর্ণ নেশাগ্রস্ত ও চেতনাহীন অবস্থায় ওর সাথে ঘটনাগুলি ঘটেছিল বলে ওর মনের উপর সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি। সময়মতস্তস পরীক্ষা দিতে পারেনি বলে একটা বছর নষ্ট হয়েছে শুধু। পরী এখন বেথুন কলেজের ছাত্রী, বন্ধুদের সাথে  অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, গৌতম ঘোষের ছবি আর নয়তো নিউ মার্কেট, কফিহাউস চষে বেড়াচ্ছে।
(১৯৯৯ সালে আনন্দবাজারে প্রকাশিত একটি মর্মান্তিক খবরের ভিত্তিতে গল্পটি রচিত, কল্পনাপ্রসূত নয়)
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।