ডালহৌসি র ফুট ধরে সোজা হাঁটলেই যে রাস্তা গিয়ে জিপিও র গায়ে ধাক্কা মারছে… সেই ফুটেই জিপিওর দেওয়ালে অনেক অনেক পুরোনো বই এর পসরা…
বই এর নির্দিষ্ট কোন বিষয়বস্তু নেই… যাহা আসে তাহাই বিক্রয় করিয়া থাকি…এই নিয়মে ব্যবসা চলে.. ফলে মার্কসীয় ” কি করিতে হইবে” থেকে শুরু করে “সাহেব বিবি গোলাম”, নিত্য পূজা ও শ্রাদ্ধ কান্ড পদ্ধতির পাশেই শুয়ে থাকে ” নবজাতক শিশুর ১০০১ নাম “.. জীবন মৃত্যু ধনেপাতা চাইনিজ কাঠের কাজ এর বই এখানে এসে সব গলে এক হয়ে গেছে….
রাদুগা পাবলিকেশন এর একের পর এক বই হলদে হয়ে যাওয়া মলাট নিয়ে বসে থাকে…ধলা কুকুর শ্যামলা কান থেকে শুরু করে দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন, নিকোলাই এর ইস্পাত একের পর এক বই গুলো কুমারী মেয়ের মত লজ্জা লজ্জা মুখ করে শুয়ে…
প্রতিটি দোকানে লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায়, আশাপূর্না দেবী, সমরেশ বসু, মনোজ বসু, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, গুনাই বিবির কেচ্ছা, বাহুডোর, জলসাঘর, কথায় কথায় যে রাত হয়ে যায়, আম আঁটি র ভেঁপু, প্রাণ প্রতিমা, বিবর, ট্রেকিং গাইড থেকে শুরু করে হেমেন্দ্র কুমার , ফেলুদার সপ্ত কান্ড থেকে শুরু করে টিনটিন বাদ যায় না কিছুই… বেছে বুছে নিলেই হল…
সবচে বেশি রমরমা জ্যোতিষ, অপরাধ আর যৌনতার বইয়ে…হৈ হৈ করে বিক্রি.. শ্যাম বাজারের শশী বাবু দুপুরে বাটা মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে একটা গোল্ড ফ্লেক ধরিয়ে টুকটুক করে হেঁটে এসে রেডিওতে মৃত্যু সংবাদ পড়ার মত গলাটা খাদে নামিয়ে ” ইয়ে মানে বই কিছু এল নাকি উঁ..????”
দোকানদার খুশী.. নীল প্লাস্টিক খুলে সযত্নে নীল বই বেরিয়ে আসে… পেন্ট হাউজ, প্লে বয়, নটি গার্ল, লাভ অন নাইট, দেবনায়ার, বডি লাভ.. পাগলা খাব কি দেখেই মরে যাব.. দেশী বিদেশী সুন্দরী পৃথুলা কুমারী কিশোরী সব্বাই হাট করে খুলে দিয়েছে নিজের সম্পদ.. নারীর একান্ত গোপন ফিসফিস মুহূর্তে র খুল্লাম খুল্লা ছবি… সেই সঙ্গে ঠোঙা পাতায় প্রিন্ট.. পাতার শুরুতেই বিধি নিষেধ এর বিজ্ঞাপন ” অনলি ফর এডাল্টস”… যৌন কেচ্ছা, গল্প, ছবি.. পুরো নীলে নীলে অম্বর সে..
পছন্দ হলেই দোকানদার পেপারে মুড়িয়ে দেবে , সেটা পকেটে পুরে কেটে পড়া বই চোরের মত… মেস বাড়ীর জীবনে নারীর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে.. ফলে অগতির গতি এই বই… বই এর চে বড় বন্ধু কে আছে বটে..???
এরপরেই জ্যোতিষ অপরাধ এর বই এর কথায় আসতেই হবে… মঙ্গল শনি যোগ হোক বা ভাদ্র মাসের ফাঁড়া টা আগাম জানতে হলে এই বই অপরিহার্য… এর সঙ্গে আছে লাল কিতাব বা টোটকা… তারানাথ তান্ত্রিক একবার কিশোরী কে গল্প বলার ফাঁকে দু একটা টোটকা বলে দিয়েছিল.. এই বই এ হাজারো টোটকা ভর্তি… টালির ঘরে মাঝরাতে “পরী দর্শন” এর উপায় থেকে শত্রু কে বান দিয়ে ব্যান করার মন্ত্র সব ই আছে…, বীভৎস তার উপাচার.. বীভৎস তার ক্রিয়া.. যত চুষবেন তত রস
অপরাধ এর বই এর প্রকাশক দের সবার ই ভদ্রলোকের এক কথা.. বড় বড় করে লেখা থাকে ” সত্য ঘটনা অবলম্বনে”.. এত খুন জখম এর সত্য ঘটনা সত্যবাদী যুধিষ্ঠির এর মতই ফলাও করে লেখা হয়.. সেখানে পোস্ট মর্টেম থিওরি থেকে লাশ এর ছবি শুদ্ধু দেওয়া থাকে… কি স্যার গা গুলিয়ে উঠছে..??? এর বিক্রি দেখলে তবে বুঝবেন আমরা খুন জখম কত্ত ভালোবাসি..
বিখ্যাত বই এর পেপার ব্যাক সিরিজ হোক বা বিখ্যাত লেখকের এক একটা লেখা সস্তার লিফলেট পেপারে মলাট দেওয়া… সবকটা দোকানে ফেলুদা, কাকাবাবু, কাল তুমি আলেয়া, হংস মিথুন, প্রথম প্রতিশ্রুতি, বিবর আর সবথেকে বেশী বিক্রি হয় শংকর এর বই.. ঘরের ভেতর ঘর শংকর….😊
নামী অনামী অজস্র সাহিত্য পত্রিকার ভীড়.. গোসাবা থেকে আমেদ পুর কবি লেখক যশ প্রার্থী মানুষ রা নিজেরা দু চার টাকা চাঁদা তুলে পত্রিকা প্রকাশ করেন.. অপটু হাতের প্রচ্ছদ… কিন্তু লেখার মান কিছু কিছু সত্যি ই ভালো.. কোন এক অজ্ঞাত কারণে বড় কাগজের সম্পাদক এর উচ্চ নাসিকায় এই সমস্ত লেখা ঢাকা পড়ে যায়.. ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই..
খ্যাপা কবি থেকে বৃদ্ধ লেখক হোক বা সদ্য প্রেম কেটে যাওয়া যুবক.. উপহার বা যৌতুক সিরিজের বই গুলো উল্টে পাল্টে দেখেন.. বৃদ্ধ লেখক বড় আশা করে ঘড়ির ব্যাটারি পাল্টানো র টাকা বাঁচিয়ে বড় কাগজে রিভিউ এর আশায় বই পাঠিয়েছিলেন.. সঙ্গে ছোট্ট চিঠি
” আমার নাম শ্রী মদন মোহন আদক.. নিবাস খামার গাছি .. আর্থিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এই বই খানি লিখিয়াছি ও এই বই পাঠকের মন জয় করিবে বলেই আমার আশা.. আপনার নিকট আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ এই যে”…. সম্পাদক কে কত আশা করে চিঠি দিয়েছিলেন..
সেই ” রিভিউ”” এর বই আরো বই ওর সঙ্গে কেজি দরে ফুটে পড়ে আছে.. নিজের সৃষ্টি র সঙ্গেই দেখা হয়ে যায় চট করে.. অভিমানে বই টা নিজেই কিনে নেন.. নিজের বই নিজেই কিনে বাড়ী ফিরে যান আধোকালীন ব্যাথা বুকে নিয়ে…
“মন্টু কে পৈতেতে বাবা” , “বাখর গঞ্জ হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর পরীক্ষায় প্রথম স্থানাধিকারী কে “, “মালিনী কে বিপ্লব”… এরকম কত মন কেমনের বই পড়ে থাকে.. স্মৃতির ধুলো মেখে..
কেউ তো আর ভালোবেসে বই উপহার দিয়ে সম্পর্ক ভাঙলে লেখেন না ” লিখিও উহা ফেরত চাও কি না”..😊