আপনার মতামত

বিষয় : এই বাংলায় বাংলা ভাষার হালহকিকত

লেখক : ড. সন্দীপ চট্টোপাধ্যায়, শিক্ষক, পানাগড় বাজার উচ্চ বিদ্যালয়, পশ্চিম বর্ধমান

কবি বিদ্যাপতি বলেছেন, “ পাখীক পাখ মীনক পানি। / জীবক জীবন হাম ঐছে জানি।। ” অর্থাৎ পাখির কাছে যেমন পাখা, মাছের কাছে যেমন জল, জীবের কাছে যেমন জীবন, সেই রকম বিদ্যাপতির কথার সূত্র ধরে আমরা বলতে পারি, বাঙালির কাছে বাংলা ভাষা। কিন্তু সেই বাংলা ভাষা আজ বাঙালির দ্বারাই বিপন্ন। প্রশ্ন এখানেই। এই বিপন্নতা কি শুধুই ভাষার, না কি জাতিরও। বাংলা ভাষা যদি বিপন্ন হয়, তাহলে জাতি হিসাবে বাঙালি কি বিপন্মুক্ত থাকতে পারবে? ভুললে চলবে না, ভাষা নিয়ে জাতি, জাতি নিয়ে দেশ। বাংলা ভাষা নিয়ে বাঙালি জাতি, বাঙালি জাতি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ। সেই পশ্চিমবঙ্গেই আজ বাংলা ভাষা বেশ কোণঠাসা। সর্বত্রই আজ ইংরেজি আর হিন্দির দাপট। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতাতে আজ অবাঙালিদের প্রভাব বেশি। দার্জিলিং-এ আজ বাঙালি নিজভূমে পরবাসী। সেখানে নেপালিরাই শেষ কথা। এমনকি, আসানসোলে পর্যন্ত ঝাড়খণ্ডী ও বিহারিদের কাছে বাঙালি পিছিয়ে পড়েছে। বাঙালিকে অচিরেই স্বখাত সলিলে ডুবে মরতে হবে, যদি না জাতি হিসাবে বাঙালি বাংলা ভাষার ব্যবাহারিক প্রয়োগ বাড়িয়ে না তোলে। মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ ইংরেজি ভাষাকে আশ্রয় করে সাহিত্য জগতে প্রবেশ করলেও নিজের ভুল বুঝতে পেরে মাতৃভাষা রূপ মণিজালে পূর্ণ খনিকেই তাঁরা শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরেছিলেন। অথচ একালের বাঙালিরা হয় নিজেদের ভুলে অথবা উপলব্ধিগত দুর্বলতার কারণে বাঙালি জাতিকেই নিশ্চিহ্ন করার দিকে এগিয়ে দিচ্ছেন। এই ভুলের এবার অবসান হওয়া দরকার। দরকার বাঙালির নব জাগরণ। বর্তমানের বাঙালির আত্মপরিচয়ের মন্ত্র হোক ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আমরি বাংলা ভাষা।

 

লেখক : ড. অশোককৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় অধ্যাপক, কবি সুকান্ত মহাবিদ্যালয় ভদ্রেশ্বর, হুগলি

নবকুমারবাবু এখন আর বাজারে যান না৷ শাকসব্জিও নাকি ছেলে-বৌমা শপিং মল থেকে নিয়ে আসেন৷ কাজ থেকে ফেরার সময় মাছ-মাংসও। শ‍রীরটা সুস্থ থাকতে যখন নিয়মিত বাজার করতেন তখন কয়েকবার মলে গেছেন নবকুমারবাবু। ঝাঁ চকচকে মলের ততোধিক সপ্রতিভ ছেলে মেয়েদের ইঙ্গ-বঙ্গ বিজাতীয় ভাষার সম্বোধনের সঙ্গে সব্জিওলা কানাই বা মুদিদোকানের সনাতনকে মেলাতে পারেন না নববাবু।বাড়িতে নামি ইংরেজি মাধ্যমে পড়া নাতনির কথাতেও আজকাল বাংলা থাকে না। আরে স্কুলে বাংলা বলে ফেললে মাইনাস করে দেয় না! বাড়িতেও তাই ইংরেজি…..৷বহুজাতিক সংস্থাতে কাজ করা ছেলে-বৌমার মুখেও সবসময় ইংরেজির খই ফুটছে৷এমনকি আবাসনের সভাতেও কার্যবিবরণী লেখা হয় ইংরেজিতে।আরে সবাই তো বাঙালি…৷ গিন্নিই বোধহয় একমাত্র বাংলা চ‍্যানেলে স্বাদ পান!
বাংলার শিক্ষক ছিলেন নবকুমার৷ ক্লাসে মধুসূদন পড়াতে গিয়ে যখন মধুকবির বাংলায় ফিরে আসার অমর পঙক্তি গুলি উচ্চারণ করতেন তখন কীরকম এক আবেগ কাজ করতো সারা দেহে-মনে৷ মনে পড়ত তাঁদের মাস্টারমশাই মেঘনাদ বধ কাব‍্য পড়ানোর আগে গ্ৰন্থে প্রণাম করে শুরু করতেন ….সন্মুখ সমরে…। মাস্টারমশাই কি সমরাঙ্গনে বাংলাভাষার বিপন্নতা কল্পনা করেছিলেন! পাড়ার সরস্বতী পূজায় তারস্বরে হিন্দি গান..পাশের পাড়ার বাংলামাধ্যমের স্কুলটার উঠে যাওয়া… এফ.এমের ছেলেটার বিকৃত বাংলা উচ্চারণ আর জগাখিচুড়ি ভাষার সম্বোধন … এগুলোর মধ্যে মিল খুঁজতে চাইছিলেন এককালের বাংলার মাস্টারমশাই৷ সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে তিন যুগ ধরে বাংলা পড়ানো শিক্ষক৷ ভাবনার তাল কেটে যায় বৌমার আত্মশ্লাঘায়; ভাগ‍্যিস বুদ্ধি করে হিন্দি সেকেন্ড ল‍্যাঙ্গুয়েজ করতে বলেছিলাম৷ থার্ড ল‍্যাঙ্গুয়েজের বাংলা বাবাই ঠিক পার করে দেবেন৷ ছেলের ঘ‍র থেকে তখন ভেসে আসছে গান…. শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে….’

 

লেখক : ড: চন্দন কুমার কুণ্ড, অভেদানন্দ মহাবিদ্যালয় সাঁইথিয়া,বীরভূম

“মোদের গরব মোদের আশা,
আ- মরি বাংলা ভাষা।”
বাংলা ভাষা। বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ,রবীন্দ্র- নজরুলের ভাষা।বাংলা আমার, আপনার ভাষা। ভারতের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষযে ভাষায় কথা বলেন সেই সংখ্যার দ্বিতীয় স্থানে বাংলা ভাষা।যে ভাষার কথা মনে রেখে আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস পালিত হয় সে ভাষা বাংলা।
কর্পোরেট শিক্ষা ব্যবস্থায় ও কর্পোরেট কর্মজীবনের ইঁদুর দৌড়ে বাংলায় বাংলা ভাষা আজ বিপন্ন।উচ্চবিত্তের কথা বাদ দিন,মধ্যবিত্ত,নিম্নমধ্যবিত্ত ও তাঁর সন্তানের জন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের খোঁজে ব্যস্ত।মফঃস্বল থেকে শহর এমন কী বর্ধিষ্ণু গ্ৰামের বাংলা মাধ্যম প্রাথমিক স্কুল বন্ধ অথবা বন্ধের মুখে।মিক্স কালচারে অভ্যস্ত শহর , শহরতলির বাঙালিবাবু বাংলার চেয়ে হিন্দিতে কথা বলতেই বেশি পছন্দ করেন।বাংলার অনেক মা- ই তাঁর শিশু সন্তান কে এখন আর
” অ- এ অজগর আসছে তেড়ে ” পড়ান না,পরিবর্তে” A for Apple”শেখাতেই আনন্দবোধ করেন।
কর্পোরেট কালচার, প্রাইভেট ইংরেজি স্কুলের রমরমা,চোখ ধাঁধানো ঝাঁচকচকে ব্যবস্থা ,আদব কায়দা ভরা মিশনারি স্কুলের লাগাম ছাড়া পারমিশন (যেখানে বোধ হয় বাংলা পড়ানো বাধ্যতামূলক নয়) এহেন ব্যবস্থা একদিকে অন্যদিকে ভেঙেপড়া পরিকাঠামোর বাংলা মাধ্যম সরকারি স্কুল,বাংলায় অন্য ভাষাভাষি বিশেষত হিন্দি ভাষিদের নানা সূত্রে বা‌ংলায় চলে আসা ও বসবাস বাংলা ভাষাকেই সংখ্যালঘু করে তুলেছে।এক সময় অন্যান্য প্রদেশেও বাংলার কবি সাহিত্যিকরা অনায়াসে জীবন যাপন করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।আর আজ বাংলা ভাষা ” নিজভূমে পরবাসী।”প্রায়। কেন্দ্রীয় সরকারের খসড়া শিক্ষানীতিতে ক্লাসিক্যাল ভাষার তালিকায় বাংলা নেই।তাতে বাংলার ছাত্র/ ছাত্রীরা বাংলা না পড়লেও চলবে ; কিন্তু দক্ষিণের একটি ভাষা শিখতে বাধ্য থাকবে।ভারতবর্ষে ‘একদেশ এক ভাষা চালু হলে আগামি দিনে হয়তো কোনপ্রত্যন্ত গ্ৰাম গঞ্জে এ ভাষা মুখ লুকাবে।আজ ও আমরা যদি সচেতন না হই ,গর্জে না উঠি তাহলে একদিন বাঙালিকে ভুলে যেতে হবে, এ ভাষার জন্যই কোন এক ২১ শে ফেব্রুয়ারী সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার প্রাণ দিয়েছিলেন।

 

লেখক : ড: সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক, টি এইচ এল এইচ মহাবিদ্যালয়, বীরভূম

বাংলা আমার মাতৃভাষা।বাংলা সংস্কৃতি আমার রক্তে।বাংলা আমার মাতৃভূমি। সুতরাং বাঙালী সেন্টিমেন্টে স্নাত আমার কান খটখট করে যখন দেখি টিভির পর্দায় বসে কাউকে ৪ টে ইংরাজির সঙ্গে ১০ টা ইনজিরি আওড়ে আপন কৌলিন্যকে তুলে ধরছে। আসলে আমার রাগ বা তার কৌলিন্য বোঝাতে চাওয়া উভয়ের মধ্যে ঔপনিবেশিক সম্পর্কের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এই কথা খাটে অন্যান্য ভাষার ক্ষেত্রেও। থাকে রাজনৈতিক অনুষঙ্গও। নদীপ্রবাহের মত করে ভাষা গ্রহণ বর্জনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে নিরন্তর। তাই আমার মতে বাঙলা ভাষা নিয়ে যখন প্রবল গর্ববোধ করি তখন গোরা চরিত্রের কথাই বেশি করে সামনে আসে। দেখা যাবে গোরার আত্ম উন্মোচনের মত আমরাও সেই তীরে গিয়ে উপনীত হব যেখানে সত্যিই খাটি বাংলা বলে কিছু খুঁজে পাব না, পরে থাকবে শুধু তর্কটা। বিদ্রোহ করার ফাঁকেই দেখব আমার ১০ টা কথার মধ্যে দুটি আরবি, দুটি সংস্কৃত, ফারসি, সাঁওতালি ইত্যাদি শব্দ ঢুকে আছে।
এই কথা বলার অর্থ এটা নয় যে বাঙলার প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনকে সমর্থন করছি। আমার বলার কথা এই যে নিজের ভাষার প্রতি অতি ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে মনের দরজা বন্ধ করা বা অন্য ভাষা, সংস্কৃতিকে ঘৃণা করার মত গোরামীকে সমর্থন করি না। যেমন সমর্থন করি না বাংলার উপরে হিন্দি বা অন্য ভাষা চাপিয়ে দেওয়াকে। প্রত্যেক ভাষারই কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট আছে। সেই বৈশিষ্ট নিয়ে তাকে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়ার পক্ষেই আমার মত।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।