অণু উপন্যাসে জারা সোমা
দোলাচল
প্রথমাংশ
১.
দুলছে , থেকে থেকেই দুলে উঠছে সাঁকোটা।প্রাণপণে চেষ্টা করছে বছর দশেকের মেয়েটা।ছোট্টহাতে আগল দিচ্ছে, চিৎকারে বিদীর্ণ করছে আকাশ…
আকাশটা কেমন অচেনা!গা ছমছম করে উঠল অজানা এক আশঙ্কায়।ঝুপ করে সন্ধ্যা নামতেই
অতর্কিতে জাপটে ধরল পাশের বাড়ির অনিদা।
খুব নোংরা গা ঘিনঘিন স্পর্শ।
বন্ধুদের সাথে ফুচকা খাবার ফাঁকে চোখ আটকে গেল ছেলেটার নরম গালে।অদ্ভুত এক ভালো লাগা
অনুচ্চারিত কিছু শব্দমালা , শপথ!
সকাল থেকে একনাগাড়ে বেজে চলছে সানাই।
ঘর ভর্তি আত্মীয়েরা , হাতে নতুন শাঁখা পলা
বেনারসি , নতুন গয়না ও স্বপ্নে এক অন্য আমি
একটু পরেই দরজায় বর বেশে দাঁড়াবে সে
নরম দাড়ির বৈভব আজ পুর্ণ যুবক। স্বপ্নের রাজপুত্র……
২.
মাম্মাআআআআ করে টলোমলো পায়ে এগিয়ে আসছে তিতলি, সদ্য বোল ফোটা আধোস্বরের ডাকে ঘুরে তাকাল মৌমিতা , ছুটে এসে কোলে তুলে আদরে আদরে ভরিয়ে দিল মেয়েকে।চোখের কোণ থেকে বেরিয়ে এলো আনন্দ ফোঁটা।
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠছে তিতলি
মৌমিতা ও বৈভব সারাক্ষণই আগলে রাখে মেয়েকে। এই কবছরে মৌ আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছিল,ভালো বৌমা , বৌদি ও বৌ হবার হয়তো বা কিছুটা সফলও হয়েছে ,সুখের সংজ্ঞায় পেটের খাঁজে জমা হয়েছে মেদরাশি।
সকাল থেকেই তিতলি কেঁদে কেটে একসা , সে কিছুতেই স্কুল যেতে চায়না। যতবার ওকে জিজ্ঞাসা করা হয় ততবারই কেমন যেন গুটিয়ে যায়।অনেক বকে মেরে বুঝিয়েও কাজ দিচ্ছে না। এরই মধ্যে আবার স্কুল থেকে কমপ্লেন এসেছে, সারাদিন অন্যমনস্ক থাকে তিতলি, পড়ায় মন নেই, থেকে থেকেই বন্ধুদের সাথে মারপিট করে।
এখন থেকেই তিতলির লেগে গেছে লাস্ট বেঞ্চ স্টুডেন্টস এর ট্যাগ। গার্জেন কল করে প্রিন্সিপ্যাল ম্যাম বুঝিয়ে দিয়েছেন, এমন চললে টি.সি দিতে বাধ্য হবেন ওরা। অনেক কাকুতিমিনতি করে মৌ ও বৈভব মুচলেকা দিয়েছে ওরা কথা বলবে তিতলির সাথে।
পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাচ্ছে তাদের চিন্তা ও আশঙ্কা।
ড: আলির সাথে আজ বিকেল পাঁচটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট তিতলির।মৌ ও বৈভবের সাথে গাড়ি করে পৌঁছে গেল ছয় বছরের তিতলি।ডাক্তার বাবু যথা সময়ে ডেকে নিলেন ওদের।কিছুক্ষণ কথা বলার পরে উনি একলা কথা বলতে চাইলেন তিতলির সাথে।
তোমার নাম তিতলি , তিতলি মানে জানো?
এই নাও চকলেট। চকলেট নিয়েও মাথা নিচু করে বসে থাকে তিতলি। ডা: আলি ওকে জিজ্ঞাসা করেন সে কেন যেতে চায়না স্কুলে!তবুও তিতলি চুপ।বেশ খানিকটা পরে, হঠাৎই বলে ওঠে, আমার ভালো লাগে না স্কুল যেতে। ওখানে গেলেই, সমীর কাকু (সুইপার স্কুলের) ওকে টেনে বাথরুমে নিয়ে যায়। তারপর ওর প্যান্ট খুলে……..ওকে ভয় দেখায় মা বাবাকে বললেই, ওদেরকে সমীরকাকু মেরে ফেলবে। তিতলি খুব ভালোবাসে ওর মা বাবাকে। তাই বলতে পারছে না ওর কষ্ট।
এইসব শোনার পরে ডাঃ আলি, আদর করে তিতলিকে বলেন, তোমার বাবা-মা কে ডাকো। আর তুমি একটু বাইরে গিয়ে বসো।
তিতলি কাঁদতে থাকে আর বলে, ডা:আঙ্কল তুমি ওদের বলবে না কিছু। সমীর কাকু ওদের মারবে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান ডা:আলি।মাথায় হাত রেখে বলেন, তিতলি, ভয় নেই আমি আছিতো। তিনি
মৌ ও বৈভবকে ডেকে নেন চেম্বারে। ডা:বাবুর মুখে সব শোনার পরে কঠিন মুখে বসে পড়ে ওরা। কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।হিমস্রোত নামে শিড়দাড়াঁয়, একটা ছয় বছরের বাচ্চা……
ফ্ল্যাশব্যাকে মনে পড়ে, মৌ এর অনিদার কথা। এইভাবেই তো একদিন ওকেও…….
তবে কি কোথাও পাল্টালো না সমাজ দৃষ্টিভঙ্গি!
কি করবে এবার!কি হবে তিতলির……
৩.
আজকে বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা ছুঁড়ে দিল সোফায়, তারপর সোজা বাথরুমে।এমন ব্যবহারে একটু চমকে গেল মৌ। যে মেয়ে স্কুল থেকে ফিরেই কলকল করে কথার ফুলঝুরি ছোটায় আজ একেবারে চুপ! তবে কি ….
নতুন কোনো আশঙ্কা বা অমঙ্গলের কথা ভাবতে থাকে মৌ।
মামমমআআআআআ, বলেই ছুটে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে তিতলি। ভয়ে চোখমুখ পাংশুটে। কি হয়েছে বলতে বলতেই মৌ দেখে তিতলির পা দিয়ে নেমে আসছে রক্তধারা। মুচকি হেসে সমস্ত কথা বুঝিয়ে বলে মৌ। কিছুটা আশ্বস্ত হয় তিতলি।
ফোন ঘোরায় মৌ , বৈভবকে বলে মেয়ের বড়ো হবার কথা। বৈভবও এক্সাইটেড হয়ে বলে,আজকে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরছি, তোমরা রেডি হও।আজতো সেলিব্রেশন বনতা হ্যায়। আজ আমার মা বড়ো হয়ে গেল।
উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে বেশ ভালো নম্বর নিয়ে পাশ করে তিতলি।ওর খুব ইচ্ছে গবেষণার।মৌ ও বৈভব সবসময় ওকে সাপোর্ট করে। তরতাজা ফুলের মতো বেড়ে উঠতে থাকে তিতলি। আজ ওর কলেজের প্রথম দিন।যতই স্মার্টনেস দেখাক না কেন, তবুও কোথাও ভেতর ভেতর ভয় পেতে থাকে তিতলি।প্রথমদিন স্কুল যাবার মতো আজও ওকে ছাড়তে যাবে মা বাবা।
গেট খুলে ভেতরে গিয়ে দেখল ওরই বয়সী ছেলেমেয়েদের ভিড়। সবাই আলাপ করছে। কথা বলছে। তিতলিকেও ডেকে নিল ওরা।তবুও সহজ হতে পারে না তিতলি। মনের মধ্যে আজও গেঁথে আছে পুরোনো স্মৃতি ও সমীরকাকুর বিকৃত মানসিকতা। ভিড় ঠেলে সমানে এগিয়ে যায় ও। হঠাৎ করেই পায়ে তার জড়িয়ে পড়ে যায় মেঝেতে।সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে।জিজ্ঞাসা করে, ও ঠিক আছে কিনা। তবুও মনে মনে লজ্জা পায় সে।
৪.
ঝড়ের গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে কলেজের দিনগুলো, কখন যে থার্ড ইয়ার হয়ে গেল ভেবে কুল পায়না তিতলি।সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বন্ধু তালিকা। আজকাল বাড়ি ফিরতে বেশ লেট হয়। মা যে অসন্তুষ্ট সেটা মুখ দেখেই বোঝা যায়, যদিও মা বলেনা কিছু।
বৈভব সেই সকালে বেরিয়ে যায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত।মাঝে ওই টুকটাক কথা।এরইমধ্যে ইহলোকের মায়া কাটিয়ে চলে গেছে মা বাবা শ্বশুর শাশুড়ি। সুখী সুখী মুখ করে থাকলেও কোথাও যেন বড়ো বেশি একা হয়ে পড়ে মৌ।রোজই একই রোজনামচা। সবার সেবা করো ,ফাইফরমাস খাটো। কাঁহাতক আর এই একঘেয়ে জীবন!বৈভবের চোখেও ধরা পড়ে উদাসীনতা। সিরিয়ালগুলোও একঘেয়ে সেই খেয়োখেয়ির গল্প।অকাজের দুপুর গুলোতে আজকাল বিদ্রোহ করে শরীর।তখন নিজেই নিজেকে………একটা দীর্ঘ নিশ্বাস …..
আজকাল এত কাজের চাপ বেড়েছে তাই মাথা তোলার ফুরসত পায়না বৈভব।মনও চায়না তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে। ফিরলেই বা কি!মৌ তো সেই একঘেয়ে সংসারের কথা নিয়ে প্যানপ্যান করবে। ধুস শালা! বড়ো বেশি একঘেয়ে জীবন। এরচেয়ে অফিসে বেশ ফুরফুরে মেজাজ।বয়সটা বাড়লেও মনটা আজও সেই পঁচিশেই বেঁধে রেখেছে সে।নতুন মেয়েগুলো অফিসে জয়েন করে যখন, স্যার স্যার করে। বেশ লাগে বৈভবের।কেউ কেউ তো একটু বেশিই চায়।অনেকটা সময় ধরে নিজেকে সৎ রেখেছে সে। তবে জানে না, কতদিন পারবে। অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা ওলিপাব। তারপর স্টেক ও চিকেন আলাকেভ এর সাথে দু পাত্র চড়িয়ে ফিরে যাওয়া।রোজ পানের অভ্যাস থাকলেও কখনওই মাতাল হতে দেয়নি নিজেকে। সেদিন বার থেকে বেরিয়ে চোখ আটকে গেল লাল রঙা রাতপরীর দিকে। মোহিনী দৃষ্টিতে অমোঘ সম্মোহন।আলো যেন পিছলে পড়ছে শরীর থেকে। বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে নিরীক্ষণ করছিল বৈভব। তখনই যেন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো লোকটা! মুখে ব্যাঁকা হাসি নিয়ে বলে উঠল, চলিয়ে সাব, সব বন্দোবস্ত হ্যায়।কোই চিন্তা নেহি।তবুও সায় দিলো না মন। কেমন যেন গুলিয়ে উঠল গা।মেয়েটার বয়স তিতলির কাছাকাছি …..
আজ কলেজে একটা মিটিং হল, ঠিক হয়েছে সামনের মাসেই এক্সকার্সনে যাবে থার্ড ইয়ার টিম। এটা শুনেই সবাই খুশিতে পাগল হয়ে নাচতে লাগল। প্ল্যান করতে লাগল। কিন্তু তিতলি কেমন জবুথবু। সবাই জানতে চাইছে, সে খুশি কিনা! মুখে হ্যাঁ বললেও, কেমন যেন ভয় পায় তিতলি। নতুন কিছুকে একসেপ্ট করতে সময় লাগে ওর।সহজ হতে পারে না সহজেই।আজও থেকে থেকেই চমকে ওঠে মাঝরাতে, যখন স্বপ্নে দেখে ওর শরীরে হুল ফোটাচ্ছে সমীরকাকুর নোংরা আঙুলগুলো। চিৎকার করে উঠে পড়ে সে।ওর আওয়াজে ছুটে আসে মা বাবা। জানতে চায়, কি হয়েছে! তবুও সে বলতে পারে না।বড়ো বেশি অপবিত্র মনে হয় শরীরটাকে। কেন,কেন ওর সাথেই এমন হল!কেন? তবুও মেলে না উত্তর……
৫.
সময়মতো সকলেই জড়ো হল শিয়ালদা স্টেশনে। প্ল্যাটফর্ম জুড়ে কলকল করছে ছেলে-মেয়েদের দল। সবাই খুব এক্সাইটেড। প্রিন্সিপ্যাল ম্যাম ও সকল টিচাররাও হাজির।
ঠিক হয়েছে এসি 2 ছেলেদের, এসি 3 কম্পার্টমেন্ট মেয়েদের। তবে অনেকেই বিদ্রোহ করছে এমন ব্যবস্থাপনার।আসলে সময় ও শিক্ষা যত এগোচ্ছে ততই ঘুচে যাচ্ছে ছেলে -মেয়েদের মাঝের ব্যবধান। আজকাল সকলেই খুব সহজে মেশে। মা বাবারাও বেশ উদারমনা।
অবাক হয়ে মৌ দেখে তিতলির বন্ধুদের।মনে পড়ে যায় ফেলে আসা দিনগুলো।সত্তরের দশকে এত সহজ ছিলনা ছেলেমেয়েদের সহজ বন্ধুত্ব।কোনো ছেলের সাথে কথা বলা মানেই খারাপ। সমাজে নানারকম কৌতুহল ছিল।গা বাঁচিয়ে চলতে হত সেই সময়।মৌ এর মনে পড়ে, স্কুল থেকে ফিরতে পাঁচ মিনিট দেরি হলেই কৈফিয়ত দিতে হত মাকে। তার সাথে সন্দেহ ও মার কপালে জোটা তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। খুব কুঁকড়ে থাকত মৌ।সবসময়ই একটা ভয় ওকে পরবর্তীকালে করে তুলেছিল বিদ্রোহী ও প্রতিবাদী।
ট্রেন ছেড়ে দিতেই কেমন যেন মনটা খারাপ হয়ে গেল বৈভবের।এই প্রথম কাছ-ছাড়া হল মেয়েটা। এখন ভালোয় ভালোয় ফিরে আসুক। ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা করে সে।ওদিকে মৌও একদম চুপচাপ। কি যেন ভাবছে সেই থেকে!বৈভব বুঝতে পারে, একই রকম দুঃশ্চিন্তা করছে মৌও।মেয়ের ব্যাপারে খুবই পজেসিভ সে।একটু ঘন হয়ে মৌএর কাঁধে হাত রাখে বৈভব।সাড়াও পায় ওর থেকে।আজ অনেকদিন পরে এমন কাছ থেকে মৌকে দেখে, নতুন করে ভালো লাগার আবেশে ভরে ওঠে বৈভব। কাছে টেনে নেয় মৌও।
ট্রেন ছাড়ার কিছুটা পরেই খাবার দিয়ে যায় কেটারিং-এর লোক।নিজের জন্য নিচের বার্থটাই বেছেছে সে।খাবার পরে হাত ধুতে গিয়ে দেখল,কি যেন একটা নড়াচড়া করছে বাথরুমের দরজার পাশে!এগিয়ে যায় তিতলি।
আগামী শনিবার শেষাংশটি প্রকাশিত হবে।