সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অর্ঘ্য রায় চৌধুরী (পর্ব – ১৩)

মুনকে লেখা চিঠিগুলোর থেকে

(তেরো)

“ত্বামাসারপ্রশমিতবনোপল্লবং সাধু মূদ্ধণা।
বক্ষ্যত্যধ্বশ্রমপরিগতং সানুমানম্রকূটঃ।।”
মেঘদূত
কালিদাস
মুন,
সহ্যাদ্রীর ওই বৃষ্টিপাতের রাতগুলোর কথা যখন মনে পড়ে, তখন মনে হয় আবার ফিরে যাই ওখানে।ওই বন পাহাড়ের সম্মোহনে যে একবার পড়েছে, তার আর নিস্তার নেই।আজ এত মাইল দূরে বসেও আমার সহ্যাদ্রীর কথা মনে পড়ে, নীরার ওপর সেই কাঠের সাঁকো, রাজগড় ফোর্টের সেই অপরূপ দৃশ্য।আর মনে পড়ে বিঠঠলের কথা।বনের একপ্রান্তে সেই ছোট্ট ঝুপড়িতে থাকা বিঠঠল, যে আমাকে বনকে কিভাবে চিনতে হয়, বনের গভীরে কিভাবে চলতে হয় তা হাত ধরে শিখিয়েছিল।
বৃষ্টি একদিন একটু কমলে আমরা দুজন জঙ্গলের পথে বেড়িয়েছিলাম।বিঠঠলের হাতে সেই বল্লম।বলল “নাগদেওতা লা বড়ি ডর আহে।”
কিকউয়ী গ্রাম কে পেছনে রেখে আমরা এগিয়ে চললাম পুরন্দর ফোর্টের পথে।ওই প্রবল দূর্যোগে মাঝেমাঝেই গাছ ভেঙে পড়েছে।বনের মধ্যে মাঝেমাঝে দোলা মতন জায়গা, সেসব জায়গায় জল জমে আছে।কোথাও কোথাও জলে পা ডুবিয়ে আমরা হেঁটে চলেছি, কিন্তু বৃষ্টিভেজা বনের মধ্যেকার সেই সৌন্দর্য বর্ণনাতীতভাবে আজও আমার চোখের সামনে ফুটে ওঠে।এক জায়গায় দেখলাম অসংখ্য সাদা ফুল ফুটে আছে।বিঠঠলকে ওই ফুলের নাম জিজ্ঞেস করাতে ও একবার ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “অহল্যা”।সাদা ফুল, কালো পাথরের ওপর সমস্ত বন আলো করে ফুটে আছে।যেন মনে হচ্ছে আকাশ থেকে খসে পড়া নক্ষত্রপুঞ্জ এই নির্জন বন পাহাড়ের ভেতরে এসে পড়েছে।সমস্ত উপত্যকা শীতল, ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকার, মাঝেমাঝে পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ।
হঠাৎ আবার বৃষ্টি শুরু হল।আমরা দুজন একটা গাছের নীচে দাঁড়ালাম।সমস্ত উপত্যকা জুড়ে প্রবল বিদ্যুৎ চমকের সঙ্গে প্রচন্ড মেঘগর্জনে বৃষ্টি নেমে এল, যেন মনে হল সেই ছায়াছন্ন নির্জন উপত্যকা এই মেঘ গর্জন, এই অঝোর ধারার অপেক্ষাতেই ছিল।প্রবল বেগে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি পড়েই চলল, আর আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম সেই বৃষ্টি ভেজা বনের ভিতর, সেই ছায়াচ্ছন্ন সুনিবিড় সুগন্ধী উপত্যকায়।

চন্দ্রতাড়িত।

মহাকবি কালিদাস বিরচিত প্রারম্ভিক শ্লোকটির অর্থ:-
হে মেঘ, তুমি পথে যেতে যেতে পথশ্রান্ত হলে আম্রকূট পর্বতে বিশ্রাম নেবে।সে তোমাকে সাদরে মস্তকে ধারণ করবে।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!