মেহফিল -এ- কিসসা রীনা তালুকদার

নব্বই দশকের কবি , প্রাবন্ধিক । মহাসচিব- অনুপ্রাস জাতীয় কবি সংগঠন। বিভাগীয় সম্পাদক: অনুপ্রাস সাহিত্য পাতা -দৈনিক নব অভিযান, দৈনিক স্বদেশ বিচিত্রা ও সাপ্তাহিক কালধারা। বার্তা সম্পাদক -দৈনিক হাতিয়া কণ্ঠ। বিশেষ প্রতিনিধি: শিরদাঁড়া। বাংলাদেশ প্রতিনিধি: মননস্রোত (ত্রিপুরা, ভারত)। সভাপতি- বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান কবিতা পরিষদ। সাবেক সভাপতি, বদরুন্নেসা কলেজ ও সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) ছাত্রলীগ। সদস্য, হাসুমনির পাঠশালা। বাবা -মো: আবদুল করিম। মাতা- আনোয়ারা বেগম। পড়াশুনা- এম.এ। জন্ম -২১ আগস্ট, ১৯৭৩, জেলা- লক্ষ্মীপুর, বাংলাদেশ।

বাংলা কবিতার প্রকরণ ও ব্যকরণিক পরিবর্তন :

বিষয়বস্তুতে ব্যাপক পরিবর্তনে মাতৃভাষা হাজার বছরের খনার বচন সমৃদ্ধ লোক ঐতিহ্য ধারণ করে সাংস্কৃতিক চেতনায় বীর বাঙালীর কর্মঠ জীবনের নতুন পরিচয়। বিজ্ঞানের নবতর আবিস্কারকে ধারণ, তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি সাধন, কম্পিউটার, পেনড্রাইভ, ইন্টারনেট, ব্রেইল ফোন, জুটা পকেট প্রিন্টার, সৌরবিমান আবিস্কার, ন্যানো টেকনোলজির জনপ্রিয়তা, মহাবিশ্বের গবেষণায় মঙ্গলে মানুষের বসতি স্থাপনের স্বপ্ন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন, হাইটেক পার্ক স্থাপন, দীর্ঘতম পদ্মা সেতু নির্মাণ, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, খেলাধুলা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নে ব্যবসা বাণিজ্যের বিস্তৃতি, অসাম্প্রদায়িক উগ্রবাদী হামলা ও জনসচেতনতা এবং সরকারী ভাবে প্রতিকার, প্রতিরোধ কবিতার প্রকরণকে বিস্তৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে কবিতায় নতুন শব্দ সৃষ্টি, ক্রিয়াকে প্রাধান্য দিয়ে সমুচ্চয়ী অব্যয়পদ বর্জন করে কবিতাকে সাবর্জনীন রূপ দেয়া, অলংকারিক বিন্যাসে, ছন্দের রিনিঝিনিতে উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও বক্রোক্তি সহ অপরাপর ব্যকরণিক বিষয়ে বিজ্ঞান সমন্বয়ে কবিতার সার্বজনীর রূপ কবিতাকে পৃথক বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। বিজ্ঞানকে ধারণের কতগুলো যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তা হলো বর্তমান বিশ্বের উষ্ণায়ণ, বরফ স্তর হ্রাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূ-কম্পণে ভূ-ত্বকের পরিবর্তন, রাসায়নিকের ব্যবহারে ফসলী জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস, আবাদী জমি হ্রাস, হাইব্রিড পদ্ধতির ব্যবহার,  ক্ষতিকর ওষুধ মানব খাদ্যে ব্যবহার, সমুদ্র জলের স্তর হ্রাস, ধুমপানে নিকোটিন গ্রহণ, বনায়ন হ্রাস, গ্রীণহাউজ ইফেক্ট, বাতাসে দূষিত সীসা, জনসংখ্যা ও আরাম আয়েশ বৃদ্ধি পাওয়া, মানুষের রোগের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া, রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার, যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজীকরণ, গ্লোবালাইজেশন, মানুষের চাওয়া-পাওয়া সমন্বয় সাধন ইত্যাদি কারণেই বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার বিষয়গুলো কবিতায় অনস্বীকার্য। কারণ এগুলো মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা ও জীবন জীবিকার সাথে সম্পৃক্ত।
ত্রিশোত্তর সময়ে কালভেদে বিশ্ব সাহিত্যে রোমান্টিসিজম, রিয়্যালিজম, ইম্প্রেশিনিজম, ফাবিজম, কিউবিজম, ফিউচারিজম, এক্সপ্রেশিনিজম, সুররিয়্যালিজম, কমিউনিজম, এক্সিসটেনশিয়ালিজম-এর মতবাদ কবিতাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ত্রিশে পাঁচতারকার লড়াই রবীন্দ্র ভাবনার বিরুদ্ধে। চল্লিশের দশকে সাম্যবাদী জোয়ার কবিতায়। আর পঞ্চাশে আন্তর্জাতিকতার ঢেউ এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সমরসেনের কবিতায় গণচেতনা। পূর্ব বাংলায় সাহিত্য ক্ষেত্রে একদিকে মানবতাকে দুরে সরিয়ে নজরুলের কবিতার ধর্মীয়করণ করার চেষ্টা; অন্যদিকে মাতৃভাষার দাবী, পঞ্চাশ দশকের পরে কবিতার পরিবর্তন কী ? ষাটের সময়ে কবিতাঙ্গনে হতাশা, গ্লানি, নৈরাজ্য ও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ৬০ এর দশকে অতিযতি ব্যবহার, অতিযতি মুক্তকরণ এবং দুঃখবাদী কবিতা চর্চা করা হয়েছে। সেই সাথে স্বল্প পরিমাণ বিজ্ঞান সমন্বয় হয়েছে। সত্তরের দশকে প্রেম আর বিপ্লব থাকলেও বিপ্লব কবিতায় কতটুকু ছিলো ? একাত্তরের যুদ্ধ ছড়া সাহিত্যে স্বদেশ প্রেম, ৮০ দশকে দুঃখবাদী ও ক্ষুধা বিরোধী কবিতা চর্চা, ৯০ দশকের কবিরা শূন্য দশকে এসে বিজ্ঞান কবিতা নিয়ে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে।  শূন্য দশকে বিজ্ঞান কবিতা চর্চার বিস্তৃতি। চলছে শূন্য এক বা শূন্য দশ দশক। এছাড়া ৭৫ থেকে ধারাবাহিক ভাবে চলমান সময়ে বঙ্গবন্ধু বা মুজিববাদী সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু মুজিব কেন্দ্রিক প্রবন্ধ ও কাব্য সাহিত্য বিজ্ঞান সমন্বয় করে নতুন দিক্ সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞান কবিতা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গন। ফেসবুক, ব্লগার সহ নানা অ্যাপস বর্তমানে বিশ্বব্যপী একটি সামাজিক নেটওয়ার্ক। যা বিশ্বব্যাপী মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সুদৃঢ় করছে, সবাইকে একসূত্রে গেঁথে রাখছে, সবার সাথে দৈনন্দিন বা যখন তখন যোগাযোগ ঘটছে। ফেসবুক সাহিত্য ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখে চলছে। বর্তমানে ফেসবুক, ব্লগার সহ নানা অ্যাপস সাহিত্য সবার কাছেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে। বিশেষ করে কাব্য সাহিত্য বেশ চর্চা হচ্ছে ফেসবুকের মাধ্যমে। মুহূর্তেই লেখা কবিতা বিশ্বব্যপী ছড়িয়ে দেয়া যায়। বর্তমানে বিজ্ঞান কবিতা অলংকারিক বিন্যাসে কোমলতায় বিজ্ঞানের সমন্বয়ে লিঙ্গবৈষম্য, ধর্ম-বর্ণ-জাত-গোত্রকে পরিহার করে সার্বজনীন মানুষ মানবতার কাছে আশ্রয় নিয়েছে। এটিও বিজ্ঞান কবিতার এক বিস্ময় ও আর্শীবাদ। মানুষের আরাম আয়েশে উন্নত জীবন যাপন, সরকারের গণকর্মমুখী পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে প্রাণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। সাহিত্য চর্চায় সকল অসাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গি থেকে কিছুটা উত্তরণ ঘটছে। সরকারী পৃষ্টপোষকতায় সাহিত্য ও সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে ধারণ, লালন, পালন উন্মুক্ত হয়েছে। বিজ্ঞান কবিতা মধ্য দিয়ে রবীন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ দাশের কবিতার সুরের বিচ্ছিন্নতার রূপায়ন ঘটেছে। ভাষা ও সাহিত্যের ধারায় বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞান কবিতা বহুল চর্চা হচ্ছে বিজ্ঞান সমন্বয়ে। বর্তমানে বাংলা ও বিশ্ব সাহিত্যে চলছে বিজ্ঞান কবিতার আন্দোলন। কবিতার গতি প্রকৃতি বদলে দেয়ার লক্ষে উপস্থাপিত বিজ্ঞান কবিতার থিওরী বিশ্বে আলোচিত ও গৃহীত হয়েছে এবং হচ্ছে। যা বাঙালির বিশ্ব জয়ের আরেক দফা উত্তোরণ বলেই মনে করি।

উপসংহার :

বিশ্ব সাহিত্যে কবিতা এক উচ্চমার্গের শিল্প মাধ্যম। খুব কম মানুষ রয়েছেন যারা সৃজনী শক্তিকে কবিতা চর্চায় কাজে লাগান। বিশ্বে বিভিন্ন ভাষা ভাষী জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আঙ্গিক তৈরী করে জাতিসত্তার রূপায়নে কবিতা প্রতিনিধিত্ব করে। বিশ্ব সাহিত্যে কবিতার বিভিন্ন উপকরণ বিভিন্ন বিষয়ে প্রকরণিক নিয়মে পরিবর্তন ও সংযোজন বিয়োজনের মাধ্যমে বিবর্তনের চেষ্টা চলমান রয়েছে। একই ধারায় বাংলা কবিতা চর্যাপদ থেকে বিজ্ঞান কবিতায় উত্তরণ ঘটেছে। বিশ্ব সাহিত্যে বর্তমানে বিজ্ঞান সমন্বয় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন বলে মনে করি। বিশ্বব্যপী প্রথম ও দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধ এবং হিরোশিমা নাগাসাকির ক্ষত, ইসরাইল-ফিলিস্তিন দাঙ্গা, পৃথিবী ব্যপী উগ্রবাদীদের নিজস্ব থিওরীর প্রতিষ্ঠায় শান্তিকামী সাধারণ জনতার জীবনহানি, পাশাপাশি উগ্রবাদীদের দমনে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা, বাংলাদেশে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হামলা সহ বিশ্বব্যপী উগ্রবাদী হামলার প্রতিবাদে প্রচুর কবিতা রচিত হয়েছে, জলবায়ু উষ্ণায়ন, বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে বিজ্ঞান সমন্বয় বিশ্ব ব্যপী বিস্তৃতি লাভ করেছে। আর  কবিতায় এসেছে অনেক পরিবর্তন। কবিতা আরো সমৃদ্ধ হয়ে কাব্য সাহিত্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরবে সমৃদ্ধ স্ব-মহিমায়। বাংলা ভাষার যুদ্ধ তবেই সার্থক।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি :

১। কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – স্টিফেন ডব্লুু হকিং, অনু.- শত্র“জিৎ দাশগুপ্ত-১৯৯৩
২। মহাকাশে কী ঘটছে – আবদুল¬াহ আল-মুতী-১৯৯৭
৩। রবীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞান – সুব্রত বড়–য়া
৪। কেমিষ্ট্রি – মোঃ জোবায়দুর রহমান ও পরিমল চন্দ্র দে
৫। এনভায়রণমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট -মোঃ সোহরাব হোসেন, মৌমিতা চৌধুরী, মোঃ রোকনুজ্জামান
৬। দি ট্রিটমেন্ট গাইড – ডাঃ মিজানুর রহমান কলে¬াল ও ডাঃ আসলাম হোসেন অশ্রু
৭। কোয়ান্টাম মেথড – মহাজাতক
৮। বাংলা কবিতায় অঙ্গ সুষমা – মাহমুদ শামসুল হক
৯। রবীন্দ্র-প্রকৃতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ- মুহম্মদ নূরুল হুদা
১০। ফরিদপুরের লৌক সাহিত্য- শেখ সামসুল হক
১১। চমৎকার সাহস (কাব্যগ্রন্থ) – শেখ সামসুল হক
১২। মনিটরে প্রিয় মুখ – সামসুন্নাহার ফারুক
১৩। বিজ্ঞান কবিতার রূপ রেখা (প্রবন্ধ) – হাসনাইন সাজ্জাদী
১৪। বিজ্ঞান কবিতার ভাবনা (প্রবন্ধ)- রীনা তালুকদার
১৫। বিজ্ঞান কবিতা – রীনা তালুকদার
১৬। প্রেমের বিজ্ঞান কবিতা – রীনা তালুকদার
১৭। সাত মার্চ শব্দের ডিনামাইট – রীনা তালুকদার
১৮। অদূরে বিপ্লব- শিলা চৌধুরী
১৯। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্যে বিচ্ছিন্নতার রূপায়ন – এম আবদুল হালিম
২০। কথা সাহিত্যে রবীন্দ্র রুচি ও অন্যান্য পদ্য – ইজাজ হোসেন
২১। জ্যামিতি পরিচয়-রচনা ও সম্পাদনাঃ শ.ম.গোলাম কবীর
২২। বিজ্ঞান বই, সপ্তম শ্রেণী
২৩। জাগ্রত (সাহিত্যের ছোট কাগজ)- সম্পাদক : রীনা তালুকদার
২৪। দৈনিক পত্রিকা ও অন্যান্য প্রকাশিত পত্রিকা, www.scientiphilia.com, ভিসস চ্যানেলের মাইকেল ভালা পাই ভিডিও, চ্যানেল- ডিসকোভারি, এনিমেল প্লানেট, হিস্টরী অব কালচার, মুক্ত বিশ্বকোষ, বাংলা পিডিয়া, উইকিপিডিয়া, এএফপি, বিবিসি, বিজনেস ইনসাইডার, সায়েন্টিফিক আমেরিকান, একবিংশ শতকের ডারউইন ও ডেইলি সায়েন্স, বিসিএস গাইড, ইন্টারনেট, প্রকাশিত সংকলন।
(প্রবন্ধটি বিশ্ব ভারতীর আন্তর্জাতিক উৎসবে মনোনীত)।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!