• Uncategorized
  • 0

প্রবন্ধে ঋতব্রত গুহ

জন্ম ১৯৮৮ সালের ১৫ ই সেপ্টেম্বর । বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত এবং বর্তমানে ব্যাঙ্গলোরেই বাস । প্রথম সম্পাদনা " নির্জনে বসে " । তারপর একটা লম্বা বিরতি । গত একবছর ধরে আবার লেখালেখি শুরু করেছেন । দেশ পত্রিকা সহ আরও কিছু পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি ।

মেঘবালকের রূপকথা


পর্ব ১

যারা দ্বন্দ্বে বাঁচে চিরকাল !
কাঁচের বন্ধ ঘরে সারাদিন যাপন । অস্পষ্ট মুখ ! অসম্পূর্ণ আবেগ । বাহ্যিক আদর গুলোকে আড়াল করে রেখেছে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন আর বৈভবচেতনা । যন্ত্রণার কথা ভিজিয়ে দেয় মরসুমি বৃষ্টি । তবু ওরা আমায় আর স্পর্শ করে না । ইচ্ছে , জীবিকা আর পরিবার এই আজব ত্রিকোণমিতির মাঝে দোদুল্যমান সদ্য তিরিশে পা দেওয়া যুবক ।কি ভালোই না হত এই তিনটে বিন্দু যদি সমরেখ হত । যত বড় হওয়া যায় তত বেশী দূরত্ব বাড়ে অতীতের সাথে । অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে দর্পণ ।স্মৃতিভার আড়ষ্ট করে মনকে । সেকেন্ড , মিনিট , দিন ও বছরের অভিলেখ ছাড়িয়ে সেই দূরত্ব স্পর্শ করে আলোকবর্ষ । এই স্থানাঙ্কেই কেটে যাচ্ছে সময় । মুক্তিবেগ জোগাড়ের চেষ্টা করছি ঘুমোতে যাওয়ার আগে । ঘুমন্ত লাশের স্বপ্ন কখন যে গড়ে আর কখন যে ভাঙে তা বোঝা একপ্রকার দুঃসাধ্য । সকাল হতেই সাজানো স্বপ্নগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় । পরিধির ভেতর ঢুকে যেতে হয় রাত্রের দামাল কল্পনাগুলোকে । আরেকটা দিন । যন্ত্রঘরে বন্দক রাখতে হয় সময় । জীবনটা আসলে কোন অদৃষ্টের হাতে তৈরি হওয়া নির্ভুল প্রোগ্রামিং । চাইলেই সব কিছু করা হয়ে ওঠে না । সত্যি কি তাই ! ব্যতিক্রম কি কিছু নেই ! না কি সবাই সেই সাহস অর্জন করতে পারে না । এই অনুবর্তনের অংশভোগী তো আমরাই । স্ক্রিন ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে খুন হয়ে যাওয়া আমারই ছায়াজাত চরিত্র । আগুণ চোখে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে ।নিস্পলক ও নিরাকার । এই বেচারার না আছে মৃত্যু না আছে জীবন । আমি ওকে সান্ত্বনা দিই এই বলে “ এমনটাই তো হতে চেয়েছিলাম ! “


পর্ব ২

নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অসত্য বলা যায় না । প্রতিবিম্ব
ঠিক ভুলের পার্থক্য করে নিতে জানে । আবরণ সরিয়ে বেরিয়ে আসে বাস্তব । তবে সত্যি কি এমনটাই চেয়েছিলাম ! হ্যাঁ বা না এ সব কিছুর উত্তর দেওয়া যায় না । জ্যামিতিক গোলযোগে আমাদের মন ছিন্ন ভিন্ন হয়ে ছিটকে পড়ে আছে এই গোলার্ধের এদিকে ওদিকে । সব টুকরো কে এক জায়গায় করে নিয়ত রূপ দেওয়া কি আর সহজ কাজ ! নিজেকে ভেঙে চুরে নূতন ভাস্কর্য তৈরি করতে যে সুবিশাল হৃদয়ক্ষরিত বেদনা সহ্য করতে হয় সেই অনির্বচনীয় ক্ষমতার অধিকারিই বা ক জন হয় ! মন সহজাত ভাবে চঞ্চল । স্থিতি তার ধর্ম নয় । এক অধ্যায়ে বেশী সময় কাটানো সহ্য হয় না মনের । গুড়োবাতাস অস্পষ্ট করেছে দৃষ্টিপথ । নিজের শহর ডাকছে হু হু করে । তবে নিজের শহরের থেকে আগের মত প্রশ্রয় আর পাই না । মুখোশটা চামড়ার সাথে এমন ভাবে আটকে গেছে আজকাল ভ্রম হয় কোনটা মুখ আর কোনটা মুখোশ । ভালো থাকার সমার্থক শব্দ গুলো আসলে পাল্টে যায় সময়ের সাথে । ক্রমশ অনুভব করছি মনের বাইরে আর কিছু নেই । মন কখনও অলৌকিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র আবার কখনও অস্তিত্বের দুর্বলতম স্থান । সেই মন নামক অদৃশ্য বাহনে সওয়ার হয়ে আমি ছুটে বেরিয়েছি এক শহর থেকে অন্য শহরে ।এক মানুষ থেকে অন্য মানুষে । এক পোশাক থেকে অন্য পোশাকে । এক প্রেম থেকে অন্য প্রেমে । কেমন আছ মেঘবালিকা !

পর্ব ৩
জমতে জমতে পাললিকের ভাজে হারিয়ে যায় অভিমানগুলো । ভুলে থাকাটাও তো একটা অভ্যেস । সমুদ্রস্রোতে মিশে যায় শেষ সময়ের অধঃক্ষেপ গুলোও । চাইলে সম্পর্ক সহজ নদীর মত । আবার চাইলে সম্পর্ক রুক্ষতম পাহাড়ের ঢাল । তবে ভুলে থাকাটা কোন জটিলতম রোগের সাময়িক প্রতিস্থাপন মাত্র । নিজের সাথে মুখোমুখি হলেই সেই আবৃত স্মৃতিদাগ বেরিয়ে আসে । নরম ভাবে মিশে যায় শরীরে । আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয় মনের দুধার । এক ছাদ , এক সংসার , এক উঠোন পরিবৃত করে থাকত যে বাগান সেখানে এখন পলাশ পোড়া গন্ধ । আঙুলগুলো এখনও ছুঁয়ে আছে সাংসারিক চিতাভষ্ম । মেরুদূরত্ব তুচ্ছ মনের দূরত্বের কাছে । মাঝরাত্রের বিভাজিকা বেয়ে নেমে আসে গভীর রাতের কক্ষচ্যুত কথাদের স্রোত । মানুষের মৃত্যু আছে । কথাদের নেই । প্রিয়তম অনুভূতি গুলো তীব্র গতিতে ছুটতে থাকে চতুষ্কোণের ভেতর । স্মৃতির প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে বারবার ফিরে আসে আমার কাছে ।প্রতিফলনের নির্দিষ্ট সূত্র আছে । আমরা সবাই সেই সূত্রের কাছে বন্দক রেখেছি নিজেদেরকে । তীব্র গতিশক্তিতে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে । মেঘবালিকা ক্রমশ জীবন্ত হতে থাকে । পর্দা অতিক্রম করে সম্পূর্ণ মনটাই দখল করে নেয় সে । কিউবিজমের আর্টের মত প্রেমটাও তো বিশেষ অনুভূতি গুলোর থ্রি ডায়েমনশনাল ইকুইভ্যালেনট । সেই বিশেষ মেঘবালিকারা কি অত সহজে হারিয়ে যায় কৃষ্ণগহ্বরের ভেতর !


পর্ব ৪

শুধু কি মেঘবালিকারাই হারিয়ে যায় ! এই যে এক বুক জলে ডুবে যাচ্ছে পরিবারের অলিন্দ নিলয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সম্পর্কগুলো । যেন আমাদের একেকজন কে ঘিরে একটি করে নির্দিষ্ট চক্রব্যূহ রয়েছে । শৈশবের পরিচিত চেহারা গুলো বয়স বাড়ার সাথে সাথে ক্রমশ ঝাপসা হয়ে গেল । কাষ্ঠদহনের তাপে পুড়ে গেল অজস্র সর্বনাম । শুকনো গাছের তলায় বসে একা একাই করছি কালযাপন ।শব্দকোষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে একেকটা অক্ষর । যৌথ থেকে নিউক্লিয়াস ।তারপর একসময় সেই নিউক্লিয়াসের আকর্ষণ টাও ফুরিয়ে আসে । ইলেকট্রন গুলো বেরিয়ে যায় কক্ষপথ থেকে । তারা ছড়িয়ে পড়ছে দেশ বিদেশের বিভিন্ন শহরে ।জীবনের কারণে । জীবিকার কারণে । সমাজ একে ডায়াস্পোরা নামেই জানে ।ক্রমবিভাজিত হতে হতে একসময় ছিঁড়ে যায় বন্ধনগ্রন্থি গুলো ।কোন অখ্যাত শহরের ছোট ফ্ল্যাটবাড়িতে শেষ নিশ্বাস ফেলে একটা প্রজন্ম । খরস্রোতা এভাবেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় টুকরো কাঁচচূর্ণ গুলো । উইক এন্ডে বসে আমি হিসেব কষে মিলিয়ে নিই ভাজ্য ভাজকের টানাপোড়েনে প্রায় ফুরিয়ে যাওয়া অবশেষগুলোকে ।


পর্ব-৫

পাথর ক্ষয়ে ক্ষয়ে বেরিয়ে আসে একেকটি মহা নির্বাণের গল্প । শতাব্দী প্রাচীন প্রস্তর খণ্ড লিপিবদ্ধ করতে থাকে আধুনিক জীবনের শিলালিপি । এগুলোও পুরনো হবে একদিন । দিন ছোট হয়ে আসছে । হেমন্ত মিশে গিয়েছে শীতে । কর্মযোগীদের ক্লান্ত হতে নেই । শিরা প্রশিরায় যে দ্বন্দ্ব চলছে সে খবর রাখে কে ! সব কিছুই এখন মাপা হয় পারফরম্যান্সের প্যারামিটারে । বর্ষার সময় যে খরস্রোতা এসে সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সে ও এখন শান্ত । অশান্তি চিরস্থায়ী নয় । শান্তিও নয় । এ এক অসীম পর্যাবৃত্ত । মুহূর্তের বাস্তুখোপে মন খারাপ গুলোকে লুকিয়ে রাখি । এ মেট্রো শহরের জন সমুদ্রে আমিও তো এক ক্লান্ত পদাতিক । সবটুকু আয়ু খরচ করে বের করে আনি সাফল্য । সাই সাই করে বাড়তে থাকে অ্যাপ্রাইসাল স্কোর । দিনান্তে আমরা সবাই যেন একটা প্রোডাক্ট । প্রবল ঘূর্ণির মধ্যে সাজিয়ে রাখি প্রেমিকার আদর । লুকিয়ে রাখি অসময়ের বলিরেখা । জিভের তলায় রেখে দিই মনভোলানো অ্যানটাসিড । মাস ফুরলে সেই ছোট ছোট ক্ষয় গুলো রূপ নেয় একটা বড় সংখ্যায় । শেষ তারিখে মোবাইলে একটা বিপ শব্দ প্রশমিত করে দেয় সারা মাসের এই অনিয়ত অশান্তি গুলোকে । অথচ এই সংখ্যায় পৌছতে গিয়ে অ্যালজাইমারসে আক্রান্ত মাকে দেখতে যাইনি প্রায় ছ মাস হল । মেঘবালিকাকে চিঠি লিখিনি একবারও । এককালে যেগুলো ছিল নিতান্ত অবহেলা যোগ্য ফাটল , সে গুলো দিয়ে বেরিয়ে আসছে ফুটন্ত লাভাস্রোত ।
পেরিয়ে গিয়েছি হাইবারনেশনের শেষতম পর্যায় ।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!