“পাঠগ্রহণের দিনগুলি” সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অমিতাভ দাস (পর্ব – ৪)

পাঠ গ্রহণের দিনগুলি 

পর্ব – ৪

১৯৯৮  সালে কলকাতায় বাংলা আকাদেমিতে দু’দিন ব্যাপী’ ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট মিট’ হয় । সেখানে সর্ব কনিষ্ঠ কবি হিসাবে আমন্ত্রিত ছিলাম আমি আর সৌরভ চট্টোপাধ্যায় । তখন আমাদের বয়স কুড়ি-একুশ । আলাপ হয়েছিল ওড়িয়া ভাষার বিশিষ্ট কবি জয়ন্ত মহাপাত্রের সঙ্গে । তিনি অবিশ্যি ইংরেজিতেও কবিতা লিখতেন ।তাঁর সদ্য প্রকাশিত বই ‘রিলেশনসিপ’ আমি আর সৌরভ কিনেছিলাম ।তার কিছু কবিতা অনুবাদ  করেছিলাম তখন । ছাপাও হয়েছে কয়েকটা । বছর কয়েক আগে দেখলাম ‘সম্পর্ক’ নামে বইটার বাংলা অনুবাদ বেরিয়েছে সাহিত্য আকাদেমি থেকে । দেখে কী যে ভালো লেগেছে । অনুবাদও চমৎকার — ঝরঝরে । সেইটেও আছে আমার সংগ্রহে ।
সেই অনুবাদের শুরু । তারপর কিছু গুজরাতি কবিতা ও রাজস্থানী কবিতা ( মূলত কিশোর কল্পনাকান্তের । তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার প্রাপক )  অনুবাদ করি । তুমুল আগ্রহে তখন শিখছি নানা শব্দের মানে ।এরপর  দক্ষিন আফ্রিকার মহিলা কবিদের কিছু কবিতার বাংলা তর্জমা । বইটার নাম african womens poetry ।জিনি কাউজেন ,জয়েস মনসুর ,এন্ড্রি চিডিড , জিন্ডজি ম্যান্ডেলা( ইনি নেলসান ম্যান্ডেলা এর ছোট মেয়ে )  প্রমুখ । গুজরাতি ভাষার পান্না নায়েক , হরিন্দ্র দেব , নিরঞ্জন ভগৎ , সীতাংশু যোগেশচন্দ্র , বিপিন পারেখ , লাভশংকর থ্যাকার প্রমুখের কবিতার ভাষান্তর করেছিলাম ।  বড়ো আনন্দ পেয়েছিলাম গুজরাতি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি জিনাবাই দেশাই স্নেহারাস্বামীর একগুচ্ছ হাইকু অনুবাদ ক’রে । তার কয়েকটি নিচে দিলাম :
“শুকনো ডালে
একটি টিয়া:সবুজ
পাতা চতুর্দিকে ।”
“একতারার সুর
আসছে ঢেউ থেকে:
শব্দেরা বিলীন ।”
“আকাশে গান:
পাখির ডানা থেকে
ভেঙে পড়ে ভোর ।”
” গোপন সংলাপ
দু’টি ফুলের : অন্ধকার
যেন মখমল ।”
—এগুলি প্রথমে তপন অঞ্জয় সম্পাদিত  ‘মাটির কাছাকাছি’ , পরে দীপক রায় সম্পাদিত  ‘অনুমাত্রিকে’ ছাপা হয় । আরো পরে দীপক রায় ও দীপকরঞ্জন সম্পাদিত ” দেশ-বিদেশের ছোট কবিতা ” গ্রন্থে সংকলিত হয় । এই কবিতাগুলি নিয়ে প্রশংসা সূচক উক্তি করেছিলেন শ্রদ্ধেয় কবি কালীকৃষ্ণ গুহ একটি পত্রিকায় আলোচনা কালে ।
সাহিত্য আকাদেমির পুরস্কার প্রাপ্ত  একটি বই ,বাংলায় অনুবাদ–‘আমাদের গাছপালা দেহরাতে এখনো জন্মায় ।’ লেখক রাসকিন বন্ড । এই বইটি  আমার মনোজগতে প্রবল প্রভাব বিস্তার করে । তাঁর মতো  প্রকৃতিচেতনা বিভূতিভূষণ ছাড়া কারো লেখায় পাইনি । ছোটদের জন্য অসামান্য সব লেখা আছে তাঁর । যা ভারতীয় ইংরেজি শিশু-কিশোর  সাহিত্যের সম্পদ । অকৃতদার বন্ডের থেকে শিখেছি অকৃত্রিম প্রকৃতিপাঠ আর বৃক্ষপ্রেম । তিনি আজো আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছেন । গল্প যে কতো সহজ করে বলা যায় তা তিনিই শিখিয়েছেন আমায় । তাঁর গল্প পড়ে শিখেছি কোথায় শেষ করব , কীভাবে শেষ করব — এসব ভেবে লাভ নেই । গল্প-ই তার চাহিদা মতো এক সময়ে শেষ হবে বা পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে ।
খুঁজতে শুরু করে দিই বন্ডের অন্যান্য রচনা । কিছু কিছু পেয়েও যাই । যেমন ,রাস্টির এডভেঞ্চার ,কিছু গাছের কথা ,দ্যা নাইট ট্রেন এট দেহলি । আরো কিছু বইয়ের নাম মনে পড়ছে না এ মুহুর্তে । ইংরাজি কম জানি ,তেমন ভালো বুঝিও না ।বলা ভালো চরম অশিক্ষিত এই ইংরেজি ভাষায়। তথাপি সাহস করে তাঁর কিছু গল্প-কবিতা অনুবাদ করলাম ।একটি গল্প ,আমার খুব প্রিয় The coral tree(লালফুলের গাছ) ছাপা হলো কবিতীর্থ পত্রিকায় । পরে আনন্দবাজার পত্রিকায় কবিতীর্থের ওই সংখ্যাটির সমালোচনায় আমার অনুদিত ‘লালফুলের গাছে’র কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছিলেন আলোচক।সেও এক প্রাপ্তি । আরো একটি গল্প অনুবাদ করেছিলাম । কোথাও ছাপা হয়নি । এখন জানি না কোথায় আছে লেখাটি , হয়ত হারিয়ে গিয়েছে । তাঁর বেশ কিছু কবিতা অনুবাদ করে কিছু পত্রিকায় দিয়েছিলাম। ‘গাছের আশীর্বাদ ‘ কবি অর্ধেন্দু চক্রবর্তীর খুব ভালো লেগেছিল । তিনি যত্ন করে ছেপেছিলেন ” বঙ্গ-বসুন্ধরা ” পত্রিকার । তখন তাঁর সঙ্গে ল্যান্ডফোনে কথা হ’ত। বড় স্নেহ করতেন । মনে পড়ছে অসুস্থ অবস্থায় ২০০৩ সালের মে সংখ্যায় ইন্টারভ্যু দিয়েছিলেন অবগুণ্ঠনে । মূল্যবান সেই কথামালাটি ।

বন্ডের একটি কবিতা ,আমার অনুবাদ–
গাছের আশীর্বাদ
ঠাকুরমা প্রায় ই বলতেন:
‘আশীর্বাদ ধন্য সেই বাড়ির দেওয়াল
যা পুরনো গাছের নরম ছায়ায় আবৃত ।’
তাই ,গত বসন্তে আমি একটি চারাগাছ পুঁতেছি ।
সে এখন ছয়মাসের ,
এবং দ্রুত বাড়ছে
ছ’বছর পর সে আমাদের
আশীর্বাদ করবে ।
রাসকিন বন্ডের জন্ম 1934 সালে ।অতি জনপ্রিয় কবি ,গল্পকার ও ঔপন্যাসিক ।The room on the roof প্রথম উপন্যাস ।এই ব ইটির জন্য পেয়েছেন লেওয়েনিল পুরস্কার 1957 সালে ।92 সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান ।সেই ব ইটির নাম’Our tree still grow in Dehera’ .এটা গল্পগন্থ ,তবে আত্মজীবনী মূলক । জাতে ইংরেজ ।পূর্বপুরুষরা চলে গেলেও ভারতকে ভালোবেসে কাটিয়ে দিলেন সারাটা জীবন ।

(চলবে)

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!