সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ২৬)

ইচ্ছামণি

পর্ব ২৬

প্রায় টলতে টলতে রুমা গলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় এল। নাঃ! এদের সাথে আর নয়। রুমার অনেক সম্মান প্রাপ্য। বেঙ্গল ট্যালেন্টের সমীরণ যেভাবে ওর ওপর নির্ভর করছে, তাতে ওদের সাথে দীর্ঘ মেয়াদী সম্পর্ক স্থাপন করাটা শুভ হবে বলে মনে হয়। ওর সেবা সদনের ওপর রিপোর্টটা তো প্রায় মাসখানেক আগে দিয়েছিল। ছেলেটা দিন দশেক আগে বলল, “লেখাটা এক্ষুণি কম্পোজ করতে পাঠিয়ে দিচ্ছি; এটার জন্যই কাগজটা আটকে ছিল।” তাছাড়াও অনুষ্ঠান পত্রিকা ইত্যাদি ব্যাপারেও নানা আলোচনার জন্য অফিসে ডাকল।
নিশ্চই ওদের ট্যাবলয়েডের কাজ শেষ। এই অসম্মান নিয়ে বাড়ি ফেরা মানে সারাটা পথ, সারাটা দিন শুধু এই নিয়ে গুমরে মরা। ভালো যা কিছু তার ভাগ নিয়েও বাড়ি যাবে। নিজেকে এক বোতল ঠাণ্ডা পানীয় দিয়ে শান্ত করল। সমীরণ ওদের নতুন একখানা পত্রিকার জন্য যে সম্পাদকীয় চেয়েছিল সেটা সঙ্গে এনেছে। এখন গেলে অনুষ্ঠানসূচি নিয়ে আলোচনা করা যাবে। যেই সঞ্চালনা করুক, একটা নির্দেশিকা তো দরকার। যদিও শ্যুটিং থেকে এত তাড়াতাড়ি, আর এভাবে ছাড়া পাবে ভাবেনি। ভাগ্যিস ওগুলো  সঙ্গে এনেছে। যতীন দাস পার্ক মেট্রোর দিকে অটো ধরল।
অটো থেকে নামতে নামতে ফোন বেজে উঠল। ধরার আগেই কেটে গেল। বেঙ্গল ট্যালেন্টের অফিসে ঢুকে বসতে না বসতেই আবার রিং শুরু হল। রাজু। এর আগেরটাও ওর ছিল। খানিকটা বিরক্তি আর অপমানের ভয় নিয়ে ফোনটা ধরল। “রুমাদি, আপনি সমীকদাকে ফোন করেছিলেন? উনি আমাদের কথা শোনাচ্ছেন। আমাদের যে খিস্তিগুলো করছে, আমি সেগুলো আপনাকে শোনাই?”
“কুকুর তো ঘেউ ঘেউ করবেই। তোমার বাজে কথা শোনার সময় নেই। আমি এখন বিজ়ি। আর কোওদিন কাজই করব না তোমাদের সঙ্গে”। কট্‌। এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে খেয়াল করল সমীরণ ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। “দিদি, জল খাবেন?” রাজুকে কথা শুনিয়ে রুমার গায়ের জ্বালা কি একটু মিটল? কোল্‌ড ড্রিংক্‌সে ততটা জুড়োয়নি।
“জল আমার সঙ্গেই থাকে। যতসব ইতরের দল। আপদ! কী বলতে ডেকেছিলে?”
“আগে একটু শান্ত হন। কাজের কথা তো আছেই।“
“দেখো, আমি ঠিক আছি। আমার চারখানা প্রতিবেদন আর দুখানা প্রবন্ধ তোমায় দিয়েছি, একটারও হদিশ নেই। এই সেদিন বললে আমার মহাবীরের লেখাটা কম্পোজে পাঠিয়েছ, এখন উচ্চবাচ্য নেই। আবার একটা ফাংশনের প্রজেক্ট তৈরি করতে বলছ। আগের লেখাগুলোর সদ্‌গতি না দেখে নতুন কিছু দিতে পারব না। সেটাও যে কাজে লাগাবে, তার গ্যারেন্টি কী?”
“এই প্রোগ্রামের ওপর অনেক কিছু ডিপেন্ড করছে। সেদিন আমরা পুরস্কৃত কবিদের পাশাপাশি যাঁরা কুড়ির মধ্যে র‍্যাঙ্ক করেছে, তাদেরও সম্বর্ধনা দেব। এখন এক জনের বাড়ি যাব, তিনি এক সময় ফিল্ম করেছেন। আবারও করতে পারেন। আপনি গিয়ে কথা বললে ভালো হয়।”
“আমি তো মাথামুণ্ড কিছুই বুঝছি না। আমি কী বলব? আমার লেখাগুলো ছাপানোর সাথে এর কী সম্পর্ক? তোমরা তো রজত গ্রুপের কাছে স্পনসরশিপ পেয়েই গেছ।”
“স্পনসরশীপ কলাভবনে যে অনুষ্ঠান হচ্ছে, তার জন্য। ঐদিন আপনাদের কবিতার সংকলনটাও প্রকাশ করব। শতাব্দী রায়কে চিফ গেস্ট করার কথা চলছে। আপনিও দিদি একটু বিজ্ঞাপণ-টন দেখুন।”
“তাহলে, আমাকে দিয়ে মহাবীর সেবাসদনের ইতিহাস-ভূগোল, আরো হাবিজাবি একগাদা রিপোর্ট লেখালে কেন? শুনেছি শ্যামলদাদের কাগজে ঐদিনের ইভেন্টাটা অনেকদিন আগেই বেরিয়ে গেছে। আমাকে সেদিনও বললে মহাবীরের লেখাটা তক্ষুণি কম্পোজ করতে দিচ্ছ। এখন আবার কী হল? তোমাদের কথামতো আমি কলাভবনের অনুষ্ঠানের জন্য প্রোগ্রাম স্ক্রীপ্‌ট লিখছি। সেই সাথে যে পত্রিকা প্রকাশ করবে, তার জন্য একটা সম্পাদকীয়। সেগুলো নিয়ে বসতেই আজ এখানে আসা। আমার হাজব্যান্ড আজ বাড়ি আছে বলেই নিশ্চিন্তে এখানে বসে আছি। মেয়ে ওর বাবার কাছে ভালো থাকে।”
“আসলে দিদি, মানে.. আমরা সঞ্জিতদার কাছ থেকে নির্দেশে অপেক্ষায় আছি। তিনি যেদিন বলবেন সেদিন ছেপে দেব। ওগুলো কম্পোজ করতে বেশিক্ষণ লাগবে না।”
“তাই বল! তোমরা সঞ্জিত লাহার অঙ্গুলিহেলন ছাড়া এক পাও চলবে না। তাই চল, আমায় বারবার সোদপুর থেকে সংসার ছেড়ে আসতে বল কেন? আমি তো ডিসিশন মেকিং-এর জায়গায় নেই। লেখিকা হিসাবেও সেই জায়গায় পৌঁছয়নি যে নিজের ইচ্ছামতো লেখা দেব বা দেব না। এভাবে বার বার হ্যারাসমেন্ট ঠিক না। আমার কবিতা নিয়ে ফেলে রাখলে খারাপ লাগে ঠিকই, কিন্তু গদ্য অনেক পরিশ্রম করে লিখতে হয়। সেগুলো নিয়ে লুকোচুরি ভালো লাগে? তোমাদের কাজে না লাগলে আমায় ফেরৎ দাও। আমি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ট্রাস্টিবোর্ডে আছি। এই রকম খবরে তারা ইনস্পায়ার্ড হবে। তাদের মুখপত্র-র একটার বেশি সংখ্যা বেরোয়নি। এই লেখাটা ফেরৎ পেলে আমার কাজে লাগবে, তাড়াহুড়োয় আমি নিজের কপি রাখতে ভুলে গেছি।“
“আপনি কপি রেখে দেননি?”
“স্বাধারণত দিই, কিন্তু এই রিপোর্টটা একবারই ফেয়ার করেছি। একেবারে রাফ্‌ওয়ার্কটা রয়েছে। আমায় আবার থেকে লিখতে হবে। তার মানে কী বলছ, লেখাটা আমি অন্য জায়গায় দিয়ে দেব তো?”
“আমি কোথায় বললাম দিদি? আপনিই তো তখন থেকে রাগ করে যাচ্ছেন। অনুষ্ঠানটা ভালোয় ভালোয় পেরোক, তখন আর কোনও কিছু আটকাবে না। নিন নিজের লেখার প্রতিটি পাতায় সই করে দিন।”
যেন রেজিস্ট্রীর কোর্টপেপারে সই হচ্ছে। প্রতিটি পাতার পাশের দিকের মার্জিনে আবার সই করল রুমা। “এটা পরের ইশ্যুতে যাচ্ছেই”, বলল সমীরণ।
“আর পরের ইশ্যু। আজ এখানে একটা কাজে এসেছিলাম। তাড়াতাড়ি হয়ে গেল, তাই আসতে পারলাম। তোমার দাদার শনিবার ছুটি থাকে, যদিও প্রায় শনিবার অফিস যেতে হয়। আমার মেয়ের আবার বৃহস্পতিবার স্কুল ছুটি, শনিবার পুরো স্কুল। আজ ওর বাবা বাড়ি আছে বলে মেয়েকে কে বড় রাস্তা থেকে নিয়ে আসবে, পরিস্কার করাবে, খাওয়াবে। তাই এসবের চিন্তা আমার মাথায় নেই। না হলে এতক্ষণ বসে থাকতে পারতাম নাকি?”
“তাহলে দিদি অনিমেষদাকে পিক আপ করে নিয়ে এক জায়গায় ঘুরে আসি। আমাদের সঙ্গে চলুন। একটা ডকুমেন্টারি বানাবেন অনিমেষদা। আপনাকে স্ক্রিপ্ট লেখার কাজটা দেবেন। পারবেন তো?”
“পারব না, তা নয়। তবে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরব। বেশি দেরি হবে না তো?”
“না না। চলুন এক্ষুণি বেরিয়ে পড়ি।”
মাথার ভেতরকার প্রদাহ একটু শমিত হল। ফিল্ম পরিচালক তথা বেঙ্গল ট্যালেন্টের পৃষ্ঠপোষকের বাড়ি খুব দূরে নয়। এই গরমে চা না যেচে ভদ্রলোক একটু ঠান্ডা পানীয় দিতে চাইলে ভালো হত।

ক্রমশ….

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।