সকালের মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর পর খবর কাগজ সহকারে চা খেতে খেতে দুজনের মধ্যে নানা সাংসারিক থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনা হয়। অতীনদের এল.আই.সি এজেন্ট গুবলু যাওয়ার পরপরই এসে হাজির। তিনটে পলিসি করানো হয়েছে মাত্র এক বছরের মধ্যে। তারপরেও আরও চাই। রুমা চা বিস্কুট দিয়েছে। কী ভাবে তাড়া দেওয়া যায় ভাবছে। তাকেও তো বেরোতে হবে। সময়াভাবের কথা বলা সত্ত্বেও সে ব্যাটা নড়ার নাম করছে না। অতীনের সঙ্গে এটা ওটা নিয়ে ক্রমাগত আলোচনা করে যাচ্ছে। সে সবজান্তা, সব বিষয়েই শেষ কথাটা বলবে। রুমার মন্তব্য যেন ধর্তব্যের মধ্যেই নয় এমন ভাবে অতীনের সাথে আলোচনা করে যাচ্ছে। অথচ খাল কেটে কুমিরটাকে রুমাই বাড়ি এনেছে; কারণ অতীনের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রবল অনীহা ছিল, বা আজও কিছুটা হলেও আছে।
পরোপকার করার জন্য এবং জীবনবীমা করিয়ে বিনিয়োগ হিসাবে তেমন আর্থিক লাভ নেই দেখেই বোধহয় অতীন তিন-তিনটে পলিসি করিয়ে বসেছে এই সুজয় চৌধুরীর কাছে। সেই তিনটে করার পর আবিষ্কার করেছে এবার একটু আর্থিক লাভজনক আর একটি পলিসি করা দরকার। সুজয় প্রায় কুপোকাৎ করে এনেছে অতীনকে। অতীন অফিস যাওয়ার তাড়া থাকলে রুমার সাথেও বাক্যালাপ করতে বিরক্ত হয়। অথচ নিজের স্বার্থে ধর্ণা দিয়ে বসে থাকা সুজয়ের সঙ্গে এমন ভাবে গল্প করছে যেন অফিস না গেলেও হয়। শেষে রুমা সন্ধ্যেবেলায় আসতে বলে এক প্রকার জোর করে অতীনকে স্নানে পাঠানোর যোগাড় করল। অগত্যা সুজয় সন্ধ্যেবেলায় অবশ্যই আসবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রস্থান করল।
ছেলেটা গ্রীলের গেট খুলে বেরোতে না বেরোতে আতীন “ঝট্পট্ ভাত বেড়ে দাও, একখুনি বেরোব” বলে দড়াম করে স্নানঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। একখুনিই বেরোনোর যা নমুনা ঘণ্টাখানেক ধরে রাখল, তা উল্লেখ করতে গেলে খচে যাবে। তাও অতীন বাথরুম থেকে বেরোনোর পর মিনমিন করে বলল রুমা, “তাড়া আছে তো সুজয়ের সঙ্গে এতক্ষণ আড্ডা দিলে কেন?”
“তুমি তোমার কাজ করলেই পারতে। মুখের কাছে বসে থাকার দরকার কী ছিল?”
“আমি বসে না থাকলে ও আবার একটা রাবিশ পলিসি গছিয়ে দিয়ে যেত। ওঃ! এত করে হিন্ট দিচ্ছি তাও নড়ার নাম নেই। আমাকেও তো গুবলু ফেরার আগে সব কাজ সেরে বেরোতে হবে আজ।”
“আমাকে কী ভাবো বল তো? গাধা? যে যা বলবে মেনে নেব? তুমি না থাকলে সব দানছত্র করে দেব? নিজে কোথায় নাচতে যাবে যাও। অন্যের দোষ দেখছ কেন?”
“আমি একা যাব না। অডিশনটা মেইনলি গুবলুরই।”
“নিজের হুইমসে বাচ্চা মেয়েটার শৈশব নষ্ট করছ।”
“শৈশব নষ্ট করছি না ভবিষ্যৎ গড়ছি তা সময় বলে দেবে। আমার হয়ে এসেছে। আজ ফ্রেঞ্চটোস্ট নিয়ে যাবে? পরোটা তরকারি করার সময়টা সুজয় খেয়ে নিল।”
“এত বাজে কথা বল না। আমার খাওয়া নিয়ে কোনও বায়নাক্কা আছে? শুধু টাইমলি চাই। আজ টিফিন দিতে হবে না। খাবার কিনিয়ে আনাব।”
যাক, তাড়াহুড়োর মধ্যে কোনও মতে ঠিক সময় সীমা বজায় রাখা গেল। টিফিন কৌটোখানা অতীনের ব্যাগে ঢুকিয়েও দিল। না দিলে হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলে যাবে।
আজ বেরোনো আছে। অতীনের ভ্রূ-ভঙ্গীকে উপেক্ষা করে খানিকটা খোশামোদই করল রুমা। অতীনের মুখে, “মেয়ে নিয়ে যাচ্ছ, সাবধানে যাবে” না শোনা পর্যন্ত স্বস্তি হচ্ছিল না। গুবলু স্কুল থেকে ফেরার পর তাকে তৈরি করে অতীনকে ফোনে জানিয়ে রুমা মেয়েকে নিয়ে বেরিয়েই পড়ল। টালিগঞ্জ স্টেশনে নেমে খানিকটা উত্তরে পিছিয়ে এলে যাদবপুরগামী অটো পাওয়া যায়। তাতে চেপে যোধপুর পার্ক স্টপেজ। ফোন করে পথ নির্দেশ জেনে হাঁটা লাগাল।
অডিশনের কোনো বাঁধা-ধরা গত নেই। গত কয়েকবার দেখেছে কয়েটা পরিস্থিতি বা সিচ্যুয়েশন ইংরিজিতে লেখা থাকে। ছোটোখাটো কোনও সংলাপ হিন্দী বা বাংলা যাই হোক ইংরিজি হরফে লেখা থাকে। যিনি অডিশন নেন, তিনি দৃশ্য ও করনীয় বুঝিয়ে দিয়ে ক্যামেরার সামনে অভিনয় করতে বলেন। ছোট ছোট দৃশ্য। দিন কতক পরে ফলাফল জানা যায়। এবারে দেখল খালি চোখে দেখেই ওদের দুজনকে মনোনীত করা হল। ছবি চাওয়া হল, যদিও ক্যামেরা হাতে মেয়েটি নিজেও ছবি তুলল কয়েকটা করে। বেশ মজা তো! এক ধকলে দুজনের কাজ হয়ে যাবে। কোঅর্ডিনেটর পরে ফোন করে জানিয়ে দেবে দিন ক্ষণ।
“বিমলদা, আমার পেমেন্ট?”
“দেখো, আমাদের অনেক রকম নিয়ম মেনে চলতে হয়। অডিশনের দিন কাউকে পেমেন্ট করি না। তোমায় দিলে বাকিরা কী বলবে? আমি ঠিক সময় করে একসাথে সব কটা কাজের টাকা দিয়ে দেব। তোমায় চাইতে হবে না।”
“কিন্তু আগের দু-দুটো কাজের পারিশ্রমিক আটকে থাকলে আমি নতুন কাজ করতে উৎসাহ পাই কোত্থেকে?”
“ঠিক আছে, এরা কবে শ্যুটিং-এর ডেট ফেলে দেখি। তার মধ্যেই তোমার টাকা তোমায় কল করে দিয়ে দেব।”
অডিশন শেষে বেরিয়ে আবার বড় রাস্তা থেকে অটো ধরার আগে মা মেয়ে দুজনে একটা আইসক্রীম পার্লার থেকে আইসক্রীম খেল। মেয়েটাকে আজ বিকেলে এ ছাড়া আর কিছু খাওয়ানো যাবে না। রাতে তাড়াতাড়ি খাইয়ে শুইয়ে দেবে। ভাগ্যক্রমে সোদপুরগামী একটা সরাসরি বাস পেয়েই গেল। বাসে দেরি হয় বিস্তর ঠিকই, কিন্তু বারবার ভেঙে ভেঙে ফিরতে হবে না।
পরের দিন সত্যিই ফোন এল। রাকার ইউনিফর্মের মাপ দিতে গড়িয়াহাটের কাছে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ছুটতে হবে। আবার ধকল খরচ। মাপটা মুখে বলে দিলে হয় না? না, যেতেই হবে। বিমলদা একটা টোপও দিল, মানে রুমার কথায় রাজি হল। আজ ওখানে গেলে আগের কাজটার টাকা নিয়ে আসতে পারবে।
কালীঘাট মেট্রোয় দেখা করার কথা। বিমলদার নাকি প্রচণ্ড তাড়া। কিন্তু হাবিজাবি অনেক কিস্যা শুনিয়ে যাচ্ছে। আরও খান পনেরো বাচ্চারও ইউনিফর্ম ভাড়া করা হবে। ওরা একটা দোকানে গিয়ে বাচ্চাদের নাম ও মাপ লিখে চলেছে। আগের কাজগুলোর দরুণ সবাই বকেয়া পেমেন্ট পেয়ে গেছে। রুমারটাই বাকি। তার এগারো মাস আগে করা একটা অ্যাড শ্যুটের পাওনা আদায় হতে চলেছে। রুমাকে আধ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে বিমলদা কাকে কাকে কোথায় পৌঁছে দিয়েছে, কতজনকে স্টার বানিয়েছে, তার বিবরণ শুনিয়ে যাচ্ছে। রুমার বাড়ি ফেরার জন্য অস্থিরতাটা যেন টেরই পাচ্ছে না। টাকার পার্স বার করে এ পকেট সে পকেট করে কেঁদে ককিয়ে প্রভূজী ভুজিয়ার জন্য তিনশোটি টাকা বের করল। সেটা ছিল রুমার প্রথম কাজ। সম্মিলিত শিল্পীদের সাথে জড়কে থাকার দৃশ্য ছিল। তিনশো টাকা তাই আপত্তিকর লাগল না। যদিও অন্য অনেকেই সেই একই কাজের জন্য বহুদিন আগেই পাঁচশ টাকা করে পেয়ে গেছে।
যাক গে, যারা পাঁচশো পেয়েছে তারা অনেক দিন ধরে এইসব করছে। কিন্তু বালাজীর ঐ মেগাটায় ওরা সব জুনিয়র আর্টিস্টের কাজ করলেও রুমা দস্তুরমতো চরিত্রাভিনয় করছে, চরিত্রটা যদিও একটা আয়ার ছিল। প্রোডাকশনের খবর হল অন্যান্য চরিত্রাভিনেতা, যারা সরাসরি কাজ যোগাড় করেছে তাদের মতো রুমার বাবদও রাকেশ শাকে দিনপ্রতি আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা। আড়াই হাজার থেকে দালালরা যতটাই নিক, দৈনিক হাজার দেড়েক, নিদেন পক্ষে হাজার খানেকের কম তো দেবে না।
বালাজীর টিভি সিরিয়ালের টাকা নাকি বিমলদা নিজেই হাতে পায়নি। রুমা জানে বিমলদা মিথ্যে বলছে। যে দীর্ঘ বক্তৃতার পর সবাইকে বিদায় জানানোর পর রুমাকে তিনশোটি টাকা হতে ধরাল, তাতে তাড়ার কোনও চিহ্ণ ছিল না। লোকটা এত কথা খরচ করল, কিন্তু মেগা সিরিয়ালের টাকাটা এখনও ঝুলিয়ে রাখল।
সদ্য পাওয়া তিনশো টাকায় কতগুলো কুশন কভার কিনে বাড়ির পথ ধরল। মেট্রোতে দমদম। সেখান থেকে ট্রেন। উৎকট ভিড় মহিলা কামরা থেকে বাচ্চাকে নিয়ে নামতে গিয়ে যে দুজনেরই বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি, সেটাই পরম বিস্ময়। কুশনকভারের প্যাকেটটা হাত থেকে ছিটকে পড়ল। গুবলু ,মাথায় মারাত্মক চোট পেতে পেতে বাঁচল। ভাগ্যিস প্লাস্টিকটা ট্রেনের কামরায় না পড়ে প্ল্যাটফর্মে পড়েছে। এক মহিলা কুড়িয়ে দিল। “থ্যাঙ্ক ইউ”।
এমন পারিশ্রমিক, ট্যাক্সিও নেওয়া যায় না। এইভাবে ছ্যাঁচোড়ের মতো কচি বাচ্চার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনও মানে হয়? হয়তো লেগে থাকলে হবে। নিজের কাজে বা বেড়াতে বেরোলে অতীন কক্ষণও ট্যাক্সি ছাড়া বাচ্চা নিয়ে কষ্ট করতে দেয় না। কিন্তু এখন ট্যাক্সি নেওয়ার অর্থ তিনশোর জন্য পাঁচশো ধসানো। ভালো লাগছে না। ওর লেখা বেশ কয়েকটা বেঙ্গল ট্যালেন্টকে দেওয়া আছে। কবিতা নয়, শুধু বড় বড় প্রবন্ধ, প্রতিবেদন। সেগুলোর খোঁজ নেওয়া হল না। ওদের অফিসটা কাছাকাছিই। যতীন দাস পার্ক মেট্রোতে নেমে যেতে হয়। কাছাকাছি এসেও অফিসে কাউকে পাবে কি পাবে না ভেবে ফিরেই এল। মনটা সায় দিচ্ছে না। কিন্তু আগামী কাজটা না করলে আগের আদায় না হওয়া তিন দিনের চরিত্রাভিনয়ের মোটা পারিশ্রমিকটা যদি ফস্কায়? নিশ্চই তিন দিনে আড়াই না হোক অন্তত দেড় করে সাড়ে চার হাজার তো দেবেই। নাকি গোটাগুটি তিন হাজার ধরাবে? বিমলদা শিল্পী মডেল এদের ভাঙিয়ে খায়, তাদের নিশ্চই চটাবে না। ঘাঘু হচ্ছে রাকেশ শাহ। দেখা যাক।
শ্যুটিং-এর দিন ঠিক হয়েছে। সল্টলেকের অরোরা স্টুডিওতে গুবলুর কাজ। রুমা আগের মেগায় তিনদিন করা কাজের দক্ষিণাটা চাওয়াতে বিমল মণ্ডল বলল “এই তো একটা পেলে। পরেরটা একসাথে নিও।”
“কিন্তু বিমলদা আর সবাইকে তো পেমেন্ট করা হয়ে গেছে। আমি এক সাথে টাকা নেওয়ার বদলে যে কাজটা করলাম তার পেমেন্ট নিতে পারলেই পরের কাজটায় মন বসে। বালাজীরটা ক্লিয়ার করে দিন না। অনামিকাদি তো বলল ওরা পেয়ে গেছে। তাছাড়া প্রতিদিন দুশো টাকা করে ট্যাক্সিভাড়াও ডাইরেক্ট ওদের প্রোডাকশন থেকে পেতে দেখেছি।”
“এটা হতেই পারে না। আমরা কাউকেই যাতায়াতের জন্য আলাদা টাকা দিইনা। ও.কে। আগেই পেয়ে যাবে। তবে তোমার মতো পেমেন্টের জন্য আর তো কেউ এমন করে না! এই চঞ্চল শোন, তোর সাথে আমার দরকার আছে।”
রুমা মনে মনে বলল, আর কাউকে এত দিন ঝুলেও থাকতে হয়না। ট্যাক্সিভাড়া নিয়ে তর্ক করা বৃথা। তাছাড়া রুমা সম্পূর্ণ নিজে নিজে সাঁতরাগাছির স্পটটায় গিয়ে পৌঁছয় নি। ক্যামাকস্ট্রীটের একটা হোটেলে সকাল ছটা নাগাদ পৌঁছে যেত। সেখান থেকে প্রযোজনার গাড়ি করেই শ্যুটিং-এর জায়গায় গিয়েছিল দুদিন। তৃতীয় দিন যেতে হয়েছিল কসবা গোলপার্কের কাছে একটা অট্টালিকায়। প্রথম দু’ দিনই অতীন ভোর বেলায় প্রথমে ট্রেন, তারপর শেয়ালদা থেকে ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে পৌঁছে দিয়েছিল। তৃতীয় দিন ট্রেন বদলে বালিগঞ্জ। বিজন সেতু থেকে অটো। সেদিনও অতীন সঙ্গে গিয়েছিল।
প্রথম দিন ঠিক আছে। তবে টানা তিনদিন সঙ্গে যাওয়ার কোনও প্রয়োজন ছিল না। বরং বাড়িতে তখন মা বাবা এসে ছিলেন। অতীনকেও কদিন পূজোর মধ্যেও অফিস করতে হয়েছে। মায়ের ওপর মেয়ে সহ সংসারের সব কাজ কর্মের দায়িত্ব ছেড়ে না এসে অতীন নিজে অফিস যাওয়ার আগে পর্যন্ত বাড়িতে থাকলে মায়ের অসুবিধা কিঞ্চিৎ কম হোত। কিন্তু এই অনাবশ্যক সঙ্গ দিয়ে স্বামী হিসাবে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেওয়ার সাথে সাথে, রুমার এই জাতীয় কাজ করাটা যে সংসারের পক্ষে কতটা অসুবিধাজনক, সেটাও টের পাওয়ানো গেল।