বাঁ পাশের জানালাটা খোলা। জানালার বাইরে পাশে কয়েকটি মশা স্বাধীন মনে গান করছে। চোখের দূরত্বেই নির্মানাধীন কয়েকটি দালান। জানালার পরই টিনের চালা। তার উপর বসে আছে অচেনা অচেনা একটি পাখি। পাখিটি ঠিক অচেনা নয়। এর আগেও বহুবার এই পাখিটিকে দেখেছি। কিন্তু এই মুহূর্তে নামটা ঠিক মনে আসছে না। পাখিটি তার পায়ের সাথে ঠোঁট রেখে এক ধরণের খেলা খেলছে। এই খেলাটার নামও আমি জানি না। একটু পর পর সে যেভাবে ছোট্ট করে লাফ দিয়ে আবার দাঁড়িয়ে যাচ্ছে তা দেখে মনে হচ্ছে—পাখিদের ভাষায় এর ভালো একটা নাম আছে। সে নামটা জানতে পারলে এই মুহূর্তে ভালোই লাগতো। আর যদি এই পাখিটার ভাষা জানা থাকতো তাহলে তো আরো ভালো হতো। এই বিধাব বিকালটা পাখিটার সাথে গল্প করে কাটিয়ে দেওয়া যেতো।
কয়েকদিন থেকে বিকেলগুলো শাদাকালো কাটছে। চেষ্টা করেও ঠিক রাঙাতে পারছি না। মনের মধ্যে আর চোখের কাছাকাছি সব রঙ দিয়ে একটু একটু করে রাঙাতে চেয়েছি। কিন্তু শেষমেষ শাদাকালোই থেকে যাচ্ছে সব দৃশ্য। হাল ছেড়ে দিয়ে শাদাকালো বিকেলের উরুতে খেলতে থাকি। ব্যর্থ মনকে বুঝাই— ‘আরে শাদাকালো তো কি হয়েছে! এক সময় সবই তো শাদাকালো ছিলো। তখন রঙের কৌটায় কতো ভেঙচি কাটতো, কতো টিপ্পনী। কই তখন তো বিকালগুলো আমারই থাকতো। আর এখন তাও মাঝে মধ্যে রঙীন হই। মাল্টি কালারের আইসক্রীম খাই। চোখকেও ঘুড়িয়ে প্যাঁচিয়ে ধরে রাখি আবার ছেড়ে দেই ঘুড়ির লেজে…’
আরেকটা পাখি এসে অন্য পাখিটির থেকে একটু দূরত্বে বসলো। দেখে বুজলাম সে অনেক দূর থেকে এসেছে। দুই পাখির চোখাচোখি দেখতে দেখতে চোখ চলে যায় টিনের চালা সাঁতরে সবুজ মাঠ, খড়ের গাদা পেড়িয়ে দাঁড়ানো দালানে। তিনতলার ব্যালকনিতে গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন একজন বয়ষ্ক পুরুষ।
মশা উড়ছে। তাদের দলটা আগের থেকে একটু বড় এখন।
তিন তলার ব্যালকনিতে টুল জাতীয় কিছু একটা দিয়ে গেলো মধ্য বয়সী একজন মহিলা। সে টুলটি দিয়েই চলে গেলো।
গলা বাড়িয়ে গাছের মাথায় তাকাই। আমের মুকুল নিয়ে মিছিলের প্রস্তুতিতে থাকা একজনকে দেখা যায়। সে কুয়াশা আর শীতের ভয়ে কেমন টিপটিপ চোখে তাকিয়ে দেখছে সব।
উঁচু থেকে কিছু পড়ার শব্দ হলো। কিছু কি ভাঙলো! মনে হলো নিশ্চয়ই বিড়ালের কাজ। কিন্তু বাসায় তো বিড়াল নেই। আমি আর চুপ করে থাকা অঅসবাবপত্র ছাড়া তো কেউ নেই। ওহ আর একজন আছেন। সে অবশ্য দর্শক। ছোটোখাটো দর্শক নয়। এক্কবারে খাঁটি দর্শক। তাকে অবহেলার সাধ্য আমার নাই। অবশ্য আমার কাউকে অবহেলা করার সাহসও নেই। অবহেলাই যখন আমাকে অবহেলা করতে ভুলে গেছে তখন তাকে ভালো না বেসে আর কই যাই।
যা-ই ভাঙে ভাঙুক। আমার উঠতে ইচ্ছে করছে না। ভাঙলে তো ভেঙেই গ্যাছে। আমি উঠে গিয়ে তো আর জোড়া লাগাতে পারবো না। শব্দটা অনেকটা গ্লাস ভাঙার মতোন। এখন গেলে ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে একত্র করতে হবে। আবার হাত কাটার ভয়ে সতর্ক থাকতে হবে। মনে মনে বিড়ালের চৌদ্দগোষ্টী উদ্ধার করতে লাগলাম। কিন্তু আগেও দেখেছি শেষ পর্যন্ত হাত কেটে যায়। সাবধানতাকে কাঁচ ভয় পায় না। সে তার মতো কেটে দেয়। জখম করে দেয়। তার দরদ উল্টেপাল্টে সীমাবদ্ধ চিৎকারকে ঢেলে দেয় চলমান বাতাসে।
মনে হলো—কেউ একজন পিছনে দাঁড়িয়ে! তার হাতে একটু আগে ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো। সে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছে। হয়তো এগুলো কুড়াতে গিয়ে তারও হাত কেটে গেছে। তার হাত থেকে রক্ত ঝরছে—
আমি পিছনে তাকাই না।
আমার মাথায় তখন রক্তমাখা কাঁচগুলো কিলবিল করে ঢুকে যায়। আমার মাথা তাকে প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা তোমার হাটু থেকে উরুসন্ধির দূরত্ব কতোটুকু? তুমি জানো?’
কেউ জবাব দেয় না। অথবা কেউ কানের কাছে মুখ নিয়ে খুউব আস্তে করে বলে যায়। ‘ আমি ছায়া থেকে যতটুকু দূরত্বে থাকি।’ তার কণ্ঠে নির্মোহভাব।
আমি অস্থির হই। ভেতরটাও কেমন ফুলেফেঁপে ওঠে।
আমি সেই ছায়া থেকে ভাঙা কাঁচ কুড়াতে থাকি!
প্রশ্ন শেষ হতেই সে বলে, ‘না কাঁচই তোমাকে কুড়িয়ে একত্রিত করছে। ’ যেন জবাবটা তৈরি করেই সে আমার মাথায় ঢুকেছে।
আমার চোখে ঘুরতে থাকে দেয়ালের বড় আয়নায়। এলোমেলো বিছানায়। ফ্লোরে পড়ে থাকা খড়িমাটির টুকরোয়। চোখ যেন আরো কিছু খুঁজতে থাকে। আমি মাথার মধ্যে ঢুকে যাই। আমার মাথায় এখন দুইটা আমি। প্রথম আমি ২য় আমিকে প্রশ্ন করে। ‘তুমি কি খুঁজছো জানো?’
২য় আমি চোখ বড় বড় করে জবাব দেয়। ‘ না। আমি সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতেই তো তোমার কাছে এসেছি।’
প্রথম আমি হাসে। তার চোখে কোনো বিস্ময়ের ভয় নেই। পবিত্রতার লোভ নেই। এমনকি খরগোস তাড়া করার মতো কোনো উৎসুকতাও নেই। ২য় আমি বলে, ‘আসলে তোমার একটা শ্লেট দরকার। তোমার চোখ একটা শ্লেট খুঁজছে।’
আমি অনুভব করি পিছনের সেই মালটা এখন ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে। হয়তো তার চোখের মধ্যেও বিকেলের প্রজাপতিরা ঢুকে পরেছে। আমার তাকে বিব্রত করতে ইচ্ছে হলো না। আমি মাথার ময়ূরগুলোকে জানালা দিয়ে উড়িয়ে দিলাম। বাতাসের সাথে হাত রেখে তাদের বললাম, ‘যা তোরা বিব্রতকর কিছু খুঁজে নিয়ে আয়…’
তারপর চুপিচুপি ভাবতে থাকলাম—এখন তো আমার মাথা প্রজাপতিহীন। এখনই তাকে শ্লেট করে ফেলি। শূন্যে প্রশ্ন ছুঁড়লাম— ‘আচ্ছা, তোমার চোখ ভরতি বিকেলগুলো কি কাঁচ কিনে রেখেছে?’
শূন্য জবাব দেয়— ‘ আরে না। তোমার মতো বিজ্ঞান পড়–য়া গণিতের জন্য এতো বিকেল সে কই পাবে! তার তো কোনো কাঁচ নেই। হুম বলতে পারো, তার হাত ভরতি পাখি আছে। আচ্ছা তুমি কি পাখি নিতে চাও? একেবারেই বিনা বাক্যে পেয়ে যাবে। ওহ তোমাকে বলে রাখি—তারা কিন্তু সবাই বোবা। তুমি যদি শেখাতে পারো তবেই তারা কথা বলবে।’
কাছাকছি কোনো মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের শব্দ উড়ে আসছে। মশাগুলো আর উড়ছে না। হয়তো তারা জানালা গলিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে এখন। অথবা ২য় আমি’র মাথায়। দুই জাতের জোড়া পাখিও নেই। টিনের চালাটা মধ্য রাতের অন্ধকারের মতো স্থির। আর তিন তলার ব্যালকেিনত বসে থাকা বয়সী পুরুষ? সে দাঁড়িয়ে আছে এখনো। এতো দূও থেকে তার চোখের ভাষা বোঝা যাচ্ছে না। তবে আমার চোখ বরছে তার চোখ আকাশ পরিমাপ করছে। নিজের অতীত নিয়ে সে আকামের সাথে বিণিময় করার চেষ্টা করছে!
ঘরের মধ্য থেকে তাকে কেউ সন্ধ্যার অজুহাতে ডাকলো মনে হচ্ছে। ডাকের চোখে সাড়া দিতে পিছনের দরজায় তাকিয়ে আবার সে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো। হয়তো আকাশের কাছ থেকে অথবা শূন্যতার কাছ থেকে সাময়িক বিদায় নিলো। তারপর চলে গেলো। ডাকের উৎসের দিকে। দূরত্বের কারণে যাকে ঠিক মাপতে পারিনি।
আমি হাত দিয়ে জানালার কাঁচটা টেনে দিই।
রক্তমাখা হাত, ভাঙা কাঁচ, বয়সী পুরুষ আর উদাস পাখি সব যেন আমার রুমের মধ্যে! তাদের সাথে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটির বেশ সখ্যতা। আমি চোখ বন্ধ করে সব দেখছি
সে গাইছে। কে গাইছে? যাকে আমি দেখিনি। দেখতে চাই না, হয়তো কখনোই না। সে গাইছে— ‘ আমার হাত বান্ধিবি পা বান্ধিবি মন বান্ধিবি কেমনে…’