পুরাতনী-তে রূপক সামন্ত

বিষ্ণুপুর ঘরানার উৎপত্তি 

গান বাজনা মতিচূর
তবে জানবি বিষ্ণুপুর

জেলা বাঁকুড়ার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী, প্রাচীন, সমৃদ্ধ জনপদ বিষ্ণুপুরের নাম আজ কে না জানে। স্থানীয় মানুষ আদিমল্ল  রঘুনাথ ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে প্রদ্যুম্নপুর, মতান্তরে লাউগ্রামে মল্ল রাজত্ব স্থাপন করেন। পরে একাদশ খ্রিস্টাব্দের প্রথমাংশে রাজা জগৎমল্ল বিষ্ণুপুরে রাজধানী স্থাপন করেন। এই মল্লরাজ্য বিষ্ণুপুর হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় স্বাধীনভাবেই নিজের গরিমা বজায় রেখেছিলো। মল্লরাজ বীর হাম্বিরের সভায় এসেছিলেন বৈষ্ণব চূড়ামণি শ্রীনিবাস আচার্য। তাঁর কাছে রাজা ও রাণী দুজনেই দীক্ষা গ্রহণ করেন। শ্রীনিবাস আচার্যের প্রভাবে বিষ্ণুপুরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জগতে বৈপ্লবিক উত্তরণ ঘটে। অজস্র পুঁথি রচিত হয়। মল্লরাজাদের প্রাণের ঠাকুর অতিবিখ্যাত ঁমদনমোহনের আখ্যান শোনেন নি এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। বঙ্গদেশের মিষ্টান্নশিল্পের উৎকর্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই মদনমোহন’এর বিশেষ ভূমিকা আছে। তবে সে আলাদা প্রসঙ্গ। একসময় বিষ্ণুপুরী ‘বাদশাহী বিলাস তামাকে’রও খুব সুনাম ছিল।
বিষ্ণুপুর আজ বিশেষভাবে পরিচিত অসাধারণ সুন্দর টেরাকোটা কারুকাজ শোভিত মন্দিররাজির জন্য। শুভঙ্করী আর্যা-রচয়িতা বিষ্ণুপুরের রামপুর গ্রামের ‘শুভঙ্কর’ জগন্নাথ দাসের নামও স্মরণীয়। বিষ্ণুপুরের বালুচরী শাড়ি আর লন্ঠনেরও খুব কদর। বিষ্ণুপুরের উদ্ভাবন ‘কালাকাঁদ’ মিষ্টিটি আজ নিজগুণে রসিকজনের আস্বাদনে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেছে। আছে বিখ্যাত সব জলাশয়- কৃষ্ণবাঁধ, লালবাঁধ, পোকাবাঁধ, বীরবাঁধ, কাজলাবাঁধ, যমুনাবাঁধ, উপরবাঁধ ইত্যাদি। আর আছে মাণিকলাল সিংহ স্থাপিত ‘আচার্য যেগেশচন্দ্র পুরাকৃতি ভবন’ সংগ্রহশালা। বিষ্ণুপুরের দলমাদল কামান, দশাবতার ও নক্স তাস, দুর্গাপূজায় ‘রাবণকাটা’ নাচ- এসবের সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করতে হবে বঙ্গদেশের একমাত্র সঙ্গীত ঘরানা ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’র নাম।
১৫৮৭-১৬১৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিষ্ণুপুরের রাজা ছিলেন বীর হাম্বির। সেই সময় দিল্লির সম্রাট ছিলেন বাদশাহ আকবর। বীর হাম্বিরের রাজত্বকালে বৃন্দাবন থেকে শ্রীনিবাস গোস্বামী অনেক বৈষ্ণব দর্শনের পুঁথি নিয়ে নবদ্বীপ যাত্রা করেন। বিষ্ণুপুর রাজ্যে আসার পর সেসব পুঁথি হাম্বীরের লোকজন লুট করে রাজদরবারে জমা করে। পুঁথি উদ্ধারের আশায় শ্রীনিবাস গোস্বামী দরবারে আসেন। তাঁর ভাগবত ব্যাখ্যা শুনে রাজা ও মন্ত্রী-অমাত্যগণ মুগ্ধ হয়ে যান। রাজা ও রাণী উভয়েই বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন এবং তাঁদের অনুরোধে শ্রীনিবাস গোস্বামী বিষ্ণুপুরে বসবাস শুরু করেন। শ্রীনিবাস গোস্বামী আনীত বিভিন্ন পুঁথির মধ্যে প্রাচীন ধ্রুপদ ও ধ্রুপদাঙ্গ কীর্তন গানের অনেক পুঁথি ছিলো। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পদকর্তা, এমনকি রাজা বীর হাম্বিরও অনেক পদ রচনা করেছেন। প্রখ্যাত রাঢ় বিশেষজ্ঞ ও বিষ্ণুপুর আচার্য যোগেশচন্দ্র পুরাকৃতি ভবন সংগ্রহশালার প্রতিষ্ঠাতা মাণিকলাল সিংহ তাঁর ‘পশ্চিম রাঢ় তথা বাঁকুড়া সংস্কৃতি’ বইতে এমন অনেক পদ, রাগ ও তাল সমেত উদ্ধৃত করেছেন। তিনি আরও লিখেছেন যে প্রভু নিত্যানন্দের ভক্ত পরমেশ্বর মল্লিকের মাধ্যমে, শ্রীনিবাস গোস্বামীর বেশ কিছু সময় আগেই বিষ্ণুপুরে বৈষ্ণব দর্শন চর্চার সূত্রপাত হয়। পরমেশ্বর মল্লিক ও তাঁর বংশধরগণ, বিশেষতঃ রামকৃষ্ণ মল্লিক অনেক পদ রচনা করেন। পুরাকৃতি ভবনের পুঁথিশালা থেকে উদ্ধার করে মাণিকলাল সিংহ এঁদের অনেক পদ, রাগ ও তাল সহ উদ্ধৃত করেছেন। এই সকল পদ ধ্রুপদাঙ্গে, নানা বাদ্যযন্ত্র সহযোগে নিয়মিত গাওয়া হোতো।
অবিভক্ত বঙ্গদেশের রাজশাহি জেলার নাটোর পরগণার প্রভুরাম সান্যালের সাথে বিষ্ণুপুরের কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের কন্যার বিয়ে হয়েছিলো। সেই সূত্রে জমিজমা লাভ করে প্রভুরাম বিষ্ণুপুর শহরের তিন কিলোমিটার দূরে ঢ্যাঙ্গারতলা গ্রামে এসে বাস করেন। সংস্কৃত ভাষায় অসাধারণ পাণ্ডিত্যের জন্য বিষ্ণুপুররাজ তাঁকে ‘ভট্টাচার্য’ উপাধি দেন ও সভাপণ্ডিতের পদে নিয়োগ করেন। প্রভুরাম ঢ্যাঙ্গারতলা থেকে এসে বিষ্ণুপুর শহরের মল্লেশ্বর কাদাকুলি গলিতে বসতবাড়ি নির্মাণ করেন। মল্লেশ্বর শিবমন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা বীর সিংহ। ইনি ‘মল্লাব্দ’ গণনার সূচনা করে ছিলেন। ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে মল্লাব্দের সূচনা হয়। মল্লেশ্বর মন্দিরেই প্রথম মল্লাব্দ উল্লিখিত হয় (  ৯২৮ মল্লাব্দ, অর্থাৎ ১৬২২ খ্রিস্টাব্দ ) । প্রভুরামের প্রপৌত্র গদাধর ভট্টাচার্যও ছিলেন সংস্কৃতে সুপণ্ডিত। বিষ্ণুপুররাজ চৈতন্য সিংহ তাঁকে সভাপণ্ডিত রূপে বরণ করেন।
গদাধর তাঁর পুত্র রামশঙ্করকেও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত করে তোলেন। খুব অল্প বয়সেই রামশঙ্করকে ‘বাচস্পতি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এই পণ্ডিত বংশে গান-বাজনার কোনো রেওয়াজ ছিল না। রামশঙ্করই প্রথম সঙ্গীতসাধনা শুরু করেন। এর পিছনে একটি ঘটনা আছে।
তখনকার সময়ে ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে তীর্থযাত্রীদের পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে জগন্নাথ দর্শনে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা ছিলো অহল্যাবাঈ রোড। রাস্তাটি বিষ্ণুপুর রাজ্যের প্রায় প্রান্তসীমা ছুঁয়ে গেছে। এক সঙ্গীতগুণী পরিবার-পরিজন নিয়ে, অনেক বাদ্যযণ্ত্র সমেত জগন্নাথ দর্শনে চলেছেন। সঙ্গীতপ্রিয় রাজা চৈতন্য সিংহের দরবারে সে খবর পৌঁছলো। রাজা সাদরে সেই সঙ্গীতজ্ঞকে রাজসভায় সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। সন্ধ্যায় বসলো সঙ্গীতের আসর। সভাপণ্ডিত গদাধর পুত্র রামশঙ্করকে নিয়ে সেই আসরে উপস্থিত ছিলেন। ‘পণ্ডিতজী’র গানে সবাই মুগ্ধ, আপ্লুত। সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হলেন একুশ-বাইশ বছরের যুবক রামশঙ্কর। সেই স্বর্গীয় সুষমামণ্ডিত গান আরও শোনার অভিপ্রায়ে রাজা চৈতন্য সিংহ পণ্ডিতজীকে কিছুদিন বিষ্ণুপুরে অবস্থান করার জন্য অনুরোধ করলেন। পণ্ডিতজী বললেন- আমি প্রভু জগন্নাথকে গান শেনানোর মানসে যাত্রা করেছি। জগন্নাথকে গান শুনিয়ে ফেরার পথে আপনার মনোবাঞ্ছা পূ্র্ণ কোরবো। রাজা বললেন- আচ্ছা, তাই হোক।
এদিকে রামশঙ্করের মনে সুরের আগুন জ্বলে উঠেছে। নিরিবিলিতে আপনমনে গুনগুন করে সাধেন পণ্ডিতজীর গলায় শোনা সেই সব গান। দিন কাটে। তীর্থ দর্শন শেষে পণ্ডিতজী আবার এলেন বিষ্ণুপুরে। বসলো আসর। আসরে বাবা গদাধরকে আর্জি জানালেন রামশঙ্কর যে তিনি এই আসরে সঙ্গীত পরিবেশন করতে চান। গদাধর শুনে অবাক। রামশঙ্কর যে গান গাইতে পারেন এমন কথা তিনি ঘূণাক্ষরেও জানেন না। ছেলের বারবার অনুরোধে রাজার কানে কথাটা তুললেন সভাপণ্ডিত গদাধর। রাজা সম্মতিও দিলেন। গাইতে উঠলেন যুবক রামশঙ্কর। আর ছেলের বালখিল্যতায় লজ্জায় মাথা কাটা যাবার আশঙ্কায় আসর ছেড়ে চলে গেলেন গদাধর।
গান করলেন রামশঙ্কর। পণ্ডিতজীর গলায় শোনা সেই গান। অপূর্ব সুরেলা গলা আর সুস্পষ্ট উচ্চারণ। সবাই অভিভূত। গান শেষ হলে সবাই ধন্য ধন্য করে উঠলো। পণ্ডিতজী উচ্চ প্রশংসা করলেন। মল্লরাজের কাছে রামশঙ্করকে সঙ্গীত শিক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। নানা কারণে মল্লরাজের আর্থিক অবস্থা তখন শোচনীয়। তবুও ব্যবস্থা করলেন তিনি। সেই পণ্ডিতজী দু’বছর থেকে গেলেন বিষ্ণুপুরে। শ্রুতিধর ছাত্র রামশঙ্করকে উজাড় করে দিলেন তাঁর জ্ঞানের ভাণ্ডার। বিষ্ণুপুরের সঙ্গীত জগতে শুরু হোলো এক নতুন অধ্যায়- বিষ্ণুপুর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ঘরানা।
রামশঙ্কর তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে পণ্ডিতজীর নাম উচ্চারণ করেন নি। তাঁর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় যে পণ্ডিতজী ছিলেন আগ্রা-মথুরা অঞ্চলের অধিবাসী এবং ধর্মমতে হিন্দু। ফলতঃ সিদ্ধান্ত করা যায় যে বিষ্ণুপুর ঘরানা ‘সেনী’ ঘরানার অন্তর্ভূক্ত নয়। এই কাহিনীটি পাওয়া যায় অধ্যাপক লীলাময় মুখোপাধ্যায় রচিত ‘বিষ্ণুপুরের পাঁচ সংগীতগুণী’ বইয়ের রামশঙ্কর ভট্টাচার্য অধ্যায়ে।
সঙ্গীত রত্নাকর রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য ‘দ্বিতীয় দিল্লি বিষ্ণুপুর’ বইতে এই পন্ডিতজীর কোনো উল্লেখ করেন নি। তাঁর মতে রাজসভায় যাতায়াতের কারণে দরবারের গুণী সঙ্গীতসাধকদের সংস্পর্শে রামশঙ্করের সঙ্গীত প্রতিভা বিকশিত হয়। আবার বিষ্ণুপুর ঘরানারই প্রবাদপ্রতিম সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রকৃত ইতিহাস ও রাগরূপের সঠিক পরিচয়’ বইতে লিখেছেন-‘রামশঙ্কর পশ্চিম থেকে আগত এক হিন্দুস্থানি খুব বড়ো ধ্রুপদ গায়কের কাছে শিক্ষা করেন, তারপর সেই গায়কের সঙ্গে চলে যান, তাঁর কাছে অনেকদিন থেকে ধ্রুপদ শিক্ষা করেন, পরে সেই স্থানের একজন বড়ো খেয়াল গায়কের কাছে খেয়াল ও টপ্পা গান শিখে দেশে ফিরে আসেন।’ তাঁর লেখা থেকে আরও জানা যায় যে রামশঙ্কর অতি উত্তম বন্দেজের বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় ধ্রুপদ ও খেয়াল গান রচনা করেছিলেন। আরও জানা যায় যে রামশঙ্কর তন্ত্রশাস্ত্রের উপর একটি বৃহৎ পুঁথিও রচনা করেছিলেন।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ প্রকাশিত ‘পশ্চিমবঙ্গ – বাঁকুড়া জেলা সংখ্যা’ সংকলনে বিষ্ণুপুর ঘরানা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে মণীন্দ্রনাথ সান্যাল তাঁর ‘বিষ্ণুপুর ঘরানার ঐতিহ্য ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে তিনটি মত বলেছেন। প্রথমত- সেনী ঘরানার তানসেন-বংশীয় বাহাদুর খাঁ’র শিষ্য গদাধর চক্রবর্তীর কাছে রামশঙ্কর ধ্রুপদ শিক্ষালাভ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত- গদাধর চক্রবর্তীর অন্যতম শিষ্য কৃষ্ণমোহন গোস্বামী ছিলেন রামশঙ্করের সঙ্গীতগুরু। এই মত অনুযায়ীও বিষ্ণুপুর ঘরানা সেনী ঘরানা থেকেই এসেছে। তৃতীয় মতটিতে লীলাময়বাবুর বইয়ের কাহিনীটি বলা হয়েছে।
আবার এই ‘পশ্চিমবঙ্গ-বাঁকুড়া জেলা সংখ্যা’তেই ধ্রুবদাস ভট্টাচার্য তাঁর ‘বাঁকুড়া জেলার সংগীত চর্চা’ প্রবন্ধে লিখেছেন যে ১৭০২ সালে মল্লরাজ দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহের রাজত্বকাল শুরু হয়। তখন দিল্লীর সম্রাট ঔরঙ্গজেব সঙ্গীতচর্চা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। রঘুনাথ সিংহ এই নির্দেশ অমান্য করে তানসেনের উত্তরসূরী বাহাদুর খাঁ’কে ( সেন ) সভাগায়ক রূপে নিয়োগ করলেন। এই উস্তাদের সেনী ঘরানার হাত ধরেই বিষ্ণুপুরের সঙ্গীতচর্চা শুরু হোলো। এঁরই শিষ্য ছিলেন গদাধর চক্রবর্তী ও রামশঙ্কর ভট্টাচার্য।
রামশঙ্করের জন্মতারিখ পাওয়া না গেলেও তিনি যে ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে ৯২ বছর বয়সে মারা যান তা জানা যায়। সেই হিসেবে তাঁর জন্ম ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে- এমন সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে। রামশঙ্করের সঙ্গীতশিক্ষার সময় বয়স ছিলো কুড়ি বছর। সেটা তাহলে ১৭৮১ সালের কথা। তখন মল্লরাজ চৈতন্য সিংহের রাজত্ব, দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহের রাজত্ব নয়। কাজেই সন তারিখের বিচারে লীলাময়বাবুর বই’এর মতটিই প্রতিষ্ঠা পায়। আর প্রত্যেকেই স্বীকার করেছেন যে বিষ্ণুপুর ঘরানার শুরু ও প্রচার-প্রসারে একমাত্র রামশঙ্করেরই অবদান অপরিসীম।
পশ্চিমাঞ্চল থেকে সংগীত শিক্ষান্তে রামশঙ্কর যখন ফিরে এলেন তখন তাঁর বয়স মোটামুটি পঁচিশ বছর। তখন থেকেই তিনি অনেক ছাত্রকে সঙ্গীত শিক্ষা দিতে থাকেন। দূরদূরান্ত থেকে অনেক ছাত্র এসে তাঁর আশ্রয়ে থেকে, বিনা দক্ষিণায় শিক্ষালাভ কোরতো। স্থানীয় বহু ছাত্রকেও একই সাথে শেখাতেন তিনি। ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী, দীনবন্ধু গোস্বামী, রামকেশব ভট্টাচার্য, অনন্তলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, কেশবলাল চক্রবর্তী প্রমুখ দিকপাল সঙ্গীতজ্ঞগণ তাঁর শিষ্য। কিংবদন্তী সঙ্গীতসাধক যদু ভট্টও কিশোর বয়সে কিছুদিন তাঁর কাছে সঙ্গীতশিক্ষা লাভ করেছেন। এই সব খ্যাতকীর্তি সঙ্গীতগুণীর মাধ্যমে রামশঙ্কর প্রবর্তিত সঙ্গীতধারাটি অচিরেই সারা ভারতে সমাদৃত হয়েছিলো এবং ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। ধ্রুপদ হোলো এই ঘরানার মূল ধারা। মল্লরাজ চৈতন্য সিংহের দরবারে সভাগায়ক হিসেবে রামশঙ্কর নিযুক্ত হন।
রামশঙ্করের পাঁচ পুত্রের মধ্যে বড় হলেন মাধব। তিনি সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত ও প্রসিদ্ধ বীণাবাদক। তাঁকে বঙ্গের আদি বীণাবাদক রূপে সম্মান জানানো হয়। রামশঙ্করের তৃতীয় পুত্র রামকেশব অসাধারণ ধ্রুপদীয়া। তিনি পশ্চিমাঞ্চল থেকে ময়ূরমুখী এসরাজ ‘তাউস’ বাদনে তালিম নিয়ে এসেছিলেন। এসরাজ বাদনে তিনিই বঙ্গদেশে পথিকৃৎ। তিনি কোচবিহার মহারাজার সভাগায়ক রূপে নিযুক্ত হন। এছাড়াও কলকাতায় দেব পরিবারের সাতুবাবুর সঙ্গীতসভাতেও তিনি সঙ্গীতাচার্যের পদ অলঙ্কৃত করেন।
রামশঙ্কর বিষ্ণুপুরে নিজের বাড়ির দুর্গাপূজায় নবমীতে সারারাত ব্যাপী সঙ্গীত আসরের আয়োজন করতেন। আজও নবমীর রাতে এই আসর বসে। ‘রামশঙ্কর’ বা ‘শঙ্কর’ ভণিতা দিয়ে অজস্র বাংলা ও সংস্কৃত গান রচনা করেছিলেন তিনি। তার অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। কয়েকটিমাত্র আজও রয়ে গেছে।
ধর্মপ্রাণ রামশঙ্কর তাঁর মৃত্যুর সময় জানতে পেরেছিলেন। দু’দিন আগেই তাঁর আত্মীয়স্বজন ও শিষ্যদের কাছে শেষ ইচ্ছা জানিয়েছিলেন তিনি। সেইমতোই দড়ির খাটিয়ায় শুইয়ে কাঁদতে কাঁদতে সকলে নিয়ে চললেন তাঁকে মল্লেশ্বর শিবমন্দিরের প্রাঙ্গনে। শিব যে সঙ্গীতবিদ্যা ও নৃত্যকলার আদি গুরু। সঙ্গীতাচার্য খাটিয়ায় শুয়ে দু’হাত বুকের উপর প্রণামের ভঙ্গীতে যুক্ত করে গাইতে গাইতে চলেছেন তাঁরই রচিত সেই প্রিয় ধ্রুপদটি–

              রাজবিজয়-তেওড়া
                         ধ্রুপদ

অজ্ঞান-তম-নিকরে    গাঢ়ময়ী পতিতে
জ্ঞান কিঞ্চিৎ বিতর জগদম্বে।
কলুষ-পুরিত মম কলেবর,
অশেষ কুৎসিত কর্মতৎপর,
স্থিরমতি সংসার জলবিম্বে।।

তব মায়াময় মোহ-গর্তে
অন্ধ অতিশয় নয়ন সত্ত্বে,
শর্করা সম বাস বিষয়-নিম্বে।।

তব চরণ কভু মননে নাহি ধরে,
এমন দুর্মতি রামশঙ্করে,
কুরু-কৃপাময়ী কৃপা অবিলম্বে।।

সকলে প্রবেশ করলেন মল্লেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গনে। খুব সাবধানে পরম মমতায় নামানো হোলো খাটিয়া। প্রায় সাথে সাথেই সঙ্গীতাচার্য রামশঙ্করের প্রাণবায়ু নির্গত হোলো। আকুল কান্নায় ভেঙে পড়লো সকলে। চলে গেলেন  রামশঙ্কর তাঁর সঙ্গীতধারাটিকে ফেলে রেখে। ক্ষীণ হলেও সেই ধারা আজও বিদ্যমান।।

তথ্যসূত্রঃ

. সুরতীর্থ বিষ্ণুপুরের পাঁচ সঙ্গীতগুণী;
লীলাময় মুখোপাধ্যায়; বাণী সংসদ; ৪এ
রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট; কলকাতা-৯।
২. পশ্চিমবঙ্গ-বাঁকুড়া জেলা সংখ্যা; তথ্য ও
সংস্কৃতি বিভাগ; পশ্চিমবঙ্গ সরকার; সাল
১৪০৯; মণীন্দ্রনাথ সান্যাল এবং ধ্রুবদাস
ভট্টাচার্যের প্রবন্ধ।

৩. বাঁকুড়া বিচিত্রা ; প্রশান্ত কুমার
বন্দ্যোপাধ্যায় ; বাঁকুড়া সংস্কৃতি পরিষদ;
রাঢ় সংস্কৃতি একাডেমী, বাঁকুড়া-৭২২১০১

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।