কিছুদিন আগের কথা,
কাঠফাটা রোদ, বৃষ্টির অভিমান, ছাদের টবের বেল গাছের হালকা সুবাস,কুঁকড়ে যাওয়া লজ্জায় অবনত মাধবিলতা,কুল্পিআলার ঘণ্টায় নিঃশব্দ দুপুর একটু বুড়বুড়ি কেটে আবার ঝিমিয়ে যায়। আমার সবুজ দেয়াল দেয়া একটা কম্পুটারের কেজো ঘর আছে।সারা বছরভর সে ঘর একলাই থকে দুপুরগুলো। শুধু গরমের ছুটির দুপুরগুলো আমার একার সাম্রাজ্য এ ঘরে। রোদ্দুর বাবাজী এ ঘরে বিশেষ আসতে পারে না। আমার উপুর ঝুপুর অকেজো, কেজো বই, মেয়ের বানানো টম এন্ড ম্যাগির মডেল, গুচ্ছের বাতিল জামাকাপড়, এককোণে তানপুরা, তার উপর দিয়ে উঁকি মারে টম আর ম্যাগি। জলের ধারে বসে একমনে মাছ ধরে ভাইবোন। ছুটিতে আসা টম বোনের সাথে মাছ ধরতে এসেছে।আমিও ধপ করে বসেই পড়ি ওদের মাঝে।
সে এক মজার বিল। সে বিলের ধারে রামধনু রঙা শামুক চরে বেড়ায়। বালিহাঁস, পানকৌড়ি ঝুপ্পুস ডুব দেয়।আমি রঙিন মাছেদের ছাড়িয়ে দি টমের ছিপ থেকে বলি ‘পালাও, পালাও’। টম আর ম্যাগি টের পায় না।
মিটমিট চোখে দেখে সবুজ নরম কুমু। আমার বিছানায় আলসেমি করে সে পড়ে থাকে। কুমু বলে ‘যাবে নাকি সাঁতার কাটতে?’ আমি বলি ‘পারি নে যে”। কুমু বলে ” আমি নিয়ে যাব”।” তা কোথায় যাব?” ” আহা চলই না , সারা জীবন তো ভয় পেয়ে মরলে, ওই শোন ফেরিওয়ালা ডাকছে, স্বপ্ন ফেরি করছে, একটা স্বপ্নের মোড়া কিনতে হবে দাম দশ পয়সা” । আমি বলি ” বল কি কুমু, দশ পয়সা পাই কোথায়?” আর এই স্বপ্ন মোড়াটিই বা কি জিনিস?” কুমু বলে ‘ তোমাদের বসার ঘরের মোড়ার মিনিয়েচার. আর দশ পয়সা ভর্তি আছে তোমার কমলা রঙের ছোটবেলার পুতুলটার পেটের মধ্যে, সে ঘুমিয়ে আছে কালো তোরঙ্গে”। ‘ও বাবা এই দুপুরে তাঁর ঘুম ভাঙাব?’ ‘যাবে কিনা?’ কুমু রেগেমেগে চোখ পাকায়।তা আমিও ভয় পেয়ে খুলেই ফেললাম তোরঙ্গ। কমলা পুতুলের পেটে দশ পয়সাও খুঁজে পেলাম। পয়সা নিয়ে কুমুর কাছে যেতেই কুমু বলে ” উঠে পড় দেরি কর না, বুড়ো আবার হাঁক পেড়ে চলে গেল’। চেপে বসলাম কুমুর পিঠে, নিয়ে গেল সে বুড়োর কাছে। সে বুড়ো আমায় সবুজ স্ফটিকের একটি ছোট্ট মোড়া দিলে ওই বসার মোড়ার মিনিয়েচার আর কি। আমি বললাম ‘ তা বুড়ো তোমায় যেন চেনাচেনা ঠেকছে’ বুড়ো বললে ” দেখেছ দিদি তোমার সাথে আমার খোয়াই পাড়ে দেখা হয়েছিল’। ‘চল চল’ কুমু তাড়া দেয় ‘সবুজ মোড়া মানে আজ সমুদ্দুরে যেতে হবে সে অনেক পথ’। আমার ঘরের সবুজ দেয়াল পেরিয়ে সাঁতার কাটে কুমু। ওমা এ যে দেয়াল নয় সমুদ্দুর। হালকা সবুজ জলে ডুুবি আমি কুমুর পিঠে চেপে। আবার সে ভেসে ওঠে।
‘নীলের কোলে শ্যামল সে দ্বীপ ,প্রবাল দিয়ে ঘেরা
শৈল চূড়ায় নীড় বেঁধেছে সাগর বিহঙ্গেরা
নারিকেলের শাঁখে শাঁখে ঝরো বাতাস কেবল ডাকে
ঘন বনের ফাঁকে ফাঁকে বইছে নগ নদী…।’
এই ছবিখানি জলছবির মত ফুটে উঠতে না উঠতেই ‘ঠক’ করে আওয়াজ , গায়ের জামাটি ভিজে শপ শপ করছে। তোমরা ভাবছ তো স্বপ্ন দেখেছি দুপুরবেলা? ঘেমেনেয়ে উঠেছি আর মাথাটি বালিশ থেকে পড়ে গেছে?
না, মোটেই না। আমি কুমুর পিঠে চেপে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সমুদ্দুরের জলে জামা ভিজে গেছে আর কুমু এসে ঠক করে নামিয়ে দিয়েছে। বিশ্বাস না হয় কুমুকে জিজ্ঞেস কর সে এখন পুতির মত চোখ আধবুজে মিটিমিটি হাসছে। বড় পরিশ্রম গেছে তাঁর। আমায় পিঠে করে সাঁতার দেয়া কি মুখের কথা এ্যাঁ ?