ভারি চমৎকার একটা দৃশ্যে ডুবে রয়েছে রুমা। যেন দর্পণ-নগরী। যেদিকে তাকায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। তফাৎ শুধু সেই রুমারা বেশ হাসিখুশি, প্রসন্ন, পরিতৃপ্ত। তাদের মধ্যে থেকে নিজেরও ভেতরটা হাল্কা হয়ে গিয়েছে। কোনও চিন্তা ভাবনা নেই, হতাশা ক্ষোভ গ্লানি সব অদ্ভূদ প্রশান্তিতে উবে গিয়েছে। কিন্তু একটা কর্কশ আওয়াজ থেকে থেকে বিরক্ত করা শুরু করল। ক্রমশ আওয়াজটা চেনা গেল। অ্যালার্মের শব্দ, বেশ খানিক্ষণ ধরে থেমে থেমে বেজে যাচ্ছে। ঘুম ভাঙতে সোয়া আটটা হয়ে গেছে রুমার। সে কী! সাড়ে পাঁচটা ও সাতটায় দুটো অ্যালার্ম নির্ধারিত ছিল মোবাইলে। তখন থেকে বেজে গেছে, কিন্তু ওর ঘুম ভাঙেনি? অতীন গম্ভীর মুখে অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে। গুবলুর স্কুল আজ ছুটি। তাই বলে সোয়া আটটা?
স্কুলের দিনগুলোয় অতীন বা রুমা যার আগে ঘুম ভাঙে, মেয়ের জন্য ভাতেভাত চড়িয়ে দেয়। অতীন আগে উঠলে সিম আঁচে প্রেশারকুকার বসিয়ে রুমাকে ডেকে দিয়ে স্নানঘরে চলে যায়। আর রুমা আগে উঠলে ভাত বসিয়ে একে-একে চা করে, মেয়ে ও বরের জন্য টিফিনের ব্যবস্থা করে। তারপর রান্নার যোগাড় আছে, অতীন ভাত খেয়ে কাজে বেরোবে। অতীনও হাত লাগায় দরকারে।
তারপর মেয়েকে খাওয়ানো, হাগু করানো, ইউনিফর্ম পরানো, জুতোমোজা পরানো এবং গলি পেরিয়ে বড় রাস্তার মুখে নিয়ে গিয়ে স্কুলবাসে তুলে দেওয়া এসব কাজ পারতপক্ষে তার বাবাই করে। যেটা পারে না সেটা হল চুল বাঁধা। মাঝে মাঝে সেলুনে গিয়ে ছেলে কাট করে আনলে সে বালাই থাকে না। এরই মধ্যে রাতে রুটিন গোছানো না থাকলে স্নান খাওয়ার ফাঁকে মা বা বাবা কাউকে সেটা সেরে ফেলতে হয়।
অতীন মেয়েকে বাসে তুলে দিয়ে ফিরে আসার অবসরে রুমা বরকে অফিস পাঠানোর তোড়জোড় শেষ করে আনে। এর মধ্যে মাছ রান্না একটা পর্ব। যেদিন অতীন বাচ্চাকে স্কুলবাসে তোলার পর বাজার থেকে মাছ আনে, সেদিন একটা সংঘাত অবশ্যম্ভাবী। কারণ মাছ ভালো করে বেছে ধুয়ে রাঁধতে রাঁধতে অতীনের বেরোনোর সময় পেরিয়ে যায়। তখন একটি ডিমের পোচ বা ঝুরো দিয়ে শান্তিরক্ষা করতে হয়।
রুমা নিজেও বরের সঙ্গে গরম ভাত খেয়ে নেয়। আর অতীন ও গুবলুর টিফিনের জন্য করা পরোটা, রুটি বা লুচি নিজের দুপুরের খোরাক বাবদ ক্যাসারোলে রেখে দেয়।
রোজ রোজ সবকটা পদ টাটকা রাঁধেও না রুমা। কিছু না কিছু ফ্রীজে করে রাখা থাকে। গরম করে নিতে হয় খালি। তবু কেন যে সে সব কাজ সময়ের মধ্যে করে উঠতে পারেনা কে জানে? তার মধ্যে আবার কোনও কোনও দিন থাকে অতীনের তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা, যা হুমকিরই শামিল।
মেয়ের কাজ গুছিয়ে অতীন আধঘন্টা মতো যোগব্যায়াম করে। তারপর স্নান। বেরিয়েই “ভাত দাও”। মাছের কালিয়া, ডাল, চচ্চড়ি, তেতোর চক্কোরে একটু দেরি হলেই অশান্তি। রাগ তো হওয়ারই কথা। ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে বৌয়ের হাতেপাতে এত সাহায্য করার পরও কেন দেরি হবে? গজগজ করলেও রাগ করে ভাত ফেলে বেরিয়ে যায় না অতীন। একে নিজের খিদে সহ্য হয় না। তার চেয়েও বড় কথা সে জানে, সে না খেয়ে চলে গেলে রুমাও না খেয়ে থাকবে এবং গ্যাসট্রিক আক্রান্ত হয়ে ঝামেলা বাড়াবে।
তবে তাও ঘটেছে । না হলে আর অতীন এসব জানবে কী করে? তাদের বারো বছরের দ্বৈত জীবনে অতীনের পরিকল্পনাহীন ভাবে উড়িয়ে-ফুরিয়ে দেওয়া স্বভাবের সঙ্গে রুমার সঞ্চয়ী ভবিষ্যৎ চিন্তার সংঘাত বহুবার বেধেছে। খুব স্বাভাবিকভাবে তখন শ্বশুরবাড়ি, বাপের বাড়ি সংক্রান্ত কর্তব্যকর্ম, প্রত্যাশা, বঞ্চনা ইত্যাদি অপ্রিয় প্রসঙ্গও উত্থাপিত হয়েছে। ব্যাপারটা বার তিন চার ভাত না খেয়ে টিফিন না নিয়ে অফিস বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত গড়িয়েছে। না হলে রুমার সাংসারিক কাজে অপটুত্বজনিত সামান্য বিষয়ই ওদের দৈনন্দিন খচাখচির কারণ হয়ে থাকে; যার প্রভাব সন্ধ্যেবেলায় অতীন ক্যাথলিন বা মঞ্জিনিস-এর ক্যারিব্যাগ হাতে বাড়ি ফেরার পর আর জিইয়ে থাকে না। যেসব দিন সন্ধ্যেবেলায় রুমার ছাত্র পড়তে আসে, সেসব দিন তো অতীন নিজেই জলখাবারের ব্যবস্থা করে নেয়। বা দেরি হলেও রাগ করে না। আর কিছুমিছু কিনে ফিরলে তো সমস্যাই নেই।
আর একটা ব্যাপার আছে; তা হল নিজের কেরিয়ার নিয়ে যখন তখন যে কোনও প্রসঙ্গে রুমার হাহুতাশ করার বিশ্রী মুদ্রাদোষ। প্রথম প্রথম সহানুভূতি দেখিয়েছে, ইদানিং বিরক্ত লাগে অতীনের। বিয়ের বেশ কিছুদিন আগে দিয়ে রাখা ইন্টারভিউয়ের পরিপ্রেক্ষিতে একটা অধ্যাপনার কাজ পেয়েছিল জামশেদপুরের একটা ম্যানেজমেন্ট কলেজে। আজকাল অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল অব টেকনিক্যাল এডুকেশন-এর অ্যাফিলিয়েশন পাওয়া গাদা গাদা ম্যানেজমেন্ট শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গজাচ্ছে এদিক সেদিক। সেরকমই একটা। লেকচারারের বদলে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর শব্দটা বেশি শোনা যায়। চাকরিটার অফার পেয়েই রুমা জামশেদপুরের পাত্রকে হ্যাঁ বলেছিল। সেই সময় একটা সফট্ওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করত, সেলস্-এর কাজ। রাস্তায় ঘুরেঘুরে বিভিন্ন অফিসে গিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রয়োজনীয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, যার গাল ভরা নাম কর্পোরেট ট্রেনিং, সেটা নেওয়ার তদ্বির করতে হত। রুমার পছন্দ ছিল সফট্ওয়্যার ক্ষেত্রটা। কিন্তু দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে ঘুরে রোদে পোড়া, লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য দৌড়নো, আর ওপরওয়ালাদের ছ্যারছ্যার-ন্যারন্যার ব্যবহার এগুলো তার বরদাস্ত হত না। বিস্তর ম্যানেজমেন্ট কলেজে আবেদন করেছে। কলকাতার প্রতিষ্ঠানগুলো নাকি কেউ জবাবই দেয়নি। দিয়েছিল জামশেদপুরের এই ইন্সটিটিউট। দু-প্রস্থ সাক্ষাতকারের মাস পাঁচ-ছয় পর যখন সেখান থেকে জবাব এল তখন রুমার জন্য পাত্র দেখা চলছে। জামশেদপুরের পাত্র অতীন তখন তার দিদির বাড়ি আগরপাড়ায় থেকে কলকাতায় চাকরি করত। রুমার পিসির বাড়ি এঁড়েদায়। বিয়ের বিজ্ঞাপনে পিসির বাড়ির ঠিকানাই দেওয়া ছিল। অতীনের দিদি জামাইবাবু যোগাযোগ করায় সম্ভবত জামশেদপুরে হবু কর্মস্থলে শ্বশুরবাড়ি হবে বলেই রুমা সম্বন্ধটায় রাজি হয়েছিল। অতীনেরও মনে হয়েছিল কী দারুণ এক সমাপতন। যদিও মা, দাদা, দিদির খুঁতখুঁতুনি ছিল বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী একসাথে থাকতে পারবে না বলে, কিন্তু পাত্র পাত্রী কারোরই সেটা বড় সমস্যা মনে হয়নি।
বিয়ের আগেই একবার শ্বশুরবাড়ি ঘোরা হয়ে গিয়েছিল পাত্রীর ঐ চাকরির আহ্বানে। অতীনের বড়দাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার সংগ্রহ করার জন্য অথোরাইজেশন লেটার দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে কলকাতায় পিসির বাড়ি ফিরেছিল কেরিয়ারিস্ট হবু বৌ। সেই নিয়োগপত্র আর রুমার হাতে আসেনি। বিয়ের পর নতুন বৌকে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে খোঁজখবরও নিতে দেওয়া হয়নি। তার বদলে শুনেছিল কিছু পরস্পর বিরোধী সংবাদ। যেমন ইনস্টিটিউট বন্ধ হয়ে গেছে, ম্যানেজমেন্ট ঘুষ চেয়েছে ইত্যাদি। অতীনের এক হতচ্ছাড়া ছোটবেলার বন্ধুর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, পুজোর সময় জামশেদপুরে এক পুজো মণ্ডপে দেখা হওয়াতে খবর দিয়ে দিল, ঐ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ তো হয়ইনি, বরং ইউজিসির স্কেল দেওয়া শুরু করেছে। ব্যাস্! রুমা দুয়ে দুয়ে চার করে একটা ধারণা তৈরি করে বসে আছে।
বিয়ের পর দাদার সর্বময় কর্তৃত্বের প্রবণতা দেখে রুমার বর্তমানে সন্দেহ অতীনের দাদাই তার হওয়া চাকরির দফারফা করেছে। সুমন হতভাগা কেন যে খবরটা ফাঁস করে ইন্ধন যোগাতে গেল? রুমা যা সন্দেহ করে সেটা যে অতীনেরও হয়নি তা নয়, তাই বলে নিজের বাড়ি সম্পর্কে তেমন সন্দেহ প্রকাশ করা যায় নাকি? বরং অপবাদ খণ্ডন করতে আক্রমণের রাস্তাই বাছতে হয়। অতীন নিজেই তো জামশেদপুর থাকা কালে রুমাকে নিয়ে ঐ ইন্সস্টিটিউটখানা ঘুরে আসতে পারত। করেনি। আশঙ্কা যদি কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়ে। রুমা মাঝে মধ্যেই এই প্রসঙ্গ তুলবে।
বিয়ের পরেও কয়েকটা চাকরি পাবার মুখে অতীন বৌকে নিয়ে জামশেদপুরে রেখে এসেছে। তখন ওদের আজকের মতো মুঠো ফোন ছিল না। অতীনের দিদির ফোন নম্বরই বায়োডেটায় দেওয়া থাকত। কতবার অতীনের জামাইবাবু এসে রুমাকে ইন্টারভিউয়ের খবর দিয়ে গেছেন। কিন্তু বেশ কয়েকটা চাকরি জামশেদপুর থাকা কালে চলে যাওয়ায় ভোগে গেছে। কয়েকটির খবর পেয়েছে দেরিতে। তার মধ্যে পেয়েওছিল একটা। কিন্তু অতীনের বিয়ের পর পরই বদলির জন্য সদ্য যোগ দেওয়া চাকরি রুমাকে ছাড়তে হয়েছিল। তাই যোগাযোগের অভাবে চাকরি ফস্কানোর জন্য আফশোস তথা অতীনের গুষ্টিকে দোষারোপ করার একটা সুযোগ থাকছেই, এবং রুমা তার যারপরনাই সদ্ব্যবহার করে। অথচ চাকরি ছাড়তে অতীন মোটেই প্ররোচনা দেয়নি। কিন্তু অতীনের জামাইবাবু নাকি সদ্য-পরিণিতা শালার বৌকে নানারকম আস্বস্তিকর কথা শোনাত।
“স্বাধারণত বিয়ের পর ছেলেরা নতুন বৌকে ছেড়ে একা থাকতে পারে না। অথচ এদের দেখো। না অন্তুর হেলদোল আছে, না তার বৌয়ের চোখে এক ফোঁটা জল। তোরা ঠিকঠাক মতো সব করিস-টরিস ত? দুমাস হয়ে গেল, বাচ্চার তো সিম্পটম দেখছি না। দুজনেরই বেশি বয়সে বিয়ে? তোরা কি কনডোম ইউজ় করিস?”
কথাগুলো অতীনকে জানাতে গিয়ে রাগে অপমানে গ্লানিতে কেঁদে ফেলেছিল রুমা। অতীন কথা দিয়েছিল সমীরদার সঙ্গে কথা বলবে, যাতে রুমাকে উল্টোপাল্টা প্রশ্ন না করে যা জানার অতীনকেই প্রশ্ন করে। কিন্তু বলতে পারেনি স্বভাব মুখচোরা শালাবাবু। বরং দিদির বাড়িতেই বৌকে ফেলে রেখে ভুটান যাত্রা করে। জামাইবাবু সেই অবকাশে কৌতুহল মিটিয়ে নিত, “অন্তু আদর করে?” “তোর কাজু ভালো লাগে? দেখ অন্তুর কিশমিশ ভালো লাগে।”
যে কোনও কথা থেকে ঐসব প্রসঙ্গের অবতারণা করত অতীনের জামাইবাবু। কথায় কথায় কাঁধে ব্যথার জন্য ওজন তোলা ডাক্তারের বারণ – এইতুকু বলাতে জবাব আসে, “হ্যাঁ, অন্তুও তাই বলছিল শরীরে ওজন নেওয়া মানা।”
দাঁত চিপে কথাগুলো হজম করতে হোত। ঐ সময় শ্বাশুড়ীও মেয়ের বাড়িতে। তাঁর অনুমতি না পেলে ননদের বাড়ি থেকে মা বাবার কাছে যাওয়ার উপায় নেই। উপরন্তু রুমার চাকরি সন্ধানের জন্য কলকাতায় থাকাটাও জরুরি ছিল।
একে নিজের মন মেজাজ ভালো লাগত না। কত রাত বালিস ভিজিয়েছে। কিন্তু জনসমক্ষে নতুন বরের প্রতি বেশি দুর্বলতা দেখাতে লজ্জা লাগত। তার বদলে অশালীন খোঁচাগুলো হজম করত। শেষ পর্যন্ত কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়ি গিয়ে রক্ষা পায়। অবশ্য এজন্য শ্বশুরকূলে আলোচনার ঝড় বয়ে যায়। যদিও বেশিদিন ননদের বাড়ি থাকার জন্যও বারবার রুমার কাছে কৃতজ্ঞতা দাবি করা হোত। আর পিতৃকূলকে আবার বিবাহিতা কন্যার বাপের বাড়িতে থেকে যাওয়া নিয়ে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে নানা ব্যাখ্যা দিতে দিতে ব্যাতিব্যস্ত হতে হোত। তা সেখানেও সুস্থিরে দিন পনেরোর বেশি থাকা যায়নি। চাকরির সাক্ষাতকারের ডাক পেয়েই ননদের বাড়ি ছুটে এসেছিল। আর ঘটনাক্রমে সেটা পেয়েও যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নতুন যোগদান করা চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে বরেরই অনুগামী হতে হয়েছিল। ওপর মহলের পাস্পরিক দ্বন্দ্বের ফলে কর্মস্থলে ছিল নানা ধরণের অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা। তার চেয়ে বিয়ের পর তিন মাস ধরে মুলতবি থাকা মধুচন্দ্রিমা যাপন আর সেই সূত্রে পাহাড়ি দেশ ভ্রমণ – এগুলোই সারা যাক।
এর জন্য তখন অবশ্য রুমাকে তেমন আফসোস করতে দেখা যায়নি। তবে মাত্র ছ-সাত মাস কর্মজগতের বাইরে থাকার জন্য তার কষ্টার্জিত এমবিএ ডিগ্রীটাই বৃথা হয়ে যাবে রুমা ভাবেনি। অতীনও। ভুটান থেকে ফিরে আসার মাস কয়েক পরে লখনৌয়ের কাছে আর একটা ম্যানেজমেন্ট কলেজে ডাক পেয়েছিল। তখন অতীনের মতো রুমা বা তার মা বাবা কেউই তো তাদের সদ্য যুগ্ম জীবন ব্যহত করে আলাদা থাকার সম্ভাবনায় খুশি হতে পারেনি।
অবশ্য যুগ্ম জীবন যাপন করতে গিয়ে রুমা যে খুশির বন্যায় ভাসতে পেরেছিল, তাও নয়। বিয়ে করতে গিয়ে তখন অতীনের প্রভিডেন্ট ফান্ড ফুটুস। দিদির কাছে ধার, দাদার কাছেও ধার। সে সব শোধ করতে হবে। বড় বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য তার ছিল না। আগরপাড়ায় দু কামরার একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিল। সেই ভাড়াবাড়িতে একটা সামনের ঘর যেটা বসা ও শোয়া দুটো কাজেই লাগাতে হোত; আর একটা ভেতরের ঘর, যার লাগোয়া স্নানঘর ও সেটি পেরিয়ে রান্নাঘর। ছোট বাসায় রুমার মা-বাবা বোন – তিনজনকে শোয়া তো দূর, ঠিকমতো বসতেও দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁরা মেয়ের সংসার দেখতে এসে একবেলার বেশি থাকতে পারেননি। তাই নিয়ে মা-বাবা গোপনে দীর্ঘশ্বাস হয়তো ফেলেছিলেন, কিন্তু অভিযোগ করেননি। অতীনকে তো নয়ই, রুমার বিয়ের মধ্যস্থতাকারী রুমার পিসি পিসেমশাইকেও নয়। বরং অতীনের মা সরস্বতীদেবী একা মানুষ বলে বেশ কয়েকদিন থাকতে পেরেছিলেন। অথচ যত অসন্তোষ, তাঁরই – ছোট বৌয়ের ওপর তো বটেই, তার ঘরকন্নার দীনতার ওপরও কম নয়। ছোট বাসা ভাড়া যে তার নিজের ছেলের সামর্থ্য অনুযায়ী, এবং সেই নিয়ে তির্যক মন্তব্য করা মানে যে রুমাকে নয় নিজের সন্তানকেই ছোট করা, সেটা মা বা ছেলে কারও মাথাতেই ঢুকত না যেন। রুমাকে হিংস্রভাবে আক্রমণ বা অপমান করার যে কোনও অজুহাত পেলেই হল। যেন অমন দীনহীন বাসা ভাড়া নেওয়ার পেছনে রুমাই দায়ী, সে ইচ্ছা করে অন্তুকে ভালো ঘর ভাড়া নিতে দেয়নি। আবার পরক্ষণেই স্বামীর সবরকম অবস্থার সাথে মানিয়ে নেওয়ার লম্বা উপদেশ দিতেন, যেন অভিযোগটা রুমাই করেছে।
অভিযোগ অবশ্য অনেক ছিল। অতীনের ভুটান বদলি হওয়ার পর রুমাও প্রথমে কিছুদিন ননদের বাড়ি ও পরে মা-বাবার কাছে চলে যাওয়ায় সেই বাড়িটা মাস দুই বন্ধ পড়ে ছিল। মাতৃদেবীর আগমণে ভাড়াবাড়িটা দু’ সপ্তাহের জন্য মুখর হয়ে উঠলেও রুমার জন্য আনন্দমুখর বলা যায় না। শাশুড়ি ঠাকরুন রুমারফ হাত থেকে বেলনা কেড়ে নিয়ে বলেছিলেন, “তোমার কাজ আমার পছন্দ হচ্ছে না। ছেলেটা আমার না খেয়ে অফিস যেত”। জননীর সন্তুষ্টির জন্য সেই ২০০০ সালের বাজারেও সাত দিনের মধ্যে কুড়ি হাজার হাওয়া। বিদেশ ভাতার সৌজন্যে মাইনেটা এক লাফে কলকাতার তিনগুণ হয়ে গিয়েছিল। উপরন্তু ভুটান রওনা হওয়ার আগে অতীন রাহা খরচ ছাড়াও কিছু আগাম মাইনে পায়। কলকাতায় ফিরে অন্তু যে অগ্রীমের টাকায় কল্পতরু হয়েছে, টাকাটা যে অতীনের মাইনে থেকে কাটা যাবে, তা রুমা ছাড়া আর কারও বোঝার দায় ছিল না। যদিও অতীনের জামাইবাবু সমীরদা রুমাকে প্রায়ই রাশ টেনে ধরে সঞ্চয়ের উৎসাহ দিতেন, কিন্তু রুমার মধ্যে বিন্দুমাত্র সচেতনতা দেখলেই ব্যাঁকা-ব্যাঁকা কথা শোনাতেন। একান্তে শুভানুধ্যায়ীর মতো উস্কে দিয়ে পর মুহুর্তেই জনসমক্ষে এমন পাল্টি খেতেন যে ছোটো বৌয়ের ছোটো মন নিয়ে আলোচনা সভা বসে যেত।
তা সেই দুস্থ বাসার রান্নাঘরটাও যে সেপটিক্ ট্যাঙ্কের ওপর নির্মিত, সেটা আবিষ্কার করা গেল একবার পায়খানার প্যানে কিছু গোলযোগ দেখা দিতে রান্নাঘরের মেঝে খুঁড়ে সাফাই কর্মীরা কাজ করায়। রুমা বাসনকোসন, কৌটবাটা সব সরিয়ে নাকে মুখে রুমাল চাপা দিয়ে বাইরের ঘরে বসেছিল, কখন রান্নাঘরটা ফিরে পেয়ে সব ধোবে। ভালোবাসার বিয়ে নয়। সম্বন্ধ করে দুবারের বিজ্ঞাপণে প্রায় একশো আবেদন বাছাবাছি করে এই জীবনযাত্রা? নিজেদের নিম্ন মধ্যবিত্ত হিসাবেই মেনে নিয়েছিল সে। মধুচন্দ্রিমায় বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা দমন করতে হয়েছিল। তাই অতীনের ভুটানে কিছুদিনের জন্য বদলি হতেই সঙ্গে ঝুলে পড়তে চেয়েছিল শুরু থেকেই। গোড়ায় অতীন একটু গাঁইগুঁই করলেও শেষ পর্যন্ত ভাড়া বাড়িতে সদ্য পাতা অনাড়ম্বর সংসার গুটিয়ে বৌকে নিয়ে পাহাড়েই পাড়ি দেয়।
বিয়ের মাস দুয়েক পর মাস ছয়েকের জন্য অতীনের এই সাময়িক পোস্টিংটাই কাল হয়েছিল। সে সময় দুই বাড়ির সবাই বৌকে সঙ্গে জুতে দিতে চেয়েছিল। অতীন প্রথমটায় রাজি হয়নি। ওর যুক্তি ছিল, আগে ও নিজে ভুটানে গিয়ে থাকার আস্তানা খতিয়ে দেখে আসবে, তারপর বৌ নিয়ে বাসযোগ্য মনে হলে রুমাকে নিয়ে যাবে। অগত্যা রুমাকে ওর মা বাবার কাছে ফিরে যেতে হয়। কয়েক মাস পরে যখন দিন পনেরোর ছুটিতে অতীন কলকাতায় আসে তখন রুমাও মা-বাবার কাছে থেকে ফিরে ননদের বাড়ি এসে একটা সফ্ট্ওয়্যার কোম্পানিতে সদ্য যোগ দিয়েছিল। ইন্টারভিউয়ের খবরটা ননদাই সমীরদারই দেওয়া। কিন্তু চাকরিতে যোগদান করেও রুমার মন দ্বিধা-বিভক্ত। পছন্দসই ক্ষেত্রে পাওয়া কাজ হাতছাড়া করে অনিচ্ছুক জীবনসঙ্গীর পিছু নেবে? একা থাকতে পারবে না? একটা অবলম্বন তো জুটেছে। ননদের বাড়িতে বোঝা না হয়ে দরকারে একা একটা এক কামরার ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকবে। মনে চাইছিল অতীন সঙ্গে যেতে একটু হলেও জোর করুক। চাকরি পাওয়ার খবরে বরের মুখে “কনগ্র্যাচুলেশন” শুনে আনন্দর বদলে প্রবল রাগ হয়েছিল।
অতীন বৌকে জোর করার পক্ষপাতী না হলেও রুমার একা ভাড়াবাড়ি বা ফ্ল্যাটে থাকায় নির্দ্বিধায় মত দিতে পারেনি। একা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকা মানে গ্যাস ইলেকট্রিক বিল সব ঝামেলা একার কাঁধে। বরং বিয়ের আগে যে হোস্টেলে থেকে চাকরি করত, সেখানে গেলে অতটা চিন্তা থাকবে না। বৌ যে একটু অন্য জগতের বাসিন্দা, সেটা ঐ অল্প ক’দিনের সহবাসেই টের পেয়েছিল অতীন।
কিন্তু হোস্টেল? বাপ্ রে! সবাইকে কার্ড দিয়ে নেমনতন্ন করে সুখী সুখী মুখ দেখিয়ে এসে আবার ঐ সমস্যাদীর্ণ খ্যাঁচাটে মেরে যাওয়া মেয়েগুলোর সঙ্গে গিয়ে থাকবে? ওখানে থাকা মানে পারিবারিক সমস্যার অলিখিত আভাস। অগত্যা রুমা নিজেই অন্যের কথায় নাচতে নাচতে শ্বশুরবাড়ি ও বাপের বাড়ির সবাইকে খুশি করে আর অতীনের “কনগ্র্যাটস্”-কে ভেংচি কেটে সদ্য পাওয়া চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ঝুলে পড়েছিল। অতীন জোর করেনি, কিন্তু পারিপার্শিক অবস্থা করেছিল। তাই অতীনের নিরাসক্ত সন্ন্যাসী ভাবটা মেনে নিতে কষ্ট হলেও শেষ পর্যন্ত খানিক মান-অভিমানের পালা সেরে অফিসের ঝামেলাগুলোকে জোঝার বদলে অজুহাত বানিয়ে বরের সঙ্গে সোজা দার্জিলিং মেইলে চড়ে বসল।
অতীন আর রুমার পুরো সংসারটা ননদের একটা ঘর জুড়ে পড়ে ছিল টানা সাত মাস। বিয়ের সম্বন্ধ করার খেসারত হিসাবে ননদ-ননদাই সেই সময় কম হ্যাপা পোয়ায়নি অন্তু রুমার জন্য। রুমা হয়তো পরিস্থিতির চাপে কিন্তু স্বেচ্ছায় বরের সঙ্গে গিয়েছিল, কেউ সরাসরি জোর করেনি। কিন্তু কলকাতায় ফিরে এসে মনোমতো চাকরি না পাওয়ায় পরবর্তী কালে তার মধ্যে আফসোস শুরু হয়, যা এখনও শেষ হয়নি। রুমার বক্তব্য – অতীনের একা বাড়ি ভাড়া নিয়ে আপত্তি। চাকরি করার জন্য হস্টেলে ফিরে যাওয়া মানে ছিল পুনর্মুষিক ভব। আর দিদির বাড়ি? দিদি সম্বন্ধ করেছে বলে ভাইয়ের বৌকে রেঁধে-বেড়ে অফিস পাঠানোর দায়িত্ব কতদিন ভালো লাগত? তাছাড়া জামাইবাবুকে এড়ানোরও উপায় থাকত না, যার কাজ ছিল সুযোগ পেলেই সন্দেহ প্রকাশ, নতুন বৌকে ছেড়ে কোনও ছেলের নির্দ্বিধায় দূরে যেতে পারার অর্থ, সে বৌয়ের কাছে অমৃতের স্বাদ পায়নি বা নেয়নি। ভাড়াবাড়ির জানলা দিয়ে দিনেদুপুরে উঁকি মেরেও নাকি তেমনটাই মনে হয়েছে। কথাগুলো অতীনের বেশ কয়েকবার শোনা। সে উত্তর দেয় না। কিন্তু পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা রুমার প্রিয় অবসর যাপন।
এখন দশ বছর হতে চলল তারা কলকাতায় রয়েছে। এলেম থাকলে এতদিন কলকাতায় থাকার সুবাদে আর কিছু কি জোটানো যেত না? সরকারি চাকরির পরীক্ষাও তো দিয়েছে একাধিক বার। ডাব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় তো গ্রুপ সি উতরেও গেল, কিন্তু ইন্টারভিঊতে যদি ঠেক খায়, সেটা কি অতীনের দোষ? কতগুলো প্রাইভেট সংস্থায় আবার চাকরি পেয়েও অসুবিধাজনক শিফ্ট ডিউটি বা যাতায়াতের সমস্যা বলে পিছিয়ে গিয়েছে। নিজের অযোগ্যতাটা স্বীকার করবে না, শুধু হয় ভাগ্যকে নয় ঠারেঠোরে অতীনকে দোষারোপ করে মুখ তোম্বা করে থাকবে যখন তখন। কোনও পরিণত ভাব এল না মধ্য-তিরিশেও। বাইরের লোকের সাথে কথা বলতে বলতেও নিজের হতাশার গল্প শুনিয়ে ফেলবে। অথচ কেউ উপদেশ দিলে, বা চেষ্টার ত্রুটি বার করলে রেগে যাবে। আরে বাবা তুমি সুযোগ দিলে লোকে তো ফোকটে জ্ঞান দেবেই। কী দরকার বরের আপত্তির জন্য বালিগঞ্জে গিয়ে নাটকের মহড়া দিতে না পারার গল্প লোককে শুনিয়ে? নিজে কী চাও সেটা আগে ঠিক করো। তা নয়, বিজয়া বর্মনের টিমে অভিনয় করার সুযোগ পাচ্ছ বলে নিজের প্রাথমিক লক্ষ্যটা ভুলে অত দূর ছুটোছুটি করে রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরবে? আর এজন্যও হাহুতাশ!
ইদানিং প্রধান উপসর্গ মোটামুটি তিনটে। প্রথমত ঘরের কাজে কর্মে প্রবল অনীহা। কোনও রকমে রান্নাটা সেরে সারাটা দিন ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। এত অগোছালো সংসার যে মহিলা ও বাচ্চার ব্যবহার্য জিনিসপত্র না থাকলে আইবুড়ো ব্যাটাছেলের সংসার বলে ভুল হোত। দরকারি জিনিস খুঁজে পাওয়া যায় না, বসার ঘরে অতিথি এলে লজ্জায় পড়তে হয়। আর গৃহিনী মানসিক অবসাদের আড়ালে দিব্যি ঘুমিয়ে আয়েশ করে নিচ্ছে। ওদিকে অতীন অফিসেও খেটে মরবে আবার বাড়িতে এসেও কাজে লাগবে? তারও তো মন মেজাজ বলে কিছু আছে না কী? মাঝেমঝেই তাই ধৈর্য্যচ্যূতি হয়।
দ্বিতীয়ত মাথায় ঢুকেছে পর্দায় অভিনয় আর মডেলিং-এর ভূত। ছুটির দিনে ডাক এলে হয় অতীনের কাঁধে সংসার ফেলে কখনও একা কখনও সকন্যা ছুটছে। আর সেটা সম্ভব না হলে মুখ ঝুলিয়ে নিজের বন্দীত্ব জাহির করছে। বাড়ির সহযোগিতা পেলে নাকি ও অনেক দূর এগোতে পারত। যত সব! আর তিন নম্বর, লেখা। সেই নিয়ে তো হাহুতাশের শেষ নেই। ভালো কোনও জায়গায় ছাপছে না, সেকি অতীনের দোষ?
ওদিকে এই খিটিমিটির মধ্যে রুমার একমাত্র বিলাসিতা মেয়েকে স্কুলে আর বরকে অফিস পাঠিয়ে অবসর সময়টুকু বাড়তি গৃহকর্মে অপচয় না করে খবর কাগজের ক্রোড়পত্র খুলে ঘুম ঘুম চোখে সুডোকু করতে করতে বালিসে ঢুলে টুক করে কয়েক ঘন্টা ঘুমিয়ে নেওয়া। দুটো কুড়ির আগে গুবলু স্কুল থেকে ফেরে না। তাকে আনতে যেতে হয় দশ মিনিট হেঁটে বড় রাস্তায়। দেড়টার আগে উঠে তার খাবার-দাবার চটকে মাছ বেছে রাখলেই হল। নিজের মধ্যাহ্নভোজন কোনও এক ফাঁকে সারলেই চলে। সুতরাং গুবলু না ফেরা পর্যন্ত ঘুম, ফেরার পর রিকশায় চাপিয়ে বাড়ি এনে নাইয়ে খাইয়ে বুকে জড়িয়ে ঘুম পাড়াতে গিয়ে ঘুম, সে ঘুমিয়ে পড়লে বিকেল সাড়ে পাঁচটা-ছটা পর্যন্ত আধোঘুম আধো জাগরণে বিছানায় গড়িমসি।
বিকেলে আবার মেয়েকে দুধ কর্নফ্লেকস্ কলা কিংবা আপেলসেদ্ধ সহকারে টিভি দেখতে দেখতে গেলানো। বাচ্চাটার খেলাধূলো, পার্ক কিছুই হয় না। স্কুল থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লে বিকেলে খেলার সময় থাকতে নিজেও উঠতে পারে না, মাও চেষ্টা করে না। তাই ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে জমে চলেছে ইনডোর গেমস্-এর পাহাড়। সেগুলো খেলারও সঙ্গীও জোটে না। গুবলুর বিনোদন বলতে তাই মূলত টিভি। পড়াশুনো ফেলে অত্যধিক টিভি দেখলে বকাঝকা করতেও মায়া লাগে।