সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ১৫)

ইচ্ছামণি

পর্ব ১৫

কিন্তু অর্কর মার্জিত পদক্ষেপে নিজের উদ্যত পা মেলানোর আগেই দুড়দাড় করে অন্য কতগুলো অস্থির পদচারণা শুরু হয়ে গিয়েছিল। কুড়ি একুশ বছরের মরূভূমির মতো জীবনে হঠাৎ একাধিক মেঘ একসাথে জল নিয়ে বর্ষণ করতে হাজির হবে কে জানত? তাদের মধ্যে সবচেয়ে উৎসাহী আর তৎপর ছিল শঙ্কর মুখার্জি। অর্কদার প্রতি রুমার মনোভাবটা টের পাওয়া সত্বেও সরবে, ঢাকঢোল পিটিয়ে রুমার প্রেমে পড়ল। পাছে রুমা বন্ধুত্ব না রাখে, তাই রুমাকে নিজের অভিসন্ধি গোপন করে ‘স্পোর্টিং’ হওয়ার পরামর্শ দিয়ে উৎসাহী প্রতিপক্ষদের আটকানোর জন্য রুমার আড়ালে নিজেকে তার প্রেমিক হিসাবে রটাত। শঙ্করের বন্ধুমহলের আলোচনায় এমনকি তার হোস্টেলে থাকা রুমার ডিপার্টমেন্টের ছাত্রদের রসিকতাতে সন্দেহ হলেও খালি পেটে থেকে কেউ বিরিয়ানি খাওয়ার গল্প কেন করবে সেটাই মাথায় ঢুকত না। তাই শঙ্করকে মাঝেমাঝে বিরক্তিকর লাগলেও নিজের সন্দেহকে আমল দেয়নি, বরং সবার ভুল ভাঙানোর দায়িত্ব একা তুলে নিয়েছিল। বাপরে, সে কি পেছনে লাগা সবার! সমবেত র‍্যাগিং বলা যায়। যখন বুঝতে পারল ঐসব আলোচনায় ইন্ধন শঙ্কর ইচ্ছাকৃত ভাবে যোগাত, অর্থাৎ রটনার পঞ্চাশ শতাংশ ভুল নয়, তখন যা হারাবার হারিয়ে গেছে।
এক দিকে শঙ্করকে নিয়ে লাগাতার রসিকতার বিরক্তি, আর অন্যদিকে অর্কদার ভুল ভাঙাতে না পারার অসহায়তা অশান্তি। ভালোলাগার সূত্রপাত হয়েছিল মাত্র। এমন কোনও কথা হয়নি যার ভিত্তিতে অর্ক কোনও কৈফিয়ত চাইতে পারে অথবা রুমা আগ বাড়িয়ে সাফাই দিতে পারে। কিন্তু নীরবে সরে যাওয়ার আগে কি অর্ক সত্যি, মিথ্যা, রুমার মন ইত্যাদি একবার যাচাই করতে পারত না? নিজেকে সরিয়ে নিতে একটুও কষ্ট হয়নি? নাকি মুহূর্তে অন্য কাউকে ফিরে পাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল? অর্ক রুমার ‘দ্বিচারিতা’য় ঠেক খেয়ে প্রাক্তন প্রেয়সীর জন্য নাকি আবার ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। শঙ্কর রুমার কাছে শেষ পর্যন্ত সাড়া না পেয়ে হিংস্র উল্লাসে প্রাক্তনী চান্দ্রেয়ীর জন্য অর্কদার মুষড়ে পড়ার খবরটা রুমাকে দিয়েছিল। বদলে বুকে ছুরি মারলে কম কষ্ট হোত বোধহয়।
রুমার ভারি আশ্চর্য লাগে, দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আলাপ হওয়ার পর বন্ধুত্ব প্রেম এসবের পথ বেয়ে সারা জীবন একত্রবাসের মতো অবস্থায় পৌঁছায় কী করে। শেষ পর্যন্ত অর্করও তো সম্পর্কটা রুমা না হোক, চান্দ্রেয়ীর সঙ্গেও পরিণতি পায়নি। পরস্পরের মনের ভাবটা বুঝতেই কতটা পথ পেরোতে হয়? বোঝার পরও নিজেকে প্রকাশের আগে কত দ্বিধা, অপরজন কীভাবে নেবে ভেবে। পাকাপাকি সম্পর্ক চাইতে গিয়ে পাঁচ বার ভাবা – যদি ঐ পক্ষ রাজি না হয়। কে কতটা মন, কে কতটা শরীরের দিকে এগোচ্ছে, এই নিয়েও কত দ্বিধাদ্বন্দ্ব! আদিম কাল থেকে মানুষ ও মনুষ্যেতর প্রাণীরা আদিম প্রবৃত্তির দাস, নারী-পুরুষের রোমান্সের ইতিহাসও অর্বাচীন নয়, অথচ ‘আমি তোমার সাথেই ঐ সম্পর্কটা চাই’ এটা জানাতে এখনও এত জড়তা, এত লজ্জা! অর্ক কি চান্দ্রেয়ীর কাছে ফিরতে চেষ্টা করেছিল? চান্দ্রেয়ী কি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল? চান্দ্রেয়ীর জন্য কষ্ট পেল, রুমার কাছে কিছু জানারও ছিল না?
অবশ্য একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। অর্কর মতো আত্মকেন্দ্রিক ছেলের চেয়ে হাজারগুণ বড় মনের মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসাবে পেয়েছে রুমা। কিন্তু এই বড় মনটাও যে, বস্তুত এই অতিরিক্ত উদার মনটাই যে রুমাদের ভালোভাবে থাকার অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সমস্ত আত্মীয় স্বজনরা আখের গোছাবে, শুধু অতীন-রুমাদের কোনও উচ্চাশা থাকতে নেই। আবার না তাদের থাকাটাকেও কটাক্ষ করতে ছাড়বে না অতীনের আপনজনরা।
ভালো মানুষের সঙ্গে খুব ভালো থাকতে না পারার হতাশা থেকেই কি ঐ মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কেরিয়ারিস্ট হৃদয়হীনটার কথা রুমা আজও ভাবে? নিজের ওপর রাগ হয় – এতটা গুরুত্ব কি অর্কপ্রভ লাহিড়ীর প্রাপ্য? সে কি জানে তার একাধিক অ্যাফেয়ারের মধ্যে সংক্ষিপ্ত ও তুচ্ছতমটির দোসর তার কথা ভেবে কত রাত জেগেছে, কত বালিস ভিজিয়েছে, কত ঘণ্টা স্নানঘরের জলে চোখের জল ধুয়েছে। জানলেও কি তার এতটুকু আফসোস হবে? হবে না, বড়জোর একটু মুচকি হাসবে। অথবা আকাশ থেকে পড়বে, কে রুমা? রুমা জানে সবই। তবু মর্ষকামীর মতো ব্যথা পুষে রাখা। কখনও বা তাকে দেখিয়ে দেওয়ার হাস্যকর সুপ্ত বাসনা, “তোমার চেয়ে মানুষ হিসাবে অনেক ভালো কাউকে নিজের করে পেয়েছি। এবং সুখে আছি।”
নাহ্‌! গল্পটা দাঁড়াচ্ছে না। তার বদলে তিন মাস আগে লেখা দুটো পংক্তির পর আরও ক লাইন মাথায় এল। কিছুতেই এই পরের কথাগুলো ছন্দোবদ্ধ ভাবে খুঁজে পাচ্ছিল না এতদিন। শেষ পর্যন্ত একটা সরল কবিতাই বেরিয়ে এল।
পৃথিবীটা গোল, একদিন ঠিক দেখা হবে তার সাথে,
দিনভর এই স্বপ্ন দেখেছি, জেগেছি বিজন রাতে।
হয়তো সেদিন ধূসর হৃদয়ে বয়ে যাবে আনচান..
হয়তো সেদিন চিনতে পেরেও না চেনার হবে ভান।
কত ভুল জানা, কত ভুল বোঝা দিন হয়ে গেছে পার;
অনেক কিছুই হয়নি তো বলা, দরকারও নেই আর।
কয়েকটা হাঁচির পর নাক বন্ধ ভাবটা একটু কাটল। কাঁচা জল গড়ানো কমে এল। গলা-নাক জ্বালা ভাবটাও হালকা হয়ে এসেছে। কষ্ট কমে যাওয়ার অনুভূতিতে মাথাটা হালকা লাগে। একটা ঝিমঝিম ভাব। আবার স্নান করল রুমা। গা শুকোলো। রাতের খাওয়ার এতক্ষণ পরে ঘুমের ওষুধ নিশ্চই কাজ করবে। গিলে ফেলল। কাজু বরফিগুলো শেষ করে ফেললেই বা কী হয়? হলদিরাম তো আছেই। এগুলো অবশ্য অতীন যখন জামশেদপুরে মাকে পৌঁছে দিতে গিয়েছিল কদিন আগে, তখনকার আমদানি। রসিকলালের।

ক্রমশ….

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।