জন-জনি জনার্দন সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে তৃষ্ণা বসাক (পর্ব – ২১)

অণিমা, বাপ বন যায়ে- ভুল সবই ভুল

পর্ব ২১

সিনেমার গানের বেলায় একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যায়। হয়তো খুবই রদ্দি, লঝজড় মার্কা সিনেমা, তিনদিন পরেই হল থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার এক একটা  গান মানুষের মনে অদ্ভুতভাবে থেকে যায়। যেমন বিস্মৃত কোন কবির একটা কবিতা বা মাত্র দু-চার পংক্তি অমরত্ব লাভ করে, তেমনই বিস্মৃত সিনেমার এক একটা গান দীর্ঘদিন মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায়।কজন জানেন ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?/ কথায় না বড়  হয়ে কাজে বড় হবে’ এই কবিতাটি কবি কুসুমকুমারী দাশের লেখা, যাঁর আর একটা পরিচয়- তিনি কবি জীবনানন্দ দাশের মা? তেমনি মনে পড়ছে এই গানটা- ‘সেই গান, কেন আমি পারি না শোনাতে?/ যে গান ব্যথা হয় মানুষের কান্নায়, বুকভরা তার বেদনাতে/ যারা শুধু দিয়ে গেল, পেল না তো কিছু, তাদেরি যে ডাকি আমি পিছু, মোর গান খোঁজে তাদেরি সে কথা, কাল গোণে কার বরষাতে, সেই গান…/ যারা ওগো চিরতরে ভুলে গেছে ভাষা, পেল না তো যারা ভালবাসা/ মোর গান খোঁজে তাদেরি সে হাহাকার কত না শিশির ভেজা রাতে’ শিল্পী বাণী জয়রাম, ছবির নাম পম্পা।  মনে আছে, আমাদের বালিকা বয়সে রীতিমতো আলোড়ন ফেলেছিল এই গানটি। সিনেমাটি আমি নিশ্চয় দেখেছি, কিছুই মনে নেই, তবে একটি অনাথ বালিকাকে কেন্দ্র করে সিনেমা, পরিচ্ছন্ন ভাবে করা হয়েছিল, আর করুণরসের গল্প, খুব ছড়িয়ে না ফেললে হিট হবেই।তবে গানটি সিনেমাকে যাকে বলে আউটলিভ করেছে।আর একটি গানের কথা মনে পড়ছে, যার সঙ্গে আমাদের মফস্বল শহরটি জড়িয়ে গেছে অদ্ভুতভাবে।‘ভুল সবই ভুল/ এই জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা সব ভুল’। অতল জলের আহ্বানে ছবির এই গানটা একসময় সবার মুখে মুখে ফিরত।সুর-হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কথা- গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। গায়িকার নাম কেউ বলতে পারবেন? পারবেন না নিরানব্বই ভাগ লোক। সুজাতা চক্রবর্তী। তিনি যাঁর লিপে গানটি গেয়েছিলেন সেই নায়িকা তন্দ্রা বর্মণ, আমাদের শহরে তাঁর জন্ম, মামাবাড়িতে। কতবার তাঁদের পারিবারিক ওষুধের দোকান বর্মণ ফার্মেসির পাশ দিয়ে রিক্সা করে গেছি। তাঁর এক দাদা বসে থাকতেন সেখানে।এক দাদা অনিল বর্মণ ছিলেন নামকরা ক্রিকেটার। কৌতূহল হয়েছে কোথায় থাকেন তন্দ্রা, কেমন দেখতে এখন তাঁকে।বহুকাল জানতাম অতল জলের আহ্বানে তাঁর যেমন  প্রথম ও শেষ সিনেমা, গায়িকা সুজাতা চক্রবর্তীরও তাই। কিন্তু গুগল পিসে জানাল তন্দ্রা বর্মণ আরও কিছু ছবি করেছিলেন প্রায় আট নটা, তার মধ্যে তানসেন ও কেরী সাহেবের মুন্সীও আছে, এমনকি সত্যজিত রায়ের ‘অপরাজিত’ সিনেমায় অপুর প্রথম প্রেমিকা মিলির রোলে অভিনয় করেও সেই অংশটি বাদ পড়ে।এই খেদ তাঁর ছিল।পরে সংসারের চাপে তিনি চলে যান সম্পূর্ণ অন্তরালে।থাকতেন কলকাতা শহরে। ২০১৮ র ১৯ ফেব্রুয়ারি চলে গেলেন সমস্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে। একথা বলাই যায় তাঁর মুখ্য পরিচিতি অতল জলের আহবানের জন্যেই। সুজাতা চক্রবর্তীর ক্ষেত্রেও তাই।    
নায়ক সৌমিত্র চট্ট্যোপাধ্যায়, সঙ্গে ছবি বিশ্বাস। ১৯৬২ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির পরিচালক প্রখ্যাত অজয় কর। এটি আদৌ ফ্লপ ছবি নয়, বিস্মৃতও নয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এর গায়িকা ও নায়িকা দুজনেই আজ বিস্মৃতির অতল জলে তলিয়ে গেছেন, বেঁচে আছে গানটি। – 
‘ভুল সবই ভুল/ এই জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা সবই ভুল/ এই শ্রাবণে মোর, ফাগুন দেখা দ্যায় যদি, সবই ভুল।/ প্রশ্ন করি নিজের কাছে কে আমি। কোথায় ছিলাম কোথায় যাব এ আমি/ মেঘের ফাঁকে একটু চাঁদের ঐ রেখা, সে ভুল/চলে গেলে ডাকবে না তো কেউ পিছু/ স্মৃতি আমার থাকবে না তো আর কিছু/ যদি ভাবি এই আমি আর নই একা, সবই ভুল’ এ গানের প্রতি ছত্রে যেন দুই  বিস্মৃত প্রতিভাময়ীর বেদনা ।
গান বেঁচে আছে, শিল্পী হারিয়ে গেছেন বা তত সফল নন, এমন বেশ কিছু অবাঙ্গালি মহিলা শিল্পীকে মনে পড়ছে।বাণী জয়রাম তো বটেই। আরও আছেন  সুমন কল্যাণপুর(মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে,) ঊষা মঙ্গেশকর (ও ফুলের দল আমায় ক্ষমা করিস যদি কাল থেকে চলে যাব), চিত্রা সিং (মনে পড়ে যদি সব ছেড়ে হায়, চলে যেতে হয় কখনো আমায়, মনে রবে কী?)। তখন ভালো কোন ফিমেল ভয়েস উঠলেই কিছু মানুষ খুব উৎসাহিত হয়ে বলতেন ‘ঐ, আর দেখতে হবে না, লতার বাজার গেল’ তারপর যখন কিছুদিন পরে সেই নবাগতা বিশেষ সুবিধে করতে পারত না, তারাই বলত ‘হেব্বি পলিটিক্স করে মারাঠি বোন দুটো, কাউকে উঠতে দেবে না, সব একচেটিয়া করে রেখেছে’ এই কথা মার সামনে বললে তার আর রক্ষে ছিল না। আট বছর বয়স থেকে সে বালিকা একলব্যের মতো লতাকেই গানের গুরু মেনেছিল, লতার নামে কোন নিন্দা শোনা তার কাছে গুনাহ ছিল। যদিও প্রতিটি শিল্পীর গানই, সে ক্লাসিকাল, কি বাংলা বেসিক গান বা ফিল্মি গান সবই খুব ভালবেসে শোনা হত। 
গানের এই জনমোহিনী শক্তি ও চিরজীবিতার কথা পৃথিবীতে বোধহয় একমাত্র উপলব্ধি করে ভারতীয় সিনেমা,  সঠিকভাবে বললে মেনস্ট্রিম সিনেমা। সেই যে যাযাবর একবার লিখেছিলেন ‘বিষবৃক্ষের কুন্দনন্দিনী যদি বিষ খেয়ে মরার আগে যদি একখানা গান না ধরে, তবে সে শুধু নিজে মরে না, প্রোডিউসারকেও মেরে রেখে যায়’ সেই আপ্তবাক্যটি ভারতীয় সিনেমা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছে। এখানে জন্মালে গান, মরলে গান, বিয়েতে গান, বৃষ্টি পড়লে সাদা শিফন শাড়ি পরে গান, খরায় আকাশের দিকে চেয়ে গান, বন্যায় ভাসতে ভাসতে গান,প্রেম স্বীকৃত হলে গান,  প্রেমে দাগা খেলেও গান, এমনকি মরার পর, ভূতেদেরও প্রায়ই গান গাইতে দেখা যায়। 
এক অত্যন্ত বিখ্যাত পরিচালক,  সিনেমায় রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহারে যিনি অতি দক্ষ, তাঁর পরের দিকের কোন ছবি দেখে, যাতে সেই ম্যাজিক টাচ আর সেভাবে ছিল না, বাবা বলেছিল ‘এ তো আমাদের গ্রামের কেষ্টযাত্রা! দু মিনিট অন্তর গান!’ অনেক দুর্বল সিনেমায় গানের পিকচারাইজেশন এমন হত যে, হয়তো খুবই করুণ সিচুয়েশনের গান, কিন্তু দেখে হাসি পেত। কী যেন সিনেমায় তাপস পালের লিপে ছিল কিশোরকুমারের গান –‘তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণ যাত্রা যেদিন যাবে।’ আহা কী দরদ দিয়ে গেয়েছিলেন কিশোর! তাতে দেখানো হল তাপস পালকে মড়ার খাটিয়ায় বেঁধে মুনমুন সেনের বাড়ির সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে! বাংলা সিনেমার মরণ যাত্রা আর কাকে বলে!   
গান ছাড়া চলে না সিনেমা?এরকম এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে অনেকে ডুবেছেন। আবার আমাদের ছোটবেলায় যেগুলোকে আর্ট ফিল্ম বলা হত, সেখানেও গান ব্রাত্য ছিল না। সত্যজিত রায়ের অনেক সিনেমাতেই গান ছিল। তিনি তো গুপি বাঘা ও হীরক রাজার দেশে –এই দুই মিউজিক্যালই বানিয়ে ছিলেন।আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে মাদারহাট দত্তপাড়ার মেয়ে বউ ঝেঁটিয়ে সিনেমা দেখতে যেত। ফেরবার সময় তাদের পরিতৃপ্ত মুখে সিনেমার গল্প আর গলায় সেই সুরের গুনগুনানি। না দেখেও বলে দেওয়া যেত ছবি হিট।একবার এস ডি বর্মণ কে  যেন বলেছিলেন আপনার ‘তকদির সে তকদির’ গানটা তো বিড়ি বাঁধতে বাঁধতে গাইছে শুনে এলাম। ছি ছি!’ তাতে তিনি ধমকে বলেছিলেন ‘তার মানে আমার গান আমজনতার কাছে পৌঁছেছে রে মুকখু!’ আরে দাদা, যাহা আমজনতা, তাহাই তো ক্যাংলাসপার্টি! 
মূলধারার, মানে ক্যাংলাসপার্টির বাংলা সিনেমা  কোমায় চলে গেছে সেদিন থেকে, যেদিন থেকে সিনেমা দেখে  ফেরার পথে কেউ আর গান গুনগুন করে না । সেইসময় মারমার কাটকাট ফেলে দিল বেদের মেয়ে জোসনা (জ্যোৎস্না নয় কিন্তু, ওটা উঁচুতলার ভাষা)। অনেক দিন পর আবার মানুষ গাইতে গাইতে ফিরল ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় ভালবেসেছে/ আসি আসি বলে আমায় ফাঁকি দিয়েছে’ মনে রাখতে হবে  এইসব কাহিনীর জড় কিন্ত আছে আমাদের ময়মনসিংহ গীতিকা এবং নানা লোককাহিনীতে। সেই কাহিনীতে জল মিশতে মিশতে দুধের আভাসটুকুও নেই! দিকু মানে বাবুলোকরা নাক সিঁটকে বলেছিল, এ তো ফোটোগ্রাফড যাত্রা! কিন্তু এই বিপুল জনতরঙ্গের কারণ কী, তা নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রয়োজন মনে করেনি। যদি করত, তাহলে কলকাতা ও মফস্বলের হলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে শপিং মল কিংবা বিয়েবাড়ি হয়ে যেত না। এক একটা সিনেমা হল শুধু কিছু মানুষের রুজি রুটিই নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে কত গল্প, কত ইতিহাস। টিকিট কাউন্টার বাঁহাতে ফেলে একতলার দেওয়ালে কাচের বাক্সে সিনেমার স্টিল ছবি একের পর এক। চলতি এবং আগামী। সেসব দেখার উত্তেজনা ছিল আলাদা। ঐ যে আসিতেছে শব্দটি –কী উন্মাদনাই না নিয়ে আসত! আর এক টাকায় পাওয়া চটি সিনেমার বই।একেবারেই বটতলার লেখা ও ছাপা, যেখানে মধুবালা আর টুনটুনকে আলাদা করে চেনা যেত না, উত্তমকুমারকে  মনে হত নবদ্বীপ হালদার, সেই বইটিই কিন্তু ছিল আমাদের জীবনের সিনেমার বর্ণপরিচয়, মুগ্ধবোধ। হায় কোথায় গেল সেইসব বই? কারো কারো ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে হয়তো। 
সেসময় কিছু কিছু গান কেন যে আমরা (একেবারে যৌথ অজ্ঞানতা যাকে বলা যায়!)  উল্টোপাল্টা শুনতাম কে জানে! যেমন স্বপন যদি মধুর এমন –মান্না দের এই বিখ্যাত গানটির একজায়গায় আছে- জাগরণের বাস্তবে/ মানুষের কী কাজ তবে? , সেটা বরাবর শুনে এলাম- জাগরণের বাথটবে!তাই হয়তো জলেই পড়ে রইলাম আজীবন! ‘হাজার টাকার ঝাড়বাতিটা, রাতটাকে যে দিন করেছে, তারি নিচে বাইজি নাচে’ এটাকে একজন শুনত ভাইঝি নাচে!একবারও তার মাথায় আসেনি, খামোখা ভাইঝি এসে ঝাড়বাতির তলায় নাচবে কেন! আর আমাদের পুরো প্রজন্ম যে নাজিয়া হাসানের আলোড়ন ফেলে দেওয়া পপ ‘আপ জ্যায়সা কোয়ি মেরে জিন্দেগি মে আয়ে, তো বাত বন যায়ে’ কে বাপ বন যায়ে জেনে এল, এবং এটা শুনে বিনিপয়সায় একটা নিষিদ্ধ আনন্দ পেয়ে এল- এত বড় ঐতিহাসিক ভুল আর শুধরোনোর কোন উপায় আর নেই আমাদের!সেই বালক রবির স্কুল প্রেয়ার- কলোকি পুলোকি সিঙ্গিল মেলালিং মেলালিং মেলালিংর মতো। অদৃশ্য কনফেশন বক্সের সামনে এটাও বলে যাই, দৌড় শুরুর আগে গেম টিচার যে ‘অন ইয়োর মার্ক’ বলতেন, সেটা আমরা বহুকাল পর্যন্ত ‘অণিমা’ শুনে এসেছি! তা কি আমাদের স্কুলের কিংবদন্তি বড়দিদিমণির নাম অণিমা ব্যানার্জি বলে? 

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।