যখন ব্যথা ওঠে, মা জননী তখন শিলে সর্ষে বাটছিল। ভরা ভাদ্র। স্ফীত উদর ইলিশ সুন্দরী অপেক্ষা করছে কখন সেই সর্ষে বাটা দিয়ে তাকে রাঁধা হবে। সেইসময় বেয়াক্কেলের মত ব্যথা উঠল। আর বাবা, দেরি না করে টানা রিক্সায় চাপিয়ে মাকে নিয়ে গেল লেডি ডাফরিন কলেজে।কার্ড করাই ছিল। এই অব্দি সব ঠিকঠাক ছিল। কিন্ত পিকচার পুরা বাকি হ্যায় দোস্ত।এর মধ্যে গুহ্য কথাটা হল, মা তখন হসপিটালে যেতেই চায়নি।বলেছিল, ইলিশ কেটে নুন হলুদ মাখানো হয়ে গেছে, সরষেও তিন পেষ্ন মিহি করে বাটা রেডি, ঝালটা নামিয়ে চাড্ডি ভাত খেয়ে যাই!
কী ভাবছেন? যাঁরা যুগযুগ ধরে মাতৃত্বের গরিমা টরিমা নিয়ে ইস্কুলের রচনা খাতা থেকে সেমিনার কাঁপিয়ে এসেছেন, তাঁরা একটু টাল খেয়ে গেলেন নিশ্চয়। বললে পেত্যয় হবে না, ইলিশ মাছের জন্যে আমার জন্মটাই পিছিয়ে দিতে বসেছিলেন আমার মাতৃদেবী।আর এত বছ্র পর সেটা ভেবে আমার রাগ দুঃখ নয়, বেজায় মজা লাগছে। আমি তাঁর রসনার উচ্চমার্গীয় রুচির তারিফ না করে পারছি না। ভরা বর্ষার ইলিশের কাছে সংসার, সন্তান, রাজ্যপাট এমনকি জীবন পর্যন্ত তুচ্ছ। কে না জানে মহ্ম্মদ বিন তুঘলক আর বিবেকানন্দের (কন্ট্রাস্টটা ভাবুন জাস্ট!) শেষ আহার এই ইলিশ!
[তবে এইখানে একখান আক্ষেপ আছে। বাবা যদি মার ইচ্ছেয় বাধা না দিত, তবে আমারও ঠাকুর রামকৃষ্ণের মত উনুনের ছাই মাখা (প্লাস ভ্যালু অ্যাডিশন ইলিশের আঁশ রক্ত)একখানা অলৌকিক জন্মকথা থাকত! তবে ইচ্ছেকুসুম বলে কথা! জন্মে মাত্র ইলিশের রক্ত না মাখি, ইচ্ছের সুবাসটুকু তো ছিল। নিন্দুকেরা বলে এই জন্যেই নাকি আমার লেখায় এত আঁশটে গন্ধ!]
এই আমিই তো একবার ইলিশের জন্যেই গৃহত্যাগ করতে গিয়েও করিনি। সদ্য চাকরিতে ঢুকেছি। দুটো ট্রেন বদলে , নৌকো ছাড়া সম্ভাব্য সমস্ত স্থলযান চড়ে আপিস করি আর বাড়ি ফিরে মায়ের হোটেলে খাই-দাই। সে ভারি মজা। কিন্ত কয়েকদিন ধরে আর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না। এক আত্মীয়া এসেছেন সপরিবারে (খুবই নৈমিত্তিক ঘটনা মার সংসারে। অতিথি, অনাহুত, রবাহুত লেগেই আছে)। তাঁরা এসে আমার বালিশ বিছানা দখল করেছেন-এই অব্দি ঠিক আছে। কিন্ত তাঁদের শিশু সন্তানটি একটি মূর্তিমান বিভীষিকা, তার ভয়ে সেদিন ফেরার পথে আমি গৃহত্যাগের সঙ্কল্প নিই। শেয়ালদা স্টেশনে বসে , একের পর এক ডাউন ট্রেন ছাড়ছি। নাহ, বাড়ি আজ আর ফিরবই না। এদিকে খিদেও পেয়েছে। বেরিয়েছি সকাল আটটায়। দেখে এসেছি ইলিশ ও চিংড়ি সমাহারে (বাঙ্গাল-ঘটি মহামিলন) অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি। চোখের সামনে ভেসে উঠল সর্ষে ইলিশ আর চিংড়ি ভাপা। আমার আর গৃহত্যাগ করা হল না।পরের ট্রেনেই উঠে পড়লাম। হে পাঠক, এরপর আর কোন সন্দেহ থাকে, আমি ওই মায়েরই মেয়ে কিনা?
ওই দেখুন টুং টুং করে রিক্সাটি চলেছে। ডঃ জগবন্ধু লেন থেকে লেডি ডাফরিনের দিকে। কার্যত মায়ের ঘেঁটি ধরে নিয়ে যাচ্ছে বাবা, আর মা প্রায় রাবণের রথে চড়া সীতার মতই বিলাপ করতে করতে চলেছে ইলিশ খাওয়া হল না বলে। এইরকম আর এক পিস মা তামাম বাংলায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাংলা সাহিত্যে দেখেছি সব মায়েরাই অনাহারে থেকে বিস্তর কৃচ্ছ সাধন টাধন করে থাকেন।পুরুষতন্ত্রের চাপে মেয়েরা কিচ্ছুটি দাঁতে কাটে না – এরকম প্রায়ই শুনি। আমার মা কিন্ত বলতে নেই, নাঃ এখুনি খাওয়ার কথা না। খাবারদাবারের প্রসঙ্গ এলেই কেমন এলোমেলো হয়ে যাই, বরাবর লক্ষ্য করেছি।
রিক্সাটি ত বাবার আতান্তর এবং মায়ের বিলাপ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। মার শোক শুধু ইলিশের জন্যে বললে ইতিহাসের অপলাপ করা হবে। সংসারটি যে ছত্রাকার হয়ে পড়ে রইল। হাঁড়ি কুড়ি আঁশ চুপড়ি ডেগো-ডাবরি সমেত। আট বছরের ছেলেটি ইস্কুল থেকে ফিরে মাকে খুঁজবে। তার খাওয়ার চিন্তা নেই অবিশ্যি। বাবা, কাকা সবাই কোন যুগ থেকে কলকাতায় বাসা ভাড়া করে পড়াশোনা করেছে, রান্না বান্নায় তারা তুখোড়। বিশেষত বাবা সদ্য গ্রাম থেকে এসে বাজারঘাট করতে দিলে প্রায়ই পথ হারিয়ে ফেলত, তাই তাকে রান্নার কাজেই বহাল করা হয়েছিল। তার সেরা কীর্তি বৈঠকখানা বাজারে চারটে পাতিলেবু কিনতে গিয়ে বাড়ির পথ হারিয়ে ফেলা। রাস্তা হারিয়ে ফেলার ভয়ে কেউ রান্নায় শিফট করেছে – এটা এর আগে আমি শুনিনি। যাই হোক, ছেলে যে না খেয়ে থাকবে না এটা মা জানত, আর সে ছেলেও তো সেই বয়সেই খাওয়ার ব্যাপারে প্রবাদপ্রতিম। তার জন্যে নাকি তিনপো মোষের দুধ নেওয়া হত! তাছাড়া জানলায় বসে থেকে থেকে গলি দিয়ে যা যা হেঁকে যেত, তাই সে খেতে চাইত। ছোলাসেদ্ধ গেলে ছোলাসেদ্ধ, বাদামছাপা গেলে বাদামছাপা। কথিত আছে, ফেরিওলার হাঁকে প্রলুব্ধ হয়ে একবার সে জুতিসেলাই অব্দি খেতে চেয়েছিল!
এইরকম একটি সংসার এবং না রাঁধা ইলিশ ফেলে মাকে হসপিটালে ঢুকতে হল। ফেরার সময় কোলে নেংটি ইঁদুরের মত একটা মেয়ে(হায়, মা যা ছিলেন! মা যা হইয়াছেন!) চারদিকে তখন ব্যাপক বোমাবাজি চলছে। সত্তরের দশক মুক্তির দশক। লেডি ডাফরিন থেকে ডঃ জগবন্ধু লেন- কতটুকুই বা রাস্তা! কিন্ত সেটুকুই ফুরোতে চাইছিল না। হলফ করে বলতে পারি সেসময় ইলিশের শোক উবে গেছে, মেয়ে নিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফেরাটাই ছিল মার একমাত্র চিন্তা!