গল্পে অর্ঘ্য রায় চৌধুরী

নজরুল প্রসঙ্গ

নজরুলের সঙ্গে প্রথম পরিচয় “লিচু চোর” কবিতাটার মধ‍্যে দিয়ে। তখনও তাঁর কোন ছবি দেখিনি। তারপর যেদিন ছবি দেখলাম, সেদিন দেখেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ওই কাঁধ পর্যন্ত ঢেউ খেলানো বাবড়ি চুল। বয়স তখন সাত আট হবে। আমিও ওইভাবে চুল বড় করতে করতে প্রায় কাঁধে এনে ফেলেছিলাম। সে সব বহুদিন আগের কথা।
দাদুর কাছে শুতাম, সারা দুপুরটা গল্প শুনে শুনে কেটে যেত। একদিন নজরুল প্রসঙ্গ উঠল। দাদু বলল কলকাতায় কোন এক জনসভায় দাদু নজরুলকে খুব কাছ থেকে দেখেছে, এবং গান গাইতেও শুনেছে। আমার তো শুনে উত্তেজনা চরমে। জিজ্ঞেস করলাম “কেমন দেখতে ছিল?” দাদু বলল ” ভীষণ সুন্দর, গায়ের রং কালো, ব‍্যায়াম করা কুস্তিগীরদের মত চেহারা, বড় বড় চোখ।”
তার আগে ওবধি আমার কল্পনায় নজরুলের গায়ের রং দুধে আলতা ছিল। হঠাৎ কালো শুনে একটু থমকে গেলাম। কিন্তু গায়ের রং আমার শৈশবের নজরুল প্রীতিতে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি।
আস্তে আস্তে বড় হচ্ছিলাম। বাড়িতে রেকর্ড প্লেয়ারে বাজত “বাগিচায় বুলবুলি তুই, ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল।” কাজী সব‍্যসাচীর ওই উদাত্ত কন্ঠ, “আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দেব পদচিহ্ন।” আর নজরুলের সঙ্গে আরো পরিচিত হচ্ছিলাম। তাঁর গানে, কবিতায়, টুকরো টুকরো জীবনীতে। এই করতে করতেই একদিন কবির জীবনীগ্রন্থ হাতে এসে গেল। আরো অনেক কিছু জানতে পারলাম। দেখলাম শেষ বয়সে কবির সেই অসহায় ছবি। ওই ঢেউ খেলানো বাবড়ি চুল আর নেই। দুই চোখে উদভ্রান্তের দৃষ্টি। মনে আছে ছবিটার নীচে ক‍্যাপশন ছিল “ফুলের জলসায়, নীরব কেন কবি।”
ভীষণ মজার এবং বেপরোয়া লোক ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথম দেখা করতে গিয়ে ঠাকুরবাড়ির বারান্দা থেকে হাঁক পাড়তে পাড়তে ঢুকেছিলেন “দে গরুর গা ধুইয়ে।” রবীন্দ্রনাথ তাতে রুষ্ট তো হনইনি। উল্টে খুশী হয়ে ভালো করে লুচি আলুরদম আর মিষ্টি খাইয়ে দিয়েছিলেন। নজরুলের সঙ্গে ছিলেন সজনীকান্ত।
এরপর আমার হাতে যা এলো, তা আমার কাছে এক বিস্ময়। মামাবাড়ির এক পুরনো ট্রাঙ্ক থেকে হঠাৎ বের হল নজরুলের স্বহস্ত লিখিত বেশ কিছু চিঠি। চিঠিগুলো লিখছেন আমার দাদামশাই প্রফুল্লকুমার সেনগুপ্তকে। দাদামশাই ঢাকাতে থাকতেন, কবিতা লিখতেন, এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন।” হাতের লেখা ছোট এবং টানাটানা, সুন্দর, বয়ান অতীব সরস। একটা চিঠি আমার এখনও মনে আছে, কবি লিখছেন,
” প্রফুল্ল,
গতকল‍্য তোমার পত্র পাইয়াছি। উত্তর প্রদান করিতে বিলম্ব হইল, কারন তুমি তো জানোই “অন্নচিন্তা চমৎকারা।” আর এই দরিদ্রের গৃহে যেই অন্নপূর্ণাটি বিরাজ করিতেছেন, তাহার উপর আমা ন‍্যায় এই অর্বাচীন কবির অত‍্যাচার তো কিছু কম পড়ে না। আপাতত গান বিক্রয় করিয়া চলিতেছে। পরবর্তীতে যাহা হইবে পয়গম্বরই অবগত আছেন।”

আশীর্বাদক
কাজীদা।

এই ধরনের বেশ কিছু চিঠি। এই সম্পদ যে আমার মামাবাড়িতে এতদিন ধরে পড়ে আছে সেই প্রথম জানলাম। শুনেছিলাম ঢাকা শহরে নজরুল, বুদ্ধদেব বসু, সজনীকান্ত প্রভৃতি মহারথীদের আড্ডার আমার দাদামশাইও এক সদস‍্য ছিলেন। পরে ওখান থেকে অচিন্ত‍্যকুমার এবং নেলী সেনগুপ্তর চিঠিও পেয়েছি। তবে সে অন‍্য প্রসঙ্গ।
ওই চিঠিগুলো পাওয়ার পর আমার নজরুল সম্পর্কে ঔৎসুক‍্য আরো বেড়ে গেল। দাদামশাই তখন আর নেই। দিদিমার কাছে ওনাদের গল্প শুনতাম। বহু অপঠিত অলিখিত ঘটনা এভাবেই একদম প্রত‍্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে জানার সৌভাগ‍্য হল।
দিদিমা বলেছিলেন, “কাজীদা ভীষণ পান খেতেন। আড্ডা দিতে বসলেই সামনে একটা ছোট রেকাবিতে আট দশটা পান সাজা থাকত। আর আড্ডার ফাঁকে ফাঁকেই ওনার গান ভেসে আসত। খুব যে ভরাট গলা, তা না। কিন্তু এমন একটা গায়কি, যে গান শুরু করলে মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতে হত।”
এখন দিদিমাও আর নেই। বড় আফসোস হয়, আমি যদি ওই সময়টাতে জন্মাতাম।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।