এখন অফিস টাইম । দিগন্ত হড়বড়িয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে । ওর মাথায় কোনো ছাতা নেই যে ছায়া দেবে । ছায়া এক রকমের হয় না , কারন অনেক রকম ছায়ায় ওর দিন পেরিয়ে যায় । রৌদ্রের প্রখর ছায়া , বৃষ্টির ভেজা ছায়া , কখনও গাছ-গাছালির ঘন ছায়া । আর ভাবে এই চাকরিটাও ছাড়বে । মাইনে হতে এখনও দেরী । গত মাসে যে তারিখে মাইনে হয়েছিলো ,এ মাসে তারও সাত-আট দিন পরে হবে । আগের মাসে তারও আগের মাসের থেকে আট দিন পরে মাইনে দিয়েছিলো । এভাবে প্রতিমাসে সাত-আট দিন করে খেতে খেতে কোম্পানি নতুন চাকরিতে দিগন্তর এক মাস হজম করে দিয়েছে । এটা দিগন্ত হিসেব করে দেখলো । আরও দেখলো যে এটা তার চতুর্থ চাকরি ছাড়া হবে । তার আগে একটা সু্ট্যেবল্ কিছু….., তার জন্য চেষ্টা শুরু করতে হবে । দিগন্তর মাথায় কোনো ছাতা নেই । মাঝে মাঝে তাই ওর মনে হয় , মহাশুন্যে যেন কোনো মাচার উপর বসে আছে । নীল আকাশ , নীলকান্তমণি যেন নিজেরই স্বরূপ ।
যদিও পকেট হালকা , তবুও এসব ভাবনাকে মন কোনো পাত্তা দিচ্ছে না । ভিতরে কেমন এক শীতল ফুরফুরে বাতাস খেলে বেড়াচ্ছে । মাথার উপর প্রথম আশ্বিনের ঝাঁঝালো রোদ্দুর ,চার পাশের হাওয়ায় উৎসবের আমেজ । দিগন্ত পিঠের ব্যাগ সামনে নিয়ে হাতড়ে দেখলো , আজ ছাতাটা ভুলে গেছে । ওটা থাকলে মাথাটা বাচিয়ে আরামে পথ চলা যেত । হঠাৎ মনে এই ভালোলাগার উৎস কি ? কারন কি? বাতাসের গন্ধ বলছে , সব সেরা উৎসবটা খুব কাছেই । এবারে তিনটে পুজো সংখ্যায় তিনটে কবিতা থাকছে দিগন্তর । কিন্তু কবিতা আর কে পড়ে ? তারপর তো তা মনে রাখার প্রশ্ন ! মনে রাখার মতো কবিতা যে কবে লেখা যাবে …. আসলে মাঝে মাঝেই পালিয়ে অক্ষরের গুহায় ঢুকে পড়া । তারপর গভীর , ঘন অন্ধকার গুহার মুখ দিয়ে যে টুকু আলোর আভাস সেটাও ছাতা খুলে বন্ধ করে আরও একলা হওয়া , ভিতরে শুধু অক্ষর আর অক্ষর , । এ জীবন তো হলো রুজি-রুটির চিন্তার জন্য , সবটাই শুষে নেবে । তারপর একদিন মরে যাবে । মরে গেলে ওকে শ্মশানে নিয়ে যাওযা হবে । তাই মাঝে মাঝেই এমন পালিয়ে বাঁচা ।
দিগন্তর মনে পরে সঞ্চারিকে । একদিন হঠাৎ দুজনে চুর্ণী নদী দেখতে । তখন সন্ধ্যে নামতে কিছু দেরী । চরাচর শুন্সান্ । দিনের ক্লান্তি শেষে সব জিরোচ্ছে । নদীর বেশীর ভাগটাই শুকিয়ে তল বেরিয়ে পড়েছে । দুজনে তীরে দাঁড়ায় , সঞ্চারি বল্ল , “প্রতিটা জীবনের পাশেই একটা নদীর প্রয়োজন ।” দিগন্ত , ” প্রতিটা শ্মশানেরও তাই । ” সঞ্চারি , ” প্রবল বর্ষনে এই নদীতেও বান ডাকবে ” । দিগন্ত , ” কিন্তু মাথা ভেজানো যাবে না , ছাতা আছে যে ….” সঞ্চারি মৃদু হেসে গুনগুনিয়ে উঠল , ” আমার দিন ফুরলো ব্যকুল বাদল সাঁঝে , গহন মেঘের নিবিড় ধারার মাঝে । ” দিগন্ত ঝুঁকে রাস্তার ধারের জংলা গাছ থেকে একগুচ্ছ পাতা ছিরে যাও পাখি বলে উড়িয়ে দিলো , পাতা গুলো আকাশে ডানা মেলল । ক্যারিয়ারের গলি-ঘুঁচির কোনো বাঁকে সঞ্চারি কবে কোথায় কিভাবে হারালো ,তা আজ আর মনে পড়ে না । কখন প্রথম আশ্বিনের আকাশ মেঘে কালো হয়েছে দিগন্তর খেয়াল নেই । বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে পড়তেই তাড়াতাড়ি ফোনটা ঢোকাল , সঞ্চারির নাম্বার খুঁজে পেলো না । ফোন চেঞ্জের সময় ওটা আর ভুলে সেভ করা হয় নি । ছাতার জন্য ব্যাগটা আবার ব্যর্থ হাতড়ালো । আকাশের মেঘ ভেতরটাও কখন ছেয়ে ফেলেছে । ভিজতে ভিজতে দ্রুত বাস স্ট্যান্ডের দিকে । একমাত্র বৃষ্টির মধ্যেই যে আছে ভেজা চোখ লুকিয়ে ফেলার প্রবল ঝোঁক । দিগন্ত গতি কমিয়ে দেয় , বৃষ্টিতে শরীরটাকে ভালো করে সেঁকে নিতে নিতে এগোয় । ছাতার জন্য দু:খ কি ? কবি মহাদেব সাঁই এই বর্ষাকেই চে গুয়েভারার জন্ম দিন বলে চিহ্নিত করেছেন ।
বাস স্ট্যান্ডের ছাদের নিছে দাঁড়ায় । সারা শরীর চুঁইয়ে জল বইছে । কেমন লজ্জা লজ্জা , এমন কাক ভেজা আর কেউ নেই । ভেতরে না ঢুকে দিগন্ত সামনেই দাঁড়ায় । বাস এলেই তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে হবে । রাস্তা দিয়ে বাইকে দুজনে এই বৃষ্টিতে । ছেলেটা ঝুপ্পুস ভিজছে , মেয়েটা পেছনে একটা ছাতা খুলে সামলানর চেষ্টায় । গাড়িটা ধীরে গড়াচ্ছে । স্ট্যান্ডের সবাই ওদের দিকে । বাইকের গতি বাড়ে । মেয়েটা ছাতাটা উপরে তুলে হাওয়ায় ঊড়িয়ে দেয় , ছেলেটাকে জোর জাপটায় । বৃষ্টির জোয়ারে ভাসমান ওরা সব চোখ শেষ পর্যন্ত টেনে রাখে । দিগন্ত চোখ ফেরায় , ছাতাটা রাস্তার ধারে গাছের নিচু ডালটায় উড়ে এসে আট্কে । জল , হাওয়ার ঝাপ্টায় ডাল থেকে উড়ে ঝপ্ করে মাটিতে । আবার উড়ে চলে যাচ্ছে । ছাতার এলোমেলো গতিপথ যেন এক প্রাচীন পথরেখা , তা আবার হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য ডিজিটাল সড়করেখায় । নাকি ও দিগন্তকে কোনো পথনির্দেশ করছে । জমি , গাছ , ল্যাম্পপোষ্ট , সড়ক , আবার আকাশ , ডিভাইডার , আবার আকাশে উড়ে উড়ে ছাতাটা ভাষা বিন্যাসের গতিপথ এঁকে চলেছে । হয়তো এ কোনো পথ নির্দেশ অথবা অনির্দেশিত । অনির্দেশিত ভ্রমনের কিন্তু কোনো গন্তব্য থাকতে নেই । দিগন্তর ইচ্ছে হলো ছুটে গিয়ে ওটাকে আটকায় । ওর এলোমেলো চলন একার পৃথিবীতে , যদিও পৃথিবীতে একার পৃথিবী বলে কিছু হয় না । সে কোন ছোটোবেলার কথা , স্কুলের ছুটির পরে মার সঙ্গে বাড়ি ফেরার সময় হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি , মা সঙ্গের ছাতাটা খুলতেই দম্কা ঝড় ওটা উড়িয়ে নিলো । মা ছাতার পেছনে দৌড়চ্ছে ,আর ছোট্ট দিগন্ত এমনই ভিজেছিলো । ওটা এবার উড়ে এসে রাস্তার ডিভাইডার আর ল্যাম্পপোষ্টে ঠোকাঠুকি , ঘসাঘসি । রংটা খুব সুন্দর । বাবার অফিস জীবনের শেষ দিন ফেয়ারওয়েলের লম্বা ছাতা নিয়ে ঘরে ঢুকতেই মা ঝেঁঝিয়েছিলো , সারাজীবন তো ছাতা -মাথা মাইনে পেলে , তা শেষে একটা ভালো রঙিন ছাতা দিতে পারলো না ! আসার মতোই ঝড়-বৃষ্টি না বলেই চলে গেলো । ক্লান্ত ওটা রাস্তায় এলোমেলো লুটোচ্ছে । একদিক উল্টে , কাপড় ছিঁড়ে , ভিতরের সিকগুলো রুগ্ন হাড়ের মতো । তবে আসমানি নীল কাপড়টা এখনও জ্বলজ্বলে । রাস্তার জমা জল গাড়ির চাকায় বার বার আছড়ে পড়ছে ওর আহত শরীরের উপর । রংটা যেন ছোটোবেলার সেই … এছাড়াও তাতে ছিলো হলুদ , সবূজ , লাল …. । এত্ত বৃষ্টি ভেতরটা কেমন শুকিয়ে দিয়েছে ।
প্রায় ফাঁকা একটা বাস , দিগন্ত উঠে পড়ে । ফাঁকা সিটে বসতে গিয়েই একটা লেডিস ছাতা ! কেউ ভুল করে । দিগন্ত বসে ওটা ভালো করে নেড়ে চেড়ে দেখে । বৃষ্টি থেমে গেলে এ কি তবে মূল্যহীন ? ভেজা কিন্তু যত্নে গোটানো । রংটাও দারুন , হাল্কা পিঙ্কের উপর লাল নীল ফুল । হয়তো সে যত্নবান এবং সৌখিন , হয়তো এই রঙিন ফুলগুলো যেমন তার হাসিটা তাই এত যত্ন , হয়তো কোনোদিন দেখা হবে । মানে আবার ও দেখা হবে , আরও আরও দেখা হবে । তাকে কি আর অচেনা , অপরিচিতা বলা যায় । দিগন্ত অবয়ব থেকে নিরাবয়তায় আবার ভেসে যেতে থাকে । জানালা দিয়ে দেখে , মেঘ-রদ্দুরের কম্বিনেশনে আকাশের এপ্রান্ত ওপ্রান্ত মস্ত এক রামধনু , পৃথিবীর ছাতার মতো । দিগন্তর কোনো ছাতা নেই ……