আলপনা গলা ফাটিয়ে চেঁচায় । খিস্তির বন্যা বয় তার মুখ থেকে । কোথাও এক বিন্দু মাটি ছাড়তে রাজি না মেয়েটা ।
ইস্কুলের গেটের সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নানান সাজের নানা রঙের তরুণী বাহারি মায়েরা বিরক্তিতে ঠোঁট চিপে মুখ ঘুরিয়ে নেয় । এদের মুখের ভাব মাছের বাজারে দাঁড়ালে গন্ধে যেমন হয় ঠিক তেমনি । রুমাল নেড়ে দুচারজন ফিসফিস করে বলেও ফেলে , ডিসগাস্টিং !
তবে ওই ভয়ে ভয়ে ফিসফিসই । জোরে বলার সাহস নেই কারো । কি করে থাকবে ? কানে গেলে সেই মুহুর্তে যে হিংস্র ভাষা এবং ভঙ্গীতে আক্রমণ করবে এ প্রাণীটি ভাবলেও ভদ্রঘরের গৃহিনীরা শিউরে ওঠেন । কাজেই সবাই বিরক্তি প্রকাশ করে লুকিয়ে , ভয়ে ভয়ে ।
দক্ষিন কলকাতার বিখ্যাত ইংরেজীমাধ্যম স্কুলের নার্সারি বিল্ডিং এটা । এত ছোট বাচ্চাদের স্কুলবাস বা কারপুলের গাড়িতে অ্যালাউ করেনা ইস্কুল । তাই মায়েরা এসে দাঁড়িয়ে থাকেন নিয়ে যাবেন বলে যার যার ছানাকে ।
অনেকে সখেও দাঁড়িয়ে থাকেন সকাল থেকেই । বাচ্চাকে ইস্কুলে পৌঁছে আর বাড়ি ফেরেন না । একেবারে ছুটি হলে নিয়ে তবেই ফেরেন । অর্থনৈতিক উপযোগিতাও একটা আছে । চারবারের জায়গায় দুবার যাতায়াত করলে পয়সা , পরিশ্রম দুটোরই সাশ্রয় হয় ।
আর যেটা হয় সেটা কোন গৃহকর্মনিপুনা স্বীকার করবেন না । একটু নিঃশ্বাস নেওয়া হয় । নতুন জামা , অন্যরকম ওড়নাটা কেনা হল , এই কলমকারির হাল ফ্যাশান , ব্র্যান্ডেড নখপালিশ , দেখাই কাকে ?যতই বল যতই কও , আরেকজন কেউ দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রশংসার চোখে কি সুন্দর দেখাচ্ছে বললে তবেই ত সাজগোজ প্রসাধনের আনন্দ । সব সময় কি আর লোক মুখে বলবে ? তা নয় । দৃষ্টিতে ফুটে উঠবে প্রশংসা , তবেই না আত্মার আরাম ; প্রাণের শান্তি।
এখনকার ছোটোখাটো সুখী পরিবারে একটি দুটির বেশি ছেলেপিলে ত নেই। কাজেই বেশির ভাগ বউদের সংগে থাকেন শ্বশুর আর শাশুড়ি , খুব জোর এক পিস দেওর আর জা । কোন কোন বাড়িতে হয়ত দেওর নেই ননদ , বিয়ে হয়ে গেছে, সপ্তাহে দুসপ্তাহে একবার বরসহ এসে ঘুরে যায় । এই দু একটি মানুষকে কত কি আর দেখানো যায় । আর তারা রোজকার দেখা বউকে ফিরে ফিরে দেখে কি ? তার থেকে , কই চা কি হল ; বলে তাগাদা মারতেই ব্যস্ত থাকে ।
বাইরের পৃথিবীর আলোবাতাস মানুষজন সবকিছু দেখার মুক্তি একমাত্র বাচ্ছাদের ইস্কুলে আসার ফাঁকে । তাই ইস্কুল বাচ্ছাদের থেকে মায়েদের অনেক বেশি পছন্দের জায়গা ।
আবার অন্যরকম প্রতিযোগিতাও আছে । কে কত বুদ্ধিমতী স্মার্ট ডেডিকেটেড কি করে টের পাওয়া যাবে ? তাদের বাচ্ছাদের দেখেই না ?
খাতা ,বই , হোমওয়ার্ক, আঁকার খাতা , খাতার পাতায় গুড ভেরি গুড সবকিছু নিয়ে কম্পিটিশান চলে ।
কে না জানে স্মার্ট মায়েদের বাচ্চারাই ভাল পারফর্ম করে । তাদের সংগেই আন্টিরা হেসে হেসে কথা বলেন ।ছুটির মুখে দরজার সামনে ঠেলাঠেলি একটু বেশিই হয় । আন্টি যদি কিছু বলেন কাউকে সে কৃতার্থ । তার পাশের সবাই , কি বললেন রে , কি বললেন গো বলে ঘিরে ধরবে । সেদিনের জন্য সেই মা সেলেব্রিটি ।
ওই দিন দোষের মধ্যে অয়নের মা আসতে পারেনি , বাড়িতে পিসিরা এসেছে , তাই ওর বাবা নিতে এসেছিলেন । সামনে আলপনা দাঁড়িয়ে , উনি বাচ্চারা কে বেরচ্ছে দেখতে পাচ্ছেন না বলে , বলেছিলেন , “ একটু সরে দরজাটা ছেড়ে দাঁড়ান না , বাচ্চাকে দেখতে পাচ্ছিনা , আন্টি কার নাম ডাকছেন সেও যদি শুনতে না পাই বাচ্চাটাকে ত আবার ভিতরে ক্লাসে পাঠিয়ে দেবে সবার পিছনে ।”
আলপনা , “ এইসব ছোটলোকগুলো ইস্কুলে কেন আসে রে –” বলে শুরু করে একেবারে , “ আমার সঙ্গে লাগতে এলে প্যান্ট খুলে নেব ”- তে গিয়ে থামল । ততক্ষনে সব্বাই সরে গেছে ওর চারপাশ থেকে । অয়নের বাবা বহুদূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন । ঠিকই করে ফেলেছেন , ছেলের কষ্ট হলেও কিছু করার নেই ; সবাই চলে গেলে তারপর আন্টির কাছ থেকে চেয়ে নেবেন ছেলেকে ।
আলপনা চারপাশের মায়েদের সরে যেতে দেখে খানিক একাই চেঁচাল । তারপর দরজা খুলে বাচ্চাদের লাইন বেরিয়ে আসতে থেমে গেল বিড়বিড় করতে করতে ।
সুমনা অফিস ফেলে কমই আসতে পারে স্কুলে । ক্লাসটেস্ট বা টিচার্স মিট থাকলে তবেই আসে । ক্লাসে কি লেখাল রে ; আর , দেখি দেখি গুড পেল তোর ছেলে? বলে হামলে পড়াটা তার হাস্যকর মনে হয় । কর্পোরেট অফিসের অনেক উঁচু ধাপে থাকা অফিসার সে । এরকম ক্লিপ কাঁটা লিপস্টিকের শেডের প্রতিযোগিতার প্রয়োজন তার জীবনে নেই । সে সত্যিকার প্রতিযোগিতা কাকে বলে রোজ হাড়ে হাড়ে টের পায় । ইস্কুলে যেদিনই আসে মুখের ভদ্র এক্সপ্রেশানের তলায় একটা প্যাট্রোনাইজিং হাসি প্রচ্ছন্ন থাকে তার মধ্যে ।
আজ এসেছে , ক্লাস টিচার দেখা করতে মেয়ের নোটবুকে লিখে দিয়েছেন তাই । ছুটির সময় জানতে পারল স্কুলে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানের জন্য মনলীনাকে গানের দলে নিয়েছেন ক্লাস টিচার । সেই রিহার্সালের সময়টময় লিখে দিতেই ডাকা ।
সুমনা অবাক হয়ে একটু আগে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে ওই গার্জিয়ান ভদ্রলোকের হ্যারাসমেন্ট । একটা তিরিশছোঁয়া ছোটোখাটো আপাতনিরীহ চেহারার মহিলা একেবারে বস্তির ভাষায় এক ভদ্রলোককে যাতা বলে গেল , অথচ এতবড় ভিড়ের মধ্যে থেকে একটি মানুষ ও সাহস পেলনা প্রতিবাদ করতে ? সুমনার কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব প্রবল ধমক দিতে রেডি হয়েছিল । অনেক মানুষ , অনেক অ্যাগ্রেসিভ ইউনিয়ন লিডার ট্যাকল করতে হয় ওকে কাজের জায়গায় অহরহ ।
কিন্তু না , এখানে সুমনা বাচ্চার মা । আর পাঁচটা মায়ের থেকে নিজেকে আলাদা করে চিহ্নিত করে ফেলতে চায়না । তাই চুপ করে লক্ষ্য করল পুরো ব্যাপারটাই।
কি আশ্চর্য , ওই মহিলাও দাঁড়িয়ে কথা বলছে ক্লাস টিচারের সঙ্গে । পাশে খুব রোগা একটা মেয়ে । মনলীনার পিঠের ব্যাগটা খুলতে খুলতে মাথা নিচু করে ইস্কুলগেটের দিকে একটু এগিয়ে গেল সুমনা । নিশ্চই কিছু ত্রুটির জন্য গালি দিচ্ছেন আন্টি ?
ওমা , এর মেয়েকেও রবীন্দ্র জয়ন্তীতে নেওয়া হয়েছে ?
আবার প্রশংসা করছেন ভদ্রমহিলা , “ এইটুকু বাচ্চা কি অপূর্ব গায়কি , বলল আপনিই শেখান ? খুব সুন্দর । চর্চাটা ছাড়বেন না । ছোটদের মন মানসিকতা রুচি এইভাবেই তো তৈরী হয় ।”
খুব হেসেটেসে কথা সেরে মেয়ের হাত ধরে বাস স্টপের দিকে ঘোরে খান্ডারনী ।
সুমনা আর থাকতে না পেরে ডাক দেয় , “ শুনুন আপনি খুব ভাল গান করেন না ?”
ঘুরে দাঁড়িয়ে খ্যাঁক করে ওঠে ছাপা শাড়ি , “ হ্যাঁ কেন তোর আপত্তি আছে ?”
সুমনা মেজাজ হারাবে না ঠিক করেই এগিয়েছে , তাই মিষ্টি হাসে ।
“ নাহ , আমিও রবীন্দ্র সঙ্গীত ভালবাসি তো –”
একটু নীচু হয় ঝগড়াটে গলার স্বর ।
“ তোর হাজব্যান্ড কি করেন ?”
কপালে ভাঁজ পড়লেও সুমনা সহজ গলাতেই উত্তর দেন , “ ইস্টার্ন রেলে কাজ করেন , কেন ? ”
এবার কাত হয়ে পড়া রোদ চিকচিক করে ওঠে মেয়েটার নাকছাবির ঝুটো পাথর আর দুই চোখের কোনায় ।
“ আমার কেউ নেই জানিস তো । ছেলেটা এর থেকে পাঁচ বছরের বড় । এ মেয়ে পেটে থাকতে ওর বাবা মারা গেছেন । আমারও বাবা মা নাই । ভাইয়েরা কত করবে ?
আমায় তো কেউ রক্ষা করবে না , তাই নিজেকে নিজেই বাঁচাই , আর নিজেকেই গান শোনাই ।”
বুকের মধ্যে কেমন করে ওঠে সুমনার । এগিয়ে গিয়ে ওর ক্ষয়াটে চেহারার মেয়েটার মাথায় হাত রাখে ।
“ নাম কি তোমার ? ”
মনলীনাই জবাব দেয় , “ ও অপরূপা । মা ও আমাদের ফার্স্ট গার্ল –”
সুমনা মায়াভর্তি চোখ তোলে , “ বাহ । কি ভাল করেই মেয়েকে মানুষ করছ ভাই ।”
জল নেমে আসে রুক্ষ গালে , “ তুইই বললাম , সমবয়েসী হব তো আমরা , কিছু মনে করলি ? সামান্য এল আই সির এজেন্সী করে দুটোকে ভাল ইস্কুলে পড়াই বড্ড কষ্ট করে । ওরা না ভাল হলে কি করে চলবে ।”
“ না , না , কিছু মনে করিনি । ”
মনে ভিতরটা তরল হয়ে টলটল করে সুমনার । একটু হেসে , “ আসি” বলে মেয়ের হাত ধরে উলটো দিকে হাঁটে । সেখানে গাড়ি পার্ক করেছে ড্রাইভার ।
চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট মস্তিষ্ক হিসেব করে , ইস্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সংসারের জ্বালায় অতি নিপীড়িত মায়েরা এবং তার নিজেরও প্রাপ্তির খাতায় কত কি ।
শাড়ি গয়না কস্মেটিক্স পার্লার । জন্মদিন অ্যানিভার্সারিতে বাইরে খাওয়া । ভাল রান্নার প্রশংসা । কেউ বকলে নালিশ করে কেঁদে ভাসানোর, আর ঝগড়ার করার গভীর আরাম । কান্না মুছিয়ে আদর করার , আর রোজ জড়িয়ে শোয়ার এক জোড়া গরম হাত । বাচ্চাকে নিয়ে হই হই করার সঙ্গী । একটা গোটা ঝলমলে পৃথিবী ।
এই মেয়েটা আর তার রক্তমাংসের শরীর প্রাণপণ আক্রোশে ফুঁসছে আর ভাবছে , আমার কেন নেই ? কেন ? কেন ?
একমাত্র রবিবাবু ওর হাত ধরে আছেন । আহা ।
মনে মনে প্রণাম জানায় সুমনা তার ভালবাসার রবীন্দ্র ঠাকুরকে ।গাড়ির এসিটা চালিয়ে ইউটিউব অন করে মোবাইলে। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বলে , “ মাম্মা শোন গানটা ।”
আরামের হাওয়া আনেন দেবব্রত বিশ্বাস ।
“ পুষ্প দিয়ে মারো যারে —”