এই রংহীন উপতক্যায় চারিদিকে শুধু সাদার শীতলতা । অনুচ্চার্য । ঠি ক যেন ভরা যৌবনে বিধবার বেশ । বিধবার বেশেও সে অপরূপ অনন্যা । ঝিলমকে বুকে নিয়ে পাইন ফারের গগনচুম্বী নিরবতা । যেন কত আলোকবর্ষ ধরে সূর্যের কৃপাদৃষ্টি পরেনি । তবুও সে অহংকারী উদ্ধত । নিজে সতন্ত্র , অথচ কান পাতলেই মৃত্যুর নৈঃশব্দ্য । ভারি বুট আর বারুদের গন্ধ । সাদা বরফের আনাচে কানাচে অভিযোগ অসন্তোষের ফিসফিসানি , কখনও বা উচ্চস্বরে । অবিরাম বরফ পড়ার ক্ষীন শব্দের সঙ্গে তা মিশে যায় । মিশে যায় বুলেটের আওয়াজ ঝিলমের খরস্রোতে ।
আজ দুসপ্তাহ ধরে কার্ফু চলছে সারা পশ্চিম কাশ্মীর জুড়ে । প্রথমে ঘোষনা হল দুদিন , তারপর সেটা বেড়ে হল একসপ্তাহ । এভাবেই দুসপ্তাহ হতে চলল কার্ফু চলছে । কবে স্বাভাবিক হবে কেউ জানে না ।এটা একমাস দুমাসও চলতে পারে কখনও কখনও তারও বেশি ।কার্ফুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে
চলছে বরফ পড়া । নভেম্বরের শেষ এখনি মনে হচ্ছে পুরো উপত্যকা বরফের কফিনের মধ্যে ঢুকে গেছে । দুরানির মনে হয় আমরা মরেই গেছি , আমাদের নাক মুখ দিয়ে জোর করে কতগুলো নল ঢুকিয়ে দিয়ে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দ্বারা কৃত্তিম শ্বাস প্রশ্বাস দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে । আসলে আমরা মরেই গেছি । দুরানি যখন বাড়ী ঢুকলো ফতেমা চুলা জ্বালিয়ে সবজী বানাচ্ছে । ফতেমা জানতে চাইলো এত তাড়াতাড়ি ফিরলে । দুরানি ওর ফিরনের মধ্যে থেকে সামান্য আপেল বেড় করে ফতেমাকে দিল আর বলল “আয়েষার বুখার ও আজ পড়বে না । ”
ফাতেমা বিড় বিড় করল “তুমিই এক পাগল , তাই এখনও জান লড়িয়ে দিচ্ছ । আফতাব চলে গেল তবুও তোমার শিক্ষা নেই, এখনো তুমি বাচচাগুলোকে কি শিক্ষা দিচ্ছ কে জানে । ”
তারপর অপেক্ষাকৃত উঁচু আওয়াজে দুরানিকে হাল্কা নির্দেশ দিল “মৌসম খারাপ হচ্ছে আজ আর বাইরে বেরিও না । ”
দুরানি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ফতিমাকে উত্তর করল ” তা বললে কি হয় ফতেমা আমি না গেলে ওরা কতটা পিছিয়ে পরবে ভাবতো ? আমি ওদের টি চার হয়ে আমার একটা দায়িত্ব নেই । কবে স্কুল বাড়ী আবার তৈরী হবে ঠি ক নেই ততদিন কি ওরা পড়াশুনা করবে না । ”
পাকিস্তানি ফৌজ ওদের স্কুল বাড়ী উড়িয়ে দেওয়ার পর থেকে দুরানির রোজকার একটাই কাজ । রোজ বাচ্চাগুলোর বাড়ী বাড়ী গিয়ে ওদের পড়ানো । ফাতিমা বলে “এসব করে কি লাভ ! ”
দুরানি উত্তর দেয় “আমি একজন শিক্ষক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি শিক্ষক থাকবো । ”
ফাতিমা প্রবল ক্রোধে বলে ” তোমার শিক্ষা আমার আফতাবকে ফিরিয়ে এনে দিতে পারবে ? ”
দুরানি নিজের দীর্ঘশ্বাসকে চেপে রেখে বলে “আর একজনও যাতে আফতাব না হয়ে যায় তারই তো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি । ভ্যালির আর একজন আব্বা আম্মীর যাতে আমাদের মতো দিন দেখতে না হয় । ”
ফতিমা কথা বলেনা আর । দুরানি জানে ফতেমার এই কথা নাবলার অর্থ , ওর কথা মেনে নেওয়া নয় , আসলে নিরুপায় হয়ে ওর কথা মানিয়ে নাওয়া । দুরানি এটা বোঝে কারণ ও নিজেওতো আসলে সবকিছু মেনে নিতে না পেরে মানিয়ে নিয়েছে ।
দুরানি খানিকটা নিজের মনে বিড় বিড় করতে লাগল ” কিন্তু আমাকে তো ভুলগুলো সুধরে নিতে হবে । তুমি আমাকে বাঁধা দিও না । তুমি অন্তত না । আমি যে উনিশ বছরের ছেলেকে নিজে হাতে মাটি দিয়েছি । আমার আফতাব । আমাদের আফতাব । আমার হাত ধরে স্কুল যেত । আববু আম্মীর বাধ্য শান্ত ছেলে আমাদের । ক্লাসের প্রথম বয় । ছেলে আমার ডাক্তার হবে , সাইন্স নিল । আমার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিল । হাতে বন্দুক তুলে নিল । আমাদের আফতাব । আব্বু আম্মীর বাধ্য শান্ত ছেলে । ”
” নাও ধরো” সামনে ধোয়া ওঠা কাবা , হিং দারুচিনির
গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে ফাতেমার অসহয়তার গন্ধ । দুরানি অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে ফতেমার কাছ থেকে গরম কাবার পাত্র হাতে তুলে নিল ।
“পাকিস্তানি ফৌজি কাল আবার একটা স্কুল উড়িয়ে দিয়েছে । আল্লার ম্যহেরবানি কোন জান যায়নি । এই নিয়ে তিন তিনটে । আরো কতো হবে কে জানে ” ফাতিমাকে শুনিয়ে বলল দুরানি । কে জানে ফাতিমা শুনলো কিনা । কারন ও বিড় বিড় করে কিছু নিজের মনে বলছে সাথে হাত চালিয়ে সংসারের কাজও করছে । টুং টাং বাসন নাড়াচাড়ার আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছে তবে ও যে আসলে কাজের মধ্যে নেই সেটা বোঝা যায় ওর অস্পষ্ট দুএকবার আফতাবের নামটা উচ্চারণ করাতে
“আষিফ কোথায় ? ”
দুরানির প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর এলো ফতেমার কাছ থেকে
” কোথায় আর যাবে ! আমাদের কোন যাওয়ার
জায়গা নেই ।”
২
দুদিন ধরে অবিরাম বরফ পড়াতে সাদা চাদরের তলাতে চলে গিয়ে হিম ঘরের রূপ নিয়েছে পুরো উপত্যকা । দেব গড়ন মানুষের মুখ গুলোয় নিরানন্দের ছাপ , অসময়ের বলিরেখা । বরফের গায়ে পিছলে নীল রঙের রাত্রি খুব তাড়াতাড়ি নেমে আসে এখানে । দুরানি দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল রাতের ডিউটির সিপাহীটা এখনো আসেনি । আসবে হয়ত এক্ষুনি ।ওরাও মানুষ । ওরাও তো এখানে মরতেই আসে , আমাদের মতো । নামেই ডিউটি আসলে তো মৃত্যুর পরবানা গলায় ঝুলিয়ে রাখে ওরা , আমাদেরই মতো । রাতে একজন দিনে একজন , চব্বিশ ঘন্টা ওরা নজর রাখে ওদের ওপর । ওরা যে আতঙ্কবাদীর ফ্যামেলি , আতঙ্কবাদীর আব্বা আম্মী ।একটু এদিক ওদিক দেখলেই লোডেড আর্মস যেকোন সময় ওদের ঝাঁঝড়া করে দেবে , যেমন দিয়েছিল আফতাবকে । উনিশ বছরের আমাদের আফতাব । বাবা হয়ে শেখাতে পারিনি কোনটা সঠিক রাস্তা ,কোনটা ভুল ।
আশিফ ঘরে ঢুকলো । এই ছেলেটাকে দুরানি বুঝে উঠতে পারে না । নিজেরই ছেলে, একি বাড়ীতে থাকে অথচ ভীষণ অচেনা লাগে দুরানির ওঁকে । ও কি ভাবে ! ওকি চায় ঠি ক বুঝে উঠতে পারেনা । ভাইয়ের মৃত্যু ষোল বছরের ছেলেটাকে ঠি ক কিভাবে নাড়া দিয়েছে বোঝা যায় না । ও নিজের জগতেই ব্যস্ত । দুরানি শুনেছে খুব ভালো ক্রিকেট খেলে ছেলে । আগে আম্মীকে ভাইজানকে স্কুল থেকে ফিরে এসে গল্প বলত ওর ক্রিকেটের । এখন কেউ আর শোনার নেই তাই হয়তো আর বলেনা ছেলেটা ।
তোর খেলা কেমন চলছে বেটা ? ” দুরানি অনেকদিন পর ছোট ছেলেকে ভালো করে দেখলো । একটা কম্পিউটার নিয়ে কিযেন মন দিয়ে দেখছে ।
“আমি খেলা ছেড়ে দিয়েছি আব্বু । ”
দুরানির মনে হল এক ছেলেকে হারিয়ে ওরা জীবন থেকে এতটাই সরে এসেছে যে অন্য ছেলেটাকে হয়ত ওরা অজান্তে অবহেলা করে ফলেছে । দুরানি টের পেল গলার কাছে একদলা কষ্ট আটকে আছে সেটাকে জোর করে ঠেলে ভিতর দিকে পাঠিয়ে দিয়ে স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞাসা করল
” খেলা কেন ছাড়লে ?”
কম্পিউটার থেকে চোখ সরালনা আষিফ শুধু বলল” আমি
খেলব আব্বু আমি আবার খেলব । যেদিন পাকিস্তান ইন্ডিয়াকে হারিয়ে ওয়ালড কাপ নিয়ে আসবে । ”
ছেলের এই উত্তরে দুরানি একটুও আবাকও হলনা । একটুও বিচলিত হলো না । কেন যেন অবচেতন মনে ও জানতো এরকমই কিছু একটা উত্তর পাবে । খুব হতাশ গলায় বললেন “পাকিস্তান জিতলে আমাদের কি বেটা ?”
আষিফ কম্পিউটারে মগ্ন । দুরানির কথা ওর কানে গেল কিনা বোঝা গেল না । কিন্তু কিছুক্ষনের অপেক্ষা , আষিফ ওর আব্বার কথার উত্তর দিলনা অথচ মুখে বলল
“আমাদের স্বাধীন কাশ্মীর চাই ”
দুরানি আসলে জানতো ছেলের মুখ থেকে ঠি ক এই কথাটাই বেড়িয়ে আসবে। ওর মাঝে মাঝে আফসোস হয় বড্ড দেরী করে ফেলেছে ও । বড্ড দেরী । পুরো উপত্যকাটাকে কর্কট রোগ গ্রাস করছে আসতে আসতে । দুরানি আপন মনে মাথা নাড়ে । নীচু অথচ স্পষ্ট গলায় বলে ” কিন্তু বেটা তোমার রাস্তা ভুল । ”
এবার আষিফ কম্পিউটার থেকে চোখ তুলে নিজের আব্বুর দিকে তাকাল, ঠি ক যেন একজন দিকভ্রষ্ট ক্লান্ত এক নাবিক । যুগের পর যুগ ভেসে বেড়াচ্ছে এ কুল থেকে ওকূল । এক তীর থেকে আরেক তীরে সময়ের সাথে শুধু ভেসে চলা । থেমে থেমে বলল ” আব্বু যার কাছে কোন রাস্তাই খোলা নেই সে কিকরে বুঝতে পারবে কোন রাস্তাটা ঠি ক আর কোনটা ভুল । যখন কোন একটা বন্ধ ঘরে ছোট্ট একটা ছিদ্র দিয়ে হালকাসা রোসনি তুমি দেখবে তোমার মনে হবে ওটাই বুঝি সম্পুর্ণ সূর্যের আলোটা । কারণ সূর্য যে কতো বড়ো সেতো তুমি দেখেনি ।
দুরানি সন্ধার আবছা আলোয় ছেলের মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেলো , বড়ো বড়ো টানা টানা মায়া ঘেরা দুটো চোখ । অথচ কঠিন , ওর দিকেই তাকিয়ে আছে । অনেক প্রশ্ন , অনেক নাজানা উত্তর ঐ চোখ দুটোয় ।দুরানি অপলক তাকিয়ে থাকলো ছেলের দিকে ,চোখ সরিয়ে নিল না । যেন ওর মনের ভেতরটা একবার ছুঁয়ে নিতে চাইছে । কতটাই বা মাটি কতটাই বা রক্ত সেখানে । অভিমান , অসন্তোষ , চাপা আর্তনাদ নরম মাটি গুলোকে রক্তাক্ত করে তুলেছে ।
” তুমি তো স্কুলে পড়েছো । আগে নিজেরা তৈরী হও । আর এটা একমাত্র সম্ভব শিক্ষা দিয়ে , বন্দুক দিয়ে নয় তোমার বুদ্ধি তোমার অস্ত্র হবে আর অন্য কিছু নয় । আর সেদিনই তুমি দুনিয়ার সামনে সুন্দর একটা কাশ্মীরকে তুলে ধরতে পারবে । দুনিয়া তোমার কথা শুনবে আর যদি তুমি বন্দুক হাতে নাও সারা দুনিয়া তোমাকে ত্যাগ করবে । ”
দুরানি বুঝল এখানেই থামলে চলবেনা ওঁকে আরো বলতে হবে । দুরানি জানতো এ কঠিন সময়টা আসবে যেদিন নিজের কলিজার সঙ্গে মুখোমুখি হতে হবে । এই সেই সময় নিজের কলিজেকে হাতে তুলে নিয়ে সঠিক রাস্তা দেখানোর । আষিফকে বলল ” আমরা তো কাঠপুতলী । দেখেছো কোনদিন কাঠপুতলী ? ” একটু সময় নিয়ে আবার কথা যোগ করল ” আমরা সাধারণ লোক । দিনে দুবার রোটি , মাথার উপর ছাদ , আর কি চাই বেটা ? এটুকু হলেই আমাদের চলে যাবে । ” তারপর বড়ো করে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে প্রত্যেকটা শব্দ স্পষ্ট উচ্চারণ করল ” সবাই হিপোক্রেট । হিপোক্রেটের মানে জানো তুমি । ” এই সরল প্রশ্ন টুকু নিজের সন্তানকে করেই ফেলল দুরানি । ঠি ক তখনই ঘরের মধ্যে আশিফের ফোনটা বেজে উঠল । ভগ্নাংশেরও কম সময়ে আষিফ ফোনটা তুললো , যেন ফোনটার জন্য অপেক্ষা করছিল । হিপোক্রেটের মানে আষিফ জানে কিনা সেটা আর জানা হল না । বাইরে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে চারিদিক । ঘরের মধ্যে সেই কুয়াশার অংশবিশেষ ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে । দুরানি পর্দা সরিয়ে বাইরের পৃথিবীতে নজর দিল । নাহ্ এখনও রাতের ডিউটির সিপাই আসেনি । নিজেকে পশমিনার উষ্ণতায় জড়িয়ে নিতে নিতে ভাবলো আজ ঠান্ডাটা বড্ড বেশী নাকি তারই এরকম লাগছে , মনের ভুল । আচমকাই দুরানির খেয়াল হল লাগাতার কার্ফু চলছে অত্যাধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম সমস্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । তাহলে কি করে ফোন আর কম্পিউটার চালাচ্ছিল আষিফ । গভীর এক চিনতা জালে জড়িয়ে পড়ল দুরানি । গভীর এক হতাশা তাকে গ্রাস করল । তার হৃদয়ে জেগে ওঠা প্রশ্নের উত্তর তার মনই দিয়ে দিল । এতো আসলে সেই ছেদ পাত্রে জল ঢালা হচ্ছে । দুরানি গভীর অবসাদ নিয়ে পাশ ফিরে শুল । বছরের পর বছর যেভাবে শুয়ে আসছে সে । হয়ত এভাবেই জীবনের বাকি বছর গুলোও কেটে যাবে । চলতে থাকবে পাশ ফিরে শোয়া নিরুপায় ভাবে । বড়ো জোড় পাশ বদলে এপাশ থেকে ওপাশ হয়ে শোবে ।
৩
দুরানির ঘুম ভেঁঙ্গে গেলো । চারিদিক চুপচাপ । কোন আওয়াজ নেই । খুব বেশী রকমের চুপচাপ চারিদিক । রাত কতো ঠি ক জানা নেই ।একঘেয়ে একটানা হিমেল হওয়ার শব্দ । কিন্তু ঘুমটা ভাঙ্গলো কিভাবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না দুরানি । একবার মনে হল কিছু একটা আওয়াজে যেন পেয়েছিল সে কিন্তু কি সেটা । দুরানি তীব্র শীতকে উপেক্ষা করে আরামের শয্যা ত্যাগ করল । দুরানির ধারনাই সত্যি হল । আষিফের ঘরে আলো জ্বলছে । ওখান থেকেই কিছু আওয়াজ আসছে । দুরানি নিজের বাড়ীতেই চোরের মত আষিফের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল । দুরানিকে অবাক করে দিয়ে ঘরের ভেতর থেকে একাধিক মানুষের আওয়াজ আসছে , তারা একটি নির্দিষ্ট মন্দিরের নাম বারবার বলছে । কিন্তু ওঁকে বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হল না দরজার বাইরে , ভেতরের মানুষ গুলোর কি উদ্দেশ্য জানা হয়ে গেল দুরানির । নিজের হৃদপিন্ডের আওয়াজকে অগ্রাহ্য করে দুরানি দরজা ঠেলে ছেলের ঘরে ঢুকলো । আষিফ ছাড়া তিনজন অপরিচিত ব্যক্তি তার নিজের বাড়ীতেই তাকে নির্ভীক দৃষ্টিতে ওয়েলকাম করল । ” সেলাম্ মালিকুম ” । ”
“মালিকুম সেলাম ” দুরানি প্রতি উত্তর করল ।
আষিফ বলল “আব্বু আজ রাতের জন্য এরা আমাদের ম্যহমান । ”
দুরানিএতক্ষনে বুঝতে পারলো কিসের আওয়াজে ওর ঘুম ভেঁঙ্গে গেছে । সেটা ছিল কাঠের মেঝেতে কোন ভারি জিনিস পড়ার আওয়াজ । সেরকমই কিছু ভারি আগ্নেয়াস্ত্র ঘরের এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে খুব সহজ ভাবে নাড়াচাড়া করছে ওরা । দুরানি বুঝে উঠতে পারলো না ঠি ক কি করা উচিত ওর এই মহূর্তে । ওরা কোথা থেকে এসেছে আর কি কারনে এসেছে সেটাও অজানা নয় । নিজের বিবেকের কাছে জবাবদিহি করার তাগিদে দুরানি প্রশ্নটা করেই ফেলল ওদের
“তোমরা কার নির্দেশে এখানে এসেছো ? সদ্য আসা মেহেমানকে বন্ধুর মতো জানতে চাইল দুরানি ।
ওদের মধ্যে একজন বলল “আল্লাহ” । অন্য দুজন ওঁকে সমর্থন করল ।
” আমার আল্লাহ তো আমাকে এরকম কোনদিন নির্দেশ দেননা ” । নিজের অজান্তেই প্রশ্নটা দুরানির মুখে চলে এলো ।
শীতের রাতের স্তব্ধতা চুরমার করে দূরে মসজিদে নামাজের সুর ভেসে এলো । দিনের প্রথম নামাজ , সকাল হতে আর বেশী বাকি নেই । ওরা দুরানির কথার সরাসরি উত্তর দিলনা আবার উত্তর দিলও বলা যায় ।
” নামাজের টাইম হয়ে গেছে । আমাদের তারপর যেতে হবে । সেই সময়ের আর বেশী দেরী নেই যখন আমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে । ”
মেহেমানের কথার উত্তরে দুরানি বলল ” আমারও নামাজের টাইম হয়ে গেছে । দিনে পাঁচ বার নমাজ পড়ি আমি , এক সাচচা মুসলমানের মতো । কিন্ত আল্লাহ আমাকে তো এরকম আদেশ কোনদিনও দেয়নি । ”
ওদের মধ্যে একজন দুরানির দিকে সোজাসুজি এগিয়ে এলো ” আমাদের লড়াই আযাদ্ কাশ্মীরের জন্য । এই লড়াইতে আপনিও আমাদের সাথে আছেন ” কঠোর মুখে লোকটা আদেশ দিল।
দুরানি ততধীক কঠিন স্বরে প্রশ্ন করল ” কাশ্মীরে ওরাও থাকে , যাদের মৃত্যুর উৎসব করতে চাইছো তোমরা আজ । কাশ্মিরটা ওদেরও । আমাদের মতো ওদের পূর্ব পুরুষরাও এই মাটির সঙ্গে মিশে আছে । মন্দির , মসজিদ , গুরুদুয়ার এই সবকিছুই বছরের পর বছর ধরে কাশ্মীরের অঙ্গ । এইসব নিয়েই আমাদের এই কাশ্মীর ।”
ওরা তিনজন দুরানির এই কথাগুলোর জন্য প্রস্তুত ছিল না যতটানা ইন্ডিয়ান আর্মির গুলি খেতে প্রস্তুত থাকে ওরা । কিন্তু দুরানি ওদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটুও মাথা ঘামালো না । যেভাবে সারাজীবন ছাত্র পড়িয়ে এসেছে , কঠিন বিষয়কে সহজ করে প্রকাশ করেছে , যাতে ছাত্রদের বুঝতে কোন অসুবিধা না হয় এবারে সেভাবেই আবার একজন শিক্ষকের মতো সামনে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ধরা ছাত্রদের বলল ” কাশ্মীর হলো ওপরওয়ালার বানানো সেই জায়গা যেখানে সবকিছু সুন্দর । এটাই আমাদের গর্ব । অসুন্দর কোনকিছুই কাশ্মীর নয় । আজ তোমরা যেটা করতে যাচ্ছো , সেটা কাশ্মীরের ধর্ম নয় , কাশ্মীরিদেরও নয় । এটা আমাদের এতবছরের গর্বকে কলঙ্কিত করবে । আমারা একসাথে ছিলাম , একসাথে থাকবো । ”
দুরানি আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল , পিছনে ফাতিমার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল । যে প্রশ্নগুলো দুরানির মনের মধ্যে ঘুড়পাক খাচ্ছিল ছেলের জন্য সেটাই ফাতিমা বলে দিল ।
“আষিফ বেটা এসব কি ? এরা কারা ?”
” তোমরা ভেতরে যাও আম্মী , এরা আজকের মতো আমাদের ম্যহেমান ।”
আষিফ ….বেটা … ফাতিমার চাপা কান্নার আওয়াজ নামাজের আওয়াজের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল ।
” আমি এদের সঙ্গে নই আম্মী । এরা শুধু আজ রাতটুকুর জন্য আমাদের এখানে এসেছে । আজ রাতের ডিউটিতে পুলিশটা আসেনি তাই ওরা আমাদের ঘরটাকে বেছে নিয়েছে ।
ওদের তিনজনের মধ্যে একজন বলে উঠল ” আষিফ তুই আমাদের সাথে চল । তোমার আব্বার ওপর আমরা ভরসা করতে পারছিনা । তোমার আব্বুর সঙ্গে পরে মুলাকাত হবে ।
এখানে এসে শব্দরা থমকে দাঁড়ালো । কিন্তু সময় চলমান ।
” আষিফ জলদি । আলো ফোটার আগে স্পটে পৌঁছে যেতে হবে । ”
পৃথিবী তখন বাক্য শূন্য । শব্দরা তখন ঘন কুয়াশায় দিকভ্রান্ত ।
আষিফকি ইতস্তত করল ? নাকি করলো না ! নিজেই পা বাড়ালো কিনা বোঝা গেলনা । দুরানি দেখল আষিফ ওদের অনুসরণ করল । বাড়ীর পিছনের দরজা দিয়ে ওরা সশব্দে বেড়িয়ে গেলো ।
দুরানি নিশ্চল দাঁড়িয়ে দেখল আষিফের লাল জ্যেকেটটা একসময় লাল বিন্দু হয়ে গেল ঘন কুয়াশার মধ্যে । আষিফও কি একবার ঘুরে তাকিয়ে আব্বু আম্মী কে দেখতে চাইল কুয়াশা ভেদ করে !
“আল্লাহ আমাদের মৎ কেন দেননা !
ফাতেমার বুক চাপড়ানো আর্তনাদ কে পিছনে ফেলে দুরানি সেই প্রচীন পুরুষের মত ওপরওয়ালার নির্দেশে দুর্যোগের শেষে এক নতুন পৃথিবী গড়ার ব্রতী নিলেন ।
তাকে পৌঁছাতেই হবে সবচেয়ে কাছের পুলিশ চৌকি পর্যন্ত , ওদের নজর বাঁচিয়ে । খুব বেশী দূর নয় । রাস্তা কঠিন । ও জানে সেটা । সামনে ঘন কুয়াশা , পায়ের নীচে বরফের গালিচা । হোক ! তবুও , ওঁকে এগোতে হবে , মানুষ গড়ার কান্ডরিরা যেভাবে এগোয় … দুরানিও এগোলো …. দ্রুত পায়ে … উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে ।।