পুজা – মা , গন্ধটা কি সুন্দর না বলো, আমার তো মনে হচ্ছে বাটিতে নাকটা লাগিয়ে রাখি।
মালতী – সে কিরে শুধু গন্ধ শুঁকলেই পেট ভরবে নাকি? নে মা আজ তোর জন্মদিন, তোকে কথা দিয়েছিলাম তোর জন্মদিনে যেখান থেকে পারি তোকে ভাত এনে খাওয়াবো, আজ কাজের বাড়ির বৌদি এক বাটি ভরে ভাত, ডাল আর মাংস দিয়েছে। কতদিন ভালো করে খাসনি। নে মা আয় আমি খাইয়ে দি। পেট ভরে খা।
পাঁচ বছরের কচি হাতে মায়ের মুখে ভাত তুলে দিল পুজা, মালতীর দুচোখে তখন বান ডেকেছে।মনে পড়ে যায় দুবেলা খেতে বসলেই মেয়েটা বলে মুড়ি আমার ভালই লাগে মা, তুমি কিচ্ছু চিন্তা করোনা, ভাত আমার অতটাও ভালো লাগেনা। পূজার বাপটা সেই মেয়ের তিন বছর হতেই বাজারে প্রচুর দেনা করে ডুবিয়ে দিয়ে গেলো সেই থেকেই কোনরকমে না চলার মত চলছে , আর তারপর থেকেই মেয়েটা চোখের সামনে কেমন বড়ো হয়ে যাচ্ছে। কত ইচ্ছা লুকিয়ে রাখতে চায় কিন্তু মায়ের থেকে কি আড়াল করা যায়। নাহ আজকে মেয়েটার জন্মদিনে একটুও চোখের জল ফেলবেনা মালতী। আজকে পাঁচ বছরে পড়লো পুজা। চোখের কোনটা আঁচল দিয়ে মুছেই বললো নে মা আমার পেট ভরে গেছে, তুই খেয়ে নে। বলেই বাইরে থেকে একটু দূর্বা নিয়ে এসে বলে খাওয়া হলে আমার কাছে এসে বসতো মা, তোকে প্রাণ ভরে আশির্বাদ করি।
পুজার খাওয়া হয়ে গেলে মায়ের কোলে চেপে বসে, ওমা একটু আদর করে দাওনা। মেয়েটাকে বুকে জাপটে ধরে আদর করতে করতে চোখে জল এসে যায় মালতীর। আজ যে কাজের বাড়িতে বৌদির মেয়ে রোমির ও জন্মদিন, আজ রোমি চার বছরে পড়লো। পুজার থেকে এক বছরের ছোট। কত ইচ্ছা করে প্রত্যেক বছর এই একটা দিনে রোমিকে কোলে নিয়ে আদর করে, নার্সিংহোম থেকে আসার দিন থেকে মালতীর হাতেই তো মেয়েটার সবকিছু কিন্তু সাধ আর মিটলো কই। রোমির জন্মদিনে যে এলাহী আয়োজন, বাড়ি ভর্তি লোকজন, কত্ত বেলুন, আলোর রোশনাই, কত রকম খাবারের গন্ধ । ওই দিনটায় এত আয়োজন আর এত উপহার দেখে পাছে মালতীর নজর লাগে তাই কয়েকটা দরকারি কাজ করিয়ে নিয়ে খাবার দাবার দিয়ে সকাল সকাল বৌদি বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। সব দিনই রোমিকে ছেড়ে আসার সময় বড্ড মন কেমন করে মালতীর মনে হয় যেন বৌদি নয় ওর নিজের মা, কিন্তু আমিই বা মায়ের থেকে কম কিসে? পুজার থেকে তো কোনোদিন আলাদা ভাবে দেখিনি রোমিকে। পুজার মুখটা ধরে আদর করে ভাবে বৌদি যদি একটু বুঝতো মালতী নিজের মেয়েকে কি কখনো নজর দিতে পারে, তাহলে হয়তো এমনটা করতে পারতোনা। মায়ের আবার কোনো জাত হয় নাকি, নাকি কোনো উচুঁ নিচু ভাগ হয়, মা তো মা ই হয় নাকি। ভাবতে ভাবতে পুজার সাথেই মনে মনে দুহাত ভরে আশির্বাদ করে রোমিকে। ভগবান আমার দুই সন্তানের জীবন সুখের আলোয় মুড়ে দিও।