গল্পে ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়

টিউনিং
হারমোনিয়ামটা টিউনিং করতে হবে। রঞ্জনকে খবর দাও।
জয়দেবকে এক-একটা কথা পেয়ে বসে এক-এক দিন। সারাদিন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওই একটা কথাই বলতে থাকেন। তবে সে সবই পুরনো কথা। আজ অনেক বছর ধরে জয়দেব সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছেন। এখনকার কথা কিছুই মনে থাকে না। হঠাৎ হঠাৎ পুরনো কিছু কথা মনে এসে যায়।
এমনিতে জয়দেব মানুষটা খুব চুপচাপ। সারাদিন উঠোনের কোণে কিম্বা বারান্দার একপাশে বসেই থাকেন। কখনও চেয়ারটা টেনে নিয়ে রোদে বসেন, কখনও উঠোনে কাক, শালিখ, কাঠবেড়ালি তাড়ান। খাবার সময় খান, দুপুরে কখনও ঘুমোন, কখনও ঘুমোন না। সারাদিনের কাজের মেয়ে মিতা দেখভাল করে, যে সময়টুকু শিপ্রা বাইরে থাকে। শিপ্রা বাড়ি ফিরলে তার ছুটি।
সেদিন শিপ্রা স্কুল থেকে হা-ক্লান্ত হয়ে ফিরে চোখে-মুখে জল দিয়ে ভাতের থালাটা টেনে বসেছে সবে, মিতা একগাল হেসে বলল,
আজ দাদুর গান গাওনের শখ হয়েছে, জান পিসি! বলছে রঞ্জনকে ডাকো। রঞ্জন কে গো?
রঞ্জন? … গান?
হিহি, খালি বলছে, হারমোনিয়ামটা টুনিং করতে হবে। টুনিং কি গো পিসি?
কোনোক্রমে খাওয়া শেষ করে শিপ্রা যখন বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, তখন এক মনে একটা পায়রার পালক দিয়ে নিজের কানে সুড়সুড়ি দিচ্ছিলেন জয়দেব। শিশুর মত সরল মুখে আরাম আর প্রশান্তি। শিপ্রাকে দেখে ভাবলেশহীন মুখে বললেন,
রঞ্জন আসে নি আজ?
কত বছর পর রঞ্জনের নাম নেওয়া হল এ বাড়িতে? বছর কুড়ি তো হবেই। শিপ্রার বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে এল। মনে হল কুড়ি বছর ধরে এই বাতাসটুকু আটকে ছিল তার বুকের ভেতর।
সন্ধ্যে হয়ে আসছে। এখনই মশার উৎপাত শুরু হবে। বাবার হাত ধরে শিপ্রা বলল,
ওঠো বাবা, ঘরে চল।
বাধ্য ছেলের মত শিপ্রার হাত ধরে উঠলেন জয়দেব। ঘরে যেতে যেতে বললেন,
তুই তো কই গাইছিস না আর? হারমোনিয়ামটা ঠিক আছে তো? রঞ্জনকে ডাক দে না একবার!
হারমোনিয়ামটা কোন অন্ধকুপে বন্দী আজ কত বছর! আর রঞ্জন? সেও তো ঘুমিয়েছে আজ বহুদিন! তবু কোথা থেকে এত গাঢ় মেঘ, এত ছায়া-ছায়া ছবি বিষণ্ণ গোধুলির মত নেমে আসে!
রঞ্জন! মুখের আদল আর বড়বড় চোখ দুটো মনে এল শিপ্রার। সাধাসিধে রঞ্জন, এতটাই যে বোকা বললেও চলে। ভালমানুষ রঞ্জন, এমনই যাকে অনায়াসে কটূক্তি করা যায় ! চালচুলোহীন রঞ্জন, যাকে একটা মানুষ বলেই গণ্য করত না কেউ। আপনজন বলতে এক বিধবা নিঃসন্তান মাসি ছিল, সেও মারা গিয়েছিল রঞ্জনের যখন বছর পনেরো বয়স। তারপর কিছুদিনের জন্য একটা যাত্রার দলে ভিড়ে গিয়েছিল সে। সেখান থেকেই সম্ভবত সে নানারকম বাদ্যযন্ত্র সারাই করার শিক্ষাটা পেয়েছিল। তারের যন্ত্র, হারমোনিয়াম, তবলা, খোল, ঢোল মৃদঙ্গ সবকিছুই চলনসই রকমের সারিয়ে দিতে পারত সে। এলাকার এক গানের ইস্কুলে জগ দিল, ফাই ফরমাশ খাটত। নানারকম বাদ্যযন্ত্র সারাই করে বেড়াত। তারের যন্ত্র, হারমোনিয়াম, তবলা, খোল, ঢোল মৃদঙ্গ সবকিছুই চলনসই রকমের সারিয়ে দিতে পারত সে। শিপ্রার হারমোনিয়ামটা কয়েকবার বাড়িতে এসেও সারিয়ে দিয়ে গেছে। ষ্টেশনবাজারের পিছনে ছোট্ট একটা টালির চালের এক কামরার ঘর ছিল তার মাসির। সেখানেই থাকত, হাত পুড়িয়ে খেত আর বাঁশি বাজাত। তার বাঁশি বাজানোর সময়টা শিপ্রার কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময়ের সাথে প্রায়ই মিলে যেত। শিপ্রার হাঁটার গতি স্লথ হয়ে আসত, বাজার পার করে আসার পরেও কিছুদুর পর্যন্ত শোনা যেত তার বাঁশির সুর।
তারপর একসময় রোজই আসতে শুরু করল রঞ্জন। ঠিক বাড়িতে নয়, বাড়ির বাইরে। শিপ্রা ভোরবেলা রেওয়াজ করতে বসত আর রঞ্জন তার জানলার বাইরে বসে থাকত চুপ করে, যতক্ষণ রেওয়াজ চলত। নিবেদনের একটা মাদকতা থাকে, মুগ্ধতার একটা উষ্ণতা থাকে, যার আঁচ এসে লাগে। শিপ্রা টের পেত সব, যদিও মৌখিক কোন ভাব বিনিময় হয় নি কখনও।
ব্যাপারটা আর কারো চোখে পড়বে না, এমনটা হওয়ার কথা নয়। বিশেষত, রঞ্জন গোপন করার চেষ্টাও করে নি। একদিন জয়দেব আর তাঁর দুই ছেলে মিলে তাকে অনেক কটু কথা বলে অপমান করেছিল খুব। শিপ্রা সেদিন কাউকে কিছু বলতে পারে নি, শুধু লুকিয়ে কেঁদেছিল। আর গান গাইতে ইচ্ছে করত না তার।
এত সবের পরে রঞ্জন আর আসত না বটে, তবে একদিন কলেজ যাবার পথে শিপ্রাকে বলেছিল
তুমি ওমনি ভোরবেলা গান গেয়ো, কেমন? আমি দূর থেকেই শুনব। সারাদিন নানা কাজে থাকি! তাছাড়া, ভোর আমার ভারি ভাল লাগে, জান! ভোর হওয়া দেখব বলে আমি রাত থাকতে উঠে বসে থাকি।
শিপ্রা মনে মনে হেসেছিল। এমন পাগলও মানুষ হয়! তারপর থেকে অনেক ভোরে উঠে সে গাইতে বসত। প্রাণমন ঢেলে গান গাইত। জানত, নিবিষ্ট এক শ্রোতা আছে তার গানের।
একদিন ভোরবেলা এল দুঃসংবাদ। ইদানীং নাকি খুব আনমনা থাকত ছেলেটা। তাই হয়ত দুরন্ত বেগে ছুটে আসা এক্সপ্রেস ট্রেনটার আলো চোখে পড়েনি, শব্দ কানে ঢোকেনি। কিন্তু সে এত ভোরে রেল লাইনে কি করতে গিয়েছিল, সে এক রহস্য। সেদিনের পর শিপ্রা আর কখনও হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করেনি, বাবা-মা, দাদাদের শত অনুরোধ, বকুনি, মিনতিতেও নয়। তারপর তো এতগুলো বছর কাটল, শোক-দুঃখের তীব্রতায় পলি পড়ল, তবু এই না গাওয়াটাই যেন অভ্যেস হয়ে গেল।
বাবাকে সময়মত খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল শিপ্রা। ঘুমিয়ে পড়লে বাবাকে যেন আরও অসহায় দেখায়। আজকাল শুধু মায়াই হয় বাবার অপর। সমস্ত ক্ষোভ, অভিমান জল হয়ে গেছে কবে! সেদিনের সেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ বাবা আজ শিপ্রার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। ছেলেরা দূরে, নিজেদের সংসারে ব্যস্ত। মাও চলে গেছেন কতদিন। কাছাকাছি প্রাইমারি স্কুলের চাকরিটা পেয়ে গিয়ে শিপ্রারও সংসার করতে ইচ্ছে হয় নি। সেও চলে গেলে বাবাকে দেখবে কে?
অন্যান্য দিন বাবা ঘুমিয়ে পড়লে টি ভি দেখে, বই পড়ে শিপ্রা। তারপর একটু রাত করে ঘুমোতে যায়। আজ যেন কিছুই ভাল লাগছিল না তার। অনেক দিন পরে সিঁড়ির নিচের ঘরটার চাবি খুলে ভেতরে ঢুকল শিপ্রা। একটা ভ্যাপসা গন্ধ। ভেতরের বদ্ধ হাওয়া যেন মুক্তি পেল। আরসোলা-মাকড়সার রাজত্ব এই ঘরটা। রাজ্যের বাতিল জিনিস ডাঁই করে রাখা। এক কোণে পড়ে আছে হারমোনিয়ামের বাক্সটা। তার ওপরে জড় হয়েছে পুরনো খবরের কাগজ, ভাঙা বাসনপত্র, ছেঁড়া প্লাস্টিক, আরও কত কি! সবুজ রঙ করা কাঠের বাক্সের ওপর সাদা রঙ দিয়ে তার নাম লেখা ছিল। এখন ধুলো আর ঝুলে আসল রঙ চাপা পড়ে গিয়ে একটা কালচে ধুসর রঙ।
কালই ওই হারমোনিয়ামের বাক্স ঘর থেকে বের করবে ঠিক করল শিপ্রা। রঞ্জনের সে দোকান আর নেই, কিন্তু অন্য কেউ তো নিশ্চয়ই করে কাজটা! এখানে বা অন্য কোনোখানে। খুঁজে নিতে হবে। গানের খাতাটাও একটু খুঁজলে হয়ত পাওয়া যাবে। যতদিন তা না হচ্ছে খালি গলাতেই গাইবে না হয় শিপ্রা। দেখাই যাক না, সুর তাকে ছেড়ে গেছে কি না। কাল সকাল থেকেই তা হলে শুরু করবে শিপ্রা। সকাল নয়, ভোর। ভোরটাই খুব ভাল সময়।
উত্তেজনায় ঘুম আসছিল না শিপ্রার। এতগুলো দিন যে চলে গেছে, এতদিন যেন টেরই পায় নি সে। ধুলোবালি ভরা জীবন, এবার একটু টিউনিং না করালেই নয়।