গুচ্ছকবিতায় উজ্জ্বল সামন্ত

ক্ষুধা

তোমার জঠরের অন্ধকারেই স্ফুলিঙ্গ লুকিয়ে
তীব্র দহনে প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা নিভাবে কোন জাদুকাঠিতে
ক্ষুধা সে তো হার মানার নয় বাস্তবের জীবনে
অন্ন শিক্ষা অর্থ প্রাচুর্য অহংকার লোভের কারণে
নিজেকে বিকিয়ে দেওয়া লালসার হাতছানিতে
একফালি কাপড়ে আচ্ছাদিত শরীরের কিছু অংশে
নগ্নতা কখনো শিল্প দৃষ্টিকটু দৃষ্টি-ভঙ্গির পার্থক্যে
জিভ শুকিয়ে কাঠ নাড়িভুঁড়ি গুলো আরষ্ঠ হয়ে ওঠে
আগুন সর্বগ্রাসী ছোবল মারে শরীরের চামড়ায় কোষে
ক্ষুধার আগুন ভয়ঙ্কর লেলিহান শিখায় শরীরের ভিতরে
এক মুঠো অন্ন যার কাছে প্রাণ জীবনের মূল্য সেই বোঝে
বন্যায় মহামারী ভূকম্পনে ভিটেমাটি ছাড়া অসহায় আশ্রয়ের খোঁজে
সমাজের চোখের চামড়া মোটা হতে হতে পুরু হয়ে
আত্ম সুখে নিমজ্জিত কোটিপতি হওয়ার সুবাদে
দান-ধ্যানে নেই সময় মুক্ত হস্তে যার সামর্থ্য আছে
পঞ্চব্যঞ্জনের আধিক্যে ডাইনিং টেবিল উপচে পড়ে ডাস্টবিনে
কেউ হয় নিরুদ্দেশ কেউ বিবাগী প্রতিবাদী কখনো
যার সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় এখনো
অধিকার শিকেয় তুলে দিশেহারা রোজগারের সন্ধানে
প্রার্থনা সবাই বাঁচুক দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের সংস্থানে….

মিসক্যারেজ

পৃথিবীর মিসক্যারেজ চলছে একনাগাড়ে ধ্বংসে
কখনো ভিন্ন নামে ঝড় ঝঞ্ঝা মহামারী ভূকম্পনে
প্রকৃতিও আজকাল বিরূপ থাকে নিষ্ঠুর আচরণে
সময় এখনো বাকি ছিল কেন চলে যায় অসময়ে
অসময়ে ঝরে যাওয়া ফুলের কলি কন্যাভ্রূণ মাতৃগর্ভে
নিষ্ঠুরতার পরিচায়ক জাত কুল বংশরক্ষার অজুহাতে
শুধু মানব কেন পশুদেরও কি আছে ছাড় নৃশংসতায়
গর্ভে থাকা হস্তিশাবক নিষ্ঠুর হত্যার শিকার ছলনায়
আমরা মানুষ নিজের দুঃখটাই বড় করে দেখার অভ্যাসে
প্রকৃতি পরিবেশের ক্ষতি করে চলছি অহরহ তার কোনো ভ্রুক্ষেপ আছে
নৃশংসতায় আমরা পশুকেও হারিয়ে যাই অজান্তে কখন
বিবেক বুদ্ধি যখন মুখ ঢাকে মনুষ্যত্ব কি অন্ধকারে থাকে তখন ?
বাবার হাতে কিশোরী ধর্ষণ লকডাউন এর তিন মাস
বিকৃত মানসিক মৌনতায় যৌন শিকার গর্ভবতী কন্যা
লুকিয়ে কোন প্রাইভেট নার্সিং হোমে আবট করিয়ে পাপস্খলন
মিসক্যারেজ কি হচ্ছে না মানবিকতার, মনুষ্যত্বের লুন্ঠন ?
দূষণে জর্জরিত সর্বত্র প্রাণ খুঁজছে চাঁদে কিংবা মঙ্গলে
পৃথিবী নিরাপদ আশ্রয়ে এখনো বাঁচার আশায় তাগিদে
দিন আসন্ন মিসক্যারেজ হবে প্রকৃতির অসময়েই
আশঙ্কা একটাই সেই দৃশ্য মানবকূল কি চাক্ষুষ করবে ?

মালা

প্রকৃতি তোমাকে রূপ-রঙ সুগন্ধ দিয়ে ঢেলে সাজিয়েছে
মল্লিকা বনে ঝড়ে পড়া সুগন্ধি রংবেরঙের ফুলগুলো
ভ্রমর কখন যেন এসে তার মধু খেয়ে গেছে চুপিসারে
ঝরে পড়া ফুল একটা একটা করে কুড়িয়ে রেখেছি সযত্নে
হয়তো কিছু ভালোবাসা নিয়ে ফুটে ছিল অজান্তে ঝরেছে প্রকৃতির কোলে কালের নিয়মে
হয়তো মালা গাঁথবো ভেবে ফুলের ডালি সাজিয়েছি
ফুলগুলো হাতের মুষ্টিতে চেপে ধরে বুকে আগলে রেখেছি
ফুলের মালা সেতুবন্ধনের সোপান হয়ে একটির সঙ্গে অন্যটি সুতোর বাঁধনে
মালা সেতো অলংকার ঈশ্বরের গলায় কিংবা পায়ে শোভাবর্ধনে
ভালোবেসে কখনো ঘন চুলের খোপায় বেঁধে জড়িয়ে সাজসজ্জাতে
সাক্ষী হয়ে জীবনসঙ্গী চয়ন সেতুবন্ধন মালাবদলে
কখনো বা মধুর রাতে খাটে বিছানায় নানা কারুকার্য শিল্পে
আনন্দে উৎসবে কিংবা বিরহে বেদনার সাক্ষী হয়ে
পৃথিবী থেকে বিদায় আপাদমস্তক ঢেকে শ্মশানে পোড়ে
মালা কখনো বন্দী হয়ে দেয়ালে টাঙ্গানো ফটো ফ্রেমে
অহংকার শেষ ফুলের পাপড়িগুলো যখন খসে পড়ে
দু-চার দিনে শুকিয়ে দড়ি হয়ে রূপান্তরিত আবর্জনা হয়ে ওঠে।

অব্যক্ত

দুষ্টুমি তোর ষোলআনা পুষিয়ে দিবি খুনসুটিতে
তোকে দেখলেই সংকোচে আমি দূরে দাঁড়িয়ে
ধুকপুকুনি বায়ুর গতি কখন যেন ধাক্কা লাগে
লক্ষ্য করি উঁকিঝুঁকি মন আমার কেমন করে
রাস্তাঘাটে স্কুলের পথে যখন তুই বান্ধবীদের সাথে
খিল্লি করে আওয়াজ দেয় নতুন সম্পর্কে বাঁধার আগেই
ডাক যদি তুই নাই শুনবি তবে আড়চোখে কেন দেখিস ?
গোলাপি ঠোঁটের ব্যাকা হাসিতে কেন মন ভুলিয়ে রাখিস ?
পড়ন্ত বিকেলবেলায় গোধূলির আলোয় মেখে
খেলাচ্ছলে গুনগুনিয়ে বিরহের গান একেলা গেয়ে
আমার রাত জাগা দুটি চোখে পেঁচা ডাকা ভোরে
কখন পাশবালিশটাকে তুই ভেবে জড়িয়ে ধরি স্বপ্নে
ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে দাঁড়াই তোর মুখোমুখি
মনের যত জমানো কথা বলার ইচ্ছা সরাসরি
অদৃষ্ট যেন আটকে রাখে কথা আর হয়ে ওঠে না
জীবন তরীর সবই আছে কান্ডারী কই নাও বায় না !

সাংবাদিক

অস্ত্র নয় কলমধারী সত্য প্রকাশে উদগ্রীব
খবরের ঘটনায় জড়িত সত্য সংশ্লেষী
সত্য বিচারে ন্যায়নিষ্ঠ খবর প্রকাশে নির্ভীক
বুড়ো আঙ্গুল চোখ রাঙানির প্রতিবন্ধকতার জয়ী
খবর সংগ্রহ নয় বাস্তব উদঘাটনে তৎপর সদা
অদম্য সাহসী জীবনকে বাজি রেখে একা এগিয়ে চলা
হাতের বুম পেনের কলমে বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে দেখা
খবর তৈরীতে নয় বাস্তবকে সমাজের সামনে রাখা
কখনো কখনো অপমানিত লাঞ্ছিত করার অপচেষ্টা
রাজনীতির যাঁতাকলে পড়ে হেরে না যাওয়া ইচ্ছা
সহ্য করে বিনা বাধায় দায়িত্বজ্ঞানের প্রাধান্য দেওয়া
আবেগ নিয়ন্ত্রণে চাটুকারিতা বর্জনে ক্ষুরধার ভাষা
শব্দ ভাষা প্রচ্ছদে খবর বর্ণনায় কলমকে হাতিয়ার
খবরের শিরোনাম সংবাদপত্রের পাতায়, টিভির পর্দায়
অবশেষে রিপোর্ট সামাজিক দায়বদ্ধতার অনন্য প্রকাশ
তুমি সাংবাদিক সত্যের পূজারী সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায়…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।