ছোটদের জন্যে বড়দের লেখায় সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে ঊশ্রী মুখোপাধ্যায় (নব্বইয়ের গল্প – ৬)

এক যে ছিল রুশ দেশ

অনেক দিন, নাকি, অল্পদিন আগের কথা। নাকি গল্প শোনার, গল্প পড়ার সেইসব দিন। বাবা-মা, দিদি, জেঠু-বড়মা, কাকু-কাকিমা, ঠাম্মার গন্ডি ছাড়িয়ে পাড়ার দাদা, কাকু, পিসি, এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আত্মীয় স্বজনদের চেনার দিন। খবরের কাগজটা যে কেবলমাত্র পটি করা আর নৌকা বানানোর জন‍্য‌ই ব‍্যবহার হয় না, কেউ কেউ সেটা পড়েও থাকে সেটা বোঝার দিন। বড়দের মুখে আমেরিকা আর সোভিয়েত রাশিয়া, নামদুটো শোনার দিন। কিন্তু এটা তখনো বোঝা বাকি ছিল যে সোভিয়েত রাশিয়াই হল সেই রুশ দেশ,যেখান থেকে ছোটদের জন্য আশ্চর্য ছবি আঁকা সব ব‌ইপত্র আসে। ওসব তো বাংলায় লেখা, অন্য দেশের হবেই বা কি করে?
ইতিহাস বলে উনিশশো নব্ব‌ইয়ে সোভিয়েত রাশিয়া টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। তবে রাশিয়ার ব‌ইপত্র এ দেশে আসার ধারা তখনো অল্পবিস্তর চলেছিল। অজস্র ব‌ই, বিশেষ করে শিশুসাহিত্য অনুবাদ করেছিলেন ননী ভৌমিক, অরুণ সোম, আরো অনেকে। তাই আমরা, যারা নিজেদের শৈশব আর কৈশোর কাটিয়েছি নব্বইয়ের দশকে, ছোটবেলার অনেকটা জুড়েই লালকমল, নীলকমল, পক্ষীরাজ ঘোড়া, শুকপাখি, রাক্ষসখোক্কস আর কলাবতী রাজকন্যার পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছিল রুশ রূপকথা আর উপকথার চরিত্ররা।
আমাদের ছোটবেলার রুশদেশ ছিল এক অদ্ভুত দেশ। সেখানে গল্পের নায়ক হ‌ওয়ার জন্য রাজপুত্র হ‌ওয়ার খুব একটা দরকার পড়ত না, চাষীর ছেলে, মুচির ছেলে, অনাথ ছেলে, এমনকি শেয়াল, ভালুক, খরগোশের মত না-মানুষরাও হতে পারত কোন না কোন গল্পের প্রধান চরিত্র। সেসব গল্পে জ‍্যান্ত হয়ে উঠত সবুজ মাঠ, হলুদ ফসলের ক্ষেত, রূপোর পাতের মত নদী, বড়বড় ওক গাছে ঢাকা গভীর বন। খুব একটা অপরিচিত লাগত না সেসব, চোখে না দেখলেও। তার‌ই মাঝখানে শনশন করে এগিয়ে যেত কোন ‘বুদ্ধিমান ইভান’ এর স্বর্ণকেশরী ঘোড়া, পাঁশুটে নেকড়ের পিঠে সদাগরের কন্যা, বীর তীরন্দাজ এর পেছনে অদৃশ্য ছায়ার মত চলত অ-জানি দেশের না-জানি কি, যার আনুগত্য জেতা যায় একমাত্র সহমর্মিতা দিয়েই। রাজা, জমিদার বা সামন্তরাজাদের দেখা গেছে প্রবল অত‍্যাচারী, লুঠেরা হিসেবে, যার কারণ পরে জেনেছি, অনেক বেশি বয়সে। কিন্তু তখনই সেসব গল্পের অন‍্যরকম, অনেকটা মানবিক আবেদন ঠিক চোখ এড়ায় নি। এমনকি ডাইনি বাবা-ইয়াগাও ‘ভেজে খাব, হাড়ে চড়ে ঘুরে বেড়াব,” হুমকি টুকুই দিত মাত্র, কার্যক্ষেত্রে ছিল ভালো মানুষ, মানে ভালো ডাইনি। শুধু সাহায‍্য‌ই করত তাই নয়, নক্সী জাজিম ঢাকা ওক কাঠের টেবিলে চর্বচোষ‍্য খাওয়াত বিপদে পড়া কুমার আর কন্যেদের। হ্যাঁ, কন্যেদের ও। এ দেশের খালি ছেলেরা নয়, মেয়েরাও অভিযানে যেত, কোন নিঝুম পুরীতে রাক্ষসের হাতে বন্দী হয়ে কেবলমাত্র রাজপুত্রের আসার অপেক্ষা করত না। এমনকি যাদুর খেলাও তারা রীতিমতো জানতো, আর আমরাও ইভানের পাশাপাশি ভালোবেসে ফেলতাম জাদুকরী ভাসিলিসা, রাজকুমারী মারিয়া আর সদাগরের মেয়ে মার‍্যুশকা কে।
তবে এতসব কথা সেসময় ঠিক এভাবে মনে আসেনি,আসার কথাও ছিল না। তখন দুচোখ ভরে থাকত আশ্চর্য রঙে আঁকা একরাশ আশ্চর্য ছবিতে। অফিসফেরত বাবা প্রতিমাসে নিয়ে আসত ‘মিশা’, একটি মাসিক ইংরাজি ম‍্যাগাজিন, ইচ্ছে ছিল মেয়েদের ইংলিশ শেখানো। কিন্তু মেয়েরা ব্যস্ত থাকত ছবি দেখায়। খরগোশ, ইঁদুর, হাঁসমুরগী, কাঠবিড়ালি, বিদেশি পোশাক পরা মানুষদের অন‍্যরকম ছবি। বাংলাতেও ছিল, ‘ছবিতে ছবিতে গল্প’, ‘গল্প আর ছবি’, যেখানে হাঁসের ছানা আর মুরগি ছানা ডিম ফুটে বেরিয়েই বলে,’ বেরিয়ে এসেছি’, সজারু, ব‍্যাং, মোরগ, মাছি একসঙ্গে কাজ করে তৈরি করে ময়দা কল, কারো জাল চুরি করে দোলনা টাঙিয়ে আরাম করে তিনটে বাঁদর, বেড়ালকে বোকা বানায় ইঁদুরের দল। এরই মাঝে বরফ ঢাকা জঙ্গলে ছোটদের বড়দিনের উৎসবের জন্য ফারগাছ আনতে এগিয়ে যায় এক বরফ পুতুল আর তার সঙ্গী ছোট্ট কুকুরছানা। এক জীবনে, শিশুমনের কল্পনাকে অনেকখানি উস্কে দিতে দিতে।
আরো বড় হয়েছি, পরিচিত হয়েছি রাশিয়ার কিশোর গল্প, এমনকি বড়দের গল্পের সঙ্গেও। প্রায় বন্ধুর মতোই মনে হয়েছে আর্কাদি গাইদারকে, যিনি ঠিক মনের কথাগুলোই কলমে ধরে আনতেন।আমরা দুই বোন একদিন ‘চুক আর গেক’ এর মত ট্রেণে করে অনেক দূর যাব, সেই পরিকল্পনা করতাম। এমনকি ‘তিমুরের’ গল্প পড়ে পাড়ায় ঝগড়ার সময় ‘চরমপত্র’ দিয়ে পত্রপ্রাপক মেয়েটির বাড়ির লোকদের ঝাড়‌ও খেয়েছিলাম(তারা তো আর গাইদার এর লেখা পড়েনি)। পরে বড়দের লেখাগুলো যখন পড়েছি, অনেকসময়ই মোহভঙ্গ হয়েছে ছোটবেলার সেই আশ্চর্য দেশ সম্পর্কে, বিশেষ করে সীমাহীন দারিদ্র্য, সম্পর্কের মালিন‍্যের বাস্তবতা যখন চোখে পড়েছে। আরো বড় হয়ে ইতিহাস পাঠ‍্য বিষয় হ‌ওয়ায় বিশদে পড়তে হয়েছে সমাজতন্ত্রের ট্রায়াল অ্যান্ড এরর, ঠান্ডা লড়াই, দাঁতাত, গ্লাসনস্ত- পেরেস্ত্রোইকা। অনেক কিছু জেনেছি যা সেই ছোট্টবেলার রুশদেশ এর ছবির থেকে অনেকটাই আলাদা। কিন্তু তাও ঠিক স্বপ্নভঙ্গ যে হয়েছে বলা যায় না। কারণ সাধারণ মানুষের জিতে যাওয়ার স্বপ্ন, মানুষের কেবলমাত্র নিজের জোরে উঠে আসার স্বপ্ন কি এত সহজে যাওয়ার? মানুষের সাধারণ গড়পড়তা দুনিয়ার পাশাপাশি যাদুর দুনিয়াতেও তো বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে(সৌজন্যে হ‍্যারি পটার), তাহলে পশুপাখির দুনিয়াটাই বা কি দোষ করল? সব কিছু, যা মানুষ খালি চোখে দেখতে পায়, সেটাই কি সব? কঠিন বাস্তবের কাঁটা খোঁচাগুলো কয়েক মুহূর্তের জন্য সরিয়ে রেখে কল্পনায় বাঁচা কয়েকটা মুহূর্ত নাহয় সারা জীবন ধরে গুছানো থাকলো। ওটুকুই অনেক। বাস্তবের রুশদেশ যেমন‌ই হোক, আমাদের ছোটবেলার রুশদেশ মনেই থাক। আদরে থাক।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।