সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব – ২১)

শহিদ ভগৎ সিং চরিত
ষষ্ঠ অধ্যায় || দ্বিতীয় পর্ব
বায়োস্কোপওয়ালা, এবার তার বাক্সের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে বলতে শুরু করেছে;ছেলেরাও উন্মুখ হয়ে, খোপে মুখ- চোখ চেপে আছে;ভিতরে চলছে রিল, সঙ্গতি রেখে বাইরে চলছে বিবরণী- ধারা।
“সুখদেব বলছে, ‘ভাবী! স্কুল থেকে ছুটি নিতে হবে; কয়েক দিনের জন্য শহরের বাইরে যেতে হবে, হ্যাঁ, কিছু টাকা হবে’? ”
” কোলকাতা হলে যেতে পারি। ”
“কয়েক দিন আগে ভগবতীবাবু,
ভাবীর স্বামী, বেশ কিছু টাকা দিয়ে কোলকাতায় কংগ্রেস- অধিবেশনে যোগ দিতে চলে গেছেন, সেই টাকাটা, সুখদেবের হাতে তুলে দিলেন। “
“ডিসেম্বর 19 তারিখে সন্ধ্যা- বেলায়, সুখদেব, দু’জন সঙ্গীকে নিয়ে দুর্গাভাবীর কাছে হাজির;দেখুন তো, ‘এদের চিনতে পারেন কি না, ‘ বলছে সুখদেব।
দুর্গাভাবী, এরকম স্যুটেড, ব্যুটেড, হাই- ফাই চেহারার কোন ছেলেকে এর আগে সুখদেবের সঙ্গে দেখেছেন বলে মনে করতে পারছেন না। “
“সুখদেব বলছে, ‘এ সেই ‘জাট্টু’, যে কমলা লেবু গিলে খেতো; এবার ছেলেটি হাসতেই, তিনি বুঝতে পারলেন, এ ভগৎ , তবে রাজগুরু- কে এর আগে কখনও দেখেননি।
ওদের জন্য, কিছু খাবার তৈরি করে খেতে দিলেন। সুখদেব ও ভগৎ খাচ্ছে ডাইনিং টেবিলে বসে। ভাবী, একটা প্লেটে কিছু খাবার নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়ানো রাজগুরুর হাতে দিলেন; এরপর, রাজগুরুকে যাত্রা- পথে সাহেবের আর্দালি সেজে যেতে হবে। “
“পরেরদিন ভোরে, স্থানীয় সি আই ডি’র প্রতিদিন বাড়ির উপর নজর রাখার সময়ের আগেই টাঙ্গা নিয়ে তারা লাহোর ষ্টেশনে হাজির। শীতকাল, গায়ে কলার উঁচু ওভার- কোট,পায়ে দামি জুতো, মাথায় সাঁচি টুপি, একটু কাত করে হেলানো, বুকের কাছে হাতে করে ধরা ভাবীর শিশু- কন্যা;এখন ভগৎ সিংজি মিলিটারি অফিসারের ভূমিকায়, সঙ্গে স্ত্রী ও
শিশু- কন্যা, পিছনে লাগেজ মাথায় চলেছে আর্দালি। লাহোর ষ্টেশন চত্বর, পুলিশ ও সি আই ডিতে ছয়লাপ। গটগট করে তাদের মধ্যে দিয়ে, মিলিটারি অফিসার, সপরিবারে ফার্স্ট ক্লাশের বগিতে উঠলেন, আর আর্দালি, রাজগুরু, লাগেজ নিয়ে
লাগোয়া সেকেন্ড ক্লাশের কামরায়
উঠেছে। গাড়ি, লাহোর ষ্টেশন ছেড়ে গেল। লখনৌ, এসে কয়েক ঘণ্টার ব্রেক; ওয়েটিং রুমে এসে অপেক্ষা;আর, এখান থেকেই রাজগুরু যাবে অন্য পথে। লখনৌ থেকে কোলকাতায় সুশীলা দিদিকে টেলিগ্রাম করা হোল—-
‘coming with brother–
Durgawati’.
“কোলকাতায় সুশীলা দিদি ভাবছেন, দুর্গা তো, কখনো দুর্গাবতী লেখে না, তার ভাই আছে, তাও তিনি কখনও শোনেননি। ভগবতীবাবু(ভগবতীচরণ), এ বাড়িতে আত্মগোপন করে আছেন। ধনবান শেঠ, স্যার ছাতুরাম (Chatturam) , বৃটিশ সরকারের কাছে খুবই আস্থাভাজন; ভিতরে স্বদেশ- প্রেম
জাজ্জ্বল্যমান; নিজের মেয়েকে স্বদেশী ভাষায় শিক্ষা দেবার জন্য, সেই সুদূর জলন্ধর থেকে এই সুশীলা দিদিকে নিয়ে এসেছেন; আর দিদিও বাড়ির সকলের মন জয় করে বিপ্লবীদের কাজ সহজ করে তুলেছেন। সুতরাং, এ বাড়ি এখন আত্মগোপনের নিরাপদ স্থান। ওরা এখানে এসে পৌঁছালে, ভগবতীবাবু বলছেন, ‘দুর্গা, এতদিনে তোমাকে চিনতে পারলাম’। ”
“ভগৎ সিংজিকে এ বাড়িতে অসুস্থ সাজতে হয়েছে; মাথার গোড়ায় রয়েছে অষুধের বোতল; লোকজনের সামনে তাঁকে, বোতল থেকে মিক্সচার খাওয়ানো হচ্ছে। দিনের বেলা ঘর বন্দী, রাতের অন্ধকারে, চলে তাঁর বাংলার স্বদেশ- প্রেমী, বিপ্লবীদের সঙ্গে আলাপ- আলোচনা। “
চলবে