সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব – ১০)

সাদা মিহি বালি
রমেন্দ্র, সুস্থ হয়ে নিজের অঞ্চলে এসে, বন্ধু নিলয়কে সবিস্তারে সব বলে। নিলয়, একজন পাকা ড্রাইভার, ছ’ফুট লম্বা, একেবারে মারকুটে চেহারা, দুঃসাহসী, ‘ভয় কারে কয়, নেইকো জানা’ স্বভাবের ছেলে। পাশের কারখানায় কাজ করে; বন্ধুর জন্য প্রাণপাত করতে পিছপা নয়। ঠিক হ’ল, এ অঞ্চল থেকে গাড়ি নিয়ে নিলয় যাবে এবং পরিকল্পনা মত রমেন্দ্র ও ইন্দরকে
নিয়ে, ঐ গাড়ি চেপেই আসানসোল ছাড়বে। স্থানীয় কোন গাড়ি ভাড়া করলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা;সর্দার গর্জন শিং’র লোকেরা ঐ অঞ্চলে খুব তৎপর, মাফিয়া- ব্যবসায়ীরা যেমন হয় আর কী!
সেদিন এসে গেল। নিলয়, বন্ধু ও ইন্দরকে নিয়ে পরিকল্পনা মত সন্ধ্যা বেলায় চিরকালের মত আসানসোল ছেড়েছে। রাঘবেন্দ্র- বাবু ও পশুপতিবাবু, প্রথমে বিস্মিত হলেও, ঘটনার গুরুত্ব বুঝে, দু’জনকেই বাড়িতে সসম্মানে স্থান দিয়েছেন । পশুপতিবাবুর চোখে জল, সেটা যে আনন্দাশ্রু,
রাঘবেন্দ্রবাবুর বুঝতে অসুবিধা হয়নি। নিজে যে দুঃসাহস দেখাতে পারেননি, ভাইপো, তা করে দেখিয়েছে;দু’হাত দিয়ে ভাইপোকে
বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। বংশের
জাত্যভিমান, জগদ্দল পাথর, আজ টুকরো টুকরো হতে শুরু করেছে।
পশুপতিবাবু, নিজের অক্ষমতার অন্তর্দাহে সারা জীবন জ্বলেছেন।
আজ, ভাইপো রমেন্দ্র ঘোষাল, পরিবারের ঠুনকো বংশমর্যাদাকে
টুসকি দিয়ে অন্যপ্রদেশের মেয়ে
ঘরে এনে বংশের বীর্য- শুল্কের
প্রতাপ বৃদ্ধি করেছে।
পশুপতিবাবু, দু’ভাই, শিব- শংকর ও রমেন্দ্রের বিয়ে একসাথে দেওয়ার প্রস্তাব করলে, শিব-শংকর বললো, “কাকা, আমি, তোমার মত একলা চলার মন্ত্রে
বিশ্বাসী;আশীর্বাদ কর, যেন তোমার পথ অনুসরণ করে আজীবন চলতে পারি। ” রমেন্দ্র- ইন্দরের বিয়ে যথাযথভাবে সুসম্পন্ন হ’ল। ঘোষাল- পরিবারের অন্যগোষ্টীরাও এ বিবাহে অংশ নিয়েছে। পশুপতিবাবু, বংশের বয়োজ্যেষ্ঠ, সাদরে ইন্দরকে পুত্র বধূরূপে স্বীকৃতি দিয়ে নিজের অক্ষমতার প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ পেলেন।
রাঘবেন্দ্রবাবু, নিজেদের অংশ বিক্রি করে কয়লা- শিল্প থেকে হাত গুটিয়েছেন; মনে মনে দুঃখ পেলেও ভাই ও ভ্রাতৃবধূকে বাঁচাতে এটুকু ক্ষতি স্বীকার না করলেই নয়;(;্য্্য্য্্্য্্য্য্্) একটু
দুঃখ তো থাকবেই, বাপ- ঠাকুরদার ব্যবসা হাতছাড়া হলে মন খারাপ হওয়াই তো স্বাভাবিক!
রমেন্দ্রকে, তিনি জেলার ঘাট- পারাপারের ব্যবসার দায়িত্ব দিয়েছেন; সেও, সেটা সামলে, ট্রাকে করে দ্বারকা, মুণ্ডেশ্বরী নদীর বালি সাপ্লাই দিচ্ছে। নতুন উপনগরী, সল্ট- লেক তৈরী হচ্ছে; সাপ্লাই- ব্যবসার রমরমা। কয়লা- খনি, হাতছাড়া হওয়ার খেদ ভুলিয়ে, দাদার মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছে।স্ত্রী ইন্দরও, ঘোষাল- পরিবারের সঙ্গে, নিজেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছে। কাকা, পশুপতিবাবুর দেখভাল সে নিজের দায়িত্বে নিয়েছে; তবে তার
মুখে আত্মীয়- স্বজন হারানোর ছাপ বেশ স্পষ্ট;সত্যই তো, রক্তের সম্পর্ক যে গাঢ়, তা কি সহজে মোছা যায়? যায় না। এদিকে, আসানসোল বা বর্দ্ধমানের দিকে যাওয়ার কোন উপায় নেই; বাবার ও আত্মীয়দের লোক সব ছড়িয়ে- ছিটিয়ে রয়েছে; হয়তো, প্রাণেই মেরে ফেলবে। তাই, এই আধা-
শহরের ঘেরা- টোপের বাইরে তার যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না; ধর্ম বা প্রাদেশিকতা এদেশে ভয়ংকর; এক্ষেত্রে কোন যুক্তিই খাটে না; ভারত, এক দেশ– এক জাতি–এক প্রাণ– জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র, ঠিক কি না!
চলবে