সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব – ১৪)

সাদা মিহি বালি

তৃতীয় অধ্যায় – প্রথম পর্ব

নিজে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর সংসারের আর্থিক অনটনের জন্য
পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।
সেই অতৃপ্তি তিনি ভাইদের মধ্যে দিয়ে মেটাতে পেরেছেন; উদয়াস্ত পরিশ্রমের ফল পেয়েছেন। নারায়ণ ঘোষালের ব্যবসার এখন রমরমা অবস্থা। সেজো-ভাই কিঙ্কর, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করে হিমাচল প্রদেশে এক বৃহৎ দেশীয় ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানায় সহকারী সি- ই-ও পদে যোগ দিয়েছে। ন’ভাই প্রাণকৃষ্ণও, মেডিকেল পরীক্ষা শেষে এখন ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজের হাউজ- সার্জেন। আর্থিক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত; পরের দু’ভাইকেও ব্যবসায় নামাবার জন্য ট্রেনিং প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। মা’র কথা মত কিঙ্কর ও প্রাণকৃষ্ণের বিয়ের ব্যবস্থা এই নতুন বাড়িতেই হ’ল। রাঘবেন্দ্র গোষ্ঠীর সবাই সপরিবারে এ বিবাহ- অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে।

মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে, মা’র কথা মত সেজো-ভাই, স্ত্রীকে নিয়ে হিমাচলের কার্যস্থলে চলে গেছে; ন’ভাই প্রাণকৃষ্ণও এ অঞ্চলের পাশের শহরে চেম্বার করেছে; ঐখানেই জায়গা কিনে, মা’র আদেশে একটা বাড়িও শুরু করেছে, শেষ হলেই ঐ নতুন বাড়িতে চলে যাবে। এ বাড়িতে, তাঁর ও মেজ-ভাই’র সংসার থাকবে; মা’র ইচ্ছা তাই। মা, কিছুতেই মেজ-ভাই’র স্ত্রীও মেয়েকে কাছ ছাড়া করবেন না; ওদের দায়িত্ব যে মাকেই নিতে হবে; মেজ-ভাই’র স্ত্রী’র মুখের দিকে তাকানো যায় না; মেয়েরা সব সহ্য করতে পারে, কিন্তু স্বামীর অনাদর, স্বামীর অন্য নারী- গমন কিছুতেই মানতে পারে না, সে লজ্জা যে তার কাছে মৃত্যু সমান। মা সব বোঝেন, তাই মেজ-ভাই’র স্ত্রীকে সব সময় আগলে রাখেন; ভাই-ঝিকে সব সময় স্বাবলম্বী হয়ে, যোগ্য জবাব দেবার জন্য প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করেন। সব সময় বোঝান, নারী- শক্তির কী মহিমা! নারী, মোটেই অবলা নয়। স্বামীর অকালমৃত্যুর পর কীভাবে তিনি এতবড় সংসারকে সুষ্টু ভাবে পরিচালিত করেছেন; তাঁর অভিমত, ঝড়- ঝাপটা সাময়িক, আদর্শের অকাল- মৃত্যু হয় না; তা শাশ্বত; পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। সত্য, আদর্শই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়ে থাকে।

এবারে, নেপাল অঞ্চলাদিতে
যাবার আগে, মেয়ের ঘরে গেলে নারায়ণ বাবু, মেয়ের মুখটা দেখেছিলেন
ভার; পূর্বের খিলখিল হাসির পরিবর্তে সেই লক্ষ্মী- মেয়ে, ফ্যাল, ফ্যাল করে চেয়েছিল তাঁর দিকে; সেই থেকেই তাঁর মনে খচখচ ভাব শুরু হয়েছিল; তার পরেই ঘটেছে তাঁর ব্যবসায়ে বিপর্যয়। ফিরে এসে, দেখেন, মেয়ের ঘর শূন্য; বুঝলেন, তিনি এবার লক্ষ্মী- ছাড়া হয়েছেন।
কয়েকদিন হল নারায়ণ বাবু,
নেপাল, ভুটান সফর করে ফিরেছেন; এবার ফিরতে তাঁর
বেশ দেরী হয়েছে;তাঁকে খুব মনমরা, ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তাঁর পুরনো সাদা আ্যম্বেসাডার মটর গাড়িটা ও ড্রাইভার নেপালী বাহাদুরকে আর দেখা যাচ্ছে না। নিজেও অসুস্থ বলে, বাড়ি থেকে আর বেরোচ্ছেন না। অঞ্চলের চারদিকে ফিশফিশানি শুরু হয়ে গেছে; তাঁর সোনালী- বিস্কুটের কারবারের কথা এখন লোকের মুখে মুখে:বর্ডার অঞ্চলে না কি তাঁর গাড়ি ধরা পড়েছে; ড্রাইভার, বাহাদুর, সবটা নিজের ঘাড়ে নেওয়ায়, নারায়ণ বাবু ছাড়া পেয়েছেন। জনশ্রুতি, কতটা সত্য না জানতে পারলেও, গাড়ি ও বাহাদুরকে যে আর দেখা যায় না,
তা সত্য। ঘড়ির দোকানের মালিকের মুখও যে শুখনো, খুবই উদ্বিগ্ন, তা দেখলেই বোঝা যায়।
নারায়ণ বাবুর ভাই’রা অবশ্য, এ সব কথাবার্তার কোন গুরুত্ব দেয় না।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।