T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় উজ্জ্বল কুমার মল্লিক

অম্লমধুর বটিকা

ষ্টেশনের দেবদারু গাছটার চাতালে বসে বসে রঞ্জন বাড়ুজ্জে
চিন্তামগ্ন ভাবে রেল- লাইন দু’টোর পানে একদৃষ্টে চেয়ে আছেন।প্রথমে লাইন দু’টো সমান্তরাল ভাবে, দূর- দূরান্ত পর্যন্ত চলেছে, তারপর, দু’টো মিলে শুধু একটাই
মনে হচ্ছে। সকালের
নতুন আলোর ছোঁয়ায় তা চিকচিক করছে, মনোমুগ্ধকর তো বটেই, মনটা আনন্দে ভরে উঠছে।

“কি রঞ্জন বাবু! কোথাও যাবেন নাকি?” বলে ষ্টেশন মাষ্টার- মশাই, বাঁ হাতে গোটা কতক টিকিট নিয়ে, ডান হাতটা প্যান্টের উপর দিয়ে পকেটের খুচরোগুলো পরখ করতে করতে বললেন, ” ট্রেন তো চলে গেল”।

“না, এই আর কী, একটু জিরিয়ে নিচ্ছি”।
” বসুন, বসুন”, বলে নিজের ঘরের দিকে ষ্টেশন মাষ্টার এগিয়ে গেলেন।

শালা! পকেটের খুচরোগুলো পরখ করছিলো, একটা গরীব মানুষকেও ছাড়বে না, সিকি, আধুলি,এমন কী দু’আনাও নেবে; শালা! যাবার সময় সব সঙ্গে নিয়ে যাবে! বাড়ি গেলে তো গিন্নি পকেট হাতড়ে, দু/এক আনা রেখে সব ভাঁড়ে ফেলবে; ঐটাই তোমার প্রাপ্য; ওতে বড় জোর, এক কাপ চা আর একটা লেড়ো জুটবে, এতেই এত ঠক- ঠকানি, চশমখোর!

রঞ্জন বাড়ুজ্জের আজও আর ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দেওয়া হল না। ঠিক আছে, কালও তো ট্রেন আসবে, পরে ভাবা যাবে। এখন যে
পেট চুঁই চুঁই করছে; আলসার ভাবটা ভয়ের কারণ হয়ে উঠছে; ডাঃ, খালি পেটে থাকতে নিষেধ করেছে; এখন পেটে কিছু না দিলে, নয়; যন্ত্রণা শুরু হয়ে যাবে।
ভোরে বেরোবার সময় তো পয়সা নিয়ে বেরোননি,যাচ্ছেন তো পৃথিবী ছেড়ে,তখন খালি হাতেই যাবেন ভেবেই তো—। মরে গেলে রোগ, ব্যারামও থাকবে না, কিন্তু, না মরা পর্যন্ত—-। এখন দোকান থেকে কিছু কেনারও উপায় নেই,
সকাল বেলায় ধারে কিছু কিনতে তাঁর রুচিতে বাধে।

ষ্টেশন থেকে বেরোতেই দেখেন, বাড়ির সব সময়ের কাজের লোক, পরানের মা, ষ্টেশন পানে এগিয়ে আসছে; ওনাকে দেখেই বলে, “ও দাদাবাবু! কখন, তোমার টিফিন খাওয়ার সময় হয়ে গেছে;গিন্নি দিদি, আর কতক্ষণ তোমার টিফিন আগলে বসে থাকবেন, বলে পাঠালেন”।

বাড়ি যেতেই দেখে, টেবিলের ওপর চাপা দেওয়া জামবাটি ভর্তি
দই- আম দিয়ে মাখা চিঁড়ে রয়েছে। ভাববাচ্যে বলা হল, ” পরানের মা, বল, খেয়ে যেন উদ্ধার করা হয়। এইটা নিয়ে ক’বার হল? আমার আগে উনি যাবেন! ভামিনী বামনিকে বেধবা করে একাদশী করানোর ব্যবস্থা, দেখাচ্ছি মজা। ”

রঞ্জনবাবু, ধীরে ধীরে চাপা খুলে, বাটিতে রাখা চামচ নাড়তেই,
জলহস্তীর মত থলথলে চেহারায়
পা ফেলে, বারান্দার মেঝেতে একটা অনবদ্য ঝংকার তুলে ভামিনী বামনি অদৃশ্য হল।

খেতে খেতে রঞ্জনবাবু মনে মনে
ভাবছেন, বেশ মেখেছে কিন্তু চিঁড়ে টা, খেতে ফাস্ট- ক্লাস লাগছে; আহা, ভামিনীর মুখের কথা গুলো
যদি এই চিঁড়ের মত মধুর হত!

গত তিন- সাড়ে তিন বছর হল চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। কোলকাতার ফেয়ারলিতে রেলওয়ের অফিসে চাকরি করতেন। গ্রাম থেকেই সারা জীবন যাতায়াত করে অফিস করেছেন। এখন আর সময় কাটে না। খবরের কাগজ, বই পড়েও সময় কাটানো দায়। আশেপাশে, পরিচিত অবসরপ্রাপ্তও কেউ নেই,
তাই মুখ বুজে, ভামিনীর ভবভার সম্পর্কীয় ভাবনার সঙ্গে তাল দিতে হয়, অন্যথায়, বাক্যবাণে বিধ্বস্ত হতে হতে, তাঁকে প্রায়ই এই পরলোকে যাবার সিদ্ধান্তে আসতে হয়। কিন্তু, যদি ভামিনী আগে চলে যায়, তাহলে তাঁর কী অবস্থা হবে, ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়।

” বলি, খেতে খেতে কোন চুলোয় মন যায়;বাজার থেকে মাংস আনতে হবে; মাংসের স্টু করা হবে। আমাকে তো এদিকে বেধবা করিয়ে একাদশী করানোর মনস্থ হচ্ছে, সে গুড়ে বালি; সধবার সাজে, মাছ, মাংস খেয়ে, লোককে জানিয়ে, ড্যাং,ড্যাং করে যাবো, লোকের মত চুপিসারে নয়, এ ভামিনী বামনির ওয়াদা। পরানের মা, আজ তুই এখানেই খাবি। তিরিশটি টাকা চেয়ে নে, বাজার যাবি।

তিনটে দশ টাকার নোট বের করে পরানের মা’র হাতে ধরিয়ে রঞ্জনবাবু বললেন, “তোমার গিন্নি –
দিদি, যা বলবে, নিয়ে আসবে বাঁচলে, তোমার কাছে রেখে দিও।”

টেবিলের উপর রাখা কাঁচিটা দেখে বুঝলেন, দু’টো ব্লেডের ধারের দিক বিভিন্ন, তাই কাঁচিতে
কাজ হয়, সুষ্ঠুভাবে তা কার্যকরী হয়, অন্যথায়, একই দিকে ধার থাকলে জীবণ হয়ে যায় মাধুর্য- হীন, অল্পদিনেই তা হয়ে ওঠে থোড়বড়ি খাড়া, একঘেয়ে, বেশুরো, বৈচিত্র্যবিহীন।

রঞ্জনবাবু- ভামিনী দেবীর শুভ- দৃষ্টির সময়,চোখা- চোখি মিলন কীভাবে হয়েছিল,তা জানার আর কোন উপায় নেই। ভামিনীর তখন ছিপছিপে গড়ন, একেবারে জগদ্ধাত্রীর মত ছিল মুখের আদল। বাবা- মা, তাই সসম্মানে ওনাকে ঘরের লক্ষী করে নিয়ে এসেছিলেন। দু’টিতে বেশ সুখেই, আনন্দেই সেই স্বপ্ন- দেখার দিনগুলো কাটিয়েছেন। বাবা- মা-ই
জোর করে কত জায়গায় ঘুরতে পাঠিয়েছেন। বিয়ের বছর তিনেক পরে রতন এলো কোলে, বাবা- মা’র কী আনন্দ! নাতিই হয়ে উঠলো সব; আর ভামিনী তো শ্বশুর- শ্বাশুড়ীর নয়নের মণি আগেই ছিল।

নাতির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা- মা’রও স্বর্গের সিঁড়ি ভাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। এক সময়ে তাঁরাও
আগুপিছু কয়েক মাসের ব্যবধানে
শেষ সিঁড়িতে পৌঁছে গেলেন। ভামিনীর কী কান্না, তা বলে বোঝানো যায় না। রঞ্জনবাবু, বুঝতেও পারেননি, ঠেসে, ঠেসে, তোয়াজে কী সুপ্ত তুবড়ি, তাঁরা রেখে গেছেন; একটু আগুনের ছোঁয়া পেলেই ভয়ংকর রকম ফুলকি ছোটাবে; না, ফটাস করে ফাটবে না বা ভুশ করে নেতিয়ে পড়বে না; সোজা হয়ে উপরে নানা- রঙের ভয়াবহ স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে মনে ভীতির সঞ্চার না করিয়ে থামবে না, অন্ততঃপক্ষে
রঞ্জনবাবুর উপলব্ধি এটাই। নামটা একেবারে সার্থক, যৌবনকালে, অবশ্য দেখা হত তো রাতে, সারাদিন অদেখা;অফিস থেকে ফিরতে ফিরতেই রাত গাঢ় হয়ে যেত, হয়তো তাই, তিনি এই রূপ
কখনও দেখতে পাননি। আবার রবিবার দিনটা এত তাড়াতাড়ি চলে যেত কখন, বুঝতেই পারতেন না। এখন তো সব সময় দেখা, বিভিন্ন রূপে দেখা, দেখতে দেখতে, না দেখাটা যেন প্রত্যাশিত হয়ে ওঠে।

ছেলেও কখন বড় হয়ে বংশের মুখ উজ্জ্বল করে নামকরা ডাক্তার হয়েছে। গ্রামের পাশের শহরে চেম্বার করেছিল; দাদুর কীর্তিকে
তুলে ধরতে, সেবাটাই তার কাছে মুখ্য হয়ে উঠেছিল। তাই কখনও
সহ্য হয় লোকের! দিতে লাগলো কত রকমের বাগড়া, কীভাবে হেনস্থা করা যায়, কু- লোকে উঠে পড়ে লাগলো। সেবা-টেবা করতে হলে, আমাদের হয়ে কর, আমরাই
তোমাকে লোকের সামনে আনবো; বাবা! আমরা, স্বাধীন দেশের সমাজ- ফড়ের দল, আমরাই তোমাদের নিয়ন্ত্রক। মানো আমাদের, তুমি ভালো; অন্যথায়, তোমাকে ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত হাল
করে ছাড়বো। শ্রী রামপুরের হাসপাতালে ঐ গাইনোকোলজিষ্টের মত মেরে নালার জলে ভাসিয়ে দেব। ছেলে, রতন, মনের দুঃখে বললো, ” বাবা, আমি এফ আর সি এস করতে বিলেত যাবো।” রঞ্জনবাবুও ছেলের দুঃখ বুঝে, জমি- জমার অধিকাংশই বিক্রি করে , ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দিলেন। সেই গেছে, না, আর তাকে ফিরে আসার জন্য চাপ দেননি বা বলতে সাহসী হননি। ভামিনীর সঙ্গে প্রতি দিন রাতে কথা হয়, ভিডিও চ্যাট হয়। তিনি, ন’টায় শুয়ে পড়েন বলে, অধিকাংশ দিনই কেবল মা’র সঙ্গে কথা হয়। ওখানেই এক লেডি ডাঃ’র সাথে বিয়ে হয়েছে।

ভামিনীর মন ভালো থাকলে সব বলে, না হলে তো ভাববাচ্যে কথা বার্তা, একেবারে সমাজ- ফড়েদের বাক্যধারা — বক্তৃতা য় বলে না, করতে হবে, দিতে হবে, করা হোক, এই আর কী!

রঞ্জনবাবু, ছেলেকে বলে দিয়েছেন, ” তোরা, এদেশে এসে মানিয়ে নিতে পারবি না। দেশের মানুষ, আর মানুষ নেই। এ বয়সে এসে আমরা আর পুত্র- শোক সহ্য করতে পারবো না। আমাদের মৃত্যূর পর দেহ পিস- হাভেনে থাকবে, তুই সময় মত এসে সৎকার করে যাবি। যদি কখনও
দেশের মানুষের চরিত্র পাল্টায়, তখনই আসার চেষ্টা করবি। তোর আদর্শ থেকে তুই পিছ্পা হবি না। মানুষের সেবা, সে যে দেশেই হোক, সেবাই মুখ্য। তোমার দেশের লোক যদি সেবা নেবার যোগ্য না হয়, তোমার তো কিছু করার নেই।
যারা ফুলের গন্ধকে দূরে রেখে, আঁশটে গন্ধে মাতে, সেখানে তোমার কোন দুঃখ করার কিছু নেই। আশীর্বাদ করি, তোমার ইচ্ছা পূরণ হোক, বাড়ুজ্জে বংশের ধারা যেন লোপ না পায়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।