ক্যাফে ধারাবাহিক উপন্যাসে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব – ৩০)

শহিদ ভগৎ সিং চরিত
নবম অধ্যায় || দ্বিতীয় পর্ব
কাহিনীকার শুরু করেছে তার কাহিনী—-ছেলেরা গভীর উদ্বেগে;
“লাহোর কোর্টে Saunderহত্যার মামলা উঠেছে।বৃটিশ- সরকার, মামলার জন্য ইমারর্জেন্সি তৎপরতায় 1930 সালে স্পেশাল অর্ডিনান্স॥৷- ঘোষণা করে ও সেই অনুযায়ী স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে।1914-15 সালেও গাদার পার্টির সদস্যদের বিচারের জন্য এ রকম ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল,পার্থক্য কেবল,সে ট্রাইব্যুনাল হয়েছিল যুদ্ধ কালে ঘোষিত Defense of India Rules1915 অনুযায়ী।অন্যান্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে , সব একই।”
“অর্ডিনান্স অনুযায়ী বিচারকালের সময়-সীমা মাত্র ছ’মাস; সুতরাং অভিযুক্তদের বিপক্ষের সাক্ষীদের ক্রস ইগজামিনের কোনো সুযোগ নেই;বিচারের উপরে কোনো আপিল চলবে না; ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সিদ্ধান্তই ফাইনাল বলে মানতে হবে।”
“ভাইস-রয় তো,এসেম্বলীর হলে বোমা ফেলার কাণ্ডকে ‘His Excellency,Henry’র বিরুদ্ধে ঘোষণার উল্লেখ করেছেন;সুতরাং,বিচার যে গাদার – পার্টির সদস্যদের মতই একতরফা হবে,তা বলাই বাহুল্য।”
“জেলে বসে,ভগৎ সিংজি,অভিযুক্তদের হয়ে ষ্টেটমেন্ট তৈরি করে ট্রাইব্যুনালের কাছে জমা দিয়েছেন; বাইরে সংবাদপত্রের হাতেও তা পৌঁছে গেছে।অভিযুক্তরা,কোনো আইনজ্ঞ নিয়োগ করেনি,কেবলমাত্র আইনি- উপদেষ্টা চেয়েছেন।ষ্টেটমেন্ট দেখে বিচারকেরা বিস্মিত;এ রকম সুন্দর ও যুক্তিযুক্ত বক্তব্য দেখে বিচারকেরা,অভিযুক্তদের আইনি- উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করছেন,’এ বক্তব্য, কে লিখেছে?’
উত্তরে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী আসফ আলি বলছেন,’আমি শুধু বক্তব্য পাঠ করছি’; উনি ছিলেন,অভিযুক্তদের আইনের পরামর্শ দাতা মাত্র। “
“ভগৎ সিংজি,বিচারসভার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হাত-কড়া ও শিকলে ঝংকার তুলে বলেন, ‘এই ট্রাইব্যুনাল বসানোর মাধ্যমে প্রমাণ হল,দেশে বর্তমান আইন অনুযায়ী,বিচার সম্ভব নয়। আমরা খুশি,যে সরকার আজ অর্ডিনান্স জারি করে বিচারের প্রহসন করতে চলেছে;সরকারের মুখোশ খুলে দেওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য;প্রাদেশিক আইনসভা,কেন্দ্রীয় আইন সভা চালু করলেও,ভাইস- রয় ,ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে, সর্বসম্মতিতে অনুমোদিত যে কোনো প্রস্তাব নাকচ করতে পারে। তাহলে,আর স্বায়ত্বশাসন হ’ল কোথায়? সরকারের সহানুভূতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোরও মুখোশ আজ উন্মোচিত।’ এতে,বিচারক,বিরক্তি প্রকাশ করলে,ভগৎ সিংজি বলছেন,’যেদিন
ইনক্লাব ধ্বনি তুলে ফাঁসির মঞ্চে উঠবো,তা দেখে,তখন কী করবে!’
ভগৎসিংজিদের, হাতকড়া অবস্থায়, পাঠান পুলিশ দিয়ে বেধড়ক লাঠিপেটা করা হ’ল; প্রায় সবাই অর্ধমৃত,তবু ওদের মন,আনন্দে ভরপুর, শেষের দিনে বীরের মর্যাদার অপেক্ষায় সবাই অধীর।”
“নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু,একদিন ওদের বিচার চলাকালে এলে,ওরা, ‘ইনক্লাব,জিন্দাবাদ ‘ ধ্বনিতে বিচারসভা ভরিয়ে তোলে; নেতাজীও, ওদের ঐভাবেই অভিবাদন করেন।”
“জেল কর্তৃপক্ষ, ভগৎ সিংজিকে খাতা ও লেখার সরঞ্জাম দিয়েছে।সিংজির পড়ার অদম্য নেশা।পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লেখকের বই পড়ে চলেছেন,চলছে নোটবুকে মন্তব্য লেখা।
মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও লেলিনের
উপর লেখা একটা বই পড়েছেন,না,সেই বই’র বেশ কিছু পাতা পড়ার পরই,জেল- ওয়ার্ডেন এসে ফাঁসির মঞ্চে যাবার নির্দেশ দেয়।বৃটিশ সরকার, তাঁকে বা তাঁর সহকর্মীদের বাঁচিয়ে রাখতে রাজি নয়।বিচারে,ফাঁসির সাজা ঘোষণা হয়েছিল 7ই অক্টোবর, 1930 সালে,কিন্ত, তা কার্যকর করার দিন স্থির হয় ,24শে মার্চ1931,ভোরে।কিন্ত, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে,তা বেশ কয়েক ঘণ্টা এগিয়ে আনা হয়, 23শে মার্চ সন্ধ্যা7টা; এটা একটা ব্যতিক্রম বলা যেতে পারে;সকলের অগোচরে,তাঁদের ফাঁসির মঞ্চে তোলা হ’ল।’ইনক্লাব, জিন্দাবাদ, ডাউন উইদ ইপ্মিরিয়ালিজিম’ ধ্বনিতে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে,হাসতে হাসতে ফাঁসির দড়ি নিজেরাই গলায় পরলেন।”
“1915 সালের ফেব্রুয়ারিতে , ভারতব্যাপী বৃটিশ-সেনা দলের বিভিন্ন ব্যারাকে ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে একই সময়ে বিদ্রোহ ঘোষনা করার সময় নির্ধারণের জন্য কেনা ঘড়িটা,রাসবিহারী বসু মশাই, বিদ্রোহ সফল হওয়ার চেষ্টার ব্যর্থতায়,এ দেশ ছেড়ে চলে যাবার আগে, ‘-‘বন্দীজীবন’-এর লেখক,শচীন নাথ সান্যাল মশাইকে দিয়ে যান।সান্যাল মশাই, তা ভগৎ সিংজিকে দেন;ভগৎ সিংজিও,দিল্লির এসেমব্লীর হলে বোমা ফেলার আগে,সেই ঐতিহাসিক ঘড়ি দিয়ে যান,বিপ্লবী সঙ্গী জয়দেবকে। সে ঘড়ি আজও হরদই(Hardoi)’র শহিদ স্মারক ভবনে,টিক টিক করে ঘোষণা করে চলেছে,সন্ধ্যা 7টায়,ভারত মায়ের
দামাল ছেলেরা,বিপ্লবের ডাক দিয়ে হাসতে,হাসতে ফাঁসির দড়ি নিজেদের গলায় পড়েছেন।”
চলবে