সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব – ২৫)

৪র্থ অধ্যায়
প্রথম পর্ব চলছে—
রাজনীতির অঙ্গনে রাঘববাবু যে দলের গা- ঘেঁষা, তা এবার গদিচ্যুত হয়েছে। প্রাক- স্বাধীনোত্তরের মানুষ- জন ক্রমে, ক্রমে বিলীন হয়ে যাচ্ছে; স্বাধীনোত্তর মানুষ- জনের নীতি হীন, ভাব- ভাবনার সঙ্গে খাপ- খাওয়ানো খুবই কষ্টের ব্যাপার। রাঘবেন্দ্রবাবুর কাছে তা অসম্ভব বলেই বোধ হচ্ছে। এই জন্যই কি শহিদ ক্ষুদিরাম, শহিদ ভগৎ সিং, বটুকেশ্বর দত্ত, আরও অনেকে ফাঁসির দড়িতে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন।অযোগ্য,অ-বোধদের
হাতে কুঠার দিলে যে পরিণতি হয়, তদনুরূপ,স্বাধীনোত্তর কালের শাসকদলের হাতে দেশের অবস্থা আজ সঙ্কটময়। শাসকদলের কয়েকজন স্বার্থ জনিত কারণে বাম- রাজনীতি করা দলের সঙ্গে হাত মেলাতেই, সরকারের পতন ঘটেছে। বামাদর্শের দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিক্ষুব্ধরা সরকার গড়েছে;
দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা হল অস্তমিত; চারদিকে শুধু ‘ভেঙ্গে ফেল’, ‘গুড়িয়ে দাও’ স্লোগান;
বাতাস হল শব্দ দূষণে কলুষিত। পুরোনো অধিবাসীদের জমি- জিরেত দখল হতে শুরু হল; কিষান বয়কট শুরু হয়ে গেল। দেশের মানুষের জীবন- জীবিকা হল বিপন্ন। অঞ্চলের কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন, কালি- মন্দিরের সম্পত্তি দখল শুরু হলে, নতুন মুখ্যমন্ত্রীর টনক নড়ে। যাই হোক, মা- কালি তো নিস্তার পেলেন, কিন্তু, স্থানীয় সব কল- কারখানার
চিমনি থেকে আর ধোঁয়া বেরোয় না; ‘দিতে হবে’, দিতে হবে’, কালো হাত গুড়িয়ে দাও’ স্লোগানের দাপটে রুটি- রোজগারের উৎস, স্থানীয় কারখানাগুলো ধুঁকতে,ধুঁকতে,বিআই এফ আরের শরণাপন্ন।
অঞ্চলের পঞ্চু ডাক্তার আছে বলে, অঞ্চলে লোক- সমাগম হয়, বাইরে থেকে লোকজন, রোগী আসে; ডাক্তারের চেম্বার তো নয়, যেন একটা ছোটো- খাটো হাসপাতাল।বাসের কন্ডাক্টররা তো নাম দিয়েছে চেম্বার স্টপেজ।অল্প দূরে রেল স্টেশন, সে পথেও রোগী আসে, কম নয়। সকাল আটটা থেকে রোগী দেখা শুরু করেন, বেলা একটা পর্যন্ত চলে অঞ্চলের বাইরের রুগী দেখা, তারপর চলে স্থানীয় লোকজনের চিকিৎসা; তা প্রায় শ’ দুয়েক রোগী প্রতি দিন, দূর- দূরান্ত থেকে আসে, তারা তো অঞ্চলের খাবারের দোকান থেকেই চা, জল-খাবার খায়, তাই এই সব দোকানের উপর পরিবর্তিত রাজনীতির প্রভাব এখনও পড়েনি, রিক্সা- যানবাহন প্রভৃতির উপরও আঁচ আসেনি। তবে খবর আসছে, ডাক্তারের শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। শরীরের আর দোষ কী! বেলা চারটের সময় দুপুরের খাওয়া, তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই চলে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা। পুরোনো বাড়িতে পঞ্চু ডাক্তার যেতেন; এ নতুন বাড়িতে আসার পর, রাঘবেন্দ্রবাবু নিজেই চেম্বারে কয়েক বার গেছেন। রঞ্জন বাবুর কাছ থেকেই এসব খবর তিনি পান। রঞ্জনবাবু তো প্রতি সপ্তাহেই একবার করে প্রেসার মাপাতে ডাঃ’র কাছে যান, পঞ্চু ডাক্তারের নির্দেশ এটা। ডাঃ তো ব্যবসা করেন না, করেন সমাজ- সেবা, ফলে, চেম্বারে রোগী উপচে পড়ে, আর উনিও সবাইকে সমান চোখেই দেখেন; জুটমিলের শ্রমিক বিহারী রোগীকে, অনেক সময় ইনজেকশন দিয়ে দুধ পাঁউরুটি ও খাওয়াতে দেখা গেছে। ডাক্তার, ডাক্তার কী না!
সংবিধানে, পাবলিক এ্যাডমিনিস্ট্রেসনকে পরিষ্কার ভাবে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। স্থায়ী পরিচালক, অর্থাৎ যারা ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আসবেন, যেমন আইএ এস, আই পি এস ইত্যাদি ও রাজ্য সরকারের রাজ্য পাবলিক সার্ভিস কমিশন, যেমন, বি ডি ও এস ডিও, ইত্যাদি রা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শাসন ব্যবস্থায় আসবেন। এরাই স্থায়ী অংশ, এদের হাতেই সংবিধান সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব। আর রয়েছে, রাজনীতি করা সমাজ-ফড়ের দল, এরা অস্থায়ী, আজ আছে, তো কাল নেই; এরা সরকার গড়ে নীতি নির্ধারণ করতে পারে, তাও চীফ সেক্রেটারীর দায়িত্ব দেখা, সে নীতি সংবিধান বর্হিভূত কী না; সুরক্ষার দায়িত্ব এদের, পরিযায়ীদের নয়। ভোটে জিতে আসবে, তো একবার এরা, অন্যবার অন্যেরা, কিন্তু ঐ স্থায়ীরা
অবসরের আগে পর্যন্ত পদে বহাল, সুতরাং, দায়িত্বও তো থেকে যায়।
ফড়েরা তো নিজেদের স্বার্থে শাসন-ব্যবস্থা চালাতে চাইবে, ঋজু শিরদাঁড়া সম্পন্ন ঐ স্থায়ী অংশ
সরকারের বিপক্ষে গিয়েও সংবিধানকে
রক্ষার দায়িত্বে অটল থাকবে। কিন্তু, যদি ঐ স্থায়ীরা পদলেহনকারী হয়, নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে, দায়িত্ব পালন না করে, অবসর কালে বিভিন্ন পদ পাবার লালসায় নিজেদের, ঐ ফড়েদের
কাছে বিকিয়ে দেয়, তখন তো দেশের আইন বিপর্যস্ত হতে বাধ্য, দেশের উন্নতি সুদূর পরাহত। ঐ সমাজ- ফড়েদের বশংবদ হয়ে দেশ চালালে, সংবিধান ক্ষত- বিক্ষত হতে বাধ্য; তখন একমাত্র বিচার- ব্যবস্থাই ভরসা, কিন্তু সকলের পক্ষে তো আইনের কড়া নাড়া সম্ভব নয়, আবার সময় সাপেক্ষও বটে; অনেক সময়, তারিখের পর তারিখে লোকে ক্লান্ত হয়ে যায়। যাই হোক, কিছদিনের মধ্যেই বিক্ষুব্ধদের টনক নড়লো, মিলি- মিশি সরকারের পতন ঘটলো। রাষ্ট্রপতি শাসন চালু হল।
বাম- রাজনীতির এক অতি – বামের আবির্ভাব পঃ বাংলায় হয়েছে; এদের আওয়াজই হচ্ছে, প্রতিক্রিয়াশীলদের খতম কর, কিন্তু কে প্রতিক্রিয়াশীল, স্পষ্ট নয়। এদিকে,সি আর পি’র বুটের আওয়াজ ও ধর- পাকড় মাঝে মাঝেই চোখে পড়লেও, সমাজে শান্তি রইলো সুদূর পরাহত।
চলবে