সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব – ৩৫)

সাদা মিহি বালি
ষষ্ঠ অধ্যায়
তৃতীয় পর্ব
রাঘবেন্দ্র বাবু এখন আর খুব একটা বাড়ির বাইরে যান না। বাড়ির অফিসে গুঞ্জনই সব কাজ দেখাশোনা করে; প্রয়োজনে জ্যাঠামশাই’র পরামর্শ নেয়। দেশের রাজনৈতিক চরিত্রটা পাল্টিয়ে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে মানুষ জনের চারিত্রিক পরিবর্তনটাও স্পষ্ট; কেউই আর দেশের- দশের
কথা চিন্তা করে না। স্বাধীনতার এতো অল্প সময়ের মধ্যেই অবক্ষয় যে( ্কে্ক্কে্্কে্ক্কে্কে্ক্কে্্কে্ক্কে)দেশটাকে এত ক্ষত- বিক্ষত করে তুলবে, তা ছিল ভাবনার অতীত। পৈতৃক বালির ব্যবসা, প্রায় একদম বন্ধ; যে , যেখান থেকে পাড়ে, নদীর পার কেটে মাটি তুলছে, নদীর বুক থেকে অবৈজ্ঞানিক ভাবে সকলেই বালি তুলছে; নদী- খাত চুরি হয়ে আবাসন তৈরি হচ্ছে, ফলে, মাটির অভ্যন্তরে ঘটছে পরিবর্তন; আবাসনগুলো, কিছু দিনের মধ্যেই পড়ছে হেলে। কোর্ট তো রয়েছে সবার জন্য, ফাইল কর পিটিশন, পাবে কাজ বন্ধ করার ইনজাংসন। এখন, কোর্টের অর্ডারে বালি তোলা বন্ধ; দামী, দামী বালি তোলার মেশিন
গঙ্গার পারে নিস্তব্ধ, নিশ্চল। পাণ্ডুয়া- মগরা অঞ্চলের হলুদ, মোটা বালির পাহাড় থেকেও বালি বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে; বালির পাহাড়ের পাশ দিয়ে যাবার সময় ধশ নেমে একজন ছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হয়েছে গণ্ডগোল; ব্যস, জারি হয়েছে ইনজাংসন। আমাদের দেশে সাধারনের জন্য কোর্টে আছে, তারিখের পর তারিখ, কিন্তু, সমাজ- ফড়েদের জন্য প্রয়োজনে
গভীর রাতেও কোর্ট বসবে; হায় রে
বিচার- ব্যবস্থা! অমরের খুনের সংগে জড়িত ব্যক্তিরা, পুলিশের খাতায় ফেরার; কবে ফয়সালা হবে, কেউ জানে না। আসামীরা, দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছে, থানায় বসে, বড়বাবুকে ধমকাচ্ছে, কিন্তু, পুলিশের খাতায় বেপাত্তা।
নিরপরাধ মানুষ যে কত জেলে
পচছে, তার হিসাব কেউ দেবে না, গণতন্ত্র কী না!
সব ফড়েই বলে, আইন, আইনের মত চলবে। ঠিকই, যার চোখে ফেট্টি বাঁধা, সে তো লাঠি নিয়ে চলবে, রাস্তা পার হবে অন্যের হাত ধরে;এখানে কোর্টের লাঠি তো পুলিশ, ইডি, সিবিআই; তারা যদি তাদের নিয়ন্ত্রকের কথায় চলে, তবে কোর্টের চলা তো অ-চলাই থেকে যায়-শুধুই দিয়ে যায়, তারিখ, আর তারিখ।
রমেন্দ্রনাথের বালি সাপ্লাই পুরোদমে চলছে; দেশে, উৎপাদন শিল্পের মৃত্যু- ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের সমাজ- ফড়ে, আবাসন শিল্পের সংগে জড়িয়েছে; চাষীর বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে, জমি দখল করে, সেখানে তৈরি হয়েছে নতুন নগরী, নিউটাউন। চাষী বাড়ির বৌ- ঝিরা, ঐ সব আবাসনে ঠিকে -ঝি,ঠিকে-রান্নার কাজ পেয়েছে, অর্থাৎ চাষীর জীবন- চর্যায় ঘটলো অবাঞ্ছিত পরিবর্তন, হারালো চাষী আপন সত্তা।
বালি, পাথরের চাহিদা আকাশ- চুম্বী; গড়ে উঠেছে এখানে ওখানে সিন্ডিকেট; ফলতঃ, স্বার্থের কারণে, খুন, জখম; বাড়লো পুলিশের সব রকমের তৎপরতা। জেলার নদীগুলোর ঘাট- পারাপার
ব্যবসা চলছে, তবে আগের মত আর নয়।
শিবশংকরের ঠিকেদারী করা কারখানার নাভিশ্বাস উঠেছে, সৌজন্যে কারখানার শ্রমিক দরদী ইউনিয়ন – নেতা ও মালিকপক্ষের অনীহা। সে ও মাধব, গড়ে ওঠা নতুন ভোগীদার পার্টির তহবিলে মোটা রকম টাকা দিয়ে সদস্য হয়েছে। ভোগীদার পার্টিও লোক চেনে, ওদের সঙ্গে থাকা কয়েকশো লোকও পার্টির লোক হয়ে গেল; পার্টির বৃদ্ধি তো সব ফড়ের দলই চায়, ওরাই হবেতো দলের সম্পদ। দু’জনই সদস্য
হয়েছে, অর্থাৎ, সেই পুরোনো রেষারেষিও দলের মধ্যে অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠলো। স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটির নির্বাচনে, দু’পক্ষই প্রার্থী দিয়েছে। নির্বাচনে, একবার চেয়ারম্যান হয় শিবশংকর,তো ওর দলের ছেলেরা মিউনিসিপ্যালিটির সব কাজ টেন্ডার মারফৎ পাবে; হাইকম্যাণ্ডকে, শতকরা অংশ বুঝিয়ে দিয়ে চলছে লুঠ। অন্যদল, মাধবের দল তো চুপ থাকবে না, কায়দা করে কমিশনার কিনে, আনে অনাস্থা। এবার মাধব হয়েছে চেয়ারম্যান, চালাও পানসি, ওর লোকেদের পোয়াবারো, কেবল, হাইকম্যাণ্ডকে তার হিস্যা সময় মতো পৌঁছে দিতে হবে। দেশ, দশে চুলোয় যাক। কারখানা নেই, তো কী হয়েছে, গড় চোলাই কারখানা, ঠেক; মদের লাইসেন্স দাও ঢালাও, ঐখান থেকে এক্সসাইজ ডিউটি সরকারের ঘরে জমা হবে, ছেলেরা কাজ পাবে, আবার নেশাগ্রস্থ হবে, কোনদিন আর প্রতিবাদের পথে চলতে পারবে না। দলের ভাগ্যবানদের
মধ্যে উচ্ছিষ্ট কিছু ভাগ – বাটোয়ারা কর, যে যেখান থেকে পার রোজগার কর, ‘আমারটা সময় মত ঠিক পাঠাবে’, নচেৎ, পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চলবে