গল্পে উত্তম বনিক

আলেয়া

চিরকাল বদলির চাকরি করার সূত্রে কোনো শহরেই পুরোপুরি স্থায়ীভাবে বসবাস করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি সদ্য অবসর নেওয়া সুধীর দাসের। একমাত্র কন্যা আলেয়া এবং স্ত্রী অঞ্জলি তারা ও সুধীরবাবুর সাথেই এ শহর ও শহর চষে বেরিয়েছেন চিরকাল যাবত।

ছবির মতোন সুন্দর এ বাংলায় প্রকৃতি যেন তার অপরূপ সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে।
দিগন্ত বিস্তৃত অগাধ জলরাশির সমুদ্র, নদী, খাল, গহীন অরণ্য, পাহাড়, ঝরনা, সবুজ গালিচার মতোন চায়ের বাগান আরো কতকিছু। কি নেই এখানে, ঋতু চক্রের ছয়টি ঋতুই উপভোগ করা যায় মন ভরে। যা ভারতের অন্য কোনো রাজ্যেই নেই। তাই এ রাজ্য ছেড়ে নিজের জন্মস্থান দিল্লিতে আর ফিরে যাওয়ার মন করেনি সুধীরবাবুর। অনেক ভাবনা চিন্তা করে শেষে এই চায়ের শহরকে বেছে নিয়ে একটা আস্তানা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন সুধীরবাবু।

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শহরের কোলাহল থেকে একটু নিরিবিলিতে একটা পছন্দমত দোতলা বাড়িও পেয়ে গেলেন ভাগ্যের বরাতে। ভাবলেন এবার বাকি জীবনটা প্রকৃতির আপন হাতে গড়া এই শহরেই কাটিয়ে দেবেন।
ত্রিশ বছরের চাকরি জীবনে সাধারণ মানুষের পেছনে অনেক পরিষেবা দিয়েছেন সুধীর দাস। নিষ্ঠা সহকারে। কখনো কোনো দাগ লাগেনি তার চাকরি জীবনে, তাই তিনি একজন নিষ্ঠাবান সৎ মানুষ হিসেবেই পরিচিত।

নতুন বাড়িতে আগের মালিকের হাতে গড়ে তোলা একটা ছোট বাগান ও ছিল। হয়তো কোনো এক অভিশাপে সেই বাগান আজ এক মরুভূমির রূপ নিয়েছে। অনেকটা যেন তার নিজের জীবনের মতই।
চিরকাল মানুষের জন্য সেবা দিতে দিতে নিজের মাথাটাও যেন আস্তে আস্তে একটা মরুভূমির আকার ধারণ করেছে, ক্যাকটাসের মত কিছু কেশ এদিক ওদিক ঝুলছে। হয়তো তারা হেসে ইশারা করছে, আমরা খুব অচিরেই ঝরে যাবো। পারলে আমাদেরকে ও আগলে রাখ তোমার ওই বাগানটার মতোন।

বাবা, কি দেখছো এভাবে? এই নাও তোমার জন্য চা এনেছি।
বলতে বলতে আলেয়া এসে হাজির। ও কিছু নয়রে মা, এই বাগানটা দেখছিলাম। ভাবছি আবার নতুন করে গড়ে তুলব। কেমন হবেরে মা? খুব ভালো হবে বাবা। আমরা দুজনে মিলেই হাত লাগাবো। নতুন ভাবে গাছ লাগিয়ে খুব যত্ন করবো। ফুলে ফুলে ভরে উঠবে এই উঠোন। কত পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি এসে গুনগুন গান শোনাবে। মা যখন সকাল বেলায় স্নান সেরে গরদের শাড়ী পড়ে ফুলের সাজি নিয়ে ফুল তুলতে আসবে, তখন সেই অপরূপ দৃশ্য তুমি অবাক চোখে দেখবে! আহ্ সে কি যে অপার অনুভূতি। ভাবলেই রোমাঞ্চিত হতে হয়। চলোনা বাবা, আমরা আজ থেকেই শুরু করি! গড়ে তুলি আমাদের এক ছোট্ট পৃথিবী।

কয়েকদিনের পরিচর্যায় বাগানটা যেন পূর্ণিমার চাঁদের মতোন হেসে উঠেছে। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে চেয়ে দেখছে আলেয়া।
—কি’রে মা, এই বাগানের মত কি তোর জীবনটা আবার নতুন করে শুরু করা যায় না? কি এমন বয়স হয়েছে তোর, মাত্র তো আঠাশ। এর থেকে অনেক বেশি বয়সেও অনেক মেয়েরা নতুন করে ঘর বাঁধে। যা হয়েছে ভুলে যা, অতীত নিয়ে বেঁচে কি লাভ বল। অতীতের কাজই তো চিরকাল সবাইকে কাঁদানো। তুই নতুন করে শুরু কর লক্ষ্মী মা আমার। আলেয়া নির্বাক শ্রোতা হয়ে সব শুধু শুনে যায়।

মুখে যতই বলুক সুধীরবাবু, নিজে সে ভাল করেই জানে তার একমাত্র রাজকন্যা এই পৃথিবীতে মাত্র কয়েকটা দিনেরই অতিথি। যে কোনোদিন যে কোনো সময় উপরওয়ালার বার্তা এসে তার দরজায় কড়া নাড়া দিবে। হে ইশ্বর কি অপরাধ করেছিল আমার এই ফুলের মত মেয়েটা? শাস্তি যদি দিতেই হয় তবে আমাকেই দিতে।

দুবছর ধরে সুখেই তো সংসার করছিলো আলেয়া ও অনিমেষ।
অফিসের কাজে এ শহর ও শহর করে হেমন্তের ঠান্ডা বুকে বসে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কয়েকদিনের মাথায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিল অনিমেষ। তারপর কি যে হল- একদিন দুম করে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো অনিমেষ। এই আকস্মিক মৃত্যু মেনে নেয়া কঠিন। কোনো কারন ছাড়া কি করে একজন মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়???
অবশেষে পি. এম. রিপোর্টে জানা গেল অনিমেষ এইচ আই ভি পজিটিভ ছিল। হে ইশ্বর এ কি করে সম্ভব? অনিমেষের মতোন একজন সৎ মানুষ, তার কিনা এইচ আই ভি সংক্রমণ ছিল!
অনিমেষের মৃত্যু যতোটা না যন্ত্রণা দিয়েছিলো আলেয়াকে তার থেকে বেশি যন্ত্রণা দিয়েছিলো অনিমেষের বিশ্বাসঘাতকতা। কি ভাবে হল অনিমেষ এই মারনব্যাধির স্বীকার? হয়তো কোনো অবৈধ সম্পর্ক নয়তো হাসপাতালে ইঞ্জেকশন সূচের মাধ্যমে! নিজেকেই বারবার প্রশ্ন করে আলেয়া। উত্তর সময়ের গর্ভে।

অনিমেষের থেকেই আলেয়ার শরীরে ধীরে ধীরে থাবা বসিয়েছে এই মারনরোগ। অনেক চিকিৎসা হলো, কিছুতেই কিছু হলোনা। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার যন্ত্রণায় মেয়েটা তিল তিল করে শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা জীবের যেমন জন্ম একবার হয়, আবার মৃত্যু ও একবারই হয়। কিন্তু আমার কলিজার মৃত্যুটা যেন প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তেই বারে বারে হয়ে চলেছে। এবার শেষ একটা পরীক্ষা চেন্নাই থেকে করিয়েছেন সুধীরবাবু, আলেয়ার অনেক নিষেধ করার পরও। হয়তো কয়েকদিন পরেই রিপোর্ট আসবে। কি লাভ বাবা, আমার জন্য আর কতো করবে তোমরা? জীবনের সব সঞ্চয়ই শেষ করে ফেলছ আমার জন্য। আমিতো আর কয়েকটা দিনেরই অতিথি। তোমাদের চলবে কিভাবে ভবিষ্যতে?

আলেয়ার এই হৃদয়বিদারক কথাগুলো ফালা ফালা করে দিচ্ছিল সুধীর বাবুর হৃদয়কে। কি করে বোঝাবে মেয়েকে যে একজন পিতা তার কন্যাকে মনে কোথায় স্থান দেয়। যে মেয়ের জন্য ছেলেবেলায় কত রাতের পর রাত জেগেছে, বিছানায় হিসি করে দেওয়া জায়গাতে নিজে শুয়ে মেয়েকে পাশে শুইয়েছে, হাত ধরে হাঁটা শিখিয়েছে, মনে কষ্ট হলে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে নিজের কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছে। এইতো সেদিনের কথা মনে হয় যেন, যে নূপুর পড়ে ছোট্ট মেয়েটা উঠোনে দৌড়াত সে নূপুরের আওয়াজ আজও যেনো কানে বাজে। যে নূপুরের শব্দ কান থেকে আজও সাড়া দিয়ে যায়, সেখানে আজ মৃত্যুর ঘণ্টার আওয়াজ ও সাড়া দেয়। এমনকি হতে পারেনা যে মেয়ের বদলে যমরাজ আমায় নিয়ে যায়! এমন যদি হতো, তাহলে আমার জীবনের বেঁচে যাওয়া দিনগুলি সব ওকে দিয়ে দিতাম। আর হাসতে হাসতে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতাম।

শীতের সকালে বাগানের চেয়ারটায় হেলান দিয়ে একমনে তাদের বাগানের সৌন্দর্য দেখছিলেন সুধীর বাবু। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে তাদের বাগানটা। কতগুলো পাখি কিচিরমিচির করছে, ঠিক আলেয়া যেমন করতো ছেলেবেলায়। গাছে গাছে কিছু ফল ধরেছে। সূর্যের মিঠে রোদ, ফুলের সৌন্দর্য ও তাদের পাগল করা ঘ্রাণ আজ হঠাৎ করে সুধীর বাবুর খুব ভালো লাগছে যেন। এত সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে যেতে আর কার মন চায়, এই কথা ভাবছে।

বাবা, এই নাও তোমার চা। কখন যে আলেয়া পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তা বুঝতেই পারেনি সুধীর বাবু।
আজ বাগানের ফুলগুলো আলেয়ার সৌন্দর্যর কাছে যেন হার মেনে যাচ্ছে। কি অপরূপ লাগছে ওকে যেন সাক্ষাত কোনো দেবী স্বর্গের রাস্তা ভুল করে আমাদের বাগানে এসে পড়েছে।
আয় মা পাশে বোস একটু। পাশে নয় বাবা, তোমার বুকে একটু মাথা রেখে আদর খেতে চাই আমি। ঠিক সেই ছোট্ট বেলার মতো। নেবে বাবা, আমাকে তোমার বুকে একটু। আর কখনো এই আদর পাবো কিনা জানিনা, তাই এই লোভ আর সামলাতে পারছিনা বাবা। আয় মা’রে আমার বুকে আয়। তোর যতো ক্লান্তি, যন্ত্রণা আজ সব থেকে আমি তোকে মুক্তি দেবো।

বাবার বুকে মাথা রেখে মেয়ে যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে তা বুঝতেই পারেনি সুধীর বাবু। হঠাৎ কলিংবেলের শব্দে দুজনের সম্বিত ফেরে। চিঠি এসেছে চিঠি। অঞ্জলি দেবী বলছেন। এই বিরহের আনন্দ ছেড়ে ওঠার মন করছিল না একদম। অতি কষ্টে উঠে চিঠিটি কান্নাভেজা চোখে খুলে একটা মাত্র লাইন ই পড়তে পারলেন সুধীর বাবু… মিস আলেয়া দাস’স রিপোর্ট ইস নেগেটিভ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।