“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় উমা বসু 

নীল পালক

দিন সাতেক ধরে বিরামহীন রিমঝিম, ঝমঝম বৃষ্টির রেওয়াজ চলছে ।রাস্তায় জলের স্রোত ।তিস্তা বেপরোয়া ।রাগে ফুঁসছে ।ভাঙ্গার গর্জনে, ভাসিয়ে নেবার উন্মত্ত আনন্দে মজে আছে ।টিভিতে দেখাচ্ছে জলপাইগুড়ির বিভিন্ন অঞ্চল প্লাবিত ।শহরের প্রাণ কেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া করলা নদীর জলও ঘরছাড়া করেছে বহু মানুষকে ।দিনবাজারে কোমর সমান জল।মনসুনের দিন যেন আর কাটে না ।পাঁচমাস ধরে স্কুল যাওয়া বন্ধ ।বন্ধুদের সাথে দেখা সাক্ষাত, গল্প, খুনসুটি সব বন্ধ ।অনলাইন ক্লাসে কোনো প্রাণ খুঁজে পায় না সে।
প্রতিটা দুপুর তার বিষন্ন কাটে জানলার দিকে তাকিয়ে ।মন বারণ না মেনে ছুটে পালায় স্কুলের মাঠে ।বই হাতে  সে হারিয়ে যায় ।সময়ের বিপন্নতা মাপার চেষ্টা করে ।2020 সালটা সত্যিই বিষময় হয়ে উঠলো ।অথচ মা বলেছিল–
ওইসব ফেসবুকিয় মস্করায় মন দিস না ।বিষে বিষে বিষক্ষয় হয়ে বছরটা পৃথিবীর মানুষের জন্য অনেক সুখবর নিয়ে আসবে ।
কিন্তু, মায়ের আশা তো পূর্ণ হল না।
করোনা থাবা পেতে কর গুনছে মৃত্যুর সংখ্যার।চারিদিকে মৃত্যু ভয় ।তার ওপর আমফানের আস্ফালনে বিপর্যস্ত রাজ্য।তারও ওপর চিনা জুজুর ভয়।নিজের দেশে মানুষ পরিযায়ী ।প্রতিদিন এইসব খবর শুনতে শুনতে ভয়ে ভাবনায় ক্লান্ত হয়ে যায় সে।একটানা বৃষ্টি আজকেও তাকে ভাবনায় ভেজায়।
হঠাৎ দাদুর গলা শুনতে পেয়ে মনসুন অনেকদিন পর উৎফুল্ল হয়ে ওঠে ।দাদু ওর মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে বললেন —
দিদিভাই, হাতে বই নিয়ে অতসব কি ভাবছ?চোখ তো তোমার বইয়ের পাতায় নেই।
মনসুন দাদুকে পাশে বসিয়ে বললো —
দূর ছাই, এরকম বৃষ্টির দুপুরে কারো পড়তে ভালো লাগে? এসময় স্কুলে থাকলে আমরা কত মজা করতাম ।
দাদু বললেন –তোমাদের বড় কষ্ট তাই না?আচ্ছা বেশ তোমায় বরং একটা গল্প শোনাই।
ভীষণ খুশি হয়ে মনসুন বললো–তাহলে তো খুব ভালো হয় ।অনেকদিন তুমি গল্প বলোনি।
দাদু জমিয়ে বসে গল্প শুরু করলেন —
অনেকদিন আগের কথা ।তখন আমি কলেজে পড়ি।সেবারও খুব বৃষ্টি হয়েছিল ।টানা পাঁচদিন ঝড় বৃষ্টির পর দুপুর থেকে বিরতি দিল।আমিও আকাশ পরিস্কার দেখে বিকেলের শেষে একটা টিউশনি পড়াতে গেলাম ।পড়ানো শেষ না হতেই আবার শুরু হল ঝড় -বৃষ্টির প্রচন্ড তান্ডব ।যখন থামলো, তখন রাত হয়ে গেছে ।ঝুপসী অন্ধকার ।জলমগ্ন রাস্তা ।মাঝেমাঝে গাছের ডাল ভেঙে পড়েছে ।হাতে টর্চ নেই । ওরা দিতে চেয়েছিল কিন্তু বীরত্ব দেখাতে নিইনি।হাঁটুর ওপর প্যান্ট গুটিয়ে, অন্ধকারে চোখ সইয়ে  নিলাম ।এবার খুব ধীরে ধীরে ছলাৎ ছলাৎ করতে করতে আর নিজের বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটার আওয়াজ শুনতে শুনতে এক পা ,দু পা করে নির্জন রাস্তায় এগোতে লাগলাম ।একটু পরেই দেখি উল্টো দিক থেকে আলো হাতে কেউ আসছে ।জীবনে প্রথম ,মানুষ দেখে প্রচন্ড আনন্দ হল ।
আমাকে অবাক করে সেই আলো মানুষটি বললো–
চলো তোমাকে এগিয়ে দিই।
আমি ইতস্তত করে বললাম —
কিন্তু, আপনার পথ তো আমার উল্টো দিকে!
আলো মানুষটি বললেন —
তা হোক, আমার কাছে আলো আছে।তোমাকে আগে পৌঁছে দিয়ে আসি।
এই পরিবেশে আপত্তি করে  নিজের বীরত্ব দেখানোর মতো মনের জোর আর ছিল না।ইতিমধ্যেই দুবার হোঁচট খেতে খেতে বেঁচেছি।সহজ হওয়ার চেষ্টা করে বললাম —
আপনি আমাকে চেনেন?
লোকটি বললো–
তুমি তো আমাদের এলাকার সবচেয়ে ভালো ছাত্র ।তাছাড়া তোমার বাবা আমাকে চেনেন ।আমার নাম পিতাম্বর সেন।কাছেই থাকি।
আলো সঙ্গী পেয়ে গল্প করতে করতে জল ছলছল পথ পেরিয়ে বাড়ির কাছে চলে এলাম ।
এবার লোকটি বিদায় নিয়ে চলে গেল ।
বাড়ি ফিরে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম ।বাবাকে বললাম নির্জন অন্ধকার জলমগ্ন পথ পেরোতে পিতাম্বর সেন আমাকে কিভাবে সাহায্য করেছিল ।
বাবা সব শুনে আকাশ থেকে পড়ে বললেন —
কি যা তা বলছিস?ভয়ে ভাবনায় তোর মাথার ঠিক নেই ।পিতাম্বর সেন গত চারদিন আগে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টির রাতে ওর গ্রামের বাড়িতে বিদ্যুৎ পৃষ্ট হয়ে মারা যায় ।
শুনে তো আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল যেন ।তবু অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বললাম —
কই,কাগজে তো এই খবর দেখলাম না ।
বাবা বললেন —
সাধারণ গরিব মানুষের মৃত্যু সংবাদ দিতে ওদের বয়ে গেছে ।
আমি শুকনো গলায় বললাম —
অন্য কোনো পিতাম্বর সেন হতে পারে ।
বাবা গম্ভীর গলায় বললেন —
আমি তো ওই নামে একজনকেই চিনি।তাছাড়া আমাদের দুটো গলি পর ও ভাড়া থাকতো।
কিন্তু তাহলে আমাকে পৌঁছে দিয়ে গেল কে?
দাদা বিজ্ঞ হেসে বললো–
অন্য কেউ পৌঁছে দিয়ে, ভয় দেখানোর জন্য ওই নামটা বলেছে।
সবাই দাদা কেই সমর্থন করলো।
আমি কিন্তু নিঃসন্দেহ ছিলাম ।অন্ধকারের জন্য নাহয় তার মুখ দেখতে পাইনি ।কিন্তু পৌছানোর পর ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে পিছন ফিরে তাকে আর দেখতে পেলাম না যে।তখন নিজের প্রাণের তাগিদে সে কথাটা তলিয়ে ভেবে দেখি নি।
তারপর ঈষৎ হেসে দাদু বললেন —
বুঝলে দিদিভাই, মানুষ বিপদে পড়লে কোনো কোনো সময় ভুতেরাও সাহায্য করে ।
মনসুন এতক্ষণ চোখ বড় বড় করে দাদুর গল্প শুনছিল।এবার অবিশ্বাসের গলায় বললো — এই গল্পটা নিশ্চয়ই তুমি বানিয়ে বললে ।কেননা, সত্যিই তো ভুত বলে কিছু নেই পৃথিবীতে ।
দাদু বললেন —
সে তুমি বিশ্বাস না করতেই পারো।কিন্তু ঘটনাটা সত্যি ।
যা হোক, আমার গল্প শেষ ।এবার তবে আমি যাই বিশ্রাম করি গিয়ে ।তুমি পড়।
আর এটা তোমার হাতে রাখো–বলে, বুকপকেট থেকে একটা রঙিন পালক বের করে মনসুনের হাতে দিলেন ।
তারপর চুপিচুপি বললেন —
এটা সেই রাত্রে পিতাম্বর সেন আমাকে দিয়েছিল ।বলেছিল, বইয়ের ভাজে রেখে দিতে ।তাহলে তার কথা আমার মনে থাকবে ।আজকে এটা তোমাকে দিলাম ।রেখে দিও।
দাদু চলে যাওয়ার পর মনসুন গাঢ় নীল রঙের পালকটা দেখতে লাগলো মন দিয়ে ।
হঠাৎ  ঘাড়ে একটা জোর ঝাঁকুনি খেয়ে সে বিরক্ত হয়ে তাকালো ।
মা এসে ঝংকার দিয়ে বলে উঠলো —
পড়াশোনার নাম নেই শুধু ঘুম আর ঘুম ।এ মেয়ের পড়াশোনা হবে না মোটেই ।
মনসুন ও ঝাঁঝের সাথে বললো —
ঘুমোচ্ছি কোথায়? গল্প শুনছিলাম তো দাদুর কাছে ।
বলতে বলতেই সামনের দেওয়ালে চোখ পড়তেই তার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো ।
ফ্রেমে বাঁধানো ছবির মধ্যে দাদু হাসছে ।চারবছর ধরে হাসিটা একই আছে ।
তাহলে কি ও এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল?
মায়ের বকবকের মধ্যেই হঠাৎ হাতের দিকে চেয়ে ,ধরে থাকা নীল পালকটা দেখতে পেয়ে কেঁপে উঠলো আপাদমস্তক ।
মাকে বললো কথাটা ।
পাশ ফিরে শুতে শুতে মা বললো —
ভুতের গল্প পড়ে পড়ে তুই নিজেই একটা ভুত হয়ে গেছিস।তোর ভবিষ্যৎ এই পালকের মতোই NIL
হতবাক মনসুন ঘোর লাগা চোখে পালকের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে চুপচাপ ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।