ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ১০)

আলাপ

আলাপের পাতায় এর আগে প্রথমে এসেছে এক একটি ঘরানার কথা, তারপর সেই ঘরানার বিখ্যাত শিল্পিদের কথা। এবার যে দুটি ঘরানার কথা বলবো, সেই দু ঘরানার জন্ম নিয়েছেন বর্তমান ভারতের এমন দুই বিখ্যাত শিল্পি, যে তাঁদের ঘরানার কথা পরে আসে, আগে আসে তাঁদের দুজনের নাম। ভারতবর্ষের বর্তমান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কথা বললেই তাঁদের নামদুটিই সবার মনে আসবে। একজন অপেক্ষাকৃত নবীন এবং অন্যজন অত্যন্ত প্রবীণ, গত বছর তাঁকে আমরা হারিয়েছি। আশা করি এতক্ষণে বিদ্বতজন বুঝে গেছেন কাদের কথা আমি বলছি। বোঝেননি? বেশ তবে শুরু করি প্রথমজনের কথা ও একটি গল্প দিয়ে।
উত্তরপ্রদেশের গঙ্গার ধারের ছোট্ট শহর রামপুর। তাকে শহর না বলে গ্রাম বলাই ভালো। সময় ভোর চারটে। আকাশে আলো ফোটেনি। বাইরে প্রবল শীত! সাত আট বছরের এক বালক আরো কটি ভাই বোনের সঙ্গে মেঝেতে রজাই গায়ে ঘুমিয়ে কাদা। ঘরের দরজা একটু ফাঁক হলো। এক দীর্ঘদেহী মানুষ ঢুকে এলেন ঘরে। পরনে পায়জামা আচকান কম্বলের লম্বা কোট, মাথায় তিরছি টোপি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। হাতে একটি লোহা বাঁধানো লাঠি। নির্ভুল লক্ষ্যে লাঠিটি খোঁচা মারলো সাত আট বছরের ছেলেটির পিঠে। ছেলেটি গভীর ঘুমে। গত বছর ওর আম্মি মারা গেছে কলেরায়। মারা গেছে একবারে শিশু ভাইটিও। ছেলেটির সাড় নেই। দীর্ঘদেহী লোকটির মন বুঝি একটু নরম হলো। একেবারে বিন মা কে বাচ্চে! শত হলেও তারই তো বোন ছিলো। কিন্তু পর মূহূর্তেই মনকে শক্ত করে আবার খোঁচা! এবার চোখ ডলতে ডলতে ও পাশ ফিরে আরো ভালো করে চাদর ঢাকা দিলো ছেলেটি! নাঃ আর ধৈর্য নেই। ছেলেটির কানে এক পাক পড়লো এবার। চমকে উঠে বসলো ছেলেটি। নেহাত অনিচ্ছায় বললো “অভি তো সুবহ নহী হুই!” দীর্ঘদেহী লোকটি শুধু বললেন “রিওয়াজকে লিয়ে ইয়েহি সবসে আচ্ছা ওয়াক্ত হ্যায়! আগর মেরা শাগির্দ বননা চাহতা হ্যায় তো আভি শুরু করনা হোগা! আভি তেরা দশ ঘন্টে কি রিওয়াজ চালু হোগা আজ সে!” বাচ্চাটির মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লেও সে উঠে ধীরে ধীরে দরজা দিয়ে বেরোতে গিয়েই দৌড়ে ফিরে এলো! বাইরের শীত যেন ফালা ফালা করে দিচ্ছে! দীর্ঘদেহী মানুষটি কম্বলের কোট খুলে জড়িয়ে দিলেন গায়ে। কোনক্রমে বাইরে প্রাতঃকৃত্য সেরে পাশের ঘরে গেলো বালক! সেখানে তখন উস্তাদ নিসার হোসেন খান ভৈরবের কোমল ঋষভ লাগিয়েছেন! গম্ভীর মন্দ্র স্বর্গীয় সে সুর। বালক তার ছোট তানপুরা নিয়ে বসে গেলো। বিশুদ্ধভাবে একই ভাবে কোমল ঋষভ লাগালো! এইটুকু বয়সে স্বর এতোটুকু নড়ে না বালকের! খুশী হলেন উস্তাদ! বললেন “রিওয়াজ জারী রাখ! ভৈরোঁ কা আরোহ ঔর অবরোহ এক এক কো শও বার কর! স্বর কা ওয়াজন বঢ়ানা হোগা!” এক মনে একই ভাবে সেধে চললো ছেলেটি – আজকের উস্তাদ রশিদ খান। রশিদ জানেন তাঁর দ্বারা গান বাজনা ছাড়া আর কিছু হবে না। আম্মি মারা যাওয়ার পর আব্বা বম্বেতে পড়তে পাঠিয়েছিলেন এক কাকার কাছে। না তাঁর মাদ্রাসায় যেতে ইচ্ছে করে, না পড়ার বইয়ের কিচ্ছু মাথায় ঢোকে। সারাদিন আম্মির জন্য মন কেমন করতো আর এই জন্মস্থান রামপুরের জন্য! ছোড়া গঙ্গাকিনারেওয়ালার মন পড়ে থাকতো রামপুরের গঙ্গার তীরে! সেখানেই তো আম্মির কবর! দফন আছে ছোট্ট ভাইটাও। ফিরে এসেছিলো রশিদ। তারপর উস্তাদ নিসার হোসেন তাঁর পক্ষপুটে আশ্রয় দিয়েছিলেন তাঁকে, খুলে গেছিলো এক নতুন জগত! আহা, সেই জগতে কতো আলো! সুরের আলো! আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছিলো বালক! শুরু হলো গান্ডা বাঁধা এবং কঠোর সাধনা গুরু নিসার হোসেন খাঁর দেখানো রাস্তায় রামপুর সাহস্বান ঘরানার ঐতিহ্য মেনে। সুরে ভরে উঠতে লাগলো গঙ্গাতীর! ভোরবেলা থেকে কখনো গুণকেলী অথবা রামকেলীর সুর ভেসে আসে, কখনো বা সূর্য ঢলার সাথে সাথে মূলতানি, ইমনের সুরে ভরে ওঠে গঙ্গাতীর! মিশে যায় মসজিদের আজানের সঙ্গে! গভীর রাত্রিকে মথিত করে ভেসে আসে দরবারীর সুর “কিন কারণ কান ভরে!” প্রথম এগারো বছর বয়সে স্টেজে গান করলেন রশিদ! ঐটুকু বয়সে আশ্চর্য সাবলীল গায়ন! সতেরো বছর বয়সে প্রথম আই টি সি সমারোহে দিল্লীতে গান গাওয়া, স্কলারশিপ প্রাপ্তি এবং কলকাতায় সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমীতে এসে বাসা বাঁধা! টালিগঞ্জের এই গাছে ঢাকা সঙ্গীতের পীঠস্থানেও নাকি সকাল হলেই গাছের পাখীর কিচমিচের সঙ্গে শোনা যেতো রশিদ খানের গম্ভীর মন্দ্র রিওয়াজ! কারণ ততদিনে সেখানে গুরু হয়ে এসেছেন উস্তাদ নিসার হুসেন খান। সেই দশ ঘন্টে কি রিওয়াজ না করিয়ে তিনি তো ছাড়বেন না তাঁর শাগির্দকে! তারপরের কাহিনী ইতিহাস। ঘুরে আসছি সে ইতিহাসে। তার আগে বলে নিই রামপুর সাহস্বান ঘরানার কথা স্বল্প করে এবং অবশ্যই উস্তাদ নিসার হুসেনের কথাও। তিনিই যে এই ঘরানার অন্যতম ধারক ও বাহক!
রামপুর সাহস্বান ঘরানার সূচনা উত্তরপ্রদেশের রামপুর স্টেটের সভাগায়ক বিখ্যাত খেয়ালিয়া মেহবুব খানকে দিয়ে। তবে এই ঘরানার বৈশিষ্টগুলি সম্পূর্ণ বিকশিত হয় তাঁর পুত্র ইনায়েত হোসেন খানের সময় থেকে। তাই ইনায়েত হোসেন খানকেই এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। ১৮৪৯ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত এই ঘরানার পরম্পরাকে তিনি এগিয়ে নিয়ে যান। ইনায়েত হুসেন শুধু যে মেহবুব খানের কাছে শিক্ষা পান তাই নয়, তিনি সেনিয়া ঘরানার বিখ্যাত রবাব বাদক বাহাদুর হুসেন খানের কাছেও শেখেন। তার ফলে এই ঘরানায় গায়কী স্টাইলের সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রসঙ্গীতের কিছু স্টাইল চলে আসে। যেমন ঝালা স্টাইলে তান করা, অথবা ডিরি-ডিরি বানী দিয়ে তারানা ইত্যাদি। সেগুলি শুনতে কিন্তু একেবারে নতুন এবং মনোগ্রাহী ছিলো। ইনায়েত হোসেনের কাছে শিক্ষাপ্রাপ্ত হন তাঁর সম্পর্কিত ভাই নিসার হোসেন খান। এ ছাড়াও নিসার হোসেন তাঁর বাবা ফিদা হোসেনের কাছেও শিক্ষা করেন। দেখা যায় যে এই ঘরানার গায়কেরা মূলতঃ নিজের পুত্র ও আত্মীয়দের মধ্যেই তাঁদের ঘরানাকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। এই ঘরানার প্রায় সব উস্তাদরাই হয় ইনায়েত হুসেন বা ফিদা হুসেনের সাথে রক্তের সম্বন্ধ রাখতেন। পরিবারের বাইরে নিজেদের ঘরের সঙ্গীত, অপূর্ব বন্দিজ, তারানাগুলি তাঁরা শেখাতে চাইতেন না। এই ঘরানার গায়কদের আদি বাসস্থান ছিল সাহস্বান এবং পরে রামপুরের রাজার কোর্টে তাঁরা সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। তাই দুটি জায়গার নামই ঘরানার নামে সংবদ্ধ।
ঘরানার গায়কীর বৈশিষ্টগুলির সঙ্গে সেনিয়া রবাব ঘরানা ছাড়াও গোয়ালিয়র ও আগ্রা ঘরানার অনেক মিল পাওয়া যায়। এর কারণ হাদ্দু খান, যিনি ইনায়েত হোসেন খানের শ্বশুর ছিলেন। বিভিন্ন ঘরানার সংমিশ্রণে এই ঘরানার স্টাইল অত্যন্ত মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে। এই ঘরানার রাগ বিস্তার করা হয় বেশ ধীর লয়ে। বুলন্দ আওয়াজ অর্থাৎ খোলা গলায় গান গাওয়া ঘরানার বৈশিষ্ট। মধ্যলয়ে তালের সঙ্গে খেলা করে রাগদারীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম তান এই ঘরানার আরেকটি বিশিষ্টতা। এ ছাড়া দ্রুত বন্দিশের পর তারানা অবশ্যই গাওয়া হয়। নিসার হুসেন খান সাহেবের তারানা ছিলো বিখ্যাত! তিনি একবার ইমদাদ খানের সুরবাহার শুনে এতো মুগ্ধ হয়েছিলেন যে সুরবাহারের ঝালাকে হুবহু তারানায় প্রকাশ করে শুনিয়েছিলেন। নিসার হোসেন খানকে শেষ ঘরানেদার উস্তাদ বলা হয়। তাঁর গান এতোই আকর্ষক ছিলো যে বরোদার রাজা বিশেষ ভাতা দিয়ে তাঁকে বরোদার সভাগায়ক হিসাবে নিয়োগ করেন। তারপর তিন দশক তাঁর কাছেই ছিলেন নিসার হোসেন। এ ছাড়াও তিনি আকাশবানীর নিয়মিত টপ গ্রেড শিল্পি এবং পদ্মভূষণ ছিলেন। সঙ্গীত নাটক আকাদেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত ছিলেন। নিসার হোসেন খান তানসেন পুরস্কার লাভ করেন এবং গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ের ডকটরেট উপাধী লাভ করেন। তবে একসময় বরোদার সভা ছেড়ে রামপুরে ফিরে আসেন ও মূলতঃ সঙ্গীতশিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। শেষ বয়সে তিনি কলকাতায় আই টি সি সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমীতে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন এবং জীবনের শেষদিন অবধি এখানেই ছিলেন।
ফিরে আসি রশিদ খানের কথায়। রশিদ খান শিশু বয়স থেকেই ছিলেন এক বিস্ময় বালক! ঘরানার সমস্ত রাগ, বন্দিশ, তারানা তিনি আয়ত্ত করেন নিতান্ত কিশোর বয়সেই। তাঁর স্বাভাবিক গম্ভীর মন্দ্র কন্ঠটি পড়লেই যে কোন সভা জমে ওঠে। রোগা কালো নেহাতই চোখে পড়ে না এমন একটি কিশোর যখন স্টেজে উঠে গলা ছাড়তেন, মনে হতো এই আওয়াজ কি ঐ কিশোরের গলা থেকে বেরোতে পারে? অদ্ভুত পরিপক্কতা তিন সপ্তক বিহারী গলায় ও সুরে। তাতে অবগাহন করলে বার বার অবগাহন করতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু শুধু কি অসাধারণ রিওয়াজ ও সুরের ব্যাপ্তি এবং ঘরানাদার শিক্ষা, রাগ, বন্দিশ, তারানার ওপর দখল তাঁকে রশিদ খান বানিয়েছে? উঁহু। তাহলে কি সেই অদ্ভুত রস যা দিয়ে রশিদ খান পাগল করে দেন জনমানসকে? সেটি হলো তাঁর গানের আবেগ। নিসার হোসেন খানের সময় পর্যন্ত গানের সমঝদার ছিলেন দেশীয় রাজারা এবং তাঁদের সভাসদবর্গ। তাঁরা খেয়াল গান বা শাস্ত্রীয় সংগীতকে বিচার করতেন গানের প্রযুক্তিগত দিকটি, কত কঠিন রাগবিস্তার বা তান কত সহজে উস্তাদরা করছেন, এবং তাঁদের ওস্তাদি দিয়ে কিভাবে সবাইকে বিস্মিত করে দিতে পারেন তাই দিয়ে। আবেগ তাঁদের কাছে প্রধান ছিলো না। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেশীয় রাজারা যখন বিদায় হলেন তখন রাগসঙ্গীতের প্রধাণ সমঝদার শ্রোতা হলেন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ। পুরানো উস্তাদদের গায়কী তাঁদের কাছে বড়ো শুষ্ক লাগতে লাগলো। তাঁরা চাইতেন গানের মধ্যে আবেগ। রশিদ খান তাঁর গানে অপূর্ব কন্ঠস্বর ও রাগদারীর সঙ্গে অনায়াসে ভরে দিতে লাগলেন মেলডি ও আবেগ! আপামর ভারতবর্ষ ভক্ত হয়ে পড়লো সেই সঙ্গীতের। সাধারণ মানুষ একাত্ম হয়ে পড়লো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে। কলকাতাকে বাড়িঘর করে বাঙ্গালী মেয়েকে বিয়ে করে ওস্তাদ রশিদ খান হয়ে পড়লেন আমাদের ঘরের ছেলে। কত চাঁদনী রাতে শুনেছি ওস্তাদের চাঁদনী কেদার! কত বরষা যে কেটেছে ওস্তাদের গভীর মন্দ্র কন্ঠে মেঘমল্লার, সুরমল্লার, মিয়ামল্লার ও সুরদাসীমল্লারের সুরে সুরে, অথবা মধ্যরাতে অসাধারণ মালকোষ ও দরবারীর মূর্ছনায়। কোথায় ঘরানা লীন হয়ে গেছে ওস্তাদের নিজের গায়কীর কাছে! উস্তাদ নিসার হোসেনের তারানাকেও তিনি সাজিয়ে নিয়েছেন নিজের মতো করে। সে স্টাইল তাঁরই।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।