ধারাবাহিক প্রবন্ধে তপশ্রী পাল (পর্ব – ৩৮)

আলাপ

১৯৩০ এর দশকে কলকাতায় সঙ্গীত জগতের বহু জ্ঞানী গুণী মানুষ এসে জড়ো হন। এর প্রধাণ কারণ কলকাতার সঙ্গীত সমঝদার মানুষজন এবং তৎকালীন জমিদার ও রাজাদের মহফিলগুলি, যেখানে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নৃত্যের কদর তখন তুঙ্গে। সিনেমা তখন সবে নির্বাক থেকে সবাক হবার পথে। সেখানেও নৃত্য গীতের ব্যবহার শুরু হলো। এই পরিবেশে এবং এই সময়ে পন্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের বয়স বিশের কোঠায়। তিনি তখন তরুণ যুবক। স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে পাশ করেছেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। গানবাজনারই বাড়ি তাঁদের। তাঁর পিতামহ দ্বারকানাথ ঘোষ তাঁর নিজের মডেলে হারমোনিয়াম যন্ত্রটি তৈরী করেন এবং “ডোয়ারকিন” বলে বিখ্যাত হারমোনিয়াম তৈরীর কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করেন। সেই হারমোনিয়াম অত্যন্ত জনপ্রিয় তখন। ফলে বেশ অবস্থাপন্ন ঘরেই তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কানে হারমোনিয়ামের সুর! কিন্তু তাঁর মন তখন খেলাধূলায়! সাহেবদের খেলা ফুটবল, হকি, পোলো, বিলিয়ার্ড সবেতে উৎসাহ! সবই খেলতে পারেন। সেই সঙ্গে কখনো গান গাইছেন, কখনো হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন, কখনো বা আঁকছেন ছবি! সবের ওপরে ভালোবাসেন ফুটবল! নিয়মিত ময়দানে প্রাকটিস করেন! কিন্তু ভবিতব্য খন্ডাবে কে? একটি ফুটবল ম্যাচে চোখে প্রবল আঘাত পেলেন জ্ঞানপ্রকাশ! নষ্ট হয়ে গেলো একটি চোখ! বন্ধ হয়ে গেলো সবরকম খেলা! অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়লেন তিনি! সেই সময় পিতামহের পরামর্শে আঁকড়ে ধরলেন সঙ্গীতকে! অত্যন্ত প্রতিভাবান জ্ঞানপ্রকাশ গান শিখতে লাগলেন গিরিজাসংকর, উস্তাদ সাগিরুদ্দীন খান ও দবীর খানের কাছে। হারমোনিয়াম বাজনা তো ছিলই। এর সঙ্গেই তবলা শিক্ষা শুরু করেন ফারুখাবাদ ঘরানার উস্তাদ মসীত খানের কাছে।
তাঁর বাজনায় প্রধাণতঃ ফারুখাবাদ ঘরানার ছাপ ছিলো বটে কিন্তু তিনি শুধুমাত্র একজন গুরুর শিক্ষায় বা কায়দায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। এই সময় লক্ষ্ণৌ থেকে কলকাতায় আসেন উস্তাদ আজিমবক্স খান তাঁর নিজস্ব ঘরানার স্টাইল নিয়ে। পাঞ্জাব থেকে আসেন উস্তাদ ফিরোজ খান! পন্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ এই তিনজনের কাছেই শিখতে লাগলেন এবং তিনটি ঘরানার স্টাইলই আত্মীকরণ করলেন!
এরপর জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রোডিউসার হিসাবে চাকরীতে যোগ দেন এবং বহু ছাত্রছাত্রীকে গান ও তবলা শেখাতে শুরু করলেন। তিনি নিজে পারফরমার না হয়ে শিক্ষাদান এবং ছাত্রছাত্রীদের তৈরী করাই জীবনের লক্ষ্য হিসাবে নিলেন।
তিনি গুরুশিষ্য পরম্পরায় শিক্ষা দিতেন। ছাত্ররা তাঁর বাড়িতেই থাকতেন। তিনটি জেনারেশনের তবলিয়া তাঁর কাছে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়েছে। তাঁর শিক্ষাদানেই যেন তবলার এক কলকাতা ঘরানা তৈরী হয় তাঁর জীবৎকালেই। তাঁর প্রথম দিককার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন পন্ডিত নিখিল ঘোষ, পন্ডিত কানাই দত্ত, পন্ডিত শ্যামল বোস, পন্ডিত শংকর ঘোষ। তার পরবর্তী প্রজন্মে পন্ডিত সঞ্জয় মুখার্জী, পন্ডিত অনিন্দ্য চ্যাটার্জী প্রভৃতি এবং এরও পরবর্তী প্রজন্মে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের ছাত্র কানাই দত্তের ছাত্র পন্ডিত তন্ময় বোস, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের পুত্র পন্ডিত মল্লার ঘোষ, শংকর ঘোষের পুত্র পন্ডিত বিক্রম ঘোষ প্রভৃতি! প্রতিটি নামই তবলাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়! কলকাতার এই তবলিয়াদের নাম ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে! ডোভার লেন সঙ্গীত সম্মেলনে এঁদের প্রত্যেকের একক বাদন, যৌথ বাদন এবং সঙ্গত শোনার অবকাশ হয়েছে বহুবার! তাঁদের বাজনা সঙ্গীতকে যে স্তরে নিয়ে যায় তা না শুনলে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

পন্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ মূলতঃ ফারুখাবাদ ঘরানায় শিক্ষা দিলেও তার সঙ্গে লক্ষ্ণৌ ও পাঞ্জাব ঘরানার শ্রেষ্ঠ জিনিসগুলি মিশিয়ে এক নিজস্ব ঘরানা তৈরী করেন। নির্দ্বিধায় ছাত্রদেরও সেই স্টাইল ও সেই সব চিজ দিয়ে যান। তাতে যেমন ছিলো ফারুখাবাদ ঘরানার কায়দা, টুকরা, তেমনই ছিলো পাঞ্জাব ঘরানার পাখোয়াজধর্মী জোরালো সব বোল! পন্ডিত শংকর ঘোষ তাঁর এক ইন্টারভিউতে গুরু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের বৌবাজারের বাড়িতে তাঁর শিক্ষার দিনগুলির কথা বলেছেন! সেই বাড়িতেই বাস করতেন ছাত্ররা। সন্ধের পর তিনি ছাত্রদের রেওয়াজ শোনা শুরু করতেন। যদি বাজনায় কোন ভুল থাকতো তা সঙ্গে সঙ্গে ধরিয়ে দিতেন! প্রিয় ছাত্র শংকর ঘোষকে ডেকে পাঠাতেন রাতের খাওয়ার পর। তাঁর শয়নকক্ষে একটি খাতা নিয়ে চলে যেতেন শংকর ঘোষ! জ্ঞানবাবু সেই খাতায় হয়তো তাঁর খেয়াল মতো লিখে দিলেন একটি নতুন স্বল্পপরিচিত কায়দা! সেটি লিখে নিয়ে প্রবল উৎসাহে তক্ষুণি সেটি রেওয়াজ করতে বসে যেতেন তিনি। শংকর ঘোষ বলেছেন সেই সময় জ্ঞানবাবুর বাড়িতে এসে থাকতেন পাঞ্জাব ঘরানার উস্তাদ ফকিরবক্সের ছাত্র উস্তাদ ফিরোজ খানসাহেব। তিনি ছিলেন আরেক বিখ্যাত চরিত্র। জ্ঞানবাবু নিজেও শিখেছেন তাঁর কাছে। জ্ঞানবাবুর প্রথম যুগের ছাত্রদেরও সুযোগ হয়েছিলো উস্তাদ ফিরোজ খানের বাজনা শোনার ও শেখার! অত্যন্ত জোরালো পাখোয়াজধর্মী ছিলো তাঁর পাঞ্জাব ঘরানার বাজ। “ঘেদান”, “ধাদান” প্রভৃতি বোল ছিলো এই ঘরানায়। উস্তাদ নিজে লুঙ্গি পরে শেখাতে বসতেন। রেওয়াজের ব্যাপারে খুব কঠোর ছিলেন। ভুল করলে মার পর্যন্ত পড়েছে ছাত্রদের ওপর।

এ প্রসঙ্গে এক অদ্ভুত গল্প বলেছেন পন্ডিত শংকর ঘোষ। কলকাতায় স্বাধীনতার ঠিক পরেই যখন রায়ট লাগে তখন রায়টারদের থেকে বাচানোর জন্য তাঁকে একটি ঘরে বন্ধ করে রাখা হয়। কিন্ত তিনি তবলা না বাজিয়ে থাকতে পারতেন না। ফলে সেই ঘরের দরজাতেই বাজাতে শুরু করেন নানা বোল এবং রায়টারদের নজর পড়ে সেই আওয়াজের দিকে তখন দরজা ভেঙ্গে তাঁকে খুন করে যায় তারা!
জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের বাড়িতে তাঁর কাছে শেখার সময় তাঁর ছাত্ররা গুরুর শিক্ষাদানের পাশাপাশি বিশেষ আকৃষ্ট হতেন উস্তাদ কেরামতুল্লা সাহেবের বাজনায়। লুকিয়ে তাঁর বিশুদ্ধ ফারুখাবাদ স্টাইলও নকল করতেন তাঁরা। সব্ধরণের বাজের শ্রেষ্ঠটুকু নিয়ে নেওয়ার এক অদম্য আগ্রহ ছিলো এই ছাত্রদলের। পন্ডিত অনিন্দ্য চ্যাটার্জী বলেছেন একবার গুরু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ রেডিওতে সেতারের সঙ্গে তবলা শুনছেন। হঠাত তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন এই তবলা কি কেরামত বাজাচ্ছেন? ভয়ে ভয়ে অনিন্দ্য বললেন যে সেটি তাঁরই বাজনা! তিনি ভেবেছিলেন গুরু রাগ করবেন। কিন্তু তিনি খুশীই হয়েছিলেন। ছাত্ররা তাঁদের নিজস্ব স্টাইল নিজের পছন্দমতো তৈরী করে নিক এটাই গুরু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ চাইতেন। তাই তো তাঁর এক একজন ছাত্র নিজের নিজের বাজনায় বিখ্যাত হয়েছেন!
জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের এই বিখ্যাত ছাত্রের দল ছড়িয়ে পড়েন গোটা বিশ্বে! পন্ডিত শংকর ঘোষ বাজাতে শুরু করেন উস্তাদ আলি আকবর খানের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গেই আমেরিকায় তাঁর কর্মশালায় দীর্ঘদিন বসবাস করেন তিনি। অন্যান্যরাও কেউ নিখিল ব্যানার্জীর সঙ্গে, কেউ পন্ডিত রবিশংকরের সঙ্গে, কেউ বা দুরদর্শনের স্টাফ আর্টিস্ট হিসাবে, কেউ বিলায়েত খান সাহেবের সঙ্গে, কেউ উস্তাদ আমজাদ আলি খানের সঙ্গে দীর্ঘদিন বাজান। সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব একক অনুষ্ঠানেও মুগ্ধ করেন শ্রোত্রিমন্ডলীকে।
গুরু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ তাঁর নিজের শিক্ষাদানের জন্য একটি স্কুল তৈরি করেন এরপর। তার নাম দেন সৌরভ একাডেমী। এ ছাড়া তিনি প্রচুর গান লেখেন এবং সুর দেন বেশ কটি সিনেমায়, যার মধ্যে আছে যদুভট্ট, আঁধারে আলো এবং রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত। পন্ডিত ভি জি যোগের সঙ্গে তার বিখ্যাত তবলাবাদনের রেকর্ড “দ্য ড্রামস অফ ইন্ডিয়া”। গুরুজী সঙ্গীত নাটক আকাদেমী পুরস্কার এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন। তার এই ডিক্সন লেন বৌবাজারের বাড়িতে
বড়ো বড়ো গান ও তবলার আসর বসতো। এই শহরের এবং বাইরের বহু সংগীতজ্ঞ আসতেন ও পারফর্ম করতেন এখানে। এসেছিলেন উস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খানের মতো মানুষও। ১৯৯৭ সালে গুরু শ্রী জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের মৃত্যু হয়। কিন্তু গান ও তবলার জগতে তিনি অমর হয়ে আছেন।
এর পরের পর্বে থাকবে তবলার পঞ্জাব ঘরানার ও তার দুই বিখ্যাত শিল্পীর কথা।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।